modi and mamata
ছবি সৌজন্যে দ্য হিন্দুস্তান টাইমস।
debarun roy
দেবারুণ রায়

বোধহয় আর শেষরক্ষা হল না। হয়তো শেষ বারের মতোই কোনো সুপরামর্শ এসেছিল। মাননীয় মোদীর নামে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সারা দেশের কাছে ফাটাফাটি একটা ব্রেকিং নিউজ। ভাবা যায়? দেশের প্রধানমন্ত্রী, যে পদকে আবার সংঘের সংস্কারিরা ‘পন্ত প্রধান’ও বলেন (আডবাণী কথিত), তো তাঁর মতো একজন ডাকসাইটে নেতা প্রেস কনফারেন্স বা সাংবাদিক বৈঠক করবেন, সেটা একটা দুনিয়াকাঁপানো ঘটনা হতে পারে? সাধারণ অবস্থায় কখনোই নয়। সাংবাদিক বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘোষণা বা সিদ্ধান্ত অবশ্যই বড়ো খবর হতে পারে। কিন্তু প্রেস কনফারেন্স হবে, শুধুমাত্র এটুকু কেবল সাংবাদিকদের জন্যই জরুরি। সেই সঙ্গে মুষ্টিমেয় আগ্রহী জনতা সময়টা জেনে নিয়ে টিভিতে চোখ রাখতে পারেন। কিন্তু না। মোদী এই না-হওয়া সাংবাদিক বৈঠকের ব‍্যাপারটাকে একটা অসম্ভবের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের পাঁচ পাঁচটা বছরে একটাও প্রেস কনফারেন্স না করে। তাই বারাণসী সফরের শেষ কর্মসূচি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা, দিকে দিকে এই বার্তা রটি গেল ক্রমে। এবং দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর সরকারি ও দলীয় সূত্র থেকে তা খণ্ডন করাও হল। তবে সরাসরি নয়। জানিয়ে দেওয়া হল শেষ কর্মসূচি, এবং সেটা মোটেই প্রেস কনফারেন্স নয়।

আরও পড়ুন অচ্ছে দিনে আকলাখ আর দশলাখি স্যুট, পশ্চিমেই মহাজোটের সূর্যোদয়

কারণ মোদী জমানায় দেশে, বিদেশে, জেলায়, রাজ‍্যে বা নির্বাচনকেন্দ্রে কখনও মানুষের বার্তাবহ হিসেবে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়নি। অথচ ২০১৪ থেকে লাগাতার পূর্বসুরির ছিদ্র দেখানো হয়েছে। গুরু আডবাণীর উপযুক্ত চেলা হিসেবে মোদী তাঁর পরিভাষায় দুর্বল প্রধানমন্ত্রী বলে আক্রমণ করে এসেছেন মনমোহনকে। ৫৬ ইঞ্চি চিতিয়ে বলেছেন, মোদী জিতে গিয়েছে। দেশবাসী জানেন, মোদী ছাড়া কেউ পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে হানাদারদের নিকেশ করতে পারবে না। মাথা উঁচু করে চোখে চোখ রেখে দুশমনের মোকাবিলা করতে পারবে না। তা হলে প্রশ্ন করা কি অন‍্যায়, যে, সবল প্রধানমন্ত্রীর একটা সাংবাদিক বৈঠক করতে এত আপত্তি কেন? এক সময় অমদাবাদ তো বটেই, দিল্লিতেও প্রত‍্যেক দিনই তো প্রেস কনফারেন্স করেছেন। ব্রিফিং করেছেন নিয়মিত দলের সদর দফতরে বসে। তা ছাড়া, দিল্লি হোক বা গুজরাত বা দেশের প্রত‍্যন্ত প্রান্তের সব চেয়ে প্রান্তিক বিজেপি কর্মীটিও সাংবাদিক বৈঠকে সিদ্ধহস্ত। বিজেপির বিপরীত মেরুর রাজনীতি যাঁদের, সেই কমিউনিস্ট দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা সচরাচর সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর সেশনে আসতেন না। এখন অবশ্য সেই লৌহ যবনিকার কাল অস্ত গিয়েছে। অস্তিত্বের প্রতিযোগিতায় থাকার সুবাদে গণতান্ত্রিক অভ‍্যাস ক্রমশ রপ্ত হচ্ছে। তা হলে বৃহত্তম গণতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্ত কেন? পাঁচ বছরে তাঁর কাছে মাইলস্টোন সিদ্ধান্ত বলতে যা যা আছে, যেমন ‘১৬-র নভেম্বরের নৈশ নোটবন্দি, কিংবা, নৈশ জিএসটি-সহ অন‍্যান‍্য অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, বালাকোটে বম্বিং, মহাকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ইত্যাদি, সেগুলোও তো চতুর্থ স্তম্ভের মাধ্যমে মানুষকে জানানো হয়নি। কোনো প্রশ্ন শুনতে অনীহা? সে জন্যই মন কি বাত, জনসভা, টিভির পর্দায় কিংবা ভিডিও স্ক্রিনে ভেসে ওঠা। যাতে কোনো প্রশ্রয় নেই অথবা প্রশ্নই নেই প্রশ্নের। অথচ তাঁকে শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী বলে প্রচার-বেলুন অহরহ চিৎকার করে। তাঁর কানে অবশ্যই আসে। তবু তিনি প্রতিবাদ করেন না। অবলীলায় নেহরু, লালবাহাদুর, ইন্দিরা এমনকি মোরারজিভাই বা সংঘের প্রথম স্বয়ংসেবক প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীকেও ডিঙিয়ে যান।

রাজনীতির লোকেদের কোনো কথাকেই শেষ কথা বা উদ্দেশ্যহীন প্রগলভতা বলা যায় না। এবং অবশ্যই উল্লেখের দাবি রাখে, কোনো ধরনেরই শ্রেষ্ঠত্বের দাবিহীন দশ বছরের প্রধানমন্ত্রী এবং ‘দুর্বল প্রধানমন্ত্রী’র তকমা পাওয়া মনমোহনও কিন্তু রাজধানীর সরকারি মিডিয়া সেন্টারে অথবা বিজ্ঞান ভবনে বছরে অন্তত একবার সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সংবাদসংস্থা-সহ সব রকম গণমাধ্যমের বিশিষ্ট ও সাধারণ সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানাতেন। তা ছাড়া দেশের ভেতরে বা বিদেশে সফরকালে সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের অসংখ্য প্রশ্নের জবাব দিতেন। কেউ কখনও অন্য মুষ্টিমেয় নেতানেত্রীর মতো তাঁকে মেজাজ হারাতে বা সৌজন্যহীন আক্রমণ শানাতে দেখেনি। দেখেনি, প্রশ্ন শুনে বেরিয়ে যেতে বা হুমকি দিতে অথবা সাংবাদিককর্মীকে টাইট দেওয়ার কৌশল ভাঁজতে। আমাদের দেশে পুজো পাওয়া প্রশাসকদের মধ্যে এমন প্রতিক্রিয়া বিরল নয়।

এ বার দৃশ‍্যান্তরে

নানা কথায় প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছেন, তিনি কখনোই খুব একটা রেগে যান না। মমতাদিদি যা-ই বলুন তিনি মনে রাখেন না। এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে নিজ থেকেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন তাঁর এ হেন মন্তব্যের মর্মার্থ। মোদী উবাচ: “এই ভোটের বাজারে এ সব কথা বলা হয়তো ঠিক নয়, তবু বলি, দিদি কিন্তু আমাকে বছরে অন্তত বার দুয়েক পছন্দের কুর্তা উপহার পাঠাতে ভোলেন না। শুধু কি তাই? বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাজি বাংলাদেশ থেকে ভালো ভালো মিষ্টি পাঠান আমাকে। এ কথা জানার পর থেকেই মমতাদিদিও আমাকে প্রায়ই কলকাতার পছন্দসই মিষ্টি পাঠানো শুরু করেছেন। কিন্তু এ কথা বললে আপনারা ভুল ধরবেন না যে, বিরোধী নেতানেত্রীরা সব ঘুঙুর পরে রেডি হয়ে আছেন। প্রধানমন্ত্রী হতে চাইছেন।”

মোদীর এই কথামালা সুনির্দিষ্ট রণনীতির দিকে আঙুল তুলেছে। তাঁর এক নম্বর লক্ষ্য বাংলা থেকে যতটা সম্ভব আসন পাওয়ার চেষ্টা করা। সে জন্য তিনি মূল টার্গেটে রেখেছেন, ‘মমতাদিদি’কে। ‘১৪-য় আশা ছিল যদি কোনো ভাবে পুরোনো এনডিএকে বাঁচিয়ে তোলা যায়। রাজনাথ বা জেটলির মতো সহকর্মীদের মতামত নিজের মনের কথার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছিলেন। দৃঢ় প্রত‍্যয় ছিল, অন্য আঞ্চলিকদের মতো তৃণমূলও কংগ্রেসের পালটা জোটে শামিল হবে। চন্দ্রশেখর রাও, জগন্মোহন বা নবীন পট্টনায়েকের মতো কংগ্রেসের শক্তি কমানোর পাশাপাশি রাহুলকে রোখার কাজ করবে। আর বাংলায় বামেদের সর্বহারা বানিয়ে দেবে। ফলে জেতা তো দূরে থাক, বিরোধী জমিও দখল করতে পারবে না বামফ্রন্ট। এই শূন্যস্থান পূর্ণ করতে বেগ পেতে হবে না বিজেপিকে। সরকারে তৃণমূল আর মূল বিরোধী দল হিসেবে বিজেপি থাকলে পরের ভোটেই তৃণমূলকে পরাজিত করতে পারবে অনায়াসে।

তা ছাড়া, মোদী-সহ বিজেপির গরিষ্ঠ অংশের অঙ্ক ছিল, তারা তো কোনো দিনই মুসলমান ভোট পাবে না। এর ফলে হিন্দু ভোট ধীরে ধীরে বাড়বে এবং তার বিপরীতে মুসলমান ভোটও সংহত হবে এক পার্টিতে। তখন বাংলায় সংখ্যালঘু ভোট পাওয়ার জায়গায় থাকবে না কংগ্রেস ও বাম। কারণ তাদের শক্তি ক্রমশ কমছে। সে ক্ষেত্রে সেই বড়ো সংখ্যক ভোট তৃণমূলের কাছে গেলে বিজেপির কোনো ক্ষতি নেই, উত্তর প্রদেশের মতো জায়গায় বিজেপির পাশাপাশি এসপি-বিএসপি যে ভাবে বেড়েছে। এবং কংগ্রেসের মতো বড়ো গাছ শুকিয়ে গিয়েছে ধীরে ধীরে। অন্য জনগোষ্ঠীর ভোটে বঞ্চিত কংগ্রেসকে হিন্দু উচ্চবর্ণের ভোটাররাও ত‍্যাগ করেছে। সুতরাং সে ভাবেই বাংলায়ও কংগ্রেসের সমর্থনভূমি পুরো শুকিয়ে গেলে এবং বামেরা তাদের লেজুড় হিসেবে মাথা তুলতে না পারলে, বিজেপিরই তো আখেরে লাভ। সব ত্রিদলীয় লড়াইয়ের রাজ্যে এ ভাবেই বিজেপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের সংখ্যালঘু ভোট কমানো সম্ভব। কমিউনিস্টরা যেমন বিজেপিকে বিরোধী জমিও ছাড়তে চায় না তেমনি বিজেপিও বিশেষ করে কংগ্রেস ও বাম হাত থেকে বিরোধী জমিও কেড়ে নিতে চায়। মমতা যে হেতু কংগ্রেস ভেঙে এক প্রখর আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পূর্ব ভারতের যে জমিতে শিকড় ছড়িয়েছেন সেখানে বিজেপি নখদন্তহীন, তাই তাঁকে এনডিএতে টেনে সেকুলার জনতার ভোটে আঁকশি লাগানো।

কিন্তু বাজপেয়ীর নরম মুখের পক্ষে যা সম্ভব মোদী-শাহর ভাবলেশহীন জমানায় তা অকল্পনীয়। তবু মতাদর্শগত দুশমন বাম ও কাশ্মীর থেকে কন‍্যাকুমারী পর্যন্ত মানচিত্রের মালিক কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মূল লড়াইয়ে আঞ্চলিকদের পাশে পেতে মরিয়া বিজেপি। রাষ্ট্রীয় মোর্চা আঞ্চলিকদের নিয়ে কংগ্রেস ও বিজেপির বিকল্প হতে চেয়েছিল। কিন্তু বামসঙ্গীদের নিয়ে এগোনো সেই শক্তির নেতৃত্বে থাকা জনতা দল নিজেরাই ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার হয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের সুবিধে করে দেয়। অবশ্য সমাজের স্থিতাবস্থার পক্ষে যারা, তাদের তরফ থেকে আক্রমণ আসবেই, এ কথা বুঝে ভাঙন রোখার প্রস্তুতি রাখা উচিত ছিল জনতা দলের। তা না থাকায় রাষ্ট্রীয় মোর্চার রণনীতির মোক্ষম অংশটা হাইজ্যাক করে নিল বিজেপি। এ বারও সেই আঞ্চলিকদেরই শরণাগত হতে হচ্ছে মোদী-শাহর মতো ৫৬ ইঞ্চির প্রবক্তাকেও। এবং এই লক্ষ্যে এগিয়ে বিজেপি অদৃশ্য হাতে রেখেছে চাণক্যনীতি ‘সাম দাম দণ্ড ভেদ’, একে একে দক্ষিণ থেকে পূবের অকর্ষিত ক্ষেত্রে। কেরলের কিছু অকিঞ্চিৎকর আঞ্চলিক শক্তি, তামিলনাড়ুর এডিএমকে, অন্ধ্রের রাজশেখর কংগ্রেস, তেলঙ্গানার টিআরএস, ওডিশার বিজেডিকে অনেকটাই সঙ্গে নেওয়া ও নির্বিষ করা গিয়েছে। এ বার চূড়ান্ত টার্গেট তৃণমূল। কিন্তু ২০০১-২ আর তার ১৭ বছর পরের রাজনৈতিক বাস্তবতা, রসায়ন এবং মুখ আর মুখোশ তার রং-ঢং সবই আমূল বদলে ফেলেছে। এখন উত্তর প্রদেশের মায়া আর কংগ্রেসের ছায়াতেও ধর্মনিরপেক্ষ জোটের কায়া অসম্পূর্ণ বাংলার মমতাকে ছাড়া। তাই তৃণমূলী ব্রিগেডে ইউনাইটেড ইন্ডিয়ার রণহুংকার শুনেই আক্রমণ-মুদ্রায় মূর্ত হন মোদী। নোটবন্দির স্টাইলেই যেন মুদ্রাবন্দি। এত দিন ধরে যে ভাবে সিবিআই, ইডির কাবাডি-খোখো পর্ব চলছিল তারও ইতির ইঙ্গিত মেলে। দণ্ড দিয়েও যখন কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না তখন ফের মুকুলের ডাক পড়ে। অর্থাৎ এ বার শেষ পর্ব ‘ভেদ’, যা নিয়ে কেন্দ্র-রাজ‍্যের বিজেপি নেতাদের উদয়াস্ত স্বস্তিবাচন চরমে। আর এরই ফাঁকে রুপোলি রেখা টেনে রাখলেন মোদী। নরমে গরমে আশার পাশায় দান চাললেন। ব‍্যক্তি পরিসরের গণ্ডি অগ্রাহ্য করে ‘স্পিড ব্রেকার’ ও ‘স্টিকার দিদি’ বলতে বলতেই শোনালেন কুর্তা-মিষ্টির কহানি এবং সব শেষে ‘পালটিবাজ দিদি’ থেকে ‘বিরোধী নেতারা ঘুঙুর পরে রেডি’ পর্যন্ত। এই লম্বা লয়ের ওঠানামায় প্রলয়ের চিহ্ন প্রকট। কোনো ৫৬ ইঞ্চির গল্প নেই। মমতাও জবাবে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বুঝে নিয়েছেন। এবং বাংলার বিহ্বল জনতার মন চায় চক্ষু না চায়। অন্ধ হলেও প্রলয়ই নির্বন্ধ!

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here