খেলা হবে

শৈবাল বিশ্বাস

পশ্চিমবঙ্গের এ বারের নির্বাচনে ভোট-পরবর্তী অঙ্ক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে। আগামী ২ মে পাঁচ রাজ্যে নির্বাচনের ফল ঘোষিত হতে চলেছে। এই পাঁচ রাজ্য‌ হল কেরল, তামিলনাড়ু, পুদুচ্চেরি (কেন্দ্রশাসিত), অসম ও পশ্চিমবঙ্গ। এর মধ্যে কেরলে যে বাম-গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেতে চলেছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সব ক’টি সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে বিরোধী কংগ্রেস অনেকটাই পিছিয়ে থাকবে। বিজেপিরও সে রাজ্যে তেমন কোনো ভবিষ্য‌ৎ নেই। তামিলনাড়ুতে এ বার ক্ষমতাসীন এআইএডিএমকে জোটকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসতে চলেছে ডিএমকে-কংগ্রেস-বাম জোট। অসমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে বিজেপিকে খুব একটা অসুবিধায় পড়তে হবে না।

বিজে্পি শীর্ষনেতারা বলছেন, তাঁরা চোখ-কান বুজে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসতে চলেছেন। কিন্তু এ পর্যন্ত যতগুলি সমীক্ষা হয়েছে, তার প্রত্যেকটিতেই দেখা যাচ্ছে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে অল্প দূরে গিয়ে খেলা শেষ করবে। অন্য‌ দিকে মোর্চার পক্ষেও ৫০টির বেশি আসন জোগাড় করা খুবই কষ্টকর। সে ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে কী ভাবে সরকার গঠিত হবে?

রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য‌, সব ক’টি রাজনৈতিক দলই নির্বাচন-পরবর্তী সমীকরণের দিকে ঝুঁকবে। যদি কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার অল্প দূরে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে তবে তার চেষ্টা হবে অন্য‌ দল থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যা জোগাড় করা। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় মোট আসন সংখ্যা ২৯৪। তার মধ্যে ২৯৩টি আসনে ভোট হবে। এর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে গেলে ১৪৭টি আসনে জেতা চাই। যদি কোনো দল ১২০-তে এসে আটকে যায় তা হলে সে চাইবে বাকি ২৭টি সদস্য‌ অন্য‌ দল থেকে জোগাড় করতে। প্রবলতর প্রতিপক্ষ যে-ই হোক না কোন, সে দলের নির্বাচিত সদস্য‌দের দুই তৃতীয়াংশকে ভাঙিয়ে না আনলে সরকার গড়া সম্ভব নয়। কোনো দলের এক তৃতীয়াংশ সদস্য‌ যদি স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রেখে কোনো জোট বা দলকে সমর্থন করে তা হলেও বলার কিছু থাকে না। সেটাও আইনত সিদ্ধ। ২০০৩ সালের সংশোধিত দলবিরোধী আইনে সে সুযোগ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এ ধরনের কোনো অঙ্ক তলায় তলায় কষা হচ্ছে কি না সেটাই এখন দেখার।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দলবদলের খেলা শুরু করেছিল কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস। বামেদের মধ্যে আরএসপির অনন্ত রায়, সিপিএমের দিপালী বিশ্বাস, ফরওয়ার্ড ব্লকের সুনীল মণ্ডল, কংগ্রেসের অর্পূব সরকার, শাওনী সিংহ রায়, শম্পা দরিপা, আবু তাহের খান, তুষার ভট্টাচার্য… তালিকাটা দীর্ঘ। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা আবদুল মান্নান, বাম পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী দলত্যাগের স্পষ্ট প্রমাণ দিয়ে অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি লেখেন। দিনের পর দিন সেই চিঠি পড়ে থেকেছে। দলবদলু বিধায়কদের একাংশ আবার সাংসদ হয়েছেন। মানস ভুঁইয়া, সুনীল মণ্ডল এই তালিকায় পড়েন। অনেকে আবার আইন বাঁচাতে শেষ মুহূর্তে বিধানসভা থেকে পদত্যাগ করে প্রার্থী হয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেস এঁদের সবাইকেই টিকিট দিয়েছে।

যে খেলা তৃণমূল কংগ্রেস শুরু করেছে, তাতে বিজেপি ভালোমতোই হাত পাকিয়েছে। সিপিএম বিধায়ক খগেন মুর্মুকে পদত্যাগ করিয়ে লোকসভায় জিতিয়ে এনেছে তারা। বাগদার তৃণমূল বিধায়ক দুলাল বর, শুভ্রাংশু রায় অনেক আগেই বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। নির্বাচনের ঠিক আগে বিজেপিতে গেলেন কাঁথি উত্তরের বিধায়ক বনশ্রী মাইতি, ব্যারাকপুরের শীলভদ্র দত্ত, উত্তরপাড়ার প্রবীর ঘোষাল, মন্তেশ্বরের সৈকত পাঁজা, নাগরাকাটার সুকরা মুন্ডা ও কালনার বিশ্বজিৎ কুণ্ডু। এঁরা সবাই ঘাসফুল ছেড়ে এসেছেন। কংগ্রেস থেকে গিয়েছেন পুরুলিয়ার সুদীপ মুখোপাধ্যায়। সিপিএম ছেড়ে পদ্মশিবিরে গেলেন হলদিয়ার তাপসী মণ্ডল ও মালদা গাজোলের দিপালী বিশ্বাস। দলবদল নিয়ে অনেক বড়ো বড়ো কথা বললেও ভিতরের রহস্য‌ কেউই ফাঁস করতে চাইবেন না। বিজেপি আসলে চেষ্টা করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেয়ারটেকার না রেখেই নির্বাচনটা করতে।

এই খেলা নির্বাচনের আগে শুরু হয়ে থাকলে নির্বাচনের পরও যে চলবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সম্প্রতি অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে, সাম্প্রতিক কালের দলত্যাগী বিধায়কদের মধ্যে ৪৫ শতাংশরই গন্তব্য‌ বিজেপি। গত পাঁচ বছরে কর্নাটক, মণিপুর, গোয়া, অরুণাচল প্রদেশ, মধ্য‌প্রদেশ, মহারাষ্ট্র-সহ বিভিন্ন রাজ্যের কংগ্রেস বিধায়করা দল বেঁধে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। মধ্য‌প্রদেশ, কর্নাটক ও কেন্দ্রশাসিত পুদুচ্চেরিতে দলবদলের ফলে সরকারের পতন হয়েছে। ওই রিপোর্টেই বলা হয়েছে, দলত্যাগী বিধায়কদের এই সময়কালে গড়পড়তা সম্পত্তি বেড়েছে ৩৯ শতাংশ।

পশ্চিমবঙ্গ সেই ভবিষ্য‌তের জন্য‌ অপেক্ষা করছে কি না তা সময়ই বলতে পারবে।

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন