modi's remark about rajiv
debarun roy
দেবারুণ রায়

ফণী গেল কোথায়? এত প্রচার, প্রলয়ের প্রচণ্ড সংলাপ সব উড়িয়ে কোথায় চলে গেল? সমুদ্রে দাপাল ঠিকই, তবে তা কোনো সুনামির মতো নয়। গাঁ-গরিবের জীবন ও সম্পত্তিহানি, তা-ও নিরানব্বইয়ের আতঙ্কের মতো দুর্দৈব নয়। অমঙ্গল ধ্বনি তুলে আসা ‘ফণী’ কোন মঙ্গলযাত্রায় যাবে বলে জগন্নাথের পূণ্য ধ্বজ সঙ্গে নিয়ে গেল। ধ্বজাহীন মন্দিরের বিগ্রহকে শেষে উপোসী থাকতে হবে? কোন সে আকাল ঘনাবে জগন্নাথভূমে? আতঙ্কে কেঁপে উঠল বিশ্বাসীর বুক! দেবতার গ্রাস থেকে ভোটার বাঁচাতে মাঠে নামলেন দুর্যোগ মোকাবিলায় অভিজ্ঞ প্রবীণ মুখ‍্যমন্ত্রী নবীনবাবু। ১২ লাখ দরিদ্র অসহায় ওডিশাবাসীকে বিপদসঙ্কুল উপকূল এলাকা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের ঠিকানায় পৌঁছোনোর রেকর্ড এখন তাঁর হাতে।

এ দিকে, কিছু গরিবের মৃত্যু এবং ভাঙা একচালা আর বড়ো মানুষের আটচালার চাল উড়িয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোথাও কোনো চিহ্ন রেখে যায়নি অপরাধী ঝড়। এ-ও সেই সামান্য ক্ষতি। ২২০ হয়ে আছড়ে পড়ল বটে সমুদ্রে, কিন্তু ঝড়ের ইতিহাস এই ভুগোলে এসে প্রণিপাত হল জগন্নাথের পদতলে। জগন্নাথধামের মানুষের ইচ্ছাশক্তি হয়তো এ ভাবেই দেবত্বের মহিমায় মহিমান্বিত। পুরীর মন্দিরের মূল পাণ্ডাকে বলা হয়েছিল, মন্দির ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে। সেটাই ছিল প্রশাসনের পরামর্শ। কিন্তু তিনি সে কথা শোনেননি। বলেছেন, এত দুর্যোগে, দারুণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও প্রভুকে ছেড়ে যাইনি। এ বারও যাব না। এ বার ঝড়ের তাণ্ডব একেবারে মিইয়ে যাওয়ার পর ওডিশাবাসী সেই পুরোহিতের প্রতিজ্ঞাতেই আত্মস্থ। তাঁদের বিশ্বাস, প্রভু জগন্নাথের দেশে সব ঝড়ই নিষ্প্রভ হতে বাধ্য। সুতরাং শাসকদল বিজেডি বলতে শুরু করেছে, বিজেপি যে কাল্পনিক ঝড়ের কথা ভেবেছিল, সেই ভাবনাটাই ঝড়ে উড়ে গিয়েছে। ওরা বলে চলেছিল, ওডিশা, বঙ্গাল আর উত্তর পূর্বাঞ্চলে নাকি মোদীঝড়। ‘ফণী’কেই মোদীঝড় মনে করেছিল ওরা। ওটা ছিল ওদের ‘মন কি বাত।’ কিন্তু কোথায় কী?

ওডিশায় বিপাক বুঝে নবীনবাবু বীণ বাজানো ছেড়ে তড়িঘড়ি নামলেন ঝড়ের মুখ থেকে মানুষজনকে বাঁচাতে। মানে নিজের মানরক্ষা করতে। অনেকটাই সফল হলেন। মৃত্যু ১৬ জনেরও কম দুঃখের নয়। কিন্তু অনেক অনেক গুণ বেশি হতে পারত। এ দিকে বাংলায় ঢুকে মেদিনীপুর আর চব্বিশ পরগনার গোলকধাঁধাতেই নিস্তেজ হল। ফণী ঝড়ও আর উঠল না। অনেকটা মোদীঝড়ের মতোই। তার পর থেকেই মোদীজি মেজাজ হারাচ্ছেন মন্দাক্রান্ত হয়ে। মন্দ কথা, যা প্রধানমন্ত্রীকে সাজে না, অত বড়ো নেতা তো দূরের কথা, একজন অঞ্চলপ্রধানও এমন বেফাঁস কথা বলেন না। মুখ ফসকে কখনও কিছু বেরোলেও পরমুহূর্তেই দুঃখপ্রকাশ করে স্বস্তির পরিবেশ ফিরে পান। কিন্তু মোদী তেমন রাজনীতির ইস্কুলে পড়েননি। তাঁর ডান চোখ ও ডানহাত শাহেনশাহ অমিতও তাঁকে মানুষের মন বুঝতে বলেননি। সুতরাং মনে মনে সারা দিন তাল ঠুকেছেন। আর এমন কুকথাকেই মোদীমঙ্গল কাব্য ভেবে অনর্গল রাহুল গান্ধীর চতুর্দশ পুরুষের নামে স্বস্তি বাচনের মিসাইল ছাড়াকে বিরোধী বধের উপায় ঠাউড়েছেন খোদ কর্তাটি। হতে পারে তেজহারা ফণীর প্রকোপ। না হলে মতিগতিও কেন গতিপথ হারাবে ফণীর মতো? বোঝা গেল মোদীর মন কি বাত আসলে এটাই। যে বাত বাতিল করেছে ভোটের ভগবান, মানুষ। 

আরও পড়ুন কুর্তা, মিষ্টি এবং ঘুঙুর-সহ নানা মুদ্রায় মোদী, আঞ্চলিকরাই টার্গেট

মোদী এমন একটি কথা বলেছেন রাহুলকে ব্রহ্মাস্ত্রে বিদ্ধ করতে গিয়ে, যা জলে গোলে না কিংবা আগুনে পোড়ে না। বলেছেন, “রাহুল তোমার বাবাই তো জীবন শেষ করেছেন ভ্রষ্টাচারী নম্বর ১ হয়ে। “প্রথমত, কথাটি অসত্য। দিল্লি হাইকোর্ট রাজীব গান্ধীকে বফর্স ঘুষের অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছিল। এবং সিবিআই ওই রায়কে সুপ্রিম কোর্টে চ‍্যালেঞ্জ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি ও এনডিএ সরকারের আমলেই। সর্বোপরি রাজীব গান্ধীর অকালমৃত্যুর পর সিবিআই বফর্স তদন্তের সূত্রে দায়ের করা অভিযোগপত্র থেকেই তাঁর নাম বাদ দেয়। কোনো মামলার তদন্তের প্রক্রিয়া চলাকালীন অভিযুক্ত কারও মৃত্যু হলে তাঁর নাম কেটে দেওয়া হয়। এটাই প্রথা।

তা ছাড়া, দ্বিতীয়ত,  ভারতীয় বা হিন্দু সংস্কার অনুযায়ী মৃত ব‍্যক্তি সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী। মৃত কোনো সাধারণ লোকের নামেও কুকথা বলা বা জীবিত কালের শত্রুতা মনে রাখা অসঙ্গত। ভারতীয় বা হিন্দুধর্মীয় মূল্যবোধ প্রয়াত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বলে। আইনতও এই নীতি যুক্তিযুক্ত কারণ, মৃত ব‍্যক্তি তাঁর পক্ষ সমর্থন করতে পারেন না। এমনকি সংসদের সদস্য নন, এমন কোনো রাজনীতিবিদ বা অন্য কারও নামে আক্রমণাত্মক হওয়া নিষিদ্ধ একই কারণে। তিনি সংসদে অনুপস্থিত। অথচ প্রধানমন্ত্রীর পদে থেকেও মোদী এই পরম্পরা অগ্রাহ্য করেছেন। তা হলে কি ভোটের ভাবনা সত্যিই তাঁর ঘুম কেড়েছে? কেড়েছে সাধারণ মানসিক শান্তি? এতটাই অস্থির অনিশ্চয় কেন হবেন দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় বলীয়ান মানুষটি? তবে কি সত্যিই এনডিএ সরকার আর উনিশের জুন পেরোবে না?

মোদী সর্বত্র বলছেন, এই প্রথম পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকা কোনো সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীরা জনপ্রিয়তা হ্রাসের কোনো তত্ত্ব খাড়া করতে পারছে না। এই প্রথম ক্ষমতায় থাকাটা কোনো সরকারের কাছে আশীর্বাদ হয়ে আসছে, অভিশাপ হয়ে নয়। মোদীজির কথা আংশিক মেনে নিলেও প্রশ্ন থেকে যায়। প্রশ্ন হল, রাহুল গান্ধীর যে পূর্বপুরুষদের কাঠগড়ায় তোলেন অষ্টপ্রহর, তাঁদের মধ্যে নেহরু স্বাধীনতার পর ১৭ বছর ক্ষমতাসীন। তো তাঁর সরকারের কি পাঁচ বা দশ বছরে জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছিল? ইন্দিরা তখত্‌ তাউসের শীর্ষে ছিলেন দু’ভাগে মোট ১৬ বছর। ব্যাঙ্ক ও কয়লাখনি জাতীয়করণ, রাজন‍্যভাতা লোপ বা পাকিস্তানকে দু’ টুকরো করার মতো ঘটনাও ম্লান হয়ে গিয়েছিল জরুরি অবস্থার স্বৈরশাসনে। ‘৭৩ পর্যন্ত তাঁর জয়ধ্বনি চলছিল ‘৬৬ থেকে। কিন্তু এক বছরেই মাত। জনপ্রিয়তার এভারেস্ট থেকে ‘৭৭-এর ভোটে ভরাডুবির অতলান্ত খাদ। বিকল্প সরকারকে আরএসএস চলতে দিলে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস অন্য ভাবে লেখা হত। মোদ্দা কথা, ভূভারতে মোদী সরকারই সর্বার্থে অভূতপূর্ব এমন ভাবার অবকাশ রাখেনি বিগত ৭২ বছর।

এবং এত দিনে বিরোধী নেতারা বলতে শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রীর একটি মুদ্রাদোষের কথা। কথাটি হল ‘মোদী’। সব সময় তিনি নিজের দল ও সরকারকে স্বনামে না ডেকে শুধু ‘মোদী’ ‘মোদী’ই করেন অনিবার। কখনও উচ্চারণ করেন না বিজেপি সরকারের, দলের, এমনকি ভারত সরকারের নাম। অতীতে কোনো দল মত ও পথের কোনো প্রধানমন্ত্রী বা মুখ‍্যমন্ত্রীকে এ ভাবে নিজের নামে নিরন্তর রণিত হতে দেখেনি ভারতবাসী। কিন্তু এই নতুন ধারাটির বিপদ হল, জয়ের শ্রেয় যদি শুধু মোদীরই হয়, তবে পরাজয়ের গ্লানিও শুধু তাঁরই। রত্নাকরের মতো কেউ তাঁর পুণ্যের ফল হাত পেতে নিলেও পাপের ভাগী হবে না। গোটা পরিস্থিতিকে একেবারে শিখরচুম্বী করেছে নিতিন গডকরির একটি নিরীহ বিবৃতি, যা অবশ্যই দ্ব্যর্থবোধক। নিতিন বলেছেন, “মিত্রোঁ, আপনারা গত পাঁচ বছর শুধু ট্রেলার দেখেছেন। ফিল্ম এখনও শুরুই হয়নি। হবে আমরা ক্ষমতায় ফেরার পর।” এ বার যে যেমন খুশি অর্থ করে নিন। কিন্তু এমন কথা তো মোদী বলেননি। বলতেই পারতেন, অচ্ছে দিন পাঁচ বছরে শুধু ঝলক দেখিয়েছে। দশ বছরে, মানে এ বারে ঠিকই আসবে। অথবা, পাঁচ বছরে পারিনি, কিন্তু কথা তো ফিরিয়েও নিইনি। এ বার ১৫ লাখ দেব মাথাপিছু। এমনই আরও ফিল গুড আইটেম। কিন্তু যা গেছে তা যাক। মোদী দেখেছেন, দেশের ভেতরে নানা দুর্দৈব। এমনকি শেষ লগ্নে মোদীঝড় ফিনিশ ফণীর তাণ্ডবে। তা ছাড়া, গত বারের ইস্তাহার শোনালেই নানা ফ‍্যাকড়া। আছে ১০ কোটি বেকারের চাকরি! কয়েক লাখও হয়নি। উলটে গোরক্ষক গোদের ওপর বেকারি বিষফোঁড়া। বেকারি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। ৪৫ বছরে এত বেকার আর বেকারি দেখেনি দেশ। অথচ ৩০ বছর পর বিজেপিকে মানুষ দিয়েছিল প্রথম নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা। সব নতুন ভোটার অচ্ছে দিন আর কাজ পাওয়ার স্বপ্ন দেখে মোদীকে মসিহা ভেবেছিল। তার পুরস্কার ৪৫ বছরে সর্বোচ্চ বেকার ও বেকারি। সুতরাং ওই ইস্তাহারের ভুলভুলাইয়ায় যেতে নারাজ মোদী। এমনকি সবার ইস্তাহার দেখে সব শেষে এত ঘটা করে নিজেদের সংকল্পপত্র বের করল বিজেপি, তা-ও ছুঁয়ে দেখলেন না মোদী। সোজা চলে গেলেন পুলওয়ামা আর বালাকোটে। শহিদ ভাঙিয়ে ভোট, ধর্মের আঁকশিতে ভোট হবে না। কিন্তু মোদী তাঁর উগ্র জাতীয়তার ভবি ভুলতে নারাজ। অভিনন্দনের ছবি দেওয়া পোস্টার সরিয়ে পাকিস্তান আর কাশ্মীর চলতে থাকল রমরমিয়ে। মোদী বারবার আওড়ালেন পুলওয়ামা।

ইস্তাহার ছেড়ে শেষটা ‘হম ভি চৌকিদার’-ও ছাড়লেন মোদী। এবং কী কুক্ষণে মৃত রাজীবকে বললেন ভ্রষ্টাচারী। নির্বাচন কমিশনের নামে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ জোরালো। প্রধানমন্ত্রীকে পরের পর ছাড় দিয়ে এক ফাঁকে রাহুলকেও ক্লিন ঢিট দিল কমিশন। কিন্তু রাজীব-তনয় তাঁর মৃত বাবাকে অপমানের অভিযোগ নিয়ে কমিশনের দরজায় দাঁড়ানোর আগে আরও একবার সপ্রেম ভেট দিলেন মোদীকে জড়িয়ে ধরে। মোদী এই আলিঙ্গনকে ‘আলি’ বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও পারবেন কী করে? রাহুল মোদীকে ‘কর্ম’-এর কথা শুনিয়েছেন আর প্রিয়ঙ্কা হিন্দু দর্শন নয়, সাফ রাজনীতিতে জবাব দিয়েছেন। বলেছেন, অমেঠি এর উত্তর দেবে আপনাকে। প্রধানমন্ত্রী এখন আর কোন ইস‍্যু এড়াতে কী বিষয় তুলবেন? যা ধরছেন তাতেই তো হাত পুড়ছে!

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here