Connect with us

প্রবন্ধ

কুকথার রেকর্ড, কেন মেজাজ হারাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

modi's remark about rajiv
debarun roy
দেবারুণ রায়

ফণী গেল কোথায়? এত প্রচার, প্রলয়ের প্রচণ্ড সংলাপ সব উড়িয়ে কোথায় চলে গেল? সমুদ্রে দাপাল ঠিকই, তবে তা কোনো সুনামির মতো নয়। গাঁ-গরিবের জীবন ও সম্পত্তিহানি, তা-ও নিরানব্বইয়ের আতঙ্কের মতো দুর্দৈব নয়। অমঙ্গল ধ্বনি তুলে আসা ‘ফণী’ কোন মঙ্গলযাত্রায় যাবে বলে জগন্নাথের পূণ্য ধ্বজ সঙ্গে নিয়ে গেল। ধ্বজাহীন মন্দিরের বিগ্রহকে শেষে উপোসী থাকতে হবে? কোন সে আকাল ঘনাবে জগন্নাথভূমে? আতঙ্কে কেঁপে উঠল বিশ্বাসীর বুক! দেবতার গ্রাস থেকে ভোটার বাঁচাতে মাঠে নামলেন দুর্যোগ মোকাবিলায় অভিজ্ঞ প্রবীণ মুখ‍্যমন্ত্রী নবীনবাবু। ১২ লাখ দরিদ্র অসহায় ওডিশাবাসীকে বিপদসঙ্কুল উপকূল এলাকা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের ঠিকানায় পৌঁছোনোর রেকর্ড এখন তাঁর হাতে।

এ দিকে, কিছু গরিবের মৃত্যু এবং ভাঙা একচালা আর বড়ো মানুষের আটচালার চাল উড়িয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোথাও কোনো চিহ্ন রেখে যায়নি অপরাধী ঝড়। এ-ও সেই সামান্য ক্ষতি। ২২০ হয়ে আছড়ে পড়ল বটে সমুদ্রে, কিন্তু ঝড়ের ইতিহাস এই ভুগোলে এসে প্রণিপাত হল জগন্নাথের পদতলে। জগন্নাথধামের মানুষের ইচ্ছাশক্তি হয়তো এ ভাবেই দেবত্বের মহিমায় মহিমান্বিত। পুরীর মন্দিরের মূল পাণ্ডাকে বলা হয়েছিল, মন্দির ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে। সেটাই ছিল প্রশাসনের পরামর্শ। কিন্তু তিনি সে কথা শোনেননি। বলেছেন, এত দুর্যোগে, দারুণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও প্রভুকে ছেড়ে যাইনি। এ বারও যাব না। এ বার ঝড়ের তাণ্ডব একেবারে মিইয়ে যাওয়ার পর ওডিশাবাসী সেই পুরোহিতের প্রতিজ্ঞাতেই আত্মস্থ। তাঁদের বিশ্বাস, প্রভু জগন্নাথের দেশে সব ঝড়ই নিষ্প্রভ হতে বাধ্য। সুতরাং শাসকদল বিজেডি বলতে শুরু করেছে, বিজেপি যে কাল্পনিক ঝড়ের কথা ভেবেছিল, সেই ভাবনাটাই ঝড়ে উড়ে গিয়েছে। ওরা বলে চলেছিল, ওডিশা, বঙ্গাল আর উত্তর পূর্বাঞ্চলে নাকি মোদীঝড়। ‘ফণী’কেই মোদীঝড় মনে করেছিল ওরা। ওটা ছিল ওদের ‘মন কি বাত।’ কিন্তু কোথায় কী?

ওডিশায় বিপাক বুঝে নবীনবাবু বীণ বাজানো ছেড়ে তড়িঘড়ি নামলেন ঝড়ের মুখ থেকে মানুষজনকে বাঁচাতে। মানে নিজের মানরক্ষা করতে। অনেকটাই সফল হলেন। মৃত্যু ১৬ জনেরও কম দুঃখের নয়। কিন্তু অনেক অনেক গুণ বেশি হতে পারত। এ দিকে বাংলায় ঢুকে মেদিনীপুর আর চব্বিশ পরগনার গোলকধাঁধাতেই নিস্তেজ হল। ফণী ঝড়ও আর উঠল না। অনেকটা মোদীঝড়ের মতোই। তার পর থেকেই মোদীজি মেজাজ হারাচ্ছেন মন্দাক্রান্ত হয়ে। মন্দ কথা, যা প্রধানমন্ত্রীকে সাজে না, অত বড়ো নেতা তো দূরের কথা, একজন অঞ্চলপ্রধানও এমন বেফাঁস কথা বলেন না। মুখ ফসকে কখনও কিছু বেরোলেও পরমুহূর্তেই দুঃখপ্রকাশ করে স্বস্তির পরিবেশ ফিরে পান। কিন্তু মোদী তেমন রাজনীতির ইস্কুলে পড়েননি। তাঁর ডান চোখ ও ডানহাত শাহেনশাহ অমিতও তাঁকে মানুষের মন বুঝতে বলেননি। সুতরাং মনে মনে সারা দিন তাল ঠুকেছেন। আর এমন কুকথাকেই মোদীমঙ্গল কাব্য ভেবে অনর্গল রাহুল গান্ধীর চতুর্দশ পুরুষের নামে স্বস্তি বাচনের মিসাইল ছাড়াকে বিরোধী বধের উপায় ঠাউড়েছেন খোদ কর্তাটি। হতে পারে তেজহারা ফণীর প্রকোপ। না হলে মতিগতিও কেন গতিপথ হারাবে ফণীর মতো? বোঝা গেল মোদীর মন কি বাত আসলে এটাই। যে বাত বাতিল করেছে ভোটের ভগবান, মানুষ। 

আরও পড়ুন কুর্তা, মিষ্টি এবং ঘুঙুর-সহ নানা মুদ্রায় মোদী, আঞ্চলিকরাই টার্গেট

মোদী এমন একটি কথা বলেছেন রাহুলকে ব্রহ্মাস্ত্রে বিদ্ধ করতে গিয়ে, যা জলে গোলে না কিংবা আগুনে পোড়ে না। বলেছেন, “রাহুল তোমার বাবাই তো জীবন শেষ করেছেন ভ্রষ্টাচারী নম্বর ১ হয়ে। “প্রথমত, কথাটি অসত্য। দিল্লি হাইকোর্ট রাজীব গান্ধীকে বফর্স ঘুষের অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছিল। এবং সিবিআই ওই রায়কে সুপ্রিম কোর্টে চ‍্যালেঞ্জ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি ও এনডিএ সরকারের আমলেই। সর্বোপরি রাজীব গান্ধীর অকালমৃত্যুর পর সিবিআই বফর্স তদন্তের সূত্রে দায়ের করা অভিযোগপত্র থেকেই তাঁর নাম বাদ দেয়। কোনো মামলার তদন্তের প্রক্রিয়া চলাকালীন অভিযুক্ত কারও মৃত্যু হলে তাঁর নাম কেটে দেওয়া হয়। এটাই প্রথা।

তা ছাড়া, দ্বিতীয়ত,  ভারতীয় বা হিন্দু সংস্কার অনুযায়ী মৃত ব‍্যক্তি সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী। মৃত কোনো সাধারণ লোকের নামেও কুকথা বলা বা জীবিত কালের শত্রুতা মনে রাখা অসঙ্গত। ভারতীয় বা হিন্দুধর্মীয় মূল্যবোধ প্রয়াত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বলে। আইনতও এই নীতি যুক্তিযুক্ত কারণ, মৃত ব‍্যক্তি তাঁর পক্ষ সমর্থন করতে পারেন না। এমনকি সংসদের সদস্য নন, এমন কোনো রাজনীতিবিদ বা অন্য কারও নামে আক্রমণাত্মক হওয়া নিষিদ্ধ একই কারণে। তিনি সংসদে অনুপস্থিত। অথচ প্রধানমন্ত্রীর পদে থেকেও মোদী এই পরম্পরা অগ্রাহ্য করেছেন। তা হলে কি ভোটের ভাবনা সত্যিই তাঁর ঘুম কেড়েছে? কেড়েছে সাধারণ মানসিক শান্তি? এতটাই অস্থির অনিশ্চয় কেন হবেন দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় বলীয়ান মানুষটি? তবে কি সত্যিই এনডিএ সরকার আর উনিশের জুন পেরোবে না?

মোদী সর্বত্র বলছেন, এই প্রথম পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকা কোনো সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীরা জনপ্রিয়তা হ্রাসের কোনো তত্ত্ব খাড়া করতে পারছে না। এই প্রথম ক্ষমতায় থাকাটা কোনো সরকারের কাছে আশীর্বাদ হয়ে আসছে, অভিশাপ হয়ে নয়। মোদীজির কথা আংশিক মেনে নিলেও প্রশ্ন থেকে যায়। প্রশ্ন হল, রাহুল গান্ধীর যে পূর্বপুরুষদের কাঠগড়ায় তোলেন অষ্টপ্রহর, তাঁদের মধ্যে নেহরু স্বাধীনতার পর ১৭ বছর ক্ষমতাসীন। তো তাঁর সরকারের কি পাঁচ বা দশ বছরে জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছিল? ইন্দিরা তখত্‌ তাউসের শীর্ষে ছিলেন দু’ভাগে মোট ১৬ বছর। ব্যাঙ্ক ও কয়লাখনি জাতীয়করণ, রাজন‍্যভাতা লোপ বা পাকিস্তানকে দু’ টুকরো করার মতো ঘটনাও ম্লান হয়ে গিয়েছিল জরুরি অবস্থার স্বৈরশাসনে। ‘৭৩ পর্যন্ত তাঁর জয়ধ্বনি চলছিল ‘৬৬ থেকে। কিন্তু এক বছরেই মাত। জনপ্রিয়তার এভারেস্ট থেকে ‘৭৭-এর ভোটে ভরাডুবির অতলান্ত খাদ। বিকল্প সরকারকে আরএসএস চলতে দিলে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস অন্য ভাবে লেখা হত। মোদ্দা কথা, ভূভারতে মোদী সরকারই সর্বার্থে অভূতপূর্ব এমন ভাবার অবকাশ রাখেনি বিগত ৭২ বছর।

এবং এত দিনে বিরোধী নেতারা বলতে শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রীর একটি মুদ্রাদোষের কথা। কথাটি হল ‘মোদী’। সব সময় তিনি নিজের দল ও সরকারকে স্বনামে না ডেকে শুধু ‘মোদী’ ‘মোদী’ই করেন অনিবার। কখনও উচ্চারণ করেন না বিজেপি সরকারের, দলের, এমনকি ভারত সরকারের নাম। অতীতে কোনো দল মত ও পথের কোনো প্রধানমন্ত্রী বা মুখ‍্যমন্ত্রীকে এ ভাবে নিজের নামে নিরন্তর রণিত হতে দেখেনি ভারতবাসী। কিন্তু এই নতুন ধারাটির বিপদ হল, জয়ের শ্রেয় যদি শুধু মোদীরই হয়, তবে পরাজয়ের গ্লানিও শুধু তাঁরই। রত্নাকরের মতো কেউ তাঁর পুণ্যের ফল হাত পেতে নিলেও পাপের ভাগী হবে না। গোটা পরিস্থিতিকে একেবারে শিখরচুম্বী করেছে নিতিন গডকরির একটি নিরীহ বিবৃতি, যা অবশ্যই দ্ব্যর্থবোধক। নিতিন বলেছেন, “মিত্রোঁ, আপনারা গত পাঁচ বছর শুধু ট্রেলার দেখেছেন। ফিল্ম এখনও শুরুই হয়নি। হবে আমরা ক্ষমতায় ফেরার পর।” এ বার যে যেমন খুশি অর্থ করে নিন। কিন্তু এমন কথা তো মোদী বলেননি। বলতেই পারতেন, অচ্ছে দিন পাঁচ বছরে শুধু ঝলক দেখিয়েছে। দশ বছরে, মানে এ বারে ঠিকই আসবে। অথবা, পাঁচ বছরে পারিনি, কিন্তু কথা তো ফিরিয়েও নিইনি। এ বার ১৫ লাখ দেব মাথাপিছু। এমনই আরও ফিল গুড আইটেম। কিন্তু যা গেছে তা যাক। মোদী দেখেছেন, দেশের ভেতরে নানা দুর্দৈব। এমনকি শেষ লগ্নে মোদীঝড় ফিনিশ ফণীর তাণ্ডবে। তা ছাড়া, গত বারের ইস্তাহার শোনালেই নানা ফ‍্যাকড়া। আছে ১০ কোটি বেকারের চাকরি! কয়েক লাখও হয়নি। উলটে গোরক্ষক গোদের ওপর বেকারি বিষফোঁড়া। বেকারি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। ৪৫ বছরে এত বেকার আর বেকারি দেখেনি দেশ। অথচ ৩০ বছর পর বিজেপিকে মানুষ দিয়েছিল প্রথম নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা। সব নতুন ভোটার অচ্ছে দিন আর কাজ পাওয়ার স্বপ্ন দেখে মোদীকে মসিহা ভেবেছিল। তার পুরস্কার ৪৫ বছরে সর্বোচ্চ বেকার ও বেকারি। সুতরাং ওই ইস্তাহারের ভুলভুলাইয়ায় যেতে নারাজ মোদী। এমনকি সবার ইস্তাহার দেখে সব শেষে এত ঘটা করে নিজেদের সংকল্পপত্র বের করল বিজেপি, তা-ও ছুঁয়ে দেখলেন না মোদী। সোজা চলে গেলেন পুলওয়ামা আর বালাকোটে। শহিদ ভাঙিয়ে ভোট, ধর্মের আঁকশিতে ভোট হবে না। কিন্তু মোদী তাঁর উগ্র জাতীয়তার ভবি ভুলতে নারাজ। অভিনন্দনের ছবি দেওয়া পোস্টার সরিয়ে পাকিস্তান আর কাশ্মীর চলতে থাকল রমরমিয়ে। মোদী বারবার আওড়ালেন পুলওয়ামা।

ইস্তাহার ছেড়ে শেষটা ‘হম ভি চৌকিদার’-ও ছাড়লেন মোদী। এবং কী কুক্ষণে মৃত রাজীবকে বললেন ভ্রষ্টাচারী। নির্বাচন কমিশনের নামে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ জোরালো। প্রধানমন্ত্রীকে পরের পর ছাড় দিয়ে এক ফাঁকে রাহুলকেও ক্লিন ঢিট দিল কমিশন। কিন্তু রাজীব-তনয় তাঁর মৃত বাবাকে অপমানের অভিযোগ নিয়ে কমিশনের দরজায় দাঁড়ানোর আগে আরও একবার সপ্রেম ভেট দিলেন মোদীকে জড়িয়ে ধরে। মোদী এই আলিঙ্গনকে ‘আলি’ বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও পারবেন কী করে? রাহুল মোদীকে ‘কর্ম’-এর কথা শুনিয়েছেন আর প্রিয়ঙ্কা হিন্দু দর্শন নয়, সাফ রাজনীতিতে জবাব দিয়েছেন। বলেছেন, অমেঠি এর উত্তর দেবে আপনাকে। প্রধানমন্ত্রী এখন আর কোন ইস‍্যু এড়াতে কী বিষয় তুলবেন? যা ধরছেন তাতেই তো হাত পুড়ছে!

Advertisement
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

প্রবন্ধ

গীতিকার প্রণব রায়ের প্রয়াণবার্ষিকীতে সশ্রদ্ধ প্রণাম

আজ থেকে ঠিক ৪৫ বছর আগে এমনই এক ৭ আগস্টে প্রয়াত হয়েছিলেন তিনি।

শুভদীপ রায় চৌধুরী

“…প্রভাতে কে আর মনে রাখে বলো রজনী শেষের চাঁদে,/ শুধু দুদিনের সাথীরে কে আর মালার বাঁধনে বাঁধে।।…”

আজ ৭ আগস্ট। কবি ও গীতিকার প্রণব রায়ের (Pranab Roy) প্রয়াণবার্ষিকী। আজ থেকে ঠিক ৪৫ বছর আগে এমনই এক ৭ আগস্টে প্রয়াত হয়েছিলেন তিনি।

প্রণব রায়ের জন্ম ১৯১১ সালের ৫ ডিসেম্বর, প্রখ্যাত সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারে। সাবর্ণ পরিবারের সুসন্তান প্রণব রায়ের রচিত প্রায় সাড়ে তিন হাজার গান রয়েছে যা বাংলা আধুনিক গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

ছাত্রাবস্থায় ‘কমরেড’ শীর্ষক কবিতা লেখায় তাঁকে কারাবাসও করতে হয়, তবুও তাঁর সৃষ্টি থেমে থাকেনি। কাজী নজরুল ইসলামের ভাবশিষ্য প্রণব রায় ব্রাহ্ম বয়েজ স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সিটি কলেজে ভর্তি হন। ছেলেবেলা থেকেই সাহিত্যের নেশা ছিল তাঁর। ‘বিশ্বদূত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘কমরেড’ কবিতাটি। গীতিকার হওয়ার প্রেরণা পেয়েছিলেন কাজী নজরুলের কাছ থেকে। তাঁর বহু রচনায় কাজী নজরুল সুরও করেছিলেন।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের রেকর্ড করা প্রথম গানের রচয়িতা প্রণব রায়। এ ছাড়া যূথিকা রায়ের কণ্ঠে আধুনিক গানের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ‘সাঁঝের তারকা আমি’ ও ‘আমি ভোরের যূথিকা’ গান দু’টির রচয়িতাও তিনি। ১৯৩৪ সালে গীতিকবি প্রণব রায়ের প্রথম গান রেকর্ড হয় কাজী নজরুলের তত্ত্বাবধানে। ১৯৩৬ সালে ‘পণ্ডিতমশাই’ ছায়াছবিতে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন গীতিকার প্রণব রায়। তাঁর প্রথম গানটি কমল দাশগুপ্তের সুরে এবং ভবানী দাসের কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়।

প্রথম গল্পগীতি লেখেন প্রণব রায়। জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে গাওয়া তাঁর লেখা গল্পগীতি ‘চিঠি’, ‘সাতটি বছর আগে পরে’ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁর গীতিকবিতার প্রতিটি ছন্দে জীবনের সূক্ষ সূক্ষ অনুভূতি ধরা পড়ত, যার অধিকাংশই তিনি রচনা করেছিলেন বাংলা চলচিত্রের জন্য। প্রায় তিনশোটি ছবির গান লিখেছিলেন তিনি। ছবির পরিবেশের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই গান রচনা করতেন। এমনকি তিরিশ থেকে চল্লিশের দশকে গীতিকবিতার রচয়িতা হিসাবে রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুলের সঙ্গে একত্রে উচ্চারিত হত তাঁর নাম।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের কণ্ঠে এবং শৈলেন দাশগুপ্তের সুরে প্রণব রায় লিখেছিলেন ‘কেন দিলে এত গান’, রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে লিখেছিলেন ‘মনের দুয়ার খুলে কে’, সুবল দাশগুপ্তের সুরে লিখেছিলেন ‘যদি ভুলে যাও মোরে’। এ ছাড়াও লিখেছিলেন ‘সে বুঝি ফিরে গেছে’, ‘কোথায় হারালো দিন’, ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে’, ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’, “চম্পা চামেলি গোলাপেরই বাগে’, ‘আমার সোনা চাঁদের কণা’ ইত্যাদি অসংখ্য গান। সুরকার দুর্গা সেনের সুরে লিখেছিলেন ‘যে গান হল না গাওয়া’, ১৯৪২ সালে শৈলেন দাশগুপ্তের সুরে লিখেছিলেন ‘সেদিন মাধবী রাতে’, ১৯৪৫ সালে কমল দাশগুপ্তের সুরে লিখেছিলেন ‘কণ্ঠে আমার নিশিদিন’ ইত্যাদি।

শুধু গীতিকারই নন, বহুমুখী প্রতিভার মানুষ ছিলেন প্রণব রায়। চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার হিসাবেও কাজ করেছেন তিনি। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও জহর রায় অভিনীত বিখ্যাত কমেডি ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্টেন্ট’-এর কাহিনি রচনা করেছিলেন প্রণব রায়।

অনেকেরই জানা নেই হয়তো, রহস্য-রোমাঞ্চ বা ভৌতিক গল্প রচনাতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। অতীত দিনের রহস্য-সাহিত্যে জনপ্রিয় পত্রিকা ‘রোমাঞ্চ’ এবং অন্যান্য পত্রিকায় তাঁর নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হত।

গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার প্রণব রায়ের আরেকটা পরিচয় ছিল – তিনি ছিলেন সাংবাদিক। বছরখানেক কাজ করেছিলেন ‘বসুমতী’ পত্রিকায় বার্তা সম্পাদক হিসাবে। ব্রিটিশবিরোধী পত্রিকা ‘নাগরিক’-এর সম্পাদক ছিলেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে প্রণব রায় ছিলেন খুব কম কথার মানুষ। বাংলা সংস্কৃতি জগতের এই প্রতিভাধর মানুষটির প্রতি রইল অনেক শ্রদ্ধা।

Continue Reading

প্রবন্ধ

শ্রাবণের এই রাখিপূর্ণিমাতেই জন্মেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ-শিষ্য স্বামী নিরঞ্জনানন্দ

শুভদীপ রায় চৌধুরী

সময়টা ১৮৮১-৮২ সালের কোনো এক দিন। দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করতে হাজির কলকাতার এক যুবক। বয়স ১৮-১৯। ঠাকুর সে সময় থাকতেন দক্ষিণেশ্বরে রানি রাসমণির প্রতিষ্ঠিত কালীবাড়িতে। তাঁর অদ্ভুত ঈশ্বরনির্ভর জীবন ও সহজ সরল ব্যবহার তখনকার কলকাতার অনেকেই জানতেন এবং তাতে আকৃষ্ট হয়ে তাঁর কাছে ছুটে আসতেন। লোকমুখে ঠাকুরের কথা শুনে সেই যুবকও তাঁকে দর্শন করবেন বলে দক্ষিণেশ্বরে এসেছেন। দেখলেন ঠাকুর ভক্তপরিবেষ্টিত হয়ে রয়েছেন। সন্ধে হতেই ভক্তরা একে একে চলে গেলে ঠাকুর তাঁর ভবিষ্যতের প্রিয় শিষ্যকে পাশে বসিয়ে অনেক কথা বললেন, যেন কত দিনের চেনা। ভবিষ্যতের সেই প্রিয় শিষ্য হলেন নিত্যনিরঞ্জন ঘোষ তথা স্বামী নিরঞ্জনানন্দ।   

তাঁর তরুণ ভক্তের শক্তি ভুল পথে ব্যয়িত হচ্ছে দেখে শ্রীরামকৃষ্ণ চিন্তিত হলেন। বললেন, “দ্যাখ নিরঞ্জন, ভূত ভূত করলে তুই ভূত হয়ে যাবি, আর ভগবান ভগবান করলে ভগবান হবি। তা কোনটা হওয়া ভালো?” নিরঞ্জন সরল ভাবেই উত্তর দিলেন, তা ভগবান হওয়াই ভালো।

ঠাকুর কেন হঠাৎ সে দিন নিরঞ্জনের ভূত-সঙ্গের কথা পেড়েছিলেন? একটু পেছনে ফিরে যাওয়া যাক।  

উচ্চ আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন নিত্যনিরঞ্জন ১২৬৯ বঙ্গাব্দের (১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ) শ্রাবণ পূর্ণিমার দিন রাজারহাট-বিষ্ণুপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে এই অঞ্চলটি কলকাতার মধ্যে অবস্থিত হলেও অতীতে এটি অবিভক্ত চব্বিশ পরগনার একটি গ্রাম ছিল। নিত্যনিরঞ্জনের বাবার নাম ছিল অম্বিকাচরণ ঘোষ। বারাসতের পণ্ডিত কালীকৃষ্ণ মিত্র ছিলেন নিরঞ্জনের মামা। মাতুলের কলকাতাস্থ বাড়িতে থেকে নিরঞ্জন লেখাপড়া করতেন।

স্বামী নিরঞ্জনানন্দ।

শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে আসার আগে নিরঞ্জন আহিরীটোলানিবাসী ডাক্তার প্যারীচাঁদ মিত্রের বাড়িতে একটি প্রেততত্ত্বান্বেষী দলের সঙ্গে পরিচিত হন। তারা নিরঞ্জনকে ভূত নামানোর মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করত। এই ভাবে ভূতুড়েদের দলে যাতায়াত করতে করতে একটি ঘটনায় নিরঞ্জনের মনে বৈরাগ্যের সঞ্চার হয়। দীর্ঘ ১৮ বছর অনিদ্রায় ভোগার পর জনৈক ধনী ব্যক্তি নিরঞ্জনের শরণাপন্ন হন। নিরঞ্জন পরে বলেছিলেন, তাঁকে ওই ভাবে দারুণ কষ্ট পেতে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, তা হলে আর এত ধনসম্পত্তির কী প্রয়োজন।

বৈরাগ্য থেকেই নিরঞ্জনের মনে আধ্যাত্মিক রাজ্যের দ্বার খুলে গিয়েছিল। তত দিনে শুনেছেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কথা। তাঁর অতুলনীয় ভগবৎপ্রেম ও আকর্ষণীয় উপদেশের কথা তখন লোকের মুখে মুখে প্রচার হচ্ছে। নিরঞ্জন ছুটে এলেন দক্ষিণেশ্বরে। সে দিন নিরঞ্জনকে ভুতুড়েসঙ্গ ত্যাগ করতে বলেছিলেন ঠাকুর এবং নিরঞ্জনে সেই সঙ্গ ত্যাগ করেছিলেন।

এর কয়েক দিন পরে নিরঞ্জন আবার এলেন দক্ষিণেশ্বরে। ঠাকুর ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে, বললেন, “ওরে নিরঞ্জন, দিন যে যায়রে – তুই ভগবান লাভ করবি কবে? দিন যে চলে যায়, ভগবানকে লাভ না করলে সবই যে বৃথা যাবে। তুই কবে তাঁকে লাভ করবি বল, কবে তাঁর পাদপদ্মে মন দিবি বল? আমি যে তাই ভেবে আকুল!” নিরঞ্জন অবাক হয়ে ভাবলেন, ইনি কে? আমার ভগবানলাভ হচ্ছে না বলে, দিন চলে যাচ্ছে বলে আমার জন্য এঁর এত আর্তি কেন? পরের জন্য এ কি অহৈতুকী ভালোবাসা! নিরঞ্জন এ রহস্য ভেদ করতে পারলেন না বটে, কিন্তু ঠাকুরের এই আবেগভরা কথায় তাঁর হৃদয় বিগলিত হল। সে দিন আর কলকাতায় ফিরে যেতে পারলেন না তিনি। সেই দিন তো ছার, পর পর তিন দিন নিরঞ্জন থেকে গেলেন দক্ষিণেশ্বরে।

নিরঞ্জনের সরলতা ঠাকুরকে প্রথম থেকেই মুগ্ধ করেছিল। একদিন শ্রীম তথা মাস্টারমশায়কে ঠাকুর বলেছিলেন, “তোমায় নিরঞ্জনের সঙ্গে দেখা করতে বলছি কেন? সে সরল ইহা সত্য কি না, এইটি দেখবে বলে।” ১৮৮৪-এর ১৫ জুন কাঁকুড়গাছিতে সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাগানবাড়িতে এক মহোৎসবে যোগ দেন ঠাকুর। এক সময় নিরঞ্জন এসে ঠাকুরকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন। ঠাকুর তাঁকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “তুই এসেছিস।” কাছেই ছিলেন মাস্টার (শ্রীম)। নিরঞ্জনকে দেখিয়ে তাঁকে বললেন,  “দেখ, এ ছোকরাটি বড় সরল। সরলতা পূর্বজন্মে অনেক তপস্যা না করলে হয় না। কপটতা পাটোয়ারী এসব থাকতে ঈশ্বরকে পাওয়া যায় না।”

নিরঞ্জনের সরলতা ও বৈরাগ্যের জন্য ঠাকুর তাঁর প্রতি অত্যন্ত স্নেহপরায়ণ ছিলেন। একদিন এই প্রসঙ্গে ঠাকুর বলেছিলেন, “দেখছ না নিরঞ্জনকে? তোর এই নে, আমার এই দে”- ব্যস, আর কোন সম্পর্ক নাই। পেছু টান নাই।”

নিরঞ্জনের স্বভাবে কিছুটা উগ্র ভাব থাকলেও তিনি ছিলেন খুবই সাহসী। আর ভেতরে ভেতরে ছিলেন কোমল প্রকৃতির এক মানুষ, অত্যন্ত সেবাপরায়ণ। ঠাকুরের দেহত্যাগের পর নরেন্দ্রনাথ-সহ গুরুভাইরা যখন আঁটপুরে যান তখন নিরঞ্জনও গিয়েছিলেন। স্নান করতে গিয়ে একদিন সারদাপ্রসন্ন (পরবর্তী কালে স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ) পুকুরে ডুবে যাচ্ছিলেন। তখন প্রাণের মায়া ত্যাগ করে নিরঞ্জন পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে উদ্ধার করেন। ১৮৮৮ সালে লাটু মহারাজের নিউমোনিয়া হলে নিরঞ্জন মহারাজ তাঁর সেবার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ভক্তপ্রবর বলরামবাবুর শেষ অসুখের সময়ও নিরঞ্জন প্রাণ ঢেলে তাঁর সেবা করেছিলেন।

গুরুভাইদের সঙ্গে স্বামী নিরঞ্জনানন্দ (একেবারে ডান দিকে)।

১৮৮৭ সালের প্রথম দিকে বরানগরে অন্য গুরুভ্রাতাদের সঙ্গে নিরঞ্জনও সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর নাম রাখেন ‘স্বামী নিরঞ্জনানন্দ’। সন্ন্যাস গ্রহণের পরেই তিনি শ্রীক্ষেত্র পুরীধামে গিয়ে ৮ এপ্রিল মঠে ফিরে আসেন। এর পর ১৮৮৯-এর নভেম্বরে আবার বেরিয়ে পড়েন স্বামী নিরঞ্জনানন্দ। প্রথমে দেওঘরে বৈদ্যনাথ দর্শন করেন। তার পর সেখান থেকে কাশীতে যান এবং বংশীদত্তের বাড়িতে কিছু দিন থেকে তপস্যা করেন। এ সময় তিনি মাধুকরী ভিক্ষা করে খেতেন। এরই মধ্যে স্বামী যোগানন্দের অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তিনি প্রয়াগে যান। সেই সুযোগে স্বামী নিরঞ্জনানন্দের কল্পবাসও হয়। পরে উত্তর ভারতের আরও কিছু তীর্থদর্শনে বেরিয়ে পড়েন তিনি এবং কোনো কোনো জায়গায় তপস্যাও করেন।  

কালীকিঙ্কর বোস তখনও স্বামী বিরজানন্দ হননি। ১৮৯১-৯২ সালে তখন তাঁর বয়স ১৮-১৯, বরানগর মঠে যাতায়াত শুরু করেছেন। সেই সময় নিরঞ্জন মহারাজকে প্রায়ই দেখতেন দক্ষিণেশ্বরের যেতে। সেখানে পঞ্চবটীতলায় ও ঠাকুরের ঘরে ধ্যান করতেন তিনি। মাঝেমধ্যে কালীকিঙ্করও তাঁর সঙ্গী হতেন। ১৮৯৩ সালে স্বামী নিরঞ্জনানন্দ আবার তীর্থদর্শনে এবং তপস্যার জন্য বেরিয়ে পড়লেন। ১৮৯৫ সালের প্রথম দিকে ঠাকুরের জন্মোৎসবের আগে তিনি আলমবাজার মঠে ফিরে আসেন।

স্বামী নিরঞ্জনানন্দ খুবই শৃঙ্খলাপরায়ণ ছিলেন। খবর পেলেন স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ব জয় করে ১৮৯৬-এর শেষ দিকে পশ্চিমের দেশ থেকে ভারতের উদ্দেশে রওনা হবেন। সেই খবর পেয়ে নিরঞ্জন মহারাজ বিশ্ববিজয়ী গুরুভাইকে অভ্যর্থনা জানাতে কলম্বো রওনা দেন। পরের বছর ১৫ জানুয়ারি স্বামীজি মহারাজ জাহাজ থেকে নামলে সর্ব প্রথম তাঁকে অভ্যর্থনা জানান নিরঞ্জন মহারাজ।

শুধুমাত্র ঠাকুরই নন, সারদাজননীর প্রতিও স্বামী নিরঞ্জনানন্দের অগাধ শ্রদ্ধাভক্তি ছিল। ঠাকুরের অদর্শনের পর শ্রীমাই ছিলেন তাঁর আশ্রয়স্থল। সবাইকে এই কথা মুক্তকণ্ঠে জানাতে দ্বিধাও করতেন না। অনেককে এই আশ্রয়ে তিনি পৌঁছেও দিয়েছেন। মা যে কেবল গুরুপত্নীই নন, তিনি যে জগজ্জননী আদ্যাশক্তি, এ কথা তিনি সর্ব সমক্ষে প্রচার করতেন।

১৯৫৩ সালের ২৪ আগস্ট স্বামী শিবানন্দ মহারাজের শিষ্য স্বামী সংশুদ্ধানন্দ মহারাজ কয়েক জন সন্ন্যাসী ও গৃহীভক্তকে নিয়ে রাজারহাট-বিষ্ণুপুরের ঘোষবাড়িতে আসেন। চণ্ডীমণ্ডপের ঠিক পূর্ব দিকের ঘরটিতে নিরঞ্জন ভূমিষ্ট হয়েছিলেন বলেই জানা যায়। সেই স্থানটিকে চিহ্নিত করে সেখানে ঠাকুর-মা-স্বামীজি ও স্বামী নিরঞ্জনানন্দের পট স্থাপন করে সকলে প্রণাম নিবেদন করেন। এর পর স্থানীয় ভক্তদের কঠোর পরিশ্রমে ‘শ্রীরামকৃষ্ণ-নিরঞ্জনানন্দ আশ্রম’-এর সূত্রপাত হয় ১৯৫৪ সালে। তখন বাৎসরিক উৎসব হত চণ্ডীমণ্ডপে ও আটচালায়।

ঘোষ পরিবারের মণিভূষণ ঘোষ দু’ শতক জমি আশ্রমকে দান করেন। সন্ন্যাসগ্রহণের পর নিরঞ্জন মহারাজ যখন শেষ বার আটচালায় এসেছিলেন সেই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন মণিভূষণ ঘোষ মহাশয়। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন স্নানযাত্রার দিন আশ্রমের নবনির্মিত মন্দিরের দ্বার উদ্ঘাটন করেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের পূজ্যপাদ শ্রীমৎ স্বামী ভূতেশানন্দজি।

নিরঞ্জন সম্পর্কে ঠাকুর বলেছিলেন, “ঈশ্বরকোটি, রামচন্দ্রের অংশে জন্ম।” রাখি পূর্ণিমার পুণ্য লগ্নে সেই পুণ্যপুরুষ স্বামী নিরঞ্জনানন্দের প্রতি রইল আমাদের প্রণাম।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:

শ্রীরামকৃষ্ণ-ভক্তমালিকা – স্বামী গম্ভীরানন্দ

বিশ্বচেতনায় শ্রীরামকৃষ্ণ – সম্পাদনায় স্বামী প্রমেয়ানন্দ, নলিনীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় ও স্বামী চৈতন্যানন্দ

শ্রীম কথিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত

Continue Reading

প্রবন্ধ

যোগকেন্দ্র-জিম খোলার এটাই কি যথার্থ সময়?

অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্র। সব কিছুই যখন একে একে খুলছে, তা হলে যোগকেন্দ্র অথবা জিম সেন্টার কেন নয়? লিখলেন ত্রিশিরা তঙ্কাদার

৫ আগস্ট থেকে যোগকেন্দ্র এবং জিম খোলার শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কোভিড-১৯ মহামারি (Covid-19 pandemic) পরিস্থিতিতে তৃতীয় ধাপের আনলক-এ শরীরচর্চার অন্যতম কেন্দ্রগুলি খোলার অনুমতি দেওয়ার পরেও দোটানায় ভুগছেন সেখানকার কর্তৃপক্ষ এবং সেখানে গিয়ে শরীরচর্চাকারী সদস্যরাও।

লকডাউনের জেরে বদ্ধঘরে থাকতে থাকতে এক দিকে যেমন স্থবিরতা আসছে শরীরে, তেমনই জড়তা জড়িয়ে ধরছে মনকেও। ঘরে বসে যতই শরীরচর্চা করা হোক না কেন, কেন্দ্রের মতো প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধান এবং যথোপযুক্ত পরিবেশ বাড়িতে অমিল। সারা পৃথিবীতে এমন কয়েক লক্ষ মানুষ রয়েছেন, যাঁরা ওষুধের পাশাপাশি শরীরচর্চাকেও রোগ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার উপাদান হিসেবে মেনে চলেন। ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের জেরে যোগকেন্দ্র অথবা জিমে না যেতে পারার কারণে তাঁদের শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। সঙ্গে মানসিক বিষণ্ণতা তো রয়েইছে। কিন্তু করোনা আক্রান্তের সংখ্যা যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখন এই কেন্দ্রগুলি খুলে দেওয়া হলে উল্টো ফল যদি হয়!

এ ধরনের কেন্দ্রগুলি মূলত বদ্ধঘরেই হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞরা আবার বলছেন, বদ্ধঘরে এক জনের থেকে আর এক জনের শরীরে ভাইরাস সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা বেশি। ফলে কোনো উপসর্গহীন আক্রান্ত আগাম না বুঝেই যদি কেন্দ্রে আসেন, সে ক্ষেত্রে তাঁর থেকে অন্য কারো সংক্রামিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। এ ক্ষেত্রে শর্ত হিসেবে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টিতেও সমান ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রটির দরজা-জানলা খোলা রেখে আয়তনের তুলনায় কতজন সদস্যকে অনুমতি দেওয়া হবে, সেটাও দেখার বিষয়।

অন্য দিকে মাস্ক পরার বিষয়টিতে এখন সবমহলের তরফে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যোগ অথবা জিমের ক্ষেত্রে মাস্ক পরা অবস্থায় শরীরচর্চা করা কতটা যুক্তযঙ্গত, তা নিয়েও বিশেষজ্ঞ মহল একমত হতে পারছে না। ব্যায়ামের সঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠানামার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধার সৃষ্টি করতে পারে, এমন কোনো মাস্ক পরে ব্যায়াম করলে হিতে বিপরীত হতে পারে কি না, সেটা নিয়েও চলছে জোর আলোচনা।

এ ব্যাপারে চলে আসছে আমেরিকা প্রসঙ্গও। আক্রান্তের সংখ্যা যখন চূড়োর দিকে দৌড়োচ্ছে, তখন জর্জিয়া, ওকলাহোমার বেশ কিছু জিম সদস্যদের জন্য দরজা খুলে দেয়। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই দেখা যায়, সংক্রমণ ছড়ানোর উৎস হয়ে উঠছে সেগুলি। কারণ, এ ধরনের কেন্দ্রগুলিতে যতই স্যানিটাইজেশন করা হোক না কেন, সর্বক্ষণ শারীরিক দূরত্ব, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা মুশকিলের কাজ। সেখানকার সরঞ্জামগুলো একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করেন। অন্য দিকে হংকং কিন্তু করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে জিমের দরজা সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করে দেয়।

তবে কেন্দ্রীয় সরকার যখন অনুমোদন দিয়েছে, তখন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শের পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা এক প্রকার নিশ্চিত। একটি মহল এমনও বলছে, দোকান-বাজার, গণপরিবহণ যখন সব কিছুই খোলা, তখন যোগ-জিম সেন্টার আর কী দোষ করল!

হু কী বলছে?

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সাম্প্রতিক একটি পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, বায়ু চলাচল অবরুদ্ধ কোনো ভিড়যুক্ত স্থান কোনো আক্রান্তের থেকে অন্যের শরীরে ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

একই সঙ্গে বলা হয়েছে, বদ্ধঘরের বিষয়টি ব্যতিরেকেও আরও একটি অন্যতম কারণ, শরীরচর্চার সময় গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস। গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা থেকে যায়। এমনিতেই ড্রপলেটের মাধ্যমে ভাইরাসের বেশকিছুটা দূরত্ব অগ্রসর হওয়ার প্রমাণও মিলেছে। ফলে জিমে গিয়ে আধঘণ্টা থেকে একঘণ্টা সময় অতিবাহিত করার বিষয়টিতে আশঙ্কা থেকে যেতে পারে।

আবার একই সঙ্গে সংস্থা দাবি করেছে, কোনো প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে আধঘণ্টার শরীরচর্চা অনাক্রম্যতা বজায় রাখতে সহায়ক।

সংকট বাড়ছে জিম-মালিকদের

কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা জারির পর উত্তরপ্রদেশ এবং হরিয়ানার মতো রাজ্য সরকারগুলিও আগামী ৫ আগস্ট থেকে জিম খোলার শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে।

জিম-মালিকরা বলছেন, মহামারিতে চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন তাঁরা। এমনিতে মাস চারেক সম্পূর্ণ বন্ধ, তার উপর বকেয়া বিল মেটানোরও কোনো লক্ষণ নেই। বাড়িভাড়া-সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। যোগ অথবা জিমের প্রশিক্ষকরা অনলাইনে প্রশিক্ষণ দিলেও সেখান থেকে আয় নামমাত্র।

এমন পরিস্থিতিতে অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই তাঁরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেন্দ্রগুলি চালু করতে আগ্রহী। কেউ কেউ স্থির করেছেন, কোনো সদস্যকে জিমে ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি দেওয়া হবে না। প্রতিটি সদস্যকে সুতির মাস্ক এবং গ্লাভস দেওয়া হবে এবং প্রশিক্ষকরা পিপিই কিট পরে থাকবেন। এ ক্ষেত্রে জিমের মালিকরা নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত সদস্য সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনলাইনে রেজিস্টার ব্যবস্থাও চালু করছেন। তবে তাঁদের এই উদ্যোগে সদস্যরা কতটা আগ্রহ দেখাবেন, সেটাই মূল প্রশ্ন।

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
শিক্ষা ও কেরিয়ার5 hours ago

সুইৎজারল্যান্ডে পড়াশোনায় আগ্রহী ভারতীয়দের সহায়তা দিতে ‘কুইন্টেসেনশিয়ালি’-এর সঙ্গে হাত মেলাল ‘লে রোসে’

রাজ্য9 hours ago

এই প্রথম রাজ্যে একদিনেই সুস্থ তিন হাজারের বেশি, নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কম

ভিডিও10 hours ago

বেসরকারি হাসপাতালের অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে গ্রেফতারির পরামর্শ নির্মল মাজির

ক্রিকেট12 hours ago

আমিরশাহিতে আইপিএল আয়োজনের অনুমতি দিল কেন্দ্র

দেশ12 hours ago

দেশে ট্রেন বাতিলের মেয়াদ বাড়ানো হল ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত

দেশ12 hours ago

কেরলে ভয়াবহ ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৮

দেশ13 hours ago

রাজনীতি ছাড়লেন ২০১০-এর আইএএস পরীক্ষায় শীর্ষ স্থানাধিকারী কাশ্মীরি যুবক শাহ ফয়জল

দেশ13 hours ago

বৃষ্টির মধ্যে সাত ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে ম্যানহোল পাহারা দিলেন মুম্বইয়ের পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলা

দেশ21 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ৬২০৬৪, সুস্থ ৫৪৮৫৯

দেশ3 days ago

বিমান দুর্ঘটনা লাইভ: উদ্ধার ব্ল্যাক বক্স, উদ্ধারকারীদের কোয়ারান্টাইনে যাওয়ার নির্দেশ শৈলজার

কলকাতা3 days ago

ঢাকায় পথদুর্ঘটনায় নিহত পর্বতারোহী, শোকস্তব্ধ কলকাতার পাহাড়প্রেমীরা

বিনোদন3 days ago

২৮ দিন পর করোনা মুক্ত অভিষেক বচ্চন

দেশ3 days ago

“দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত খুন”, কোড়িকোড়ের ঘটনা নিয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এয়ার সেফটি এক্সপার্টের

দুর্গা পার্বণ3 days ago

মল্লিকবাড়ির ঠাকুরদালানে মা সিংহবাহিনীকে দর্শন করেই শ্রীরামকৃষ্ণ হয়েছিলেন সমাধিস্থ

বিনোদন2 days ago

হাসপাতালে ভরতি সঞ্জয় দত্ত, তবে করোনা নেগেটিভ

দেশ2 days ago

অন্ধ্রপ্রদেশের কোভিড কেয়ার সেন্টারে আগুন, মৃত বেড়ে ১১

রবিবারের খবর অনলাইন

কেনাকাটা

কেনাকাটা4 days ago

ঘর ও রান্নাঘরের সরঞ্জাম কিনতে চান? অ্যামাজন প্রাইম ডিলে রয়েছে ৫০% পর্যন্ত ছাড়

খবরঅনলাইন ডেস্ক : অ্যামাজন প্রাইম ডিলে রয়েছে ঘর আর রান্না ঘরের একাধিক সামগ্রিতে প্রচুর ছাড়। এই সেলে পাওয়া যাচ্ছে ওয়াটার...

কেনাকাটা5 days ago

এই ১০টির মধ্যে আপনার প্রয়োজনীয় প্রোডাক্টটি প্রাইম ডে সেলে কিনতে পারেন

খবরঅনলাইন ডেস্ক : চলছে অ্যামাজনের প্রাইমডে সেল। প্রচুর সামগ্রীর ওপর রয়েছে অনেক ছাড়। ৬ ও ৭  তারিখ চলবে এই সেল।...

কেনাকাটা5 days ago

শুরু হল অ্যামাজন প্রাইম ডে সেল, জেনে নিন কোন জিনিসে কত ছাড়

খবরঅনলাইন ডেস্: শুরু হল অ্যামাজন প্রাইম ডে সেল। চলবে ২ দিন। চলতি মাসের ৬ ও ৭ তারিখ থাকছে এই অফার।...

things things
কেনাকাটা2 weeks ago

করোনা আতঙ্ক? ঘরে বাইরে এই ১০টি জিনিস আপনাকে সুবিধে দেবেই দেবে

খবরঅনলাইন ডেস্ক : করোনা পরিস্থিতিতে ঘরে এবং বাইরে নানাবিধ সাবধানতা অবলম্বন করতেই হচ্ছে। আগামী বেশ কয়েক মাস এই নিয়মই অব্যাহত...

কেনাকাটা2 weeks ago

মশার জ্বালায় জেরবার? এই ১৪টি যন্ত্র রুখে দিতে পারে মশাকে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: একে করোনা তায় আবার ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়েছে। এই সময় প্রতি বারই মশার উৎপাত খুবই বাড়ে। এই বারেও...

rakhi rakhi
কেনাকাটা3 weeks ago

লকডাউন! রাখির দারুণ এই উপহারগুলি কিন্তু বাড়ি বসেই কিনতে পারেন

সামনেই রাখি। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে মনের মতো উপহার কেনা একটা বড়ো ঝক্কি। কিন্তু সেই সমস্যা সমাধান করতে পারে অ্যামাজন। অ্যামাজনের...

কেনাকাটা3 weeks ago

অনলাইনে পড়াশুনা চলছে? ল্যাপটপ কিনবেন? দেখে নিন ৪০ হাজার টাকার নীচে ৬টি ল্যাপটপ

ইনটেল প্রসেসর সহ কোন ল্যাপটপ আপনার অনলাইন পড়াশুনার কাজে লাগবে জেনে নিন।

কেনাকাটা3 weeks ago

করোনা-কালে ঘরে রাখতে পারেন ডিজিটাল অক্সিমিটার, এই ১০টির মধ্যে থেকে একটি বেছে নিতে পারেন

শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বুঝতে সাহায্য করে এই অক্সিমিটার।

কেনাকাটা4 weeks ago

লকডাউনে সামনেই রাখি, কোথা থেকে কিনবেন? অ্যামাজন দিচ্ছে দারুণ গিফট কম্বো অফার

খবরঅনলাইন ডেস্ক : সামনেই রাখি। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে দোকানে গিয়ে রাখি, উপহার কেনা খুবই সমস্যার কথা। কিন্তু তা হলে উপায়...

laptop laptop
কেনাকাটা4 weeks ago

ল্যাপটপ কিনবেন? দেখে নিন ২৫ হাজার টাকার মধ্যে এই ৫টি ল্যাপটপ

খবরঅনলাইন ডেস্ক : কোভিভ ১৯ অতিমারির প্রকোপে বিশ্ব জুড়ে চলছে লকডাউন ও ওয়ার্ক ফ্রম হোম। অনেকেই অফিস থেকে ল্যাপটপ পেয়েছেন।...

নজরে

Click To Expand