বেঙ্গালুরুতে বর্ণপরিচয় রাহুলের, আঞ্চলিক উত্থান নয়, উনিশের মেরুকরণের মূল প্রশ্ন তুলল কর্নাটক

0
দেবারুণ রায়

সনিয়া-লাইনেই সোনা ফলানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন গুলাম নবি আজাদের মতো কংগ্রেসিরা। খানিকটা স্বয়ম্ভু সাজে সজ্জিত ও স্তাবক পরিবৃত নব্য নেতা রাহুল গান্ধী কানে নেননি সে কথা। সময়ের কাজ সময়ে না করায় যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। কর্নাটকে জবরদস্ত তৃতীয় শক্তির উপস্থিতিতে ধসে গিয়েছে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস। ধস এতটাই তীব্র যে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া জাতপাতের সমীকরণে কংগ্রেসের অন্য নেতাদের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাবশালী হয়েও একটি কেন্দ্রে হেরে গিয়েছেন। অন্য দিকে, অবিভক্ত জনতা দলের সমস্ত শাখাপ্রশাখার মধ্যে দলের আদি রাজনীতি আঁকড়ে একমাত্র টিকে আছেন কর্নাটকের দেবগৌড়া। ছেলে কুমারস্বামী নৈতিকতার রাজনীতি আঁকড়ে থেকে উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথ ছাড়তে নারাজ। তবু দলের সনাতনী জমিটুকু বাবার মুঠোয় বলেই এখনও তাঁর সঙ্গে।

কর্নাটকে দেবরাজ আরসের কংগ্রেসকে উপড়ে ফেলে সারা দেশে কংগ্রেসের পুনরুত্থান পর্বে যিনি প্রথম ওই রাজ্যে অকংগ্রেসি সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই ব্রাহ্মণ নেতা রামকৃষ্ণ হেগড়ের মতো জাঁদরেল ও জিনিয়াস রাজনীতিবিদকেও ম্লান করে দিয়েছিলেন কৃষকপুত্র দেবগৌড়া। কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রিত্ব থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রিত্ব পর্যন্ত তাঁর উত্থানের ভিত্তি ছিল যে সামাজিক ও রাজনৈতিক গণিত, সেই সমীকরণই নতুন করে প্রতিষ্ঠা পেল বেঙ্গালুরুর ক্ষমতার অলিন্দে। আর কংগ্রেসের দুঁদে নেতাদের মাথায় বসে পরিবারতন্ত্রের প্রতিভূ রাহুল রামধাক্কা খেয়ে ফিরলেন ‘বিদেশিনি’র লাইনে। ফলে প্রাক নির্বাচনী আঁতাঁতে না যাওয়ার দম্ভ থেকে নির্বাচনোত্তর জোটের সূত্রে মাথা মোড়াতে হল কংগ্রেসকে। ভোটের আগে জোট করলে নেতৃত্ব কংগ্রেসের হাতেই থাকত। কিন্তু কর্নাটকের জনগণ কংগ্রেসের অহংকার চূর্ণ করতেই এমন একটি ম্যানডেট দিলেন যাতে স্বাভাবিক ভাবেই বিজেপি হল বৃহত্তম দল। অসম্পূর্ণ মেরুকরণ হবে, বুঝতে পারেনি বিজেপিও। যে কারণে বিরোধী ভোটের ভাগাভাগিতে তারা খুশি ছিল। ভেবেছিল লিঙ্গায়েতদের সমর্থন তাদের ঝুলি পূর্ণ করে দেবে। তাদের অঙ্ক মিলেও গিয়েছিল অনেকটাই। কিন্তু মাত্র সাত-আটের ব্যবধানে থেমে গেল ইয়েদিয়ুরাপ্পার রথ। তাঁকে নিয়ে রাজ্য দলের চোরাস্রোত রোখা গেলেই নিরঙ্কুশ হয়ে যেত বিজেপি।

এখানেই দেবগৌড়ার মতো তৃতীয় শক্তির কূটনৈতিক কার্ডও একটা ফ্যাক্টর। তাঁর জায়গায় শুধু কুমারস্বামী থাকলে মেরুকরণের ভোটে কংগ্রেস-জেডিএস অগৌরবে বহুবচন হয়ে যেত। পূর্ণ মেরুকরণের ফল কুড়োত বিজেপি। কিন্তু দেবগৌড়ার উপস্থিতি কর্নাটকে কংগ্রেস-বিরোধী হাওয়া অল্প হলেও হাইজ্যাক করে নিল। যার আঁচ মূলত কংগ্রেসের গায়ে লাগলেও বিজেপিরও যাত্রাভঙ্গ হল। জাতীয় রাজনীতির ভূত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদাসীন ও সখের রাজনীতিবিদ রাহুল গান্ধী রাজনীতির প্রতি অনাগ্রহে তাঁর বাবার রাজনীতিও দূর থেকে দেখেছেন। দেখার সেই চোখও তৈরি হয়নি। সুতরাং ঠাকুমার রাজনীতি-কূটনীতির তুখোড় চাল বুঝে ওঠার প্রশ্ন কোথায়?

indira gandhi on the campaign trail in chikmagalur
চিকমাগালুরে নির্বাচনী প্রচারে ইন্দিরা গান্ধী।

সাতাত্তরের ব্যালট-বিপ্লবে ইন্দিরা জমানার মাস্তুল খসে পড়েছিল রায়বরেলিতে। তার পর আর হিন্দি বলয়ে আস্থা রাখেননি। আশ্রয় নিয়েছিলেন কর্নাটকে। কলকাতার যুব কংগ্রেসিরা তখন কার্যত কোমায় যাওয়া সংগঠনে অক্সিজেন দিতে স্লোগান দিয়েছিল: “রায়বেরিলি ভুল করেছে, চিকমাগালুর করেনি/জনগণ জেনে রাখো, ইন্দিরা গান্ধী মরেনি”।

’৮০-র উত্থানের পর ইন্দিরা আঁকড়ে থাকলেন দক্ষিণ ভারতকেই। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বীরেন্দ্র পাটিলের সঙ্গে ঝগড়া মিটিয়ে নিলেন। যদিও কর্নাটকের পালাবদল রোখা গেল না। উত্তরে পুনর্বাসন পেলেও দাক্ষিণাত্যে ধস নামল। কর্নাটকে বিরোধী সরকার কায়েম হওয়ার পর অন্ধ্রে আঞ্চলিক দলের উত্থান হল তেলুগু দেশম প্রতিষ্ঠাতা নন্দমুরি তারক রামরাওয়ের হাতে। একটা সময় এল যখন কর্নাটক-অন্ধ্র-তামিলনাড়ু-কেরল, কোথাও কংগ্রেস সরকার নেই। কংগ্রেসের একচ্ছত্র শাসনের বিকল্প হিসাবে মাথা তুলল কোয়ালিশন। পরিবর্তনের এই ঝড় কিন্তু শুরু হয়েছিল দক্ষিণে কর্নাটক থেকেই। জাতিগত সমীকরণের দিক থেকে দক্ষিণের এই একমাত্র রাজ্যের মিল আছে হিন্দি বলয়ের একাংশের সঙ্গে।

kumarswamy, siddaramaiah, yeddyurappa
কুমাতস্বামী, সিদ্দারামাইয়া এবং ইয়েদিয়ুরাপ্পা।

একক শাসনের অহংকারকে অস্ত্র করে এ রাজ্যে কারও পক্ষেই দ্বিতীয় বার কলকে পাওয়া অসম্ভব। তাই মানুষ দু’টো বিকল্প পথ খোলা রেখে রায় দিয়েছে বিধানসভা ভোটে। হয় বিজেপিকে বৃহত্তম দল হিসাবে মেনে নাও, না হয় জোট সরকারে যাও। আপাতত কাউকেই খাসতালুক করার ছাড়পত্র দেওয়া হল না। কারণ সিদ্দারামাইয়া, ইয়েদিয়ুরাপ্পা এবং কুমারস্বামী, এই তিন চরিত্রই পরীক্ষিত। জনগণ মোহাবিষ্ট নয়। লাগাম হাতে রেখেই শাসনভার সঁপেছে। এ ক্ষেত্রে সরকার আর বিরোধী পক্ষের মধ্যে ব্যবধান এতই কম যে, যে কোনো সময় পালাবদলের খাঁড়া ঝুলছে। অবশেষে বিজেপি বলছে, জোট সরকার চলতে চায় চলুক। আপনাআপনিই তাসের ঘর ভেঙে পড়বে। বছরও ঘুরবে না। তার পর মানুষ বুঝবে আসল বিকল্প কারা। কারা দিতে পারে স্থিতিশীল সরকার। আর কর্নাটকের এই নড়বড়ে মঞ্চে  দাঁড়িয়েই বিরোধী দলগুলো বলছে, এটাই উনিশের জোট। যে জোট দিল্লিতেও বিকল্প সরকার গড়বে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই। কর্নাটক কংগ্রেসের অহংকার ভেঙেছে। যারা এ পর্যন্ত এক মঞ্চে আসেনি, তারাও এসেছে। চরিত্রগত ভাবে দেবগৌড়ার দল আঞ্চলিক নয়। কিন্তু আঞ্চলকিরা তাতেও উল্লসিত। আর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ক্লাসে ভর্তি হয়ে রাহুল গান্ধীর বর্ণপরিচয় হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here