ছবি: ইউটিউব থেকে

উজ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়

দিনটা ছিল ২৫ মে, ২০০৯। আর পাঁচটা দিনের মতোই সকাল শুরু হয়েছিল গোসাবা, বাসন্তী, পাথরপ্রতিমা, কুলতলি , রায়দীঘি, হিঙ্গলগঞ্জের শ্যামল, সুধন্য, মইদুল, শ্যামলী, রমা, রুবিনাাদের। আর কয়েক দিন পর বর্ষা নামবে। তাই বীজ ধান তৈরির জন্য জমি প্রস্তুত করতে রাকি, সাবিররা অনেক সকালেই পান্তা খেয়ে মাঠে চলে গিয়েছিল।

অনিল, সুবোধরা চলে গিয়েছিল নিজেদের তৈরি ফিশারিতে মাছ ধরতে। রত্না, মানসীরা কুমিরের ভয় অগ্রাহ্য করে পেটের তাড়নায় চিংড়ির মীন ধরতে মাতলা, পিয়ালি নদীতে নেমে পড়ে ছিল। বাড়ির মেয়েরা ঘরের কাজ সেরে গরু, ছাগ, হাঁস, মুরগি সামলাতে ব্যস্ত। তখনও ওরা জানে না. কি ভয়ংকর বিপর্যয় সুন্দরবনবাসীর দিকে ধেয়ে আসছে।

তখনও ওরা বুঝতে পারেনি আর কিছুক্ষণের মধ্যে আয়লা নামক সেই ভয়ংকর দানব এসে তাদের সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে চলে যাবে। প্রথমে তীব্রগতিতে পাড় ও নদীতে জলোচ্ছ্বাস হতে থাকল। বাঁধ ভেঙে কোথাও কোথাও নোনাজল ঢুকে পড়তে শুরু করল। কোটালের সময় এ রকম বাঁধ ভাঙা দেখে ওরা অভ্যস্ত। কিন্তু যত সময় গেল ওদের ধারণাটাই বদলে গেল। ১০-১৫ ফুট উচ্চতার ঢেউ এসে দানবের মতো আছড়ে পড়তে লাগল বাঁধের উপর। নোনাজল বাঁধ ভেঙে ভয়ংকর গতিতে লোকালয়ে প্রবেশ করল। ভাসিয়ে নিয়ে গেল তাদের মাটির ঘরবাড়ি, খড়ের চাল, আসবাবপত্র সব কিছুই। দিনের বেলায় এই দুর্যোগ হওয়ার কারণে দূরবর্তী স্কুলবাড়ি বা পাকাবাড়িতে গিয়ে সে দিন তাদের নিজেদের প্রাণ বেঁচেছিল।

তখনও বোঝা যায়নি আয়লা তাদের জীবনে কী ভয়ংকর অভিশাপ নিয়ে এসেছিল। সরকারি ও বেসরকারি নানা সংস্থা প্রাথমিক ভাবে সুন্দরবনের আয়লাদুর্গত মানুষের পাশে এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। সাময়িক ভাবে তাদের দেওয়া খাদ্য, পানীয় জল, কাপড় ও ওষুধপত্র সেই সময়ের মতো তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করেছিল। কিন্তু কিছু দিন পর টের পাওয়া গেল, তাদের জীবনধারণের জন্য আয়ের যে উৎসগুলি ছিল, সেগুলি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে আয়লার দাপটে।

সুন্দরবনের প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল। ৩.১৫ হেক্টর কৃষিজমির উপর নির্ভর করছে এই অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। আয়লার সময় নদীবাঁধ ভেঙে নোনাজল প্রবেশের ফলে বাঁধ সংলগ্ন অধিকাংশ জমিতে লবণের মোটা স্তর জমা পড়েছে। ফলে জমিগুলি নিস্ফলা হয়ে গিয়েছে। .

সুন্দরবনের জনসংখ্যার এক বৃহদাংশ মৎস্যজীবী। পুকুর বা ফিশারিতে মাছ চাষ করে অথবা নদীতে মাছ, কাঁকড়া বা চিংড়ির মীন ধরে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। আয়লার পরে তাদের জীবিকা ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আয়লার তাণ্ডবে তাদের মাছ ধরার নৌকাও ভেঙে গেছে বা ভেসে গেছে। মাছ ধরার জালও ছিঁড়ে গেছে। গ্রামের পুকুরগুলো আজও লব্রণ-হ্রদ। মিষ্টি জলের মাছগুলো নিশ্চিহ্ন। আগে বছরে ৮ মাস নদীতে মাছ পাওয়া যেত। এখন তিন মাস পাওয়া যায়। আগে পক্ষকালে হাজার টাকা রোজকার ছিল আর এখন চারশো টাকা। আয়লার ফলে জলের বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চিংড়ির মীনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় যারা চিংড়ির মীন ধরে জীবিকা নির্বাহ করত, তাদের অবস্থা আজ শোচনীয়।

আয়লা সুন্দরবনের মানুষের জীবন-জীবিকার উপরই শুধু প্রভাব ফেলেনি, তাদের শরীর-স্বাস্থ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আয়লার সময় নোনা জলের আঘাতে গাছপালা-গবাদিপশুর পচন হয়েছে। জল তথা পরিবেশ দূষিত হয়েছে।এই দূষিত জল ও আবহাওয়ার প্রভাবে নানা রকমের চর্মরোগ, পেটের রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ে সুন্দরবনে।

আয়লা সুন্দরবনের মানুষের জীবনযাত্রাই পালটে দিয়ে গেছে। যাঁরা গ্রামে কৃষি কাজ করে বা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত আজও তারা এলাকাছাড়া। এই এলাকার মানুষেরা দারিদ্র্যের কারণে অন্য রাজ্যে জীবিকার সন্ধানে চলে গেছে। এক সময়ের অবস্থাপন্ন চাষি আজ শহরে গিয়ে দিনমজুরে পরিণত হয়েছে। এই অঞ্চলের ৮০ শতাংশ যুবক কাজের সন্ধানে দিল্লি, মুম্বই-সহ অন্য শহরে চলে গেছে। যে ছেলেটি পড়াশোনা শিখে ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখত, সে আজ দিল্লি কিংবা মুম্বইয়ে শিশুশ্রমিকে পরিণত হয়েছে। গ্রামের যে মহিলারা চিংড়ির মীন ধরত, গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি পুষত, আজ তারা শহরে গিয়ে পরিচারিকার কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। যে মহিলারা ঘর গেরস্থালির কাজ করত, আজ তারা কড়াখুন্তি ছেড়ে পুরুষদের সঙ্গে রোদে-জলে ১০০ দিনের কাজ করছে। একই সঙ্গে অভাবের তাড়নায় সুন্দরবনে নারীপাচার চক্র আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

এত কিছুর পরেও সুন্দরবনের মানুষ বিদ্রোহ করেনি। সরকারি তরফে সুন্দরবনের পর্যটনে এত উন্নয়ন আনা হচ্ছে। তবে আয়লার ১০ বছর পার করেও সুন্দরবনের আয়লা-আক্রান্ত মানুষগুলো কেমন আছে তার সরাসরি খবর আর কেউ রাখে না।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here