rahul gandhi, arun jaitley and Narendra Modi
debarun roy
দেবারুণ রায়

প্রথমে পরিবারতন্ত্র তার পর পাপ্পু বলে তাচ্ছিল্য-তাস খেলেই  রাহুল গান্ধীকে ক্রিজের বাইরে পাঠানোর প্ল্যান ছিল বিজেপির। এবং উইকেটে স্পিন বেশ ধরেওছিল। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক থেকে সহ-সভাপতি হয়ে অনভ‍্যস্ত হাতে ব‍্যাটিং চলছিলই । হচ্ছিলই না ব‍্যাটেবলে। প্রতি ওভারে পর্যূদস্ত হতে হতে শেষ পর্যন্ত লোকসভায় ক‍্যাপ্টেন রাহুল থামলেন মাত্র চুয়াল্লিশে। সবচেয়ে কম স্কোরের রেকর্ড গড়লেন তাঁর টিমের। নিদেনপক্ষে হাফ সেঞ্চুরিও হল না।অথচ টিম মোদী তাদের পেসার,স্পিনারদের ছাতু করে দিয়ে, ডাইভ-হুক-স্কোয়ারকাটের ঝড় তুলে দিয়ে অনায়াসে কাপ জিতে নিল এক লহমায়। স্কোর দাঁড়াল ট্রিপল সেঞ্চুরি ছুঁই ছুঁই। পাপ্পু রবে মাতোয়ারা সংসদে কিন্তু মালুম হল, রবে না এ দিন বেশি দিন। কিন্তু ভীষ্ম, দ্রোণ, শল্য, কর্ণ  আদি সব ধনুর্ধরই  তো প্রতিপক্ষের শিবিরে। এমনকি কূটচালে কুশলী  মাতুল শকুনিও। অবশ্য কালে কা্লে কাজ হল এতেই। সরকারপক্ষ, মানে ট্রেজারি বেঞ্চের  রথী মহারথীরা যে ভাবে কোমর বেঁধে রাহুলনিধনে নামলেন নিয়ম করে তাতেই দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া, ন‍্যূনপক্ষে বিরোধী দলনেতার তকমাতেও বঞ্চিত  টিম রাহুলের নায়ক ঘুরে দাঁড়াতে শিখলেন, পিছনে ফেরার পথ ছিল না বলেই। ট্রেজারি বেঞ্চের তিরন্দাজদের কাছেই শিখলেন ধনুকে জ‍্যা পরানো থেকে শুরু করে তূণীরের সঠিক তিরটি যোজনা করার শৈলী। বাঘা বাঘা সংসদবেত্তাদের শাণিত তির ফিরিয়ে দেওয়া তাদেরই মতো করে।

ট্রেজারি বেঞ্চের সেনাপতির দায়িত্বে বেশির ভাগ দিনই অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। সোনিয়া, রাহুল, প্রিয়াঙ্কাদের সঙ্গে তাঁর পুরনো ঘনিষ্ঠতা। হয়তো  সেজন্যই  বারবার তাঁর ওপরই পড়ে রাহুলকে আক্রমণের দায়। একের পর এক তীক্ষ্ণ তির ছুটে আসছে দেখে পাল্টা মোক্ষম অস্ত্র বেছে নেওয়ার শৈলী এখন রাহুলের করায়ত্ত। গত দু’দিনে সংসদের ভেতরে-বাইরে জেটলি আর মোদীর সঙ্গে রাহুলের সংলাপেই ফুটে উঠেছে সংসদবেত্তার ছাপ। যে দিন রাহুল নরেন্দ্রভাইকে জড়িয়ে ধরলেন, সেদিনের সেই ঝাপ্পি” ছিল একাধারে বাগ্মিতাকে পাশ কাটিয়ে সংসদের বিতর্কের‍ বদলে গান্ধীগিরির নাটকীয়তার অস্ত্রপ্রয়োগ। কিন্ত সামান্য দিনের মধ্যেই কংগ্রেসের নবীন সভাপতি হয়ে উঠছেন বেশ দুঁদে তার্কিক এবং প্রথিতযশা সংসদবেত্তাদের ঘরানার উত্তরপুরুষ। যে জন্য তুমুল উত্তেজনার মধ্যে পকেটের মোবাইল বের করে স্পিকারকে ভিডিও শোনানোর আর্জি। মনে পড়ে যায় বফর্স দালালদের নামধাম ও সুইস ব‍্যাংকের আমানত নম্বর তাঁর কাছে আছে বলে দাবি করে ভিপি সিং একটা চিরকুট দেখিয়েছিলেন মঞ্চে ও সংসদে। ওই ইস‍্যুতেই ভোট ও সরকার বদল হয়ে গেল, কিন্তু সেই লেখা, আজও স্পষ্ট হল না। এর পেছনে অবশ‍্য ছিল বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের মত দুর্নীতিবিরোধী ক্রুসেডারের জীবনচরিত ও রাজনৈতিক বিশ্বাস যোগ্যতা। রাহুলের রাজনীতির আনকোরা স্লেটে এখনো কোনও কালো দাগ লাগেনি। তাই তিনি অনায়াসেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদে দেশের মানুষের মাস্তুল হতে পারেন। রাজনেতাদের সম্পর্কে মোহভঙ্গ হওয়ার পর্বে নিজেকে ঠিক রেখে ব‍্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের  পথ  এটাই। এই পথে অচলায়তনকে আঘাত করার রণনীতি সফল হয়েছে বলেই মোদী থেকে শাহ , জেটলি থেকে প্রসাদ সারাদিন রাত একটি নামই জপছেন। দেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম  যে কারও পক্ষে জপা স্বাভাবিক। কিন্তু ‌যে ব‍্যক্তিসংসদে বিরোধী দলনেতা পর্যন্ত নন তাঁকে যদি দেশের নেতা এতটা সময় দেন, ভাবেন, তাঁর সাফল্য ও কৃতিত্ব স্বীকার না করে পথ কোথায় ? ক্রমশ দেখা যাচ্ছে, আক্রমণের মূল লক্ষ্য তিনি। তাঁর হাতেই যে রথের রশি সেটা সবার আগে মালুম হয়েছে প্রতিপক্ষের।

রাহুলের এই মোবাইল ভিডিও শোনানোর চমক প্রসঙ্গে ইতিহাস আরও একবার কাছে এল। যাঁদের কথা মনে এল তাঁরা ভারতীয় সংসদের উজ্জল অতীত। রেকর্ড পড়লে আজকের নবীন অবশ্যই আগামীর পথ খুঁজে পাবেন। সেই সব কং-বিরোধী সাংসদ যাঁদের রেয়াত না করে উপায় ছিলনা রাহুলের ঠাকুমার মতো দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রধানমন্ত্রীরও। জ‍্যোতির্ময় বসু , পিলু মোদী, মধু লিময়েরা একেকটি সাড়া জাগানো গোপন সরকারি ফাইল উদ্ধৃত করে ইন্দিরাকেও ধন্দে ফেলে দিতেন। শৈলীই ছিল এমন। আরও আরও আগে, লোকসভায় প্রথম আলোর দিনে  গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সৃজনলগ্নে প্রথম প্রধানমন্ত্রীকেও পদে পদে জবাবদিহি করতে হত শাসকদলেরই কিংবদন্তির সংসদবেত্তাদের প্রশ্নে। এমনই একজন ছিলেন রাহুলের ঠাকুরদা ফিরোজ গান্ধী। দল ও আত্মীয়তার মোহ কাটিয়ে সাংসদের দায়বদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এই  আধুনিক মনস্ক মানুষটির চাপেই সংসদের অধিবেশনের ধারাবিবরণী ও সংবাদ প্রচার প্রথম চালু হয়েছিল। অথচ সঙ্ঘ ও বিজেপির তেনারা ফিরোজ গান্ধীর জাত নিয়ে গবেষণায় ও প্রোপাগান্ডায় এতটাই ব‍্যস্ত ও ব‍্যতিব‍্যস্ত থেকেছেন বিগত ৭০ বছর ধরে , যে ভারতীয় রাজনীতির  এই পূণ্যশ্লোক প্রতিনিধির ধারাটিকে কখনও মূল্যায়নের সময় পাননি। সেদিনের পরিমণ্ডলে যা সম্ভব হয়েছে আজকের আবহাওয়া পরিবর্তনের পর তা সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়েছে। তবু তার ছিটেফোঁটাও যদি পাওয়া যায় এদিনের কারও কাছে ? আপাতত এই আশাবাদ ফুলে-ফলে পল্লবিত হোক। তেমন কল্লোল তো কখনও কখনও শোনা যায়।

মনে পড়ে যায় বফর্স দালালদের নামধাম ও সুইস ব‍্যাংকের আমানত নম্বর তাঁর কাছে আছে বলে দাবি করে ভিপি সিং একটা চিরকুট দেখিয়েছিলেন মঞ্চে ও সংসদে। ওই ইস‍্যুতেই ভোট ও সরকার বদল হয়ে গেল, কিন্তু সেই লেখা, আজও স্পষ্ট হল না।

লিগ্যাসির, ঐতিহ্যের ভগ্নাংশ এখনো বিরল নয়। এই তো ৯০ -এর দশকেও, এমনকী গত শতকের শেষ প্রহরের মতো, এই শতকের প্রথম দশকেও সংসদে, বিশেষ করে লোকসভায় ছড়িয়ে আছে বেশ কিছু মণি-মাণিক‍্য। পিভি, ভিপি, অর্জুন সিং, বাজপেয়ী, আডবাণী, জয়পাল, ফার্নান্ডেজ, ইন্দ্রজিৎ, সোমনাথ, সৈফুদ্দিন, প্রিয়রঞ্জন, মণিশংকর, চিদম্বরম, প্রমোদ মহাজন, সুষমা স্বরাজ এবং প্রায় পঁয়তিরিশ বছর রাজ‍্যসভার পর লোকসভায় শেষ প্রায় দুমেয়াদে প্রণব মুখোপাধ্যায়। এঁরা প্রত‍্যেকেই যাঁর যাঁর শ্রেষ্ঠ ফর্মেই সাংসদের ভূমিকা থেকে বিদায় নিয়েছেন। একমাত্র ব‍্যতিক্রম বিজেপির পদ্মফুল ফোটানোর নায়ক লালকৃষ্ণ আডবাণী। দলের প্রতি আজীবন লয়‍্যাল এই নবতিপর মানুষটি এখনও গান্ধীনগরের লোকসভা সদস্য। আর দাঁড়াতে চান না। যেমন চান না অনেকেই। সুষমাও। কিন্তু তাঁরা জানেন না তাঁদের কী হবে। এবারের ঘোর দুর্দিনে নামি দামি বিশেষ করে বিক্ষুব্ধ বা ইতিমধ্যেই সামনে থেকে পেছনের সারিতে পাঠানো জনপ্রিয়দের কি বাদ দেওয়ার ঝুঁকি নেবেন মোদীশাহী? কারণ, ওল্ড গার্ডদের সরিয়ে দিলে এবং রাহুলের হুলে বিদ্ধ হলে কার ঘাড়ে দোষ চাপাবেন ? তা ছাড়া  পদে পদে ছাই ফেলতে ভাঙা কুলোও তো লাগে। যদিও দলে অনাহূত , রবাহূত আডবাণী, জোশীকে বসিয়ে রেখে ভাঙা কুলোর কাজ দেওয়া হয়েছে জেটলিকে। শুধু রাফাল জেট নিয়েই নয়। জেট ছাড়াও জেটলীকে দেওয়া হয়েছে মহাভারতের মোক্ষম কথাটি বলার ভার।অশ্বত্থামা ইতি গজ“। কিন্তু একে তো তিনি যুধিষ্ঠির নন। আর যুধিষ্ঠিরের প্রাপ্তি ও পরিণামও তাঁর অজানা নয়। কিন্তু অসুস্থতার সমস্যা তো আছেই। সেই সঙ্গে লোকসভার ভোটেজেতার গুড়েও বালি পড়েছে ২০১৪-য়। ক‍্যাপ্টেনের কাছে মাথা মোড়াতে হল অমৃতসরে। তার পরও পঞ্জাবে অমরিন্দারের জয়যাত্রা অব‍্যাহত। পঞ্চায়েতেও জয়জয়কার কংগ্রেসের। এখন ফের লোকসভায় দাঁড়িয়ে কী লাভ ? সবটাই রামের ইচ্ছে।

দিল্লিতে শুধু ক্রিকেট দুনিয়া। লোকে কার্ড নেয়, কিন্তু ভোট দেয় না। এবং অর্থে বসে সব অনর্থগুলোয় তাল ঠুকতে হচ্ছে। নোটবন্দি আর ডিজিটাল টাকার জয়গান গাওয়ার কাজ নিষ্কাম। ভোটগন্ধ নাহি তায়। শেষ বিতর্কে রাহুল কে ঠাকুমা তুলে “স্বৈরতন্ত্রের নাতি” বলেছেন জেটলি। রাফাল নিয়ে বলতে বলতে সেই নেকড়ে আর মেষশাবকের গল্প এসেছে। তুই করিসনি কিন্তু তোর বাপ তো করেছিল ?  ডেডলি কমেন্ট, না জেট-লি কয়েনেজ? রাহুল জবাব দেননি সরাসরি।বা্রবার বুঝিয়ে দিচ্ছেন, অর্থমন্ত্রীকে বলব কেন ? যা বলার বলব মাথাকে। হাত পা কে বলে কী লাভ ? কিন্তু জেটলিরতো একথা বলার উপায় নেই। তাঁকে অনর্গল জবাব দিয়ে যেতে হচ্ছে। মোদীজির সামনে কুড়ি মিনিট বসতে চাই বলাতে রাহুলের কথার সদুত্তর খোঁজা চলছে। তার পরই এসেছে আরেকটি টুইটার খোঁচ। ভয় পেয়ে  পালালেন? ছাত্রদের জ্ঞান দেবেন?  একটা প্রশ্নেরও উত্তর হয় না। অথচ সরকারের বিরুদ্ধে শতমুখে বলার ইস‍্যু হয়ে যায়। একি উভয়সংকট !  ক্রমশ প্রকট হচ্ছে প্রতিমার খড়। ভাবমূর্তির ভাবের রং তো চটে গিয়েছিল ‘১৬-তেই। বাকিটা আপাতত মনোহর পরিক্করের বেডরুমে রাখা ফাইলে বন্দি। বফর্সের প্রতিবাদ ও সাড়া জাগানো পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন যেমন বিশ্বনাথ প্রতাপ, তেমনই রাফাল নিয়ে হিন্দি বলয়ের চৌপাল সরগরম করে তুলেছেন রাহুল। এবং আমআদমির কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার পথে  প্রতিদিন তাঁর উত্তরণ একেকটি সোপানে। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নেপথ্যে মা সোনিয়ার পথনির্দেশ এবং কংগ্রেসের  অবশিষ্ট স্টলওয়ার্টদের সঙ্গে পোড়খাওয়া বিরোধী নেতাদের পরামর্শ। অহংকারের প্রাকারশীর্ষের নীচে উলুখাগড়াদের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে এবং ওই ওপরে দাঁড়ানো মূর্তিকে সবচেয়ে ভালো করে দেখা যায়। বাকিটা রাম জানে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here