প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের যোগ্য উত্তরসূরি পেয়ে গেল কংগ্রেস?

0

দু’জনের মিল অনেক। আবারও অমিলও রয়েছে একাধিক। তবে একের পর এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত মিলছে তেমনটাই। লিখছেন জয়ন্ত মণ্ডল

দু’ জনেই আরবিআইয়ের প্রাক্তন গভর্নর। অর্থনীতিবিদ হিসাবে দু’ জনেরই খ্যাতি বিশ্বজোড়া। এক জন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ড.মনমোহন সিং, ১৯৮২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৮৫ সালের ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব সামলেছিলেন আরবিআইয়ের। তিনি আরবিআইয়ের ১৫তম গভর্নর। অন্য জন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের ২৩তম গভর্নর রঘুরাম রাজন। ২০১৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ছিলেন ওই পদেই।

ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন দেশীয় অর্থনীতির মন্দা দশা এবং ব্যাঙ্কিং সেক্টরের দুরবস্থার সমালোচনা করায় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ তাঁকে তীব্র আক্রমণ করেন। তার পরেই ফের খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন রাজন।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সভায় ভাষণ দেওয়ার সময় অর্থমন্ত্রী এক প্রশ্নের জবাবে মন্তব্য করেছিলেন, “রাজন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর থাকাকালীন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি শুধু মাত্র ফোনকলের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়ার নীতি নিয়েছিল। এথন সেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিই ওই পদক্ষেপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকারের ইক্যুইটি আধানের উপর নির্ভর করছে”।

দেশের ব্যাঙ্কিং সেক্টর রাজন এবং প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সময় থেকেই ‘সব থেকে খারাপ অবস্থা’র মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। রাজন সে বিষয়েই সীতারমনকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, আরবিআইয়ের গভর্নর হিসাবে তাঁর মেয়াদের দুই তৃতীয়াংশ সময়ই তিনি অতিবাহিত করেছেন কেন্দ্রের বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আওতায়। রাজনের যুক্তি, “আমি কংগ্রেস জমানায় মাত্র আট মাসের মতো আরবিআইয়ের গভর্নরপদে ছিলাম। অন্য দিকে বিজেপির শাসনে প্রায় ২৬ মাস ওই পদে ছিলাম। স্বাভাবিক ভাবেই বর্তমান সরকারের অধীনে আমার কাজের মেয়াদ অনেকটাই বেশি”।

গত শনিবারেও অর্থমন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর এক হাত নিয়েছেন রাজনকে। কাংড়া বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ঠাকুর বলেন, “রাজন এক জন অর্থনীতিবিদদের থেকে অনেক বেশি কাজ করেন এক জন রাজনীতিবিদদের মতোই। তিনি প্রায়শই অর্থনীতি নিয়ে কথা বলেন, তবে সেটা রাজনৈতিক সুরে। সুতরাং, তাঁর রাজনীতিতে যোগ দেওয়া এবং এখানেই চেষ্টা করা ভালো”।

তবে এটা প্রথম নয়। গত লোকসভা ভোটের আগে থেকেই রাজন নিরন্তর কেন্দ্রের মোদী সরকারের সমালোচনা করে আসছেন। লোকসভা ভোটের আগে কেন্দ্রের বহুল আলোচ্য নোটবন্দি এবং জিএসটি নীতি নিয়ে বোমা ফাটিয়েছিলেন রাজন। বার্কলেতে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে রাজন দাবি করেন, ২০১২-১৬ সাল, চার বছর ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি তীব্র গতিতে এগোচ্ছিল। তার আগে বিশ্ব জুড়ে সৃষ্টি হওয়া আর্থিক মন্দার প্রভাব কাটিয়ে ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলক ভাবে সামনের দিকে ধাবমান ছিল। কিন্তু নোট বাতিল এবং জিএসটি চালু করার পর থেকেই সেই গতিতে ছেদ পড়ে যায়।

সব মিলিয়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ছায়া তাঁর মধ্যেই দেখতে পাচ্ছেন রাজনীতির কারবারিরা। কারণ, মনমোহন সিং এবং রঘুরাম রাজনের মধ্যে মিল অনেক। দু’জনই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদ অলংকৃত করেছেন। উভয়েরই বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ভাবে দু’ জনেই বিশ্বস্ত এবং গ্রহণযোগ্য অর্থনীতিবিদ হিসাবে পরিচিত।

কংগ্রেসের এমন বিশ্বাসযোগ্য মুখের প্রয়োজন হলে রাজন ‘ডার্ক হর্স’ হতে পারেন অথবা শতাব্দী প্রাচীন দলটির পরবর্তী মনমোহন সিং হতে পারেন কি না, তা ভাবছেন অনেকেই। কংগ্রেসে এখন শক্তিশালী অর্থনৈতিক ধারাভাষ্যকারের অভাব। সনিয়া গান্ধী ২০০৪ সালে ‘আম আদমি’ স্লোগানটি তুলেছিলেন, যা ১০ বছর ধরে সজীব ছিল, কিন্তু গত পাঁচ বছরে সেটাও স্থবির হয়ে গিয়েছে।

কংগ্রেসের এখন প্রয়োজন একজন জোরালো অর্থনৈতিক বিবরণ তুলে ধরার বিশ্বস্ত মুখ। রাজনৈতিক মহলের মতে, কংগ্রেস কর্তাদের সঙ্গে রাজনের সুসম্পর্ক রয়েছে। কেউ কেউ এমনও উল্লেখ করেছেন যে, কংগ্রেসের যদি অন্য আর একজন সিংহের প্রয়োজন হয়, রাজন সেই শূন্যস্থানে বেশ মানানসই। খুব বেশি দিন নয়, মাস কয়েক আগে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে, বেশ কয়েকটি নিবন্ধ রাজনকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ হিসাবে প্রচার করেছিল। তাঁকে মনমোহন সিংয়ের জায়গায় অন্যতম সেরা এবং যোগ্য প্রার্থী হিসাবেই দেখা হয়েছিল।

তবে এ নিয়ে জল্পনাকল্পনা সময়ের অনেকটা আগেই সম্ভবত শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রাজন যে নরেন্দ্র মোদী সরকারের সমালোচনা করতে বিভিন্ন ফোরাম ব্যবহার করে চলেছেন এবং বিজেপি ও নির্মলা সীতারমণের সাম্প্রতিক বক্তব্যে তা সুস্পষ্ট। এক দিকে কংগ্রেসের দরকার একজন সুদক্ষ এবং বিশ্বাসযোগ্য অর্থনীতির ধারাভাষ্যকার, অন্য দিকে বিজেপিও নিজের অজান্তেই সরকারের সমালোচনা করার দায়ে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে রাজনকে।

উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে পি ভি নরসিমহা রাও যখন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তখন তিনি আন্তর্জাতিক ভাবে পরিচিত মুখের সন্ধান করছিলেন, তিনি ড. মনমোহন সিংকে চিহ্নিত করেছিলেন কারণ ভারত বিশ্বব্যাঙ্ক-সহ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সন্ধানে তখন হন্যে হয়ে ঘুরছিল। একটি মারাত্মক বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া ভারতের তখন তেমনই কোনো মুখের প্রয়োজন ছিল।

সে সময় অর্থনীতি ছিল সব থেকে খারাপ অবস্থানে। রাও প্রথমে আই জি পটেলকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যিনি তৎকালীন লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিক্সের ডিরেক্টর ছিলেন। কিন্তু তাঁর নিয়োগ বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী পছন্দ ড. মনমোহন সিং, যিনি সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান হওয়ার আগে দায়িত্ব সামলেছেন আরবিআইয়ের। সে সময় কেন্দ্রের অর্থমন্ত্রকের দায়িত্ব তুখোড় রাজনীতিক এবং ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের হাতে। সেই মনমোহনকেই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাও টেনে এনেছিলেন অর্থমন্ত্রকে। রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর সাংগঠনিক টালমাটাল পরিস্থিতিতেও সরকার পুরো মেয়াদ পূরণ করেছিল। সে সময় মনমোহনের একাধিক সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবের রূপ নেয়, কারণ রাও তাঁর নিজের দল থেকেও তাঁকে রাজনৈতিক ভাবে রক্ষা করেছিলেন।

সেই শুরু, মনমোহনের রাজনৈতিক জীবনের পথ এ ভাবেই তাঁকে শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিল। টেকনোক্র্যাট হিসাবে পরিচিত,কিন্তু সে অর্থে রাজনীতিবিদ হিসাবে খ্যাতি ছিল না তাঁর। যখন কংগ্রেসের অধিনায়কত্ব রাও থেকে সীতারাম কেশরী এবং তার পরে সনিয়া গান্ধীর হাত বদলে ছিলে, মনমোহন কিন্তু সমস্ত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন। ২০০৪ সালে যখন সনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হতে অস্বীকার করেছিলেন এবং তাঁকে নিজের মনোনীত প্রার্থী হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন, তখনই মনমোহন জ্যাকপটটি জিতেছিলেন।

রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশের পর তিনি যখন সরকারি বিষয়গুলির তদারকি করছেন, অন্য দিকে সনিয়া গান্ধী দলের যত্ন নিচ্ছেন। দায়িত্ব ভাগাভাগির এই বিষয়টি এত ভালো ভাবে কাজ করেছিল যে ২০০৯ সালে কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় এলে সনিয়া মনমোহনকেই চালিয়ে যেতে বলেছিলেন। তিনি এ ভাবেই স্থিতিশীল জোট সরকারকে টানা ১০ বছর টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন।

মনমোহন ও রাজনের মধ্যে অনেক মিল থাকলেও সুস্পষ্ট ভিন্নতাও রয়েছে। যেমন ১০ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মনমোহন, রাজন এখন রাজনীতিতে পদার্পণ করতে পারেননি। মনমোহন পঞ্জাবের, আর রাজন তামিলনাড়ুর। এ ছাড়াও রাজন অনেক কমবয়সি এবং প্রায়শই তাঁকে ‘রকস্টার’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়, অন্য দিকে মনমোহন ‘লো প্রোফাইল’ বজায় রাখেন। তবে এ সব পার্থক্যের তেমন কোনোও ভিত্তি নেই রাজনীতির খোলা মাঠে।

রাজনের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সাহসী এবং স্পষ্ট। তিনি সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “ভারতের আরও বেশি শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দরকার, তবে তা মেরামতের মাধ্যমে আসবে না। এটির জন্য সত্যই দরকার নতুন প্রজন্মের সংস্কার। সুসংবাদ এটাই, সরকারের রাজনৈতিক শক্তি যথেষ্ট রয়েছে এবং এই সংস্কারগুলি গ্রহণ করার ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু খারাপ খবর, সরকার এটা এখনও করে দেখাতে পারেনি”।

একই ভাবে লোকসভা ভোটের আগে তাঁর বিস্ফোরক মন্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর তৈরি হয়। রাজনের নিজের ভাষায়, “নোট বাতিল এবং জিএসটির ধারাবাহিক ধাক্কা ভারতের অর্থনৈতিক বৃ্দ্ধির হারকে পিছনের দিকে নিয়ে গিয়েছে। সব থেকে বিস্ময়ের বিষয়, ঠিক যে সময় বিশ্ব অর্থনীতির উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ঘটে চলেছে, তখন ভারত তার থেকে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে।”

তবে এখানে দু’টি সন্দেহজনক বিষয় রয়েছে। প্রথমটি হল, কংগ্রেস রাজনকে পরবর্তী মনমোহন সিং হিসাবে বেছে নেবে কি না। দ্বিতীয়টি হল রাজন মনোনীত হলেও মনমোহনের মতো সাফল্য পাবেন কি না। কারণ আরবিআইয়ের গভর্নরপদে থাকার অর্থ এই নয়, তিনি রাজনৈতিক ভাবেও সফল হবেন!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here