দিলীপ ঘোষরা না জানতেই পারেন, বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলে বুদ্ধিজীবীরা কতটা প্রাসঙ্গিক!

0
934
dilip
jayanta mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

২৫ মার্চ রামনবমীর অস্ত্র মিছিল থেকে উৎপত্তি হওয়া গোষ্ঠী সংঘর্ষের আগুন তো প্রায় অস্তমিত। হনুমান জয়ন্তীর মিছিল নিয়ে হুগলির রিষড়ায় সুনির্দিষ্ট একটি ঘটনা ঘটলেও আপাতত পঞ্চায়েত ভোটের মনোনয়ন-সংঘর্ষের কাছে ম্লান হয়ে গিয়েছে সে সব অতি তুচ্ছ ঘটনা। তবে কেন গত শনিবার কলকাতার বুকে বুদ্ধিজীবীদের (বিদ্বজ্জন) হাঁটালেন বামপন্থীরা?

এ ধরনের সম্প্রীতি, শান্তি বা ঐতিহ্যের মিছিল বামেদের কাছে নতুন নয়। গত ৬ ডিসেম্বরেও অযোধ্যার বিতর্কিত সৌধ ধ্বংসের স্মৃতি উসকে দিয়ে তাঁরা মিছিল-কর্মসূচি পালন করেছেন। কিন্তু রামনবমী এবং তার সঙ্গে বিদ্বজ্জনদের পথে নামানোর এমন পরিকল্পনার নেপথ্য কারণ কী হতে পারে। এমন নয়, রামনবমীর উগ্র মৌলবাদী অস্ত্র মিছিল নিয়ে বামপন্থীরা এই প্রথম পথে নামলেন। গত ২৫ মার্চ রাম-রহিমের মিছিল বা আসানসোল-কাণ্ডের পর গোটা বর্ধমান জুড়ে প্রতিবাদ মিছিল সংগঠিত করেছেন তাঁরা। সুর্নিদিষ্ট ভাবে বিদ্বজ্জন নামিয়ে কী বার্তা দিতে চাইলেন বামপন্থীরা, তেমন প্রশ্নের মৃদু যাতায়াত চলছে রাজনৈতিক মহলে। তবে ওই মিছিলে শুধুমাত্র বাম-ঘেঁষা বুদ্ধিজীবীদের অংশগ্রহণ যে সেই প্রশ্নকে দানা বাঁধতে দেবে না, তাও এক প্রকার নিশ্চিত। সেদিনই তো অনেকে বলেছেন, সুবোধ সরকার, অপর্ণা, শাঁওলি, জয় গোস্বামী বা শুভাপ্রসন্নদের মতো বেশ কয়েকজন মা-মাটি-মানুষপন্থী বুদ্ধিজীবী যদি ধর্মতলা থেকে রবীন্দ্র সদনের ওই পদযাত্রায় অংশ নিতেন, তা হলে অনেকটাই গুরুত্ব বেড়ে যেতে পারত ওই মিছিলের।

কিন্তু যা হয়নি, তা নিয়ে বিশদ কাল্পনিক আলোচনা না করাই ভালো। তার থেকে বেশ খানিকটা পিছনে তাকিয়ে এমন একটি ঘটনার কথা ঝালিয়ে নেওয়া যেতে পারে যা ঘটেছিল এবং ঘটাতে সাহায্য করেছিল এক সুদূরপ্রসারী পালা বদলের।

দিলীপের কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ এবং কমিউনিস্ট পার্টির ১৯৫৩, তৃণমূলের ২০১১

বামপন্থীরা তখন হয়তো নিজেরাই কল্পনা করতে পারেননি, এক দিন তাঁরা  বঙ্গের বুকে ৩৪ বছর আয়ুর সরকার গড়বেন। হয়তো বা তেমন কোনো কল্পনার দরকারও পড়েনি। ১৯৫৩ সালে পুলিশের তৈরি করা একটি গোপন রিপোর্ট বলছে, ১৯৭৭ থেকে প্রায় ২৪ বছর আগে বাংলার বুদ্ধিজীবীদের কাছে টানার অদম্য প্রয়াস চালিয়ে ছিল অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি। ওই বছরের ১৫ থেকে ১৭ মে কলকাতায় সিপিআইয়ের ডাকে শান্তি সম্মেলনের আয়োজন হয়। যেখানে দলের সংগঠনকে মজবুত করতে সমস্ত শ্রেণির মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তবে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয় বুদ্ধিজীবীদের মন আকৃষ্ট করে তাঁদেরকে পার্টির কাছাকাছি নিয়ে আসার চিন্তাভাবনায়।

ওই সম্মেলন সম্পর্কে বিশদে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে হয় না। কারণ সেই থেকে প্রায় অর্ধ শতকের বেশির ভাগ সময়ই বঙ্গের বুদ্ধিজীবী বলতে এই একটি শিবিরের সান্নিধ্যে থাকা সম্প্রদায়কেই বোঝাত। গণনাট্য, গণসংগীত নিয়ে বামপন্থীয় রেনেসাঁ এ রাজ্যের মানুষের রন্ধ্র রন্ধ্রে সেঁধিয়ে গিয়েছে। মাত্র বছর কয়েক আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বুদ্ধিজীবীদের দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাওয়ার ঘটনা যে পরিবর্তন চাইয়ের আওয়াজকে বাস্তবে রূপ দিতে কতটা সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল, তা প্রমাণ হয়ে চলেছে মুখ্যমন্ত্রীর হালফিলের কর্মকাণ্ডেও।

এখন নতুন করে যে সংস্কৃতির আমদানি করা হচ্ছে তা হল, এ ধরনের বুদ্ধিজীবী ব্যতিরেকেই বঙ্গজীবন এগিয়ে চলতে পারে। বাঙালির সমাজ-মননের অঙ্গ বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় বর্তমান উন্নয়ন-কায়দায় নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তুবড়ি-উত্থানের শামিল বিজেপির তরফে। দলের রাজ্য সভাপতি যে কুৎসিত ভাষায় গত শনিবার বামপন্থীদের ডাকা মিছিলে অংশগ্রহণকারী বুদ্ধিজীবীদের আক্রমণ করলেন, তা কি আদৌ নতুন কোনো রাজনৈতিক-সংস্কৃতির সূচনা করবে? নাকি বাংলার হৃৎস্পন্দন না বুঝে বেমক্কা মন্তব্যের অধিকারী নিজেই হারিয়ে যাবেন? তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েকটা অধ্যায়ের!

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here