Connect with us

কথাশিল্প

জলবায়ু পরিবর্তন আর লকডাউনেই আরও শক্তিশালী আর ধ্বংসাত্মক রূপ উম্পুনের

শ্রয়ণ সেন

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও শক্তিশালী এবং ধ্বংসাত্মক হচ্ছে ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড় উম্পুন তারই একটা উদাহরণ। এমনই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে উম্পুনের শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি এ বার লকডাউনও একটা বড়ো কারণ বলেই মনে করা হচ্ছে।

কী ভাবে জলবায়ু পরিবর্তন আরও শক্তিশালী করে তুলছে ঘূর্ণিঝড়কে?

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বিশ্ব উষ্ণায়ণের কারণে সমুদ্রে জলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে অনেকটাই বেড়ে যাচ্ছে। জলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বাড়ানোর পক্ষে যথেষ্ট অনুকূল। এর ফলে ঝড়ের পাশাপাশি বাড়ছে বৃষ্টির দাপটও। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হচ্ছে। উম্পুনের দিন কলকাতায় মাত্র তিন ঘণ্টায় ১৮০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল গড়ে।

এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রে জলের স্তরও বাড়ছে। ফলে ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। নোনা জল ঢুকে যাচ্ছে স্থলভাগের বেশ গভীরে। হেক্টরের পর হেক্টর কৃষিজমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

এর পাশাপাশি বায়ুদূষণের এবং ঘূর্ণিঝড়ের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটাও খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।

কোভিড ১৯-এর কারণে যে লকডাউন চলছে, তাতে বায়ুদূষণের মাত্রা অনেকটাই কমে গিয়েছে। ঘূর্ণিঝড় উম্পুনের রাতারাতি শক্তিবৃদ্ধিতে এটা একটা বড়ো কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও এই বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনও রয়েছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।

বাতাসে ভাসমান ধূলিকণার কারণে ভূপৃষ্ঠে সূর্যের তাপ বেশি পৌঁছোতে পারে না। এর কারণে ঘূর্ণিঝড় শক্তি বাড়াতে কিছুটা হলেও অক্ষম হয়। কিন্তু সেই ধূলিকণা যদি না থাকে তা হলে বাধাহীন ভাবে সূর্যের তাপ পৌঁছোবে ভূপৃষ্ঠে। শক্তি বাড়াতে সক্ষম হবে ঘূর্ণিঝড়।

ঘূর্ণিঝড় উম্পুনের রাতারাতি শক্তিবৃদ্ধির পেছনে এটা একটা কারণ বলেই মনে করছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা।

আরও একটা ধারণা হল, ভাসমান ধূলিকণার কারণে তৈরি হওয়া মেঘের জন্য বৃষ্টি নামে সহজে। এই ব্যাপারটিও ঘূর্ণিঝড়ের শক্তিবৃদ্ধির জন্য প্রতিকূল।

ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব ট্রপিক্যাল মেটেরিওলজির গবেষক রক্সি ম্যাথু কল এই প্রসঙ্গে বলেছেন, “গবেষণায় দেখা দিয়েছে যে উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রের তাপমাত্রা অনেকটাই বেশি। এটা ভয়ংকর এবং ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড় তৈরি করার ক্ষেত্রে অনেকটাই অনুকূল।”

তিনি যোগ করেন, “মে মাসের প্রথম দু’ সপ্তাহে বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা ৩২-৩৪ ডিগ্রিতে উঠে গিয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই সমুদ্রের তাপমাত্রা এতটা বেড়েছে। অতীতে বঙ্গোপসাগরে এ রকম তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়নি। এর ফলেই অল্প সময়ের মধ্যেই উম্পুন গভীর নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড় হয়ে রাতারাতি সুপার সাইক্লোন হয়ে গিয়েছিল।”

ভুবনেশ্বরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলোজির অধ্যাপক ভি ভিনোজ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গোটা বিশ্বেই সমুদ্রের জলস্তরের তাপমাত্রা বেড়েছে।

তাঁর কথায়, “ভারতের চার দিকে যে মহাসাগরীয় অঞ্চল রয়েছে, সেখানেও তাপমাত্রা বাড়ছে। প্রাক-বর্ষার সময়কালে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হওয়ার পেছনে এটা অন্যতম কারণ।”

তবে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি বায়ুদূষণ আচমকা কমে যাওয়া যে উম্পুনের শক্তি বাড়ানোর পেছনে একটা বড়ো কারণ ছিল, সেটা তিনিও মনে করেন।

তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বাড়ছেই। এ বার তার সঙ্গে যোগ হয়েছে লকডাউন। এই দুইয়ের সাঁড়াশি চাপেই ১৯৯৯ সালের পর এই প্রথম সুপার সাইক্লোনের জন্ম দিয়েছে বঙ্গোপসাগর।”

তবে লকডাউনের ব্যাপারটা নিয়ে আরও কিছুটা গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন ভিনোজ।

প্রবন্ধ

স্বাস্থ্যসাহিত্য: আত্মহত্যা থেকে বাঁচা

দীপঙ্কর ঘোষ

সত‍্যকাম ভরা সন্ধ্যায় আমগাছটার তলায় বাদুড়ে ঠোকরানো আমগুলোর সঙ্গেই অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিল। পচা আম, বৃষ্টিতে পচা পাতা আর দেশি মদের গন্ধে চারপাশ ম ম করছে। না, এই সত‍্যকাম জবালপুত্র নয়, অতিরিক্ত মদ‍্যপানে চাকরি থেকে বিতাড়িত এক স্কুলমাস্টার। সামনের পথ দিয়ে বহু লোক গেছে। মাস্কের ওপরে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে। হেরে যাওয়া মাতালের গন্ধ সহ‍্য করা খুব মুশকিল।

ব‍্যাঙ্কের চাকরি শেষ করে কৃষ্ণা একটু গভীর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরছিল। ওই রাস্তা দিয়েই। আগে সত‍্যকামের সঙ্গে প্রতি দিন বাসে দেখা হত। সত‍্যকাম একটা সাদামাটা আটপৌরে সংসারি মানুষ। বাসস্টপেজে হয়তো দু’টো কথাও হত। ও জানে সত‍্যকামের বৌ গরিমা। কৃষ্ণা একলাবাসী, অবিবাহিতা। পড়ে থাকা অচেতন একটা মানুষ দেখে কৃষ্ণা এগিয়ে গেল। পচা পাতা পায়ে দলে, আধখাওয়া আমে হোঁচট খেয়ে। আরে, এ তো চেনা লোক! অসাড়ে পড়ে আছে। কৃষ্ণা দ্বিধা করল। ভাবল। তার পর রাস্তায় ফিরে এসে একটা রিকশা ডাকল।

লকডাউনে রাস্তা অন্ধকার। চমৎকার ঝকঝকে আকাশে বৃহস্পতি জ্বলজ্বল করছে। বাড়িতে বাড়িতে টিভি – প্রতিটি বাড়িতে একপাল সম্মোহিত বিচ্ছিন্ন মানুষ বহু বার দেখা সিনেমায় নিবদ্ধদৃষ্টি বসে আছে।

“দিদি, ইনি তো ইস্কুলের ম‍্যাস্টর ছিলেন। মাল খাউয়ার জন‍্যি চাকরি গেছে…।”

রিকশাওয়ালা বকতে বকতে চলে। কৃষ্ণা ঘামতেল-মাখা কপালে আঁচল বোলায়। লকডাউনের মৃদু হাওয়ায় ওর ঝুরো চুল উড়ে যায়।

“আসলে কী হল জানো দিদি?” মধ‍্যবয়সিনী কৃষ্ণা এ পাড়ার বহু দিনের বাসিন্দা – কার‌ও দিদি, কার‌ও বা মাসি।

“ম‍্যাস্টরের বউ বহু কাল হল ছেড়ে চলে গেছে। শুনেছি ম‍্যাস্টরের নাকি ক্ষ‍্যামতা কম…”, রিকশাওয়ালা দম নেয়। দু’ জনে মিলে সত‍্যকামের এলিয়ে পড়া দেহটা বিছানায় শুইয়ে দেয়। রিকশাওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে কৃষ্ণা একটুখানি বসে, এক গেলাস জল খায়, তার পর পাশের পাড়ার ওর এক বান্ধবীকে ফোন করে। সুজাতা। সে ডাক্তার। সুজাতা আধ ঘণ্টা পরে এসে পৌঁছোয়।

“শোন কৃষ্ণা, এটা শুধু মদের ওভারডোজ নয়, খুব সম্ভব ভদ্রলোক অন‍্য কোনো কিছুও খেয়েছেন। বাই দ‍্য ওয়ে ইনি সেই স্কুলটিচার না?”

মফস্‌সল শহরে সবাই মোটামুটি সবাইকে চেনে। সকলের কুৎসা সবাই খুব উপভোগ করে। আসলে হেরে যাওয়া আর স্বপ্ন-অসম্পূর্ণ একদল মানুষ অন‍্যের পতনে একটা অনৈসর্গিক আনন্দ পায়। এই লকডাউনের বাজারে একটু রাত হলেই কোনো যানবাহন পাওয়া দুষ্কর। তাই আরেকটা ভ‍্যানগাড়ি ডেকে সত‍্যকামকে বন্ধ হয়ে থাকা দোকান-বাজার পার করে নিয়ে যাওয়া হল কাছের একটা নার্সিংহোমে। পুলিশ কেস। বন্ড স‌ই। একটুও দ্বিধা না করে সুতোয় বাঁধা কলম দিয়ে কৃষ্ণা স‌ই করে দিল। তার পর স্টম‍্যাকওয়াশ, আরও কত কী সব চলল।

রবিবার ডাক্তারবাবু বাড়ির লোককে দেখা করতে বলেছেন। সত‍্যকামের বাড়ির ঠিকানায় কৃষ্ণা এর মধ্যে দু’ বার গেছে। কিন্তু একটা জং পড়া তালা আর শ‍্যাওলা ধরা দেওয়াল ছাড়া কিছুই দেখতে পায়নি। সত‍্যকাম ওর বউয়ের যে ফোন নম্বরটা দিয়েছে তাতে কেউ সাড়া দিচ্ছে না। বাকি নম্বরগুলোয় সবাই ব‍্যস্ত, সময় নেই। একজন বলল, “টাকার প্রয়োজন হলে হসপিটাল বিল কত হয়েছে জানালে কিছু টাকা পাঠিয়ে দেব।” শুধুমাত্র টাকা নিয়ে কি মানুষ বাঁচে?

এই সব ভাবতে ভাবতে কৃষ্ণা তিনতলার কোনার রুমে সত‍্যকামের বিছানার পাশে একটা টুল নিয়ে বসল। পাশের জানলা দিয়ে দূরের সবুজ দেখা যাচ্ছে। নারকেল, কলাগাছের ভিড়। মধ‍্য আষাঢ়ে আকাশে এক কোনায় ঘন কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে। সত‍্যকাম অন‍্য মনে জানলায় চোখ মেলে বসে আছে। আজ অনেক ফিটফাট। দাড়ি কামানো। গায়ে পাউডারের গন্ধ। মা যখন হাসপাতালে ছিল তখনও কৃষ্ণা এই গন্ধটা পেত। নার্সদিদি একটা হুইলচেয়ার নিয়ে এসে সত‍্যকামকে বসাল। শূন্য প্রাণ সত‍্যকাম একটা কথাও না বলে সেটায় বসল।

নার্সদিদি বললেন, “আসুন দিদি, ডাক্তারবাবুর চেম্বারে যাই।”

এক তীক্ষ্ণ নাসা ডাক্তার। কাঁচাপাকা চুল তাঁর। একটা বড়ো বিদ‍্যাসাগরী টাক‌ও আছে। সরু লম্বা লম্বা আঙুলগুলো টেবিলে দাগ কাটছে।

“বসুন।”

জড়ভরতের মতো সত‍্যকাম ওঁর সামনের চেয়ারে বসল। কৃষ্ণা পাশেরটায়।

“বাড়ির কাউকে পাওয়া গেল?”

কৃষ্ণার ম্লান হাসি দেখে বৃদ্ধ ডাক্তার উত্তরটা বুঝে নিলেন।

“এই যে স‍্যোশাল মিডিয়ায় সবাই বলছে পাশে থাকুন, হাত বাড়িয়ে দিন – এর পাশে এখন দরকার একজন একান্ত আপনার জন। যে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে পারবে – আমি আছি, তুমি নিশ্চয়ই ভালো হবে, হবেই।”

কৃষ্ণা আনমনে আঙুলে শাড়ির আঁচলটা পাকায়। তার পর সোজা চোখে জানতে চায়, “এ রকম কেন হয় ডাক্তারবাবু? কেন কেউ কেউ জীবনের এই সব ওঠা-পড়া মেনে নিতে পারে না…হেরে যায়…পালিয়ে যেতে চায়?”

বুড়ো ডাক্তার উত্তর না দিয়ে সত‍্যকামকে প্রশ্ন করেন, “আচ্ছা সত‍্যকামবাবু, আপনি মরে যেতে চাইছেন কেন?”

সত‍্যকাম টেবিলে চোখ নিবদ্ধ রেখে বলে ওঠে, “ডাক্তারবাবু, আপনি জানেন তো? ইয়োর ডেজ আর নাম্বারড, আমারও। প্রতিটা দিন গোনা আছে – যে দিন নম্বরটা লেগে যাবে আপনাকে যেতে হবেই।”

সত্যকাম একটু ক্ষণ ভাবে। একটু যেন দ্বিধা করে, “তা হলে জীবনযাপনের এই অসহ্য কষ্টটা বেশি দিন কেন ভোগ করব? আমার যাওয়ার দিনটা আমিই ঠিক করে নিলে ক্ষতি কীসের? ইচ্ছামৃত‍্যু – ভীষ্মের মতো?”

সত‍্যকামের মুখে একটা ক্লান্ত হাসি ফুটে ওঠে।

কৃষ্ণা শিউরে ওঠে। প্রতিটি কথা কী ভয়ানক বাস্তব। কী অসম্ভব যন্ত্রণাসঞ্জাত এই বাক্যবন্ধ। এ মানুষকে কে বাঁচাবে?

“আপনি কত দিন ধরে এই সব ঘুমের ওষুধ খাচ্ছেন?”

“বহু দিন…অনেক দিন ধরে…যখন মাথার মধ্যে অসম্ভব কষ্ট হয়…রাতে বিছানায় থাকতে পারি না…পাগলের মতোন…মনে হয় রাস্তায় গিয়ে গাড়ির সামনে…বিশ্বাস করুন আমি ওই ঘুমের বড়ি না খেলে ঠান্ডা মাথায় ক্লাস‌ও নিতে পারতাম না… তবু ঘুম হতো না…একটা থেকে দু’টো…তার পর আর‌ও বেশি…অনেক অনেক ওষুধ খেতাম। তবুও ওই কষ্টটা আমাকে… ওই অস্থিরতা…রাত হলেই মনে হত চিৎকার করে কাঁদি…দেওয়ালে মাথা ঠুকি…সঙ্গে ছিল মদ…মদ কেনার অত পয়সা কোথায় পাব…কী হবে এ ভাবে বেঁচে থেকে? প্রতি দিনের এই একঘেয়ে বমি করার মতো করে কাজ উগরে দেওয়া? তার পর এক রাত অস্থিরতা…কষ্ট…।”

সত‍্যকাম টেবিলে মাথা রাখে, “আমি একজন স্পোর্টসম‍্যান – হার স্বীকার করে নিচ্ছি ডাক্তারবাবু। ব্রাজিল যেমন জার্মানির কাছে সাত গোলে হেরে গেছিল, তেমনি আমি একটা হেরো মানুষ – জীবনের খেলায় গোহারা হেরে গেছি। আমি তা হলে এ বার আসি ডাক্তারবাবু?”

সত‍্যকাম কুঁজো শরীর আর কালি পড়া চোখ নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। কাঁপা কাঁপা হাতদু’টো জোড় করে নমস্কার করে।

আরও পড়ুন: স্বাস্থ্যসাহিত্য: বাড়ির পুজো আর সেই গোপন কথাটি

ডাক্তার মুখ থেকে মাস্ক নামিয়ে হাসেন, “যেতে তো হবেই সত‍্যকাম – ছুটি হয়ে গেছে – ওই যে কার একটা গান আছে না? পেয়েছি ছুটি বিদায় দেহ ভাই? যাবার বেলায় এক কাপ চা তো খেয়ে যান। আর আপনার এই আত্মীয়টি একটা প্রশ্ন করেছিল, কেন এ রকম হয়? ওটার উত্তর দেওয়া বাকি আছে তো। চা পান করতে করতে আমরা একটু কথা বলি?”

ডাক্তারের বিষণ্ণ চোখ দু’টিতে কৌতুক খেলা করে। এই করোনাকালে একমাত্র এই ডাক্তারবাবুই আসছেন, রোগী দেখছেন। সে ক্ষেত্রে এঁর কথা ফেলাও যায় না।

“উষা, তিনটে চা দিবি মা?”, ডাক্তার সহকারীকে হাঁক পাড়েন, “আমাদের এখানে কিন্তু সব‌ই গুঁড়ো চা, দুধ-চিনি সহ।”

কৃষ্ণা বলে ওঠে, “এ মা! তাতে কী? আমাদের সব চলে।” ‘আমাদের’ কথাটা বলে কৃষ্ণা নিজেই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।

চায়ে চুমুক দিয়ে বৃদ্ধ বলতে আরম্ভ করেন, “আমাদের মানুষদের মধ্যে অনেক রকম মানসিকতা দেখা যায় – রগচটা, বদরাগী, নরমসরম, স্নেহপ্রবণ প্রভৃতি। এগুলোর অনেকগুলোই হর্মোন রিলেটেড। অক্সিটোসিন বেশি বেরোলে স্নেহপ্রবণ, আবার ভ্যাসোপ্রেসিন বেশি বেরোলে বদরাগী। আবার অনেক ক্ষেত্রে মাথার ঘিলুর কোনো কোনো জায়গা এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। ও সব কথা থাক – এ কি সত‍্যকাম চা তো জুড়িয়ে গেল। নাও নাও শুরু করো, এখানে তো আমরা আর দারুর বোতল দিতে পারব না…।” সত‍্যকাম হেসে চায়ে চুমুক দেয়।

“আমাদের ভালো লাগা, আনন্দে থাকা, এগুলো সেরোটোনিন নামে আমাদের নার্ভের একটা রাসায়নিক যার ডাক্তারি নাম নিউরো ট্রান্সমিটার তার ওপরে নির্ভর করে। এটা যদি একেবারে টইটুম্বুর হয়ে থাকে তা হলে ঘুম থেকে উঠে সূর্য উঠলেই মনে হবে, আঃ কী চমৎকার সকাল… সমস্ত দুঃখ সহ‍্য করাটা সহজ হয়ে যাবে।” সত‍্যকাম কৃষ্ণা দু’জনেই ঘাড় নাড়ে।

“যত আমরা চাপের মধ্যে থাকব, ততই আমাদের ভালো রাখার জন্য নার্ভগুলো সেরোটোনিন খরচ করবে। হ‍্যাঁ আবার তৈরিও হবে” – বৃদ্ধের চোখ সত‍্যকাম আর কৃষ্ণার মুখে ঘুরতে থাকে।

“যতটা খরচ হয় আবার সেটা তৈরিও হয়ে যায়। আমি কিন্তু খুব সহজ করে বলছি। এখন বয়স যত বাড়বে ততই নানা চাপে চিন্তায় সেরোটোনিন বেশি বেশি খরচ হবে। আবার যারা ভয়ানক চাপের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটায় তাদের সেরোটোনিন যেমন তাড়াতাড়ি খরচ হয় তেমনই উৎপাদন‌ও কমে আসে।”

বৃদ্ধ একটা সিগারেট বার করে বলেন, “উইথ ইয়োর কাইন্ড পারমিশন।”

তার পর অনুমতির তোয়াক্কা না করেই খচখচ করে দেশলাই জ্বেলে হুশ হুশ করে ধোঁয়া ছাড়েন।

কৃষ্ণা বলে, “ইস কী বাজে নেশা…এটা ছেড়ে দেবেন আপনি। কিন্তু সেরোটোনিন কমে গেলে কী হয়?”

বুড়ো ডাক্তার চায়ের গেলাসে ছাই ঝাড়েন।

“হুম গ‍্যুড ক‍্যোয়েশ্চন। প্রথমত, ঘুম কমে আসবে…ভোররাতে ঘুম ভেঙে যাবে এটাকে বলে লেট ইনসমনিয়া। বুক ধড়ফড় করবে, ঘাম হবে…সেক্সুয়াল ইচ্ছে টিচ্ছে একদম চলে যাবে। পরের দিকে অসম্ভব দুশ্চিন্তা আসবে, শুয়েও ঘুম আসবে না – অস্থিরতা আসবে – শুলেই সারা দিনের বা সারা জীবনের কথাবার্তা, কাজকর্ম – স‌অঅব মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকবে অর্থাৎ আর্লি ইনসমনিয়াও হবে এবং ফলে যেটা ভীষণ স্বাভাবিক সেই বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা আস্তে আস্তে চলে যাবে।”

সত‍্যকাম ঘাড় নাড়ে। সে সহমত।

কৃষ্ণা অস্ফুটে বলে, “বাঁচার ইচ্ছে চলে যাবে? বুঝলাম না।”

ডাক্তার আরেকটা সুখটান দিয়ে বলেন, “প্রথম প্রথম নিজের মৃত্যু-দৃশ‍্য কল্পনা করে নিজেই চোখের জল ফেলবে। তার পর মৃত‍্যুর পদ্ধতি কল্পনা করবে – এবং সেটাকে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করবে এবং শেষকালে…।”

ডাক্তার সিগারেটে আরেকটা টান দেন। সত‍্যকাম এখন আর ওঠার চেষ্টা করছে না দেখে ডাক্তার বলেন, “সত‍্যকাম বেঁচে থাকা বড়ো কষ্টের – তাই না? যেমন ক‍্যানসার ছড়িয়ে পড়লে যন্ত্রণায় রোগী মরতে চায় ঠিক তেমনই?”

সত‍্যকাম নিরুত্তর।

“আর যদি এই যন্ত্রণা কমে যায়? তা হলে? তা হলে যে প্রাণ তোমার মা-বাবা দান করেছেন, ভালোবাসায় যত্নে বড়ো করেছেন, তাঁদের সেই দান নষ্ট করার কোনো অধিকার কি তোমার থাকবে? যাও, বাড়ি যাও, তোমার সব কষ্ট আমি নিয়ে নিলাম। ঠিক সাত দিনের মধ‍্যে তোমার সকাল আবার ছোটোবেলার মতো বর্ণময় হয়ে উঠবে – শুধু ওষুধটা ঠিক মতো খাবে…যাও ফিরে যাও।”

ওরা একটু এগোতেই বুড়ো পিছু ডাকেন, “এই যে মামণি, এক বার একটা কথা শুনে যাও।”

কৃষ্ণা ফিরে আসে।

“আর দ‍্যাখো মা, ও যেন আর একা না থাকে।”

টাকাপয়সা মিটিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গভীর। কৃষ্ণার বাড়িতে একটা ঘুপচি কামরা আছে। যত রাজ‍্যের সব অকেজো জিনিসে বোঝাই। ফিরেই সত‍্যকাম সেই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসে ছিল। দু’জনে এ ভাবে থাকা সমাজ তো মানবে না। ওকে ফিরে যেতে হবে…নিজের একলা ঘরে।

একটু পরে কৃষ্ণা দরজা ঠকঠক করে ডাক দিল, “চা করেছি, খেতে আসুন।”

সত‍্যকাম ধীরে ধীরে দরজা খুলে বারান্দায় চেয়ারে এসে বসে। ম‍্যাক্সি পরা কৃষ্ণার শরীর শিল‍্যুয়েটে থাকে। জোনাকিরা ঝাড়বাতি জ্বালে। ব‍্যাঙ আর ঝিঁঝিঁপোকার কলতানের মধ্যেই সত‍্যকাম চায়ের কাপে ঠোঁট ঠেকায়। সত‍্যকাম বেঁচে ওঠো।

চিত্রাঙ্কন: লেখক

(লেখক একজন চিকিৎসক)

Continue Reading

প্রবন্ধ

রথযাত্রায় কাঠামোপুজো, বনেদিবাড়ির পুজোর সূচনা

শুভদীপ রায় চৌধুরী

আজ আষাঢ় ১৪২৭, মঙ্গলবার। রথযাত্রার পুণ্যতিথিতে আজ বিভিন্ন বনেদিবাড়ির এ বছরের শারদীয়া দুর্গাপুজোর সূচনা হবে। এই রথযাত্রা থেকে উলটোরথ অবধি বঙ্গের বহু প্রাচীন বনেদিবাড়িতে কাঠামোপুজো অনুষ্ঠিত হবে নিষ্ঠার সঙ্গে, যা এত বছর ধরে হয়ে আসছে। দেবী কাত্যায়নীর আরাধনা এই সমস্ত পরিবারে বহু বছর ধরে হয়ে আসছে এবং বর্তমান সদস্যরা সেই ধারাবাহিকতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে চলেছেন। তাই আমি আজ কয়েকটি পরিবারের কাঠামোপুজোর কথাই তুলে ধরলাম।

দর্জিপাড়া মিত্রবাড়ি

এই বাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনা হয় রথের দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে। দর্জিপাড়া মিত্রবাড়ি বলতেই সবাই এক ডাকে চেনেন নীলমণি মিত্রের বাড়িকে। নীলমণি মিত্রের নাতি রাধাকৃষ্ণ মিত্র এই দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন। এই বাড়ির পুজো হয় বৃহৎনান্দীকেশ্বর পুরাণ মতে। ঠাকুরের চালচিত্র হয় মটচৌরির আদলে। ষষ্ঠীর দিন কুলদেবতা শ্রীশ্রীরাজরাজেশ্বরকে সাক্ষী রেখে পুজো শুরু হয়। বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই বাড়ির সন্ধিপূজায় ১০৮ পদ্মের পরিবর্তে ১০৮ অপরাজিতা নিবেদন করা হয়।

জোড়াসাঁকোর দাঁ পরিবার

এই বাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনাও হয় রথের দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে। এমন প্রবাদ রয়েছে, দেবী এই দাঁ বাড়িতেই আসেন গয়না পরতে। এই বাড়ির পুজোর প্রতিষ্ঠাতা গোকুলচন্দ্র দাঁ। ১৮৪০সালে পুজো শুরু হয়। পরিবারের বংশধর শিবকৃষ্ণ দাঁ জার্মানি আর প্যারিস থেকে হিরে, এমারেল্ড জুয়েলারি আর একচালার চালচিত্র সাজানোর জন্য তবক নিয়ে এসেছিলেন। দেবী আকারে প্রায় ১২ ফুট লম্বা ও ১০ ফুট চওড়া। দেবী এখানে পূজিত হন বৈষ্ণবমতে, তাই বলিপ্রথা নেই এই পরিবারে। এই পরিবারের বৈশিষ্ট্য অষ্টমীর দিন সন্ধিপূজার নৈবেদ্য সাজান বাড়ির ছেলেরা।

জোড়াসাঁকো দাঁ বাড়ির পুজো।

চোরবাগান শীল পরিবার

রামচাঁদ শীল ১৮৫৬ সালে এই পরিবারে দুর্গাপুজো শুরু করেন। শীল পরিবারেও রথের দিন কাঠামোপুজো অনুষ্ঠিত হয়। অষ্টমীর দিন সকলে হয় ধুনো পোড়ানো আর দুপুরে হয় গাভীপুজো। নবমীতে কুমারীপুজোর সঙ্গে সঙ্গে সধবা পুজোও। এই পরিবারে সম্পূর্ণ বৈষ্ণবমতে দেবীর আরাধনা হয়, ভোগে থাকে লুচি, ভাজা, তরকারি, শিঙাড়া, কচুরি ইত্যাদি। এই পরিবারের বৈশিষ্ট্য হল দেবীর দুর্গার হাতে খাঁড়ার পরিবর্তে থাকে তলোয়ার।

খড়দহের গোস্বামী পরিবার

এই পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন নিত্যানন্দ মহাপ্রভু আনুমানিক ১৪৫২ শকাব্দে (১৫৩০ খ্রিস্টাব্দ)। এই বাড়ির পুজো শুরু হয় উলটোরথের দিন একটি চার হাত সমান বাঁশ কিনে গোপীনাথের মন্দিরে কাত্যায়নীর পুজো করে। মেজোবাড়ির দুর্গাপুজো কৃষ্ণানবমী তিথিতেই শুরু হয়, অর্থাৎ ১৫ দিন ধরে চলে দেবীর আরাধনা। এই পরিবারে দুর্গার পাশে লক্ষ্মী-সরস্বতীর স্থানে জয়া-বিজয়া বিরাজমান। কারণ প্রভু নিত্যানন্দ বিশ্বাস করতেন কাত্যায়নী পুজো করলে গৌরকে পাওয়া যায়। এই বাড়ির পুজো হয় বৈষ্ণবমতে, তাই কোনো পশু বলিদান হয় না। তবে এখানে মন্ত্রের সাহায্যে মাসকলাই বলিদান করার প্রথা আছে।

জানবাজারের রাসমণির বাড়ি

জানবাজারের রানি রাসমণিদেবীর শ্বশুরবাড়িতে প্রীতিরাম দাস (শ্বশুরমশাই) এই বাড়ির পুজো শুরু করেন। পরবর্তীকালে রানীর পুজো বলেই বেশি পরিচিত এই পুজো। জানবাজারের এই বাড়ির পুজোও শুরু হয় রথের দিন কাঠামোপুজো করে। মায়ের গায়ের রঙ শিউলি ফুলের বোঁটার মতন অর্থাৎ তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ। প্রায় ১৪ ফুট লম্বা এই প্রতিমার গায়ে সোনার নথ, টিপ, পায়ে  রুপোর মল, মাথায় রুপোর মুকুট। এই বাড়ির পুজো বৃহৎনান্দীকেশ্বর পুরাণ মতে হয়। ২০০৩ সাল অবধি ছাগবলি হয়েছে কিন্তু তার পর থেকে চালকুমড়ো, মাসকলাই ইত্যাদি প্রতীকী বলিদান হয়। এই বাড়ির বৈশিষ্ট্য পঞ্চাঙ্গ স্বস্তয়ন অর্থাৎ চণ্ডীপাঠ, মধুসূদন মন্ত্র জপ, মাটির শিবলিঙ্গ পূজা, দুর্গানাম জপ – প্রতিপদ থেকে নবমী অবধি হয়ে থাকে।

কাশিমবাজার ছোটো রাজবাড়ি

বিখ্যাত রেশম ব্যবসায়ী দীনবন্ধু রায় রেশম ব্যবসার জন্য কাশিমবাজারে এসেছিলেন। ব্রিটিশ সরকারের আনুকূল্যে ফুলে ফেঁপে ওঠে তাঁর ব্যবসা। ১৭৯৩ সালে তাঁকে জমিদারির স্বত্ব দেয় ব্রিটিশ সরকার। রথের দিন এই বাড়িতেও কাঠামোপুজো হয় দেবীর। পরিবারের সদস্যরা এই পুজোর ক’টা দিন রাজবাড়িতেই কাটান। ষষ্ঠীর দিন দেবীর অধিবাস, বোধন হয়। দশমীর দিন এই পরিবারে অপরাজিতা পুজোর প্রচলন রয়েছে। অতীতে পুজোয় বলিদান প্রথা থাকলেও এখন আর বলিদান হয় না। রাজবাড়িতে আগে বিসর্জনের সময় নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর প্রথা ছিল কিন্তু সেই প্রথাও আজ বন্ধ।

হাটখোলা দত্ত পরিবার

হাটখোলা দত্তবাড়ি, ছবি সৌজন্যে: এডি ফটোগ্রাফি

১৭৯৪ সালে হাটখোলায় ভদ্রাসন পত্তন করেছিলেন জগৎরাম দত্ত। তাঁর হাত ধরেই পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু। উলটোরথের দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে শুরু হয় দত্তবাড়ির দেবী আরাধনা। এই পরিবারে দুর্গাপুজো হয় সম্পূর্ণ বৈষ্ণবমতে, তাই পশু বলিদান সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। বলি দেওয়া হয় ক্ষীরের পুতুল। এই বলিদানও আড়ালে হয় কারণ পরিবারের কোনো সদস্যের বলি দেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পরিবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, এই দত্ত পরিবারে দশমীর দিন নয় অষ্টমীর দিন সিঁদুরখেলা হয়। এ এক বহু প্রাচীন রীতি যা আজও অব্যাহত রয়েছে দত্ত পরিবারে।

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি

এই পরিবারের দুর্গাপুজোও বহু দিনের। এই বাড়ির দেবী রাজরাজেশ্বরী নামেই পরিচিত, দেবীর সিংহ ঘোটকাকৃতি, দেবীর পরনে লাল শাড়ি, গায়ে বর্ম। রথের দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে এই বাড়ির পুজোর সূচনা হয়। মহালয়া থেকেই শুরু হয়ে যায় পুজো। সে দিন ভোরে জ্বালানো হয় হোমকুণ্ড, নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চলে হোম নবমী অবধি। আগে রাজবাড়ি থেকে বিসর্জনের সময় নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো হত। সেই প্রথা আজ বন্ধ। তবু ধারাবাহিকতা ও ঐতিহ্য আজও অব্যহত রাজবাড়ির অন্দরে।

Continue Reading

কথাশিল্প

স্বাস্থ্যসাহিত্য: বাড়ির পুজো আর সেই গোপন কথাটি

দীপঙ্কর ঘোষ

শরৎবাবু তখন সবে আসব আসব করছেন। দু’-একটা সাদা মেঘ মাঝেমাঝেই আকাশ আলো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাস্তার ধারে ধারে কাশফুলেরাও মুখ তুলে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।

সে দিন একটা লম্বা ঝুলোচুলো হাড় ডিগডিগে সদ‍্য যুবকের সঙ্গে বসে বিমলবাবুর দোকানে চা আর ডিমভাজা খাচ্ছিলেন আধবুড়ো হাতুড়ে। ছেলেটার মুখের সঙ্গে হাতুড়ের মুখের বেশ একটা মিল আছে। দেখলে মনে হবে কপি পেস্ট করা।  ঘোড়ানিম গাছে তখন একটা কাঠঠোকরা ট্টি ট্টি ট্টি টুকড়ুম বলে প্রাণপণে চ‍্যাঁচাচ্ছে। পাশের খালে একটা গো বক তার লম্বা ঠ‍্যাং তুলে তুলে প্রাতরাশের জন্যে জলে ঠোঁট ডুবিয়ে জলজ জন্তুদের খুঁজে ফিরছে। কাকেদের কাকিমা নেই, তাই ওরা বিজলি তারে বসে কাকা কাকা বলে ডাকছে।

পাশেই মেছো বাজার – নীল লাল হলুদ সবুজ সব পলিথিন টাঙানো এক ছোট্ট প্রভাতী বাজার। সেখান থেকে চমৎকার একটা সামুদ্রিক মেছো গন্ধ আসছে। আলু-পেঁয়াজের পাশে পুজোর ফুল বিল্বপত্র, একটু দূরে সুন্দরবন থেকে আসা বউটি কুমড়ো চিচিঙ্গা ঢ্যাঁড়শ পাতিলেবু সাজিয়ে বসে আয়েশ করে পাঁউরুটি খাচ্ছে। গিজিগিজি ভিড় – সকলেই সমস্বরে কথা বলছে।

এমন সময় এক্কেবারে কানের গোড়ায় এক মাছ‌ওয়ালা ভয়ানক জোরে চেঁচিয়ে উঠল, “পচা পচা… পচা ল্লিয়ে যাও ল্লিয়ে যাও।” চিৎকারে আঁতকে উঠে হাতুড়ের আট টাকার ভাঁড় থেকে একটুখানি চরম গরম চা চলকে আঙুলে গিয়ে পড়ল। আপাতগম্ভীর স্বল্পভাষী ঝুলোচুলো ছেলেটা ব‍্যাপারটা দেখে একটু মৃদু হাসল। কেননা হাতুড়ে কোনো কাজ‌ই না ফেলে ছড়িয়ে ঠিকঠাক করতে পারেন না।

এমন সময় ধ‍্যাবড়ানো লিপস্টিক, নিশিমাখা নাইটির ওপর হাউসকোট চাপানো এক বাজাড়ু মহিলা এ পাশ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। অভ‍্যাসবশত থলি-বোঁচকা নামিয়ে বিমলবাবুর দোকানে দাঁড়ালেন। বিমলবাবুও চটপট ফুটন্ত বড়ো মগ থেকে ছোটো মগে করে চা নিয়ে পাঁচ টাকার ছোটো ভাঁড়ে ঢেলে বললেন, “দিদি, বিশকুট?”

দীর্ঘাঙ্গী খর্বনাসা ভদ্রমহিলা হাত তুলে বিমলবাবুকে একটা আঙুল দেখালেন। বিমলবাবুও বয়েম থেকে একখানা প্রজাপতি বিস্কুট বার করে হাতবদল করলেন। বিস্কুটে কামড় দিয়ে ভদ্রমহিলা চা পানান্তে ধোঁয়া উদগীরণ করা হাতুড়ের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকালেন। বলা বাহুল্য অত‍্যন্ত সংকুচিত হয়ে এলোমেলো বুড়ো শশব‍্যস্তে পাজামা থেকে দড়ি টড়ি কিছু ঝুলছে কিনা খুঁটিয়ে দেখে নিশ্চিন্ত হলেন।

ভদ্রমহিলা প্রশ্ন করলেন, “আপনিই আমাদের হাতুড়েবাবু না?”

সিগারেটটা ফেলু স্টাইলে টুশকি দিয়ে ফেলে হাতুড়ে জানালেন, ওঁর ধারণা অভ্রান্ত। তখন ভদ্রমহিলা বললেন, “আপনার সাথে আমার কিছু গোপন কথা ছিল।”

ভদ্রমহিলার গলাখানি যে তারসপ্তকে বাঁধা আছে তাতে বাজারের অর্ধেক লোক‌ই চা পান, দরদাম সব ছেড়ে সেই গোপন কথাটি শোনার জন্যে হাতুড়ের দিকে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে র‌ইল। এমনকি একটা ভোঁদড়মার্কা কুকুর পর্যন্ত এসে হাতুড়ের দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে র‌ইল।

হাতুড়ে অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, “আহা, আপনার গোপন কথাটি বলেই ফেলুন না দেখি।”

বাজাড়ু একটুখানি গলা নামিয়ে বললেন, “সামনেই তো পুজো আসছে।”

অত্যন্ত চিন্তিত হাতুড়ে বললেন, “তা তো বটেই – মানে তা তো বটেই।”

“আমাদের বাড়িতে পুজো হয়, একশো ছাব্বিশ বছরের পুজো। আমিই তো বাড়ির মেজ বউ… মানে বুঝতেই পারছেন আমার কত দায়িত্ব…।”

লম্বাপারা ছেলেটা একটু অধৈর্য হয়ে ওঠে। কেননা সে কিংবা তার পাশে বসা হাতুড়ে এখনও গোপন কথাটির আভাসমাত্র‌ও পাননি।

বাজাড়ুদেবী হাতুড়ের পাশে একটা লাল রঙা প্লাস্টিকের টুল টেনে নিয়ে বসলেন। “বিমলদা আর তিনটে চা দাও তো… ভাই তোমার চা চলে?”

বিমলবাবু ভাঁড়ে চা ঢেলে এগিয়ে দিলেন। উনি বুড়োর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, “তারিখটা একটু পিছিয়ে দিতে হবে।”

বুড়ো ভারী অবাক হয়ে বললেন, “পুজোর তারিখ? পিছিয়ে দেব?”

এ বারে পাশের ঝুলোচুলো যুবক‌ও কিঞ্চিৎ বিস্মিত।

“না ওই সময়ে আমার ইয়ে হবে… নইলে বুঝতেই তো পারছেন…।”

আধবুড়ো হাতুড়ে পকেট হাতড়ে একটা লাল সাদা সিগারেটের প‍্যাকেট বার করে একটা সিগারেট ধরালেন। ব‍্যাপারটা এতক্ষণে ওঁর ঘিলুতে সেঁধিয়েছে – “কী পুজো?”

ভদ্রমহিলা একটুক্ষণ অবাক হয়ে বলেন, “এ মা! আপনি না ভীষণ দুষ্টু – জানেন না? মায়ের পুজো। মা আসবেন তো।”

আধবুড়ো আঙুলের টোকা দিয়ে ছাই ঝাড়েন, “মা কোথায় আসবেন?”

এ বার বাজারশ্রান্ত মহিলার মুখে একটা মিষ্টি হাসি খেলা করে, “মা তো বাপের বাড়ি আসবেন…আপনি মজা করছেন…।”

বুড়ো একটা রহস্যময় হাসি হাসেন, “মা কি একাই আসেন? নাকি সঙ্গে কেউ থাকে?”

ভদ্রমহিলা শুনেছেন লোকটা একটু ছিটগ্রস্ত, আজ নিঃসন্দেহ হয়ে হাসেন, “সঙ্গে দুই ছেলে আর দুই মেয়ে থাকে… হয়েছে? আর হ‍্যাঁ একটা সিংহও থাকে। নিন এ বার ওষুধটা বলুন তো আমি ঘরে যাই…সব কাজ পড়ে আছে।”

আধবুড়ো হাতুড়ে নিমীলিত নয়নে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলেন, “চারটে ছেলেমেয়ে? সেই মা আবার বাপের বাড়িও আসে…আমাদের ঘরের মেয়ের মতো।” ডাক্তার চায়ে চুমুক দেন – “তা দিদিমণি, আমাদের মায়ের কি পিরিয়ড হয় না? বিয়ে হয়, শ্বশুরবাড়ি আছে…বাচ্চাও হয়… আমাদের জগজ্জননীরও তো তা হলে পিরিয়ড হ‌ওয়ার কথা।”

কপালে ঘাম জমে থাকা বাজারফেরত মহিলা এই দিকটা ভাবেননি। উনি শূন্য চায়ের ভাঁড় হাতে বসে থাকেন – বসেই থাকেন। হাতুড়ে ডাক্তার বলতে থাকেন, “শুনুন দিদিমণি, আমাদের পেটের ভেতরে সব সময় পায়খানা তৈরি হচ্ছে… পেচ্ছাপের থলিতে পেচ্ছাপ জমা হচ্ছে…সব সময় – তার মানে পুরুতঠাকুর যিনি চার ঘণ্টা ধরে নেচে নেচে আরতি করবেন – ওই সময়ের মধ্যে তাঁর‌ও শরীরে ওই সব জমা হচ্ছে। পায়খানা, পেচ্ছাপ দু’টোই জমছে। তা ছাড়া বয়স্ক হলে আর প্রোস্টেট গ্ল‍্যান্ড বড়ো হয়ে থাকলে ট‍্যাঙ্কি ভর্তিই থাকবে। অর্শ থাকলে অল্প অল্প রক্তপাতের সম্ভাবনা অবশ্যই থাকে। তাই তো? তিনি পুরুষ বলে পবিত্র র‌ইলেন আর আমাদের বাড়ির মেয়েটার ঋতুস্রাব হয়েছে বলে অপবিত্র? তাকে ক্ষতিকর ওষুধ খেয়ে দিন পেছোতে হবে? এ আপনার কেমন বিচার দিদিমণি?”

ভদ্রমহিলা স্তব্ধবাক – “ওই জিনিসটা অপবিত্র নয়? নোংরা নয়?”

“আপনাকে বড়ো ক্লান্ত দেখাচ্ছে মা…সকালে তো খাওয়া হয়নি? হোক আজ সব কাজে দেরি। বিমলবাবু ওঁকে একটা কেক আর ঘুঘনি দিন – আপনি খেতে থাকুন, আমি গল্প বলি – আপনার শরীরেরই গল্প – কিন্তু আপনার অজানা গল্প।”

আধবুড়ো ডাক্তারের পাশে বসা হাড় ডিগডিগে ছোকরা বিমলবাবুকে বলে, “কাকু, আমাকে আর একটা ওমলেট দাও তো।”

বিমলবাবু হাসেন, “ইনি বকবক করতে শুরু করলে কখন থামবে ঠিক নেই – তোমায় একটা ডিমটোশ করে দেই?”

ছেলেটা হাসে, “গোলমরিচ দিও না কিন্তু কাকু।”

ডাক্তার বলতে থাকেন, “আসলে এটা অনাগত সন্তানের জন্য জরায়ুর কান্না।”

ভদ্রমহিলা ওড়না দিয়ে কপালের ঘাম মোছেন, “কান্না?”

ডাক্তার বলেন, “শোন রে মা শোন, মেয়েদের শরীরে লক্ষ লক্ষ ডিম ভর্তি দু’টো ডিম্বকোষ থাকে। ঋতুস্রাব শুরু হ‌ওয়ার পরে মেয়েদের শরীরে প্রতি মাসে একটা ডিম ম‍্যাচিওর হয়ে শুক্রাণুর জন্যে অপেক্ষা করে। শুক্রাণুর সঙ্গে ডিম্বাণুর মিলনে তৈরি হয় ভ্রূণ। শুক্রাণুর সঙ্গে মিলনের আগে জরায়ু মানে ইউটেরাসে কিছু কিছু পরিবর্তন হয় – একটা প্ল‍্যাসেন্টা বা ফুল তৈরি হতে থাকে। যাতে ভবিষ্যতে তৈরি হ‌ওয়া সন্তানের খাবারের কোনো অভাব না হয়। তখন জরায়ু অনাগত সন্তানের খাদ্যের জন্য একটা ব‍্যবস্থা করে রাখে। তার পর যদি মেয়েটা গর্ভবতী না হয় তখন সেই ফুল বা সম্পূর্ণ না তৈরি হ‌ওয়া প্ল‍্যাসেন্টাটা রক্তের সঙ্গে যোনি দিয়ে বেরিয়ে আসে। আবার নতুন করে নতুন সন্তানের জন্য জরায়ুর ভেতরে ফুল তৈরি হ‌ওয়া শুরু হয়। গর্ভবতী না হলে প্রতি মাসে সেই ভ্রূণের খাবার জোগাড় দেওয়ার জন্যে তৈরি প্ল‍্যাসেন্টা বা ফুলটা ঝরে যায়। সেটাই মাসিক বা পিরিয়ড। তাই এটাকে অনাগত সন্তানের জন্যে জরায়ুর কান্না বলা হয়।”

ডাক্তার চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে দিয়ে বলেন, “মাসিক হয় বলেই দুর্গা মা হয়, আমাদের এই মেয়েটাও মা হয় – না হলে – মহামায়ার মায়ার খেলা থেমে যেত। যা, মা দশভুজা বাড়ি যা। বলবি মা দুর্গার‌ও মাসিক হয়। তাই দুগ্গা মা হতে পেরেছেন। আমি এই নিয়েই পুজো করব।”

ভদ্রমহিলা চায়ের গ্লাসটা রেখে দামটাম না দিয়েই গটগট করে বাড়ির দিকে হাঁটা লাগান। হাতুড়ে মাথা টাথা চুলকে বিমলবাবুকে টাকা দিয়ে রোগা ছেলেটার হাত ধরে হাঁটা লাগান।

চিত্রাঙ্কন: লেখক

(লেখক একজন চিকিৎসক)

Continue Reading
Advertisement
কলকাতা28 mins ago

করোনার পাশাপাশি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে শুরু হচ্ছে অন্যান্য রোগের চিকিৎসা

দেশ55 mins ago

লকডাউন সফল করতে কম্যান্ডো মোতায়েন হল কেরলের গ্রামে

দেশ59 mins ago

অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর ‘সবুজ সংকেত’ দেখছেন নরেন্দ্র মোদী

বিনোদন1 hour ago

‘তারক মেহতা…’ বাদে সোমবার থেকে হিন্দি বিনোদনের চ্যানেলগুলোয় ফিরছে নতুন এপিসোড

দেশ2 hours ago

বলিউড ছবির ধাঁচে কী ভাবে রচিত হয় বিকাশ দুবের ধরা দেওয়ার চিত্রনাট্য?

রাজ্য2 hours ago

ঘুমের মধ্যেই চলে গেলেন মহীনের অন্যতম ‘ঘোড়া’ রঞ্জন ঘোষাল

দেশ3 hours ago

সক্রিয় করোনা রোগীর ৯০ শতাংশই আটটি রাজ্যে!

বিদেশ3 hours ago

বিদেশি ছাত্রদের বিতাড়ন সংক্রান্ত নয়া মার্কিন নির্দেশিকার বিরুদ্ধে মামলা হার্ভার্ড ও এমআইটির

দেশ9 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ২৪৮৭৯, সুস্থ ১৯৫৪৭

কলকাতা1 day ago

কলকাতায় লকডাউনের আওতায় পড়া এলাকাগুলির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশিত

রাজ্য2 days ago

পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু জায়গায় ফের কড়া লকডাউনের জল্পনা

দেশ2 days ago

দ্রুত গতিতে বাড়ছে সুস্থতা, ভারতে এক সপ্তাহেই করোনামুক্ত লক্ষাধিক

বিদেশ2 days ago

অনলাইনে ক্লাস করা ভিনদেশি পড়ুয়াদের আমেরিকা ছাড়তে হবে, নির্দেশ ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের

রাজ্য2 days ago

বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটা থেকে রাজ্যের কনটেনমেন্ট জোনগুলিতে কড়া লকডাউন

রাজ্য3 days ago

নতুন সংক্রমণ কিছুটা কম, রাজ্যে করোনামুক্ত হলেন ১৫ হাজার

প্রযুক্তি3 days ago

নতুন অ্যাপ ‘সেল্‌ফ স্ক্যান’ নিয়ে এল রাজ্য সরকার! এর কাজ কী?

কেনাকাটা

কেনাকাটা2 days ago

বাচ্চার জন্য মাস্ক খুঁজছেন? এগুলোর মধ্যে একটা আপনার পছন্দ হবেই

খবরঅনলাইন ডেস্ক : নিউ নর্মালে মাস্ক পরাটাই দস্তুর। তা সে ছোটো হোক বা বড়ো। বিরক্ত লাগলেও বড়োরা নিজেরাই নিজেদেরকে বোঝায়।...

কেনাকাটা3 days ago

রান্নাঘরের টুকিটাকি প্রয়োজনে এই ১০টি সামগ্রী খুবই কাজের

খবরঅনলাইন ডেস্ক : লকডাউনের মধ্যে আনলক হলেও খুব দরকার ছাড়া বাইরে না বেরোনোই ভালো। আর বাইরে বেরোলেও নিউ নর্মালের সব...

কেনাকাটা4 days ago

হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে অ্যামাজন

অনলাইনে খুচরো বিক্রেতা অ্যামাজন ক্রেতার চাহিদার কথা মাথায় রেখে ঢেলে সাজিয়েছে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সম্ভার।

DIY DIY
কেনাকাটা1 week ago

সময় কাটছে না? ঘরে বসে এই সমস্ত সামগ্রী দিয়ে করুন ডিআইওয়াই আইটেম

খবর অনলাইন ডেস্ক :  এক ঘেয়ে সময় কাটছে না? ঘরে বসে করতে পারেন ডিআইওয়াই অর্থাৎ ডু ইট ইওরসেলফ। বাড়িতে পড়ে...

নজরে