প্রবাসীর অন্য চোখে: অভেদ্য বর্ণ/১৪

0

rubina-chowdhuryটরন্টোয় ‘ভায়োলেন্স এগেনস্ট উইমেন’-এর সক্রিয় কর্মী রুবিনা চৌধুরী। বর্ণবাদ নিয়ে ধারাবাহিক লিখছেন খবর অনলাইনে

রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন কারওর বিজয়কে অবিশ্বাস্য আখ্যায়িত করা হয়, তখন বিজেতার জনপ্রিয়তার মাত্রা প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ায়। যে সব নেতৃত্ব জনপ্রিয় নয়, তাদের অবস্থান জনসাধারণের কতটা কাছের তা প্রশ্নবিদ্ধ। পুঁজির ক্রয়ক্ষমতা জনগণের হাত, মন নয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি সাড়ার নাম, যা মস্তিষ্কের কোণা থেকে মনকে নাড়া দিল। যারা পৃথিবীর সব চাইতে ক্ষমতাশীল অফিসে কালো সুদর্শন, তীক্ষ্ণ বাকপতি, ধারালো বুদ্ধিসম্মত, একজনকে গদিতে বসতে দিয়ে পৃথিবী থেকে বর্ণবাদের উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছিল, তাদের সেই ভুল এবং চাতুর্যের একটি উত্তর ট্রাম্পের বিজয়। তার আগমনে সাদা বর্ণের স্বস্তির নিশ্বাস সকলের গায়ে এসে পড়ছে ক্রমাগত। বর্ণবাদ কতটা গভীরে সে সম্পর্কে পুরাতন ধারণা স্পষ্ট ভাবে নতুন করে জানা হল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি বড়ো শহরে পুলিশপ্রধান কালো বর্ণের অধিকারী কয়েক বছর ধরে। এ সব গদিতান্ত্রিকতা প্রণালীবদ্ধ। নিয়ম করেই ক্ষমতায় সংখ্যালঘুদের নিয়োগ করা লোক দেখানোর জন্য, মূল তন্ত্রটি সাদাদের তৈরি আইনতন্ত্রে বাঁধা। কালোবর্ণধারীদের উপর অত্যাচারের মাত্রা ওবামা শাসনামলেও হ্রাস পায়নি, বিচলিত হয়নি সাদা বর্ণের নিয়মপ্রণালী কালো চামড়ার ক্ষমতায়।

আজকাল চর্চা চলছে মিশেল ওবামাকে নিয়ে। পশ্চিম ভার্জিনিয়ার ক্লে শহরে ঘটে গেল এক ঘটনা। পামেলা রামজি টেইলার নামের এক ‘ননপ্রফিট প্রতিষ্ঠানের’ পরিচালক, মিশেলকে ‘এ্যাইপ ইন হিলস’ বলে চিহ্নিত করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। ওই শহরের মেয়র বেভারলি হোয়েলিং ট্রাম্পের বিজয়ের পর লিখেছিল, “জাস্ট মেইক মাই ডে প্যাম”। টেইলার আরও লিখেছে, ও নাকি হোয়াইট হাউজে হিলে বাঁদরি দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, এ বার আবার নাকি উৎকৃষ্ট শ্রেণীর সাদা একজন ফার্স্ট লেডিকে দেখবে। টেইলার চাকরি হারিয়েছে, মেয়র পদত্যাগ করেছে সিএনএন প্রচার করার পর। এই দুইজন মহিলা স্বেচ্ছায় সরেনি, সরানোর জন্যে পিটিশনে পঁচানব্বই হাজার সই পড়েছিল। আজকের সংবাদে দেখলাম মিশেল ওবামার ডিজাইনার সোফি থিলেট জানিয়েছে, সে মেলানিয়া ট্রাম্পের জন্যে ডিজাইন করবে না। এ সব বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটছে, ঘটবে; আর প্রকাশ পেতে থাকবে জমে থাকা আক্রোশ, যা ক্ষমতা হারানোর ভয়ের ভিত্তিতে সৃষ্টি।

কিন্তু ঘটনাটি যদি উল্টো হতো? মেলানিয়া ট্রাম্পের অবস্থান মিশেল ওবামার জায়গায় হত? তা হলে সাদাবর্ণধারীরা ঠিক উল্টো ভাষ্য দিত। মেলানিয়া ট্রাম্প তার দেশ স্লোভেনিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষ করেনি। তার বাবার ভালো ব্যবসা থাকলেও সে পর্ণ-মডেল হিসাবে কাজ করেছে প্যারিস এবং যুক্তরাষ্ট্রে। চলতি বছরের ৩১ জুলাই নিউইয়র্ক পোস্টে প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯৬-তে তোলা উলঙ্গ ছবি। ট্রাম্পের নির্বাচন প্রচারণার সময় তাকে দেখা গেছে মিশেল ওবামাকে নকল করে ভাষণ দিতে।

অথচ সেই মিশেলকে তুলনা করা হল মেলানিয়ার সঙ্গে শুধুমাত্র তার বর্ণের কারণে।

যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন মাত্র ফার্স্ট লেডি পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি অর্জন করেছেন; হিলারি ক্লিনটন, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়েছেন, মিশেল ওবামা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়েছেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর। শুধু তা-ই নয়, দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নেতৃত্বের কথা অনেক ভাবেই পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছে। এরপর লরা বুশ, লাইব্রেরি সায়েন্সে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করেছেন টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ফার্স্ট লেডি হিসাবে লরা বুশকে আমরা দেখেছি নারীদের হৃদরোগ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে এবং মিশেল ওবামাকে দেখেছি স্থূলতা বিষয়ে অবদান রাখতে। হিলারির বিষয়ে বলার কিছু নেই, সে তার দেশের জাতীয় পর্যায়ে কাজ করে চলেছে। মেলানিয়াকে লরা বুশ বা হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে তুলনা করেনি, করেছে মিশেল ওবামার সঙ্গে। কালো বর্ণের অধিকারী মিশেল যেন সব সময় ওদের চোখে কয়েক ধাপ নীচেই থেকে গেল। আশা করি, মিশেল ওবামা অতীতের মতোই ভবিষ্যতে সব কিছুরই উত্তর দেবেন। হার্ভার্ডে পড়াকালীন তার সাদা রুমমেটের মা চেয়েছিল মেয়েকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে, এক কালো বর্ণের সঙ্গে মেয়েকে এক ঘরে রাখাটা তার কাছে সম্মানহানির বিষয় ছিল। এর পর ওবামা ক্ষমতা লাভ করার পর মিশেল পোশাক নিয়ে সমালোচিত হয়েছিলেন। ও নাকি জ্যাকুলিন কেনেডি ওনাসিসের ডিজাইন নকল করেছিল। জ্যাকুলিন জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট, পেশায় ছিলেন ফোটোগ্রাফার। তার পেশাগত দক্ষতার তেমন কোনো উল্লেখযোগ্যতা না থাকলেও, ফরাসি বাবা আর আইরিশ মায়ের দৌলতে পাওয়া সম্পূর্ণ সাদাবর্ণধারী তিনি, বিখ্যাত ছিলেন রূপ আর ক্ষমতাশালী এবং ধনকুবের স্বামী অর্জনে। সময় সব চাইতে বড়ো শিক্ষক এবং উত্তরদাতা।

rubina-2বর্ণ, ধর্ম, জাত, শ্রেণির মতো বাদতন্ত্রের শিকড় ক্ষমতায়। যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, সেই অধিকারী, বাকিরা অধীন এবং বশীভূত না থাকলেই ফুঁসে ওঠে ক্ষমতা এবং ক্ষমতাধারীরা। টরন্টো শহরে বিক্ষিপ্তভাবে বর্ণবাদী ঘটনা শুরু হয়ে গেছে ট্রাম্পের বিজয়ের পর। বিভিন্ন সংখ্যালঘুদের এলাকায় বর্ণবাদী পোস্টার দেখা যাচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের মতো কর্কশ ভাষায় লেখা নয়, তবুও কয়েকটা লাইন উল্লেখ করছি, ‘সারা পৃথিবীর সমস্যা কারণের দোষ নিতে নিতে হাঁপিয়ে উঠেছি আমরা’, ‘শুধুমাত্র সাদাদের দেশগুলোই কেন মাল্টিকালচারাল হতে হবে?’ ‘কবে ইমিগ্রেশন বন্ধ হবে?’ ‘নিজের এবং পরিবারের ভবিষ্যত দেখো না?’ ‘অসহ্য হয়ে গেছি টেলিভিশনে আবর্জনা দেখতে দেখতে’। উদ্দেশ করা হয়েছে সাদাদেরই। টরন্টো শহরের ইস্ট ইয়োর্কে গাছের গায়ে লাগানো হয়েছে এই লাইনগুলোসহ পোস্টারটি। তবে অন্য দিকে প্রতি সপ্তাহে ঘটে চলেছে ট্রাম্প বিরোধী র‍্যালি এবং মার্চ। এসবের আয়োজক কানাডার বামপন্থী দলগুলো।

rubina-1শুধু কি পশ্চিম? এই ক্ষমতায় জ্বলছে, মরছে, ভাসছে, গৃহহীন সংখ্যালঘুরা; বাংলাদেশে, ভারতে, পাকিস্তানে, মায়ানমারে। বর্ণ বা ধর্ম মানুষের বাহ্যিকবেশ, অন্তরমহলে কেউ সংখ্যাগুরু কেউ সংখ্যালঘু। হিংসা এবং প্রতিহিংসায় জ্বলছে দখল এবং দমননীতি। (চলবে)

ছবি: সৌজন্যে ফেসবুক

     

------------------------------------------------
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.