প্রবাসীর অন্য চোখে : অভেদ্য বর্ণ/৬

0

rubina-chowdhuryটরন্টোয় ‘ভায়োলেন্স এগেনস্ট উইমেন’-এর সক্রিয় কর্মী রুবিনা চৌধুরী। বর্ণবাদ নিয়ে ধারাবাহিক লিখছেন খবরঅনলাইনে।

গত পর্ব লিখতে বসে যখন ভাবছিলাম কী নিয়ে লেখা শুরু করব, ঠিক সেইসময়  চোখে ভেসে উঠল চকলেট বক্সের মতো পরিচিত কালো নারী পুরুষ মিশ্রণের একটা ছবি। ছবির বিষয় এলেই তো একটা আদলের ছায়া চোখে ভাসে, নিজের অজান্তেই সৌন্দর্য-আদল-আকৃতি জমা হয় মনে।

বর্ণবাদ অস্থিমজ্জায় ঢুকে আছে পশ্চিমা সংস্কৃতির ধমনিতে, তেমনি ঔপনেবিশকতার কারণে ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। আর্য, আরব, মঙ্গোলিয়ানদের সংমিশ্রণে কালো আর শ্যামল দক্ষিণ এশীয় মানুষরাও বর্ণবাদ শিখেছিল, তার সাথে যোগ হয়েছে যখন পশ্চিমের বরফতলের সাদা চামড়ার মানুষগুলোর পা পড়ল। নারীর ক্ষেত্রে তো তুমুল বর্ণবাদী ঐ সমাজ। যে দেশের নারী ছোটোকাল থেকে পুরুষসেবাকে জীবনের পরিপূর্ণতা মানতে শেখে, সেখানে নারীর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য এবং আদর্শ হল বিয়ে। সেই বিয়ের পাত্রী কালো হলে বাজারে মূল্য হারায়। কালো আঁধার, সৌন্দর্যের পরিপন্থী রূপ ধরে নেওয়া হয়েছে। কারণ জানতে চাইলে কিন্তু কেউ উত্তর খুঁজে পায় না। কারণ, এই ভাবধারার উৎস বর্ণবাদিতা, তাই কারওর জানা নেই। সাদা চামড়ার মাঝেই ঔজ্জ্বল্য তাদের চোখে। শ্যামল বাংলায়ও একটি শব্দ তাই বহুল প্রচলিত, উজ্জ্বল শ্যামলা, যার প্রয়োগ নারীর রূপের ক্ষেত্রে বেশি। শব্দটির ব্যবহার যেন নিষিদ্ধ, কোনোভাবেই প্রকাশ হয়ে যাওয়া চলবে না। ‘জাতের মেয়ে কালোও ভালো’, ‘নদীর পানি ঘোলাও ভালো’; এমন প্রবাদের সারাংশ একদিকে শুধু শ্রেণিভেদ নয়, অন্যদিকে জাত এবং বর্ণপ্রথা। প্রচলিত এই প্রথায় দু’রকমের মুনাফাখোর পকেট ভরে চলেছে। একদিকে পাত্রপক্ষের মোটা পণের দাবি, অন্যপক্ষে আছে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সস্তা ব্লিচিং ক্রিমের ব্যবহার। এর আগেও মুলতানি মাটি নামের এক পদার্থ বাজারে চলত, তারও উদ্দেশ্য ছিল মেয়ের কালো নাম ঘোচানো। তাছাড়া যুগ যুগ ধরে হলুদ চন্দনের ঘষাঘষি তো চালু আছে।

আমার সোমালিয়ান পড়শির কাছে জানতে পারলাম আরও অবাক করা তথ্য। আফ্রিকা মহাদেশের মাত্র দু’টো দেশ মিশর আর লিবিয়ায় গ্রিক, রোমান এবং আরবদের ঔপনিবেশিকতায় সাদা বর্ণ দেখা যায়। সেই খোদ আফ্রিকায়ও নাকি কালো মেয়েদের কেউ বিয়ে করতে চায় না, অনেক মেয়ের বিয়ে হয় না কালোর আধিক্যে। হায় রে, সারা পৃথিবীতে নারীকে তিরস্কারের কতই না বাহানা পুরুষসমাজের!

টরন্টোতে বসবাস করার আগের বিষয়ে আগেই জানিয়েছি। এর আগের শহরে যতবার প্রসাধনের দোকানে গিয়েছি, সাদা বর্ণের প্রসাধন বিশারদ ছাড়া চোখে পড়েনি। দোকানে যায় মানুষ নিজের প্রয়োজনে, আমার নিজের গাত্রবর্ণ যেহেতু গড় বাঙালিদের মতো নয়, তাই এইদিকের কমতিটা কখনও চোখে পড়েনি। টরন্টোতে বড় প্রসাধনের দোকানে ঢুকেই অন্যরকম আমেজে ভেসেছি, কালো নারী পুরুষের ভিড়। প্রসাধন শুধু সাদা নারীর, এই ভাবধারা একেবারেই ভেঙে দিয়েছে এই প্রজন্ম। কালো নারীর মতো চোখের চাহনি সাদাদের কমই হয়, তাই কাজলের বিজ্ঞাপনে বা বিক্রেতার দলে তাদেরই মানায়, সেই ভাবধারা থেকেই এই ক্ষেত্রে আজ তাদের জয়জয়কার। তাছাড়া, এখনকার পুরুষরাও বেশ সৌন্দর্য সচেতন, আগের মতো শুধু শেভিং আর সুগন্ধীতেই তারা আটকে নেই। রীতিমতো নারী, পুরুষ সকলেই কেতকী কেশরে মুখের, চুলের, ত্বকের যত্নের জ্বলজ্বলে মৌ মৌ সুরভিস্নাত। টরন্টোর বড় প্রসাধনের দোকানগুলোর নির্দিষ্ট কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগই কালো নারীদের দখলে। যা আগে যুক্তরাষ্ট্রেও দেখেছি। সত্তর দশকের সিনেমায় দেখতাম, কালো নারী বলতে নিয়ন রঙের জামা, তার সাথে খুব উজ্জ্বল রঙের প্রসাধনের বাহার। তখন কালো বর্ণের জন্য কোনো প্রসাধন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল না। এখন তো শুধু কালোদের জন্যই বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। তাই সাজগোজে এসেছে নতুন মাত্রা। এই অবস্থায় আসতে কালো সম্প্রদায়কে কয়েক শত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। টিভিতে যেদিন মডেল টাইরা ব্যাঙ্কসকে প্রথম দেখি, অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলাম। এর আগেও ছোটোবেলায় দেখা ছিল ডায়না রস। মনে পড়ল এক এক করে জেসিকা হোয়াইট, বেভারলি জনসন, ডনিয়েল লুনা, ইউজিনা ওয়াশিংটন, ডেনি ইভান্স, রোসুম্ভা উইলিয়ামস, তোকোরা জোন্স, আরও কতজনের মুখ। মডেলিং বলতেই এককালে ছিল শুধু ফরাসি এবং অন্যান্য পশ্চিমাদেশের নারীর দখলে। চলন, বলন, গড়নের মাপ সব হতে হবে নির্দিষ্ট ধাঁচের, যা কিনা শুধু সাদা বর্ণের নারীর আদলে বানানো ছিল। সেই নাগপাশ ভেঙে কালো নারীরা নিজের স্থান দখল করে রাজ করা শুরু করেছে; যে জয় শুধু যে সৌন্দর্যের তা নয়, এ জয় দৃঢ়তার, বর্ণবাদিতা ভেঙে ফেলে নিজেদের  অধিকার প্রতিষ্ঠার এক অভিযান। যেখানে তাদের নিজেদের নিয়ম চলে, অন্য জাতের নয়।

অনেকেরই হয়তো জানা আছে, বারাক ওবামা যখন ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় এলো, অনেকেই আঙুল তুলেছিল মিশেল ওবামার দিকে। তার ফ্যাশন ডিজাইনের সঙ্গে জ্যাকুলিন কেনেডির (এখানে কেনেডি ব্যবহার করলাম, যেহেতু প্রেসিডেন্ট কেনেডির স্ত্রীর সাথেই তুলনা করা হয়েছিল) মিল খুঁজে পেয়েছিল নিন্দুকেরা। এটাও বলেছিল, মিশেলের বিশাল শরীরে নাকি জ্যাকুলিনের পোশাক বেমানান। কিন্তু নিন্দুকের মুখে ভস্ম ঢেলে মিশেল ওবামা নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করেছে। প্রকৃতপক্ষে, তার দৃঢ়তা, শিক্ষাগত যোগ্যতার কাছে জ্যাকুলিন তেমন কিছুই ছিল না। রানি এলিজাবেথকে তো স্পষ্ট দেখেছি টিভিতে মিশেল ওবামার হাত সরিয়ে দিতে, হয়ত বর্ণবাদী রাজ রাক্ষসের কাছে বড্ড কালো লেগেছিল তার হাত। হোয়াইট হাউস থেকে এমন কালো নির্যাস জীবদ্দশায় সে দেখে যেতে চায়নি। বাকি অংশ তো পররাষ্ট্র বিভাগের নিয়মের বিধিতে মেনে নেওয়া ছিল।

প্রতিটি জাতি যেমন অবয়বের ভিন্নতায় ভিন্ন জাতিরূপে চিহ্নিত হয়, তেমনি তাদের সৌন্দর্যও ভিন্ন মাত্রার। নদীর জলের রঙের পার্থক্যে নদীর স্রোতধারা ভিন্ন হয় না, জলের স্বাদও ভিন্ন হয় না। এ দৃষ্টিভ্রম কেবল দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যে; অন্তর্দৃষ্টিতে নদী দুই কূলের  গভীর স্রোতস্বিনী, যা তৃষিতের আশ্রয়, অথচ প্রতি মুহূর্তে জাতভেদ প্রথা আর বর্ণবাদের মতোই ভাঙাগড়া খেলায় প্রমত্ত।

(চলবে)  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.