মোদী ঠিকই বলছেন, তাঁকে ভয় পাওয়ার মতো একাধিক কারণ রয়েছে

পশ্চিমবঙ্গের খুনের রাজনীতি নিয়ে যখন তিনি প্রতিবাদে মেতে উঠে পাল্টে দেওয়ার টোটকা বাতলান, তখন নতুন করে ভয় পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় বইকি!

0
Narendra Modi
অরুণাচলে প্রধানমন্ত্রী। ফাইল ছবি
jayanta mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

বিরোধীরা তাঁকে ভয় পাচ্ছেন। তাঁর নিজের কথায় -“চৌকিদার চোর-লুঠেরাদের ছাড়বে না। মহাজোট আসলে হল মহাভেজাল। ভয় পেয়েই বিরোধীরা ওই মহাভেজাল তৈরি করেছে”।

শুধু কী তা-ই! ‘দালাল’, ‘ধোঁকাবাজ’, ‘প্রতারক’, ‘গুন্ডা’, ‘খুনি’…হরেক রকমের গা-গরম করা শব্দের জাল বুনলেন প্রধানমন্ত্রী। স্থান জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ি। নিশানায় তাঁর বিরোধী রাজনৈতিক দল।

গায়ে বাঙালি মাস্টারমশাই কায়দায় শাল। এমন মেকআপে সচরাচর তাঁকে দেখা না-যাওয়ায় বেশ কড়কছাপই ঠেকে দর্শকের চোখে। সঙ্গে তো তাঁর বহুবিধ অঙ্গভঙ্গিমা আর বিবিধ টোনে গলার স্বরের ওঠা-নামা। সব মিলিয়ে তাঁর কাল্পনিক বক্তব্য বাস্তব হয়ে উঠতে সময় নেয় না। তিনি দাবি করেছেন, “কমিউনিস্ট সরকার খুনের রাজনীতি করে গিয়েছে। তৃণমূল সরকারও একই কাজ করছে। এই তৃণমূল সরকার আসলে কমিউনিস্ট সরকার পার্ট-২”।

তবে বাংলার মানুষকে ভয় পাওয়ানোর জন্য মোদীর এই নানান উপকরণের তেমন কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তিনি খুনের কথা বলছেন, তিনি গরিবের টাকা চুরি-গুন্ডামির কথা বলছেন, সাধারণ মানুষকে ভয় পাওয়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা যে তিনি জারি রেখেছেন, তা স্পষ্ট।

এই চেষ্টা এতটাই প্রবল আকার নিয়ে ফেলেছে যে, প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কয়েকটা সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধনের মাচায় উঠেও তিনি বারবার টেনে নিয়ে আসছেন সেই ভয়কেই। হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ নিয়েও মানুষকে অনুন্নয়নের ভয় পাওয়াতে চান তিনি। কিন্তু এ সবের কি আদৌ প্রয়োজন রয়েছে?

গত সাড়ে চার বছরের কাছাকাছি সময়ে কেন্দ্রের এনডিএ সরকার চলেছে, তাঁর নেতৃত্বে। এই মেয়াদকালে সাধারণ মানুষের মুখে নির্ভেজাল হাসি ফোটানোর মতো কী এমন কাজ করেছে তাঁর সরকার? ঘটনা পরম্পরা থেকেই বোঝা যায়, হিসেব দিতে চাইবেন না নোটবন্দির মোদী। জিএসটির মোদী। রাফালের মোদী। তারও আগে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন-ই বা তিনি কোন পর্যায়ের শান্তিস্থাপনের উদাহরণ রেখেছিলেন, সেটাও দেশবাসীর অজানা নয়। স্বাভাবিক ভাবে পশ্চিমবঙ্গের খুনের রাজনীতি নিয়ে যখন তিনি প্রতিবাদে মেতে উঠে পালটে দেওয়ার টোটকা বাতলান, তখন নতুন করে ভয় পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় বই-কি!

ময়নাগুড়ির সভা থেকেই মোদী বলেন, “মহাজোট নিয়ে আমি মুখ খুলতেই বিরোদীদের মুখের হাসি চলে গিয়েছে। সত্যি কথা বললেই এঁরা চিৎকার শুরু করে দেয়। এঁদের কোনো আদর্শ নেই। কোনো দৃষ্টিভঙ্গি নেই”।

এই বক্তব্যেও বিন্দুমাত্র দ্বিচারিতা নেই প্রধানমন্ত্রীর। কারও মুখে হাসির প্রলেপ লাগাতে না পারুন, সেটা গায়েব করতে যে তিনি সিদ্ধহস্ত, সেটা সর্বজনবিদিত। যে ভাবে দেশ থেকে গায়েব হয়েছেন বিজয় মাল্য বা নীরব মোদী, মেহুল চোকসির মতো প্রতারকরা।

গত বৃহস্পতিবার সংসদে বাজেট অধিবেশনে জবাবি ভাষণ পেশ করেছেন মোদী। তাঁর কয়েক ঘণ্টার বক্তব্যের সিংহভাগ জুড়ে শুধুই সেই ভয় পাওয়ানোর আর্তি। বিসি মানে বিফোর কংগ্রেস আর এডি মানে আফটার ডায়ন্যাস্টি ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি ঐতিহাসিক ভয়ের বাতাবরণ উদ্গীরণের চেষ্টা করেছন মাত্র। দেশের মানুষকে বোঝাতে চেয়েছেন, দেখুন আমার মাথায় প্রধানমন্ত্রীর মুকুট না থাকলে, কী ভয়াবহ পরিস্থিতি গ্রাস করবে গোটা দেশকে। যা থেকে গত সাড়ে বছর আগে দেশের সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিয়েছেন তিনি।

কিন্তু সাড়ে চার বছরে ঠিক কী কী খুশির খবর তিনি শুনিয়েছেন, সে সব নিয়ে খুব একটা ঘাঁটাঘাঁটি করেননি। সংসদে একগুচ্ছ ইস্যুতে সরব হয়েছেন বিরোধীরা। কিন্তু ভোটের আগে শেষ অধিবেশনে কোথায় তাঁর মুখে কৃষক সমস্যা, কাবেরি ইস্যু, শিক্ষাক্ষেত্রে সংরক্ষণের কথা?

শুধু মাত্র বিরোধীদের মুখে ঝামা ঘষে দিতেই রাফাল, নাগরিকত্ব বিলের সংশোধন বা ইভিএম অথবা তিন তালাক নিয়ে এক বগ্গা চড়া কথার অবতারণা করে গেলেন। মীমাংসার কোনো সূত্র নেই তাঁর হাতে, মাথায় নেই সুযোগ দেওয়ার সদিচ্ছাও।

তা না হলে শেষ এক বছরে রাজধানীর বুকে কৃষকদের এতগুলো অবস্থান-বিক্ষোভ দেখার পরেও কী ভাবে তিনি তাঁদের উদ্দেশে ‘ভিক্ষে’ দিতে পারেন? কৃষকেরা চায় দীর্ঘস্থায়ী সমাধান। মোদী চান দিনকে দিন। যার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গিয়েছে তাঁর সরকারের শেষ বাজেটেও। তিনি একাংশের কৃষকের জন্য দিনপ্রতি ১৭ টাকার অনুদান দেবেন বলে ঘোষণা করেছেন। আর তাঁর অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সরকারের আয় বাড়লেই অনুদান আরও বাড়ানো হবে। কিন্তু সরকারের আয় যদি কমে যায়?

[ আরও পড়ুন: নদিয়ায় তৃণমূল বিধায়ক খুনে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য ]

এই ভয়টাই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে পক্ষান্তরে। গত সাড়ে চার বছর বেমালুম সরকার-সফরের পর নিয়মমাফিক ভোটের আগে চাগিয়ে ওঠার কারণ একটাই। ভয়ে আছেন কি প্রধানমন্ত্রী? তিনি আর সব কিছুর মতোই সেই ভয়টাকেই দেশবাসীর সঙ্গে বাঁটতে চাইছেন না তো?

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন