Connect with us

কথাশিল্প

স্বাস্থ্যসাহিত্য: বাড়ির পুজো আর সেই গোপন কথাটি

Published

on

দীপঙ্কর ঘোষ

শরৎবাবু তখন সবে আসব আসব করছেন। দু’-একটা সাদা মেঘ মাঝেমাঝেই আকাশ আলো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাস্তার ধারে ধারে কাশফুলেরাও মুখ তুলে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।

সে দিন একটা লম্বা ঝুলোচুলো হাড় ডিগডিগে সদ‍্য যুবকের সঙ্গে বসে বিমলবাবুর দোকানে চা আর ডিমভাজা খাচ্ছিলেন আধবুড়ো হাতুড়ে। ছেলেটার মুখের সঙ্গে হাতুড়ের মুখের বেশ একটা মিল আছে। দেখলে মনে হবে কপি পেস্ট করা।  ঘোড়ানিম গাছে তখন একটা কাঠঠোকরা ট্টি ট্টি ট্টি টুকড়ুম বলে প্রাণপণে চ‍্যাঁচাচ্ছে। পাশের খালে একটা গো বক তার লম্বা ঠ‍্যাং তুলে তুলে প্রাতরাশের জন্যে জলে ঠোঁট ডুবিয়ে জলজ জন্তুদের খুঁজে ফিরছে। কাকেদের কাকিমা নেই, তাই ওরা বিজলি তারে বসে কাকা কাকা বলে ডাকছে।

Loading videos...

পাশেই মেছো বাজার – নীল লাল হলুদ সবুজ সব পলিথিন টাঙানো এক ছোট্ট প্রভাতী বাজার। সেখান থেকে চমৎকার একটা সামুদ্রিক মেছো গন্ধ আসছে। আলু-পেঁয়াজের পাশে পুজোর ফুল বিল্বপত্র, একটু দূরে সুন্দরবন থেকে আসা বউটি কুমড়ো চিচিঙ্গা ঢ্যাঁড়শ পাতিলেবু সাজিয়ে বসে আয়েশ করে পাঁউরুটি খাচ্ছে। গিজিগিজি ভিড় – সকলেই সমস্বরে কথা বলছে।

এমন সময় এক্কেবারে কানের গোড়ায় এক মাছ‌ওয়ালা ভয়ানক জোরে চেঁচিয়ে উঠল, “পচা পচা… পচা ল্লিয়ে যাও ল্লিয়ে যাও।” চিৎকারে আঁতকে উঠে হাতুড়ের আট টাকার ভাঁড় থেকে একটুখানি চরম গরম চা চলকে আঙুলে গিয়ে পড়ল। আপাতগম্ভীর স্বল্পভাষী ঝুলোচুলো ছেলেটা ব‍্যাপারটা দেখে একটু মৃদু হাসল। কেননা হাতুড়ে কোনো কাজ‌ই না ফেলে ছড়িয়ে ঠিকঠাক করতে পারেন না।

এমন সময় ধ‍্যাবড়ানো লিপস্টিক, নিশিমাখা নাইটির ওপর হাউসকোট চাপানো এক বাজাড়ু মহিলা এ পাশ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। অভ‍্যাসবশত থলি-বোঁচকা নামিয়ে বিমলবাবুর দোকানে দাঁড়ালেন। বিমলবাবুও চটপট ফুটন্ত বড়ো মগ থেকে ছোটো মগে করে চা নিয়ে পাঁচ টাকার ছোটো ভাঁড়ে ঢেলে বললেন, “দিদি, বিশকুট?”

দীর্ঘাঙ্গী খর্বনাসা ভদ্রমহিলা হাত তুলে বিমলবাবুকে একটা আঙুল দেখালেন। বিমলবাবুও বয়েম থেকে একখানা প্রজাপতি বিস্কুট বার করে হাতবদল করলেন। বিস্কুটে কামড় দিয়ে ভদ্রমহিলা চা পানান্তে ধোঁয়া উদগীরণ করা হাতুড়ের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকালেন। বলা বাহুল্য অত‍্যন্ত সংকুচিত হয়ে এলোমেলো বুড়ো শশব‍্যস্তে পাজামা থেকে দড়ি টড়ি কিছু ঝুলছে কিনা খুঁটিয়ে দেখে নিশ্চিন্ত হলেন।

ভদ্রমহিলা প্রশ্ন করলেন, “আপনিই আমাদের হাতুড়েবাবু না?”

সিগারেটটা ফেলু স্টাইলে টুশকি দিয়ে ফেলে হাতুড়ে জানালেন, ওঁর ধারণা অভ্রান্ত। তখন ভদ্রমহিলা বললেন, “আপনার সাথে আমার কিছু গোপন কথা ছিল।”

ভদ্রমহিলার গলাখানি যে তারসপ্তকে বাঁধা আছে তাতে বাজারের অর্ধেক লোক‌ই চা পান, দরদাম সব ছেড়ে সেই গোপন কথাটি শোনার জন্যে হাতুড়ের দিকে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে র‌ইল। এমনকি একটা ভোঁদড়মার্কা কুকুর পর্যন্ত এসে হাতুড়ের দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে র‌ইল।

হাতুড়ে অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, “আহা, আপনার গোপন কথাটি বলেই ফেলুন না দেখি।”

বাজাড়ু একটুখানি গলা নামিয়ে বললেন, “সামনেই তো পুজো আসছে।”

অত্যন্ত চিন্তিত হাতুড়ে বললেন, “তা তো বটেই – মানে তা তো বটেই।”

“আমাদের বাড়িতে পুজো হয়, একশো ছাব্বিশ বছরের পুজো। আমিই তো বাড়ির মেজ বউ… মানে বুঝতেই পারছেন আমার কত দায়িত্ব…।”

লম্বাপারা ছেলেটা একটু অধৈর্য হয়ে ওঠে। কেননা সে কিংবা তার পাশে বসা হাতুড়ে এখনও গোপন কথাটির আভাসমাত্র‌ও পাননি।

বাজাড়ুদেবী হাতুড়ের পাশে একটা লাল রঙা প্লাস্টিকের টুল টেনে নিয়ে বসলেন। “বিমলদা আর তিনটে চা দাও তো… ভাই তোমার চা চলে?”

বিমলবাবু ভাঁড়ে চা ঢেলে এগিয়ে দিলেন। উনি বুড়োর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, “তারিখটা একটু পিছিয়ে দিতে হবে।”

বুড়ো ভারী অবাক হয়ে বললেন, “পুজোর তারিখ? পিছিয়ে দেব?”

এ বারে পাশের ঝুলোচুলো যুবক‌ও কিঞ্চিৎ বিস্মিত।

“না ওই সময়ে আমার ইয়ে হবে… নইলে বুঝতেই তো পারছেন…।”

আধবুড়ো হাতুড়ে পকেট হাতড়ে একটা লাল সাদা সিগারেটের প‍্যাকেট বার করে একটা সিগারেট ধরালেন। ব‍্যাপারটা এতক্ষণে ওঁর ঘিলুতে সেঁধিয়েছে – “কী পুজো?”

ভদ্রমহিলা একটুক্ষণ অবাক হয়ে বলেন, “এ মা! আপনি না ভীষণ দুষ্টু – জানেন না? মায়ের পুজো। মা আসবেন তো।”

আধবুড়ো আঙুলের টোকা দিয়ে ছাই ঝাড়েন, “মা কোথায় আসবেন?”

এ বার বাজারশ্রান্ত মহিলার মুখে একটা মিষ্টি হাসি খেলা করে, “মা তো বাপের বাড়ি আসবেন…আপনি মজা করছেন…।”

বুড়ো একটা রহস্যময় হাসি হাসেন, “মা কি একাই আসেন? নাকি সঙ্গে কেউ থাকে?”

ভদ্রমহিলা শুনেছেন লোকটা একটু ছিটগ্রস্ত, আজ নিঃসন্দেহ হয়ে হাসেন, “সঙ্গে দুই ছেলে আর দুই মেয়ে থাকে… হয়েছে? আর হ‍্যাঁ একটা সিংহও থাকে। নিন এ বার ওষুধটা বলুন তো আমি ঘরে যাই…সব কাজ পড়ে আছে।”

আধবুড়ো হাতুড়ে নিমীলিত নয়নে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলেন, “চারটে ছেলেমেয়ে? সেই মা আবার বাপের বাড়িও আসে…আমাদের ঘরের মেয়ের মতো।” ডাক্তার চায়ে চুমুক দেন – “তা দিদিমণি, আমাদের মায়ের কি পিরিয়ড হয় না? বিয়ে হয়, শ্বশুরবাড়ি আছে…বাচ্চাও হয়… আমাদের জগজ্জননীরও তো তা হলে পিরিয়ড হ‌ওয়ার কথা।”

কপালে ঘাম জমে থাকা বাজারফেরত মহিলা এই দিকটা ভাবেননি। উনি শূন্য চায়ের ভাঁড় হাতে বসে থাকেন – বসেই থাকেন। হাতুড়ে ডাক্তার বলতে থাকেন, “শুনুন দিদিমণি, আমাদের পেটের ভেতরে সব সময় পায়খানা তৈরি হচ্ছে… পেচ্ছাপের থলিতে পেচ্ছাপ জমা হচ্ছে…সব সময় – তার মানে পুরুতঠাকুর যিনি চার ঘণ্টা ধরে নেচে নেচে আরতি করবেন – ওই সময়ের মধ্যে তাঁর‌ও শরীরে ওই সব জমা হচ্ছে। পায়খানা, পেচ্ছাপ দু’টোই জমছে। তা ছাড়া বয়স্ক হলে আর প্রোস্টেট গ্ল‍্যান্ড বড়ো হয়ে থাকলে ট‍্যাঙ্কি ভর্তিই থাকবে। অর্শ থাকলে অল্প অল্প রক্তপাতের সম্ভাবনা অবশ্যই থাকে। তাই তো? তিনি পুরুষ বলে পবিত্র র‌ইলেন আর আমাদের বাড়ির মেয়েটার ঋতুস্রাব হয়েছে বলে অপবিত্র? তাকে ক্ষতিকর ওষুধ খেয়ে দিন পেছোতে হবে? এ আপনার কেমন বিচার দিদিমণি?”

ভদ্রমহিলা স্তব্ধবাক – “ওই জিনিসটা অপবিত্র নয়? নোংরা নয়?”

“আপনাকে বড়ো ক্লান্ত দেখাচ্ছে মা…সকালে তো খাওয়া হয়নি? হোক আজ সব কাজে দেরি। বিমলবাবু ওঁকে একটা কেক আর ঘুঘনি দিন – আপনি খেতে থাকুন, আমি গল্প বলি – আপনার শরীরেরই গল্প – কিন্তু আপনার অজানা গল্প।”

আধবুড়ো ডাক্তারের পাশে বসা হাড় ডিগডিগে ছোকরা বিমলবাবুকে বলে, “কাকু, আমাকে আর একটা ওমলেট দাও তো।”

বিমলবাবু হাসেন, “ইনি বকবক করতে শুরু করলে কখন থামবে ঠিক নেই – তোমায় একটা ডিমটোশ করে দেই?”

ছেলেটা হাসে, “গোলমরিচ দিও না কিন্তু কাকু।”

ডাক্তার বলতে থাকেন, “আসলে এটা অনাগত সন্তানের জন্য জরায়ুর কান্না।”

ভদ্রমহিলা ওড়না দিয়ে কপালের ঘাম মোছেন, “কান্না?”

ডাক্তার বলেন, “শোন রে মা শোন, মেয়েদের শরীরে লক্ষ লক্ষ ডিম ভর্তি দু’টো ডিম্বকোষ থাকে। ঋতুস্রাব শুরু হ‌ওয়ার পরে মেয়েদের শরীরে প্রতি মাসে একটা ডিম ম‍্যাচিওর হয়ে শুক্রাণুর জন্যে অপেক্ষা করে। শুক্রাণুর সঙ্গে ডিম্বাণুর মিলনে তৈরি হয় ভ্রূণ। শুক্রাণুর সঙ্গে মিলনের আগে জরায়ু মানে ইউটেরাসে কিছু কিছু পরিবর্তন হয় – একটা প্ল‍্যাসেন্টা বা ফুল তৈরি হতে থাকে। যাতে ভবিষ্যতে তৈরি হ‌ওয়া সন্তানের খাবারের কোনো অভাব না হয়। তখন জরায়ু অনাগত সন্তানের খাদ্যের জন্য একটা ব‍্যবস্থা করে রাখে। তার পর যদি মেয়েটা গর্ভবতী না হয় তখন সেই ফুল বা সম্পূর্ণ না তৈরি হ‌ওয়া প্ল‍্যাসেন্টাটা রক্তের সঙ্গে যোনি দিয়ে বেরিয়ে আসে। আবার নতুন করে নতুন সন্তানের জন্য জরায়ুর ভেতরে ফুল তৈরি হ‌ওয়া শুরু হয়। গর্ভবতী না হলে প্রতি মাসে সেই ভ্রূণের খাবার জোগাড় দেওয়ার জন্যে তৈরি প্ল‍্যাসেন্টা বা ফুলটা ঝরে যায়। সেটাই মাসিক বা পিরিয়ড। তাই এটাকে অনাগত সন্তানের জন্যে জরায়ুর কান্না বলা হয়।”

ডাক্তার চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে দিয়ে বলেন, “মাসিক হয় বলেই দুর্গা মা হয়, আমাদের এই মেয়েটাও মা হয় – না হলে – মহামায়ার মায়ার খেলা থেমে যেত। যা, মা দশভুজা বাড়ি যা। বলবি মা দুর্গার‌ও মাসিক হয়। তাই দুগ্গা মা হতে পেরেছেন। আমি এই নিয়েই পুজো করব।”

ভদ্রমহিলা চায়ের গ্লাসটা রেখে দামটাম না দিয়েই গটগট করে বাড়ির দিকে হাঁটা লাগান। হাতুড়ে মাথা টাথা চুলকে বিমলবাবুকে টাকা দিয়ে রোগা ছেলেটার হাত ধরে হাঁটা লাগান।

চিত্রাঙ্কন: লেখক

(লেখক একজন চিকিৎসক)

Advertisement
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

প্রবন্ধ

মারাদোনা – গোল করা আর ভুল করা যাঁর কাছে দু’টোই সমান!

১০ নম্বর জার্সির মালিকরা যে রকম ভাবেন, তেমনই ভেবেছেন মারাদোনা।

Published

on

দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা। ফাইল ছবি

শুনুন ‘লেখক’, এখন আর কেউ জন্ম-মৃত্যু নিয়ে ঘ্যাঁট খায় না। সোজাসুজি চলে যায় বাছাই ডিশে, দেখে নেয় যে এল আর গেল তার মাঝখানের বছরগুলোয় সে কতটা আঁচড় কাটতে পারল। নো ডাউট, যাঁকে নিয়ে এই স্ক্রিপ্ট, তাঁর নাম-ই কাফি। লিখলেন অরুণাভ গুপ্ত

মারাদোনা-নামের মধ্যে বসে থাকা আরমান্দো মোটেই ঝিমুচ্ছে না, বলছে, এর অর্থ হল ‘ম্যান ইন দ্য আর্মি’। ফ্যামিলিও সেই রকম। খাওয়ানোর খ্যামতা নেই, অথচ সন্তানসংখ্যা চড়া পরদায় বাঁধা, অভাব-অনটন দরজায় কড়া তো নাড়বেই! তবে মা দোনাতোতা মমতাময়ী বটে! হাতড়াতে হবে না, খোদ মারাদোনার মুখ থেকে শুনি – “তাঁর কোনো দিন পেট ব্যথা ছিল না, তিনি শুধু চাইতেন আমাদের কোনো রকমে পেট ভরাতে। যখনই খাবার নিয়ে বসতেন, তাঁর একটাই কথা ছিল, আমার না বুঝলি পেটটা গড়বড় করছে। কী মিথ্যে কথা-আ। আমি জানতাম, এটা একটা অজুহাত, কারণ তাঁর ভাঁড়ারে যথেষ্ট খাবার থাকত না। আর এই কারণেই আমি এই মহিলাকে এতটা ভালোবাসতাম।” সত্যিই তাই, মারাদোনার প্রতিটি ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা অসামান্য।

মজার ঘটনা হল, মারাদোনার তিন বছর বয়সের জন্মদিনে খুড়তুতো ভাই বেতোজারেত খুদে ভাইকে একটা বল উপহার দেয়। মারাদোনাকে আর পায় কে! এমনকি ঘুমোনোর সময় বলটাকে জামার ভিতর ঢুকিয়ে লুকিয়ে রাখত ছোট্ট মারাদোনা। যাতে কেউ সেই বল হাতিয়ে নিতে না পারে। মা কিন্তু তখন প্রচুর বকাবকি করতেন, তাঁর সাধ, ছেলে লেখাপড়ায় মন দিক। গরিবের ঘরে এ সব মানায় না। পরে মা বুঝলেন, তাঁর এই সন্তানকে ফুটবল ডাকে।

Loading videos...

দৃশ্য: ২

কত হবে, বড়োজোড় আট। ঢুকে পড়লেন লাস ওগোলিতাস ছেলেদের দলে। যারা আবার ‘দ্য লিটল ওনিয়নোস’ নামে পরিচিত। ব্যস, ঢুকেই প্রতিপক্ষদের ভো-কাট্টা। পর পর ১৩৬ ম্যাচে জয়। এবং একই সঙ্গে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ সম্মান ক্লাবের। ১৯৭৬-এ প্রথম ডিভিশনে যাত্রা শুরু, তার চার মাস বাদেই একেবারে জাতীয় দলে সুযোগ। এর আগে এত অল্প বয়সে আর্জেন্তিনার আর কেউ এমন কৃতিত্ব পায়নি। কাগজে খেলার পাতায় ছাপা হল, ‘দেয়ার ওয়াজ আ কিড উইথ দ্য অ্যাটিটিউড অ্যান্ড ট্যালেন্ট অব আ স্টার’। ফাটাফাটি প্রচার, কিন্তু প্রুফ রিডারের ক্যাপাকাইটিতে মারাদোনার নাম হল ‘ক্যারাদোনা’, বলিহারি ব্যাপারস্যাপার। অথবা দোষ কারও নয় গো মা….।

যা হোক, তাতে মারাদোনার কিছু যায়-আসেনি, হুড়হুড়িয়ে আকাশ ছুঁয়েছেন। গাট্টাগোট্টা চেহারার মিডফিল্ডার মারাদোনা ক্লাব ম্যাচে গোল করেছেন ২৫৯, খেলেছেন ৪৯০ ম্যাচ। স্বদেশ আর্জেন্তিনার হয়ে ৯১ ম্যাচে ৩৪টা গোল। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ ১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯০ এবং ১৯৯৪ (এখানে অবশ্য ড্রাগ টেস্টের কবলে দল থেকে ছাঁটাই)। ‘৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপে কী বিচিত্র ফুটবল চরিত্রের প্রকাশ – ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিতর্কিত গোল করে নো লাজলজ্জা, সপাটে নিজেই মন্তব্য করেছেন, “আ লিটিল উইথ দ্য হেড অব মারাদোনা অ্যান্ড আ লিটিল উইথ দ্য হ্যান্ড অব গড”। আরও আছে ওই ইংল্যান্ডের ম্যাচেই কম করে হাফডজনকে ড্রিবল করে ধোঁকা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে জালে বল ঠেলে এমন অনবদ্য গোল করেন যে ফিফা ভোটাভুটিতে ঘোষিত হয় ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’।

ওই বিশ্বকাপেই বেলজিয়াম ম্যাচে ধারাভাষ্যকার ভিক্টর হুগোসাহেব মারাদোনার কাণ্ডকারখানা দেখে বলে ওঠেন, “আকাশ থেকে আচমকা যেন ধুমকেতুর আবির্ভাব’। মানে মারাদোনা বল পেলেই বেলজিয়ানরা থরহরিকম্প! সাধে কী আর সতীর্থ জর্জ ভালদানো বলেছেন, “ওর বাঁ পায়ে বল পড়লে বলের ভিন্ন জাতের অভিজ্ঞতা হয়”।

আনন্দ এবং স্বাধীনতা

মারাদোনার চিরস্মরণীয় মন্তব্যের বহর তাঁর কৃতিত্বের মতোই দীর্ঘ। কোনোটা ফুটবলকেন্দ্রিক তো কোনোটা জীবনভিত্তিক। তিনি বলতে দ্বিধা করেননি – “ফুটবলকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এটা একটা এমন খেলা, যা আমাকে শুধু আনন্দ দেয়নি, দিয়েছে অফুরন্ত স্বাধীনতা। অনেকটা ওই হাত দিয়ে আকাশ ছুঁয়ে ফেলার মতো, আবারও বলি – ধন্যবাদ, ধন্যবাদ ফুটবল”।

আরেকটা তাঁর হাতে পাঁচখানা ট্যাটু নিয়ে। পাঁচটা ট্যাটুর মধ্যে একটা বিশেষ ট্যাটু তাঁর ডান হাতে ছিল। যেটা চে গ্যোভেরার, পরম যত্নে ওই ট্যাটুটিকে আজীবন লালনপালন করেছেন মারাদোনা। এবং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, “আমি শুধু হাতেই ওঁকে বহন করিনি, অন্তরেও বহন করেছি। আমি তাঁর অসংখ্য ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, আমি তাঁকে ভালোবাসতে শিখেছি। হ্যাঁ, আমি দৃঢ় ভাবে বলছি, তাঁর সম্পর্কে যে সত্য আমি জেনেছি, তা শুধু অকাট্য নয়, সম্পূর্ণ নিখাদ”।

তবে ফুটবলের পাশাপাশি জীবনদর্শনেও নিজেকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন ফুটবলের যুবরাজ। তাঁর কালজয়ী মন্তব্যের ঝাঁপিও যে কারণে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। এক সময় তিনি যখন বলেন, “আমি কালো হই বা ফরসা, জীবনে কখনও ধূসর হয়নি” তখন তাঁর ব্যক্তিত্ব ধুয়েমুছে সাফ করে দেয় তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনেক বিতর্ককেই।

গড়পড়তা ১০ নম্বর জার্সির মালিকরা যে রকম ভাবেন, তেমনই ভেবেছেন মারাদোনা। তবে ভালো-মন্দ মেশানো চরিত্রে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল, কোনো রকম ঢাকঢাক গুড় গুড় নেই। একেবারে সোজাসাপটা। কী অদ্ভুত ফুটবলার! বুক চিতিয়ে বলে দিলেন, “ওরে ভাই, শুনে রাখো, আমি হলাম মারাদোনা। সে যেমন গোল করে আবার ভুল-ও করে। আমার কাছে দু’টোই সমান। কোনো বাছবিচার নেই। আরও মনে রেখো, আমার কাঁধ যথেষ্ট চওড়া, তাই যে কোনো প্রতিঘাতে আমি সমানে লড়তে পারি”।

তিনি যে আসছেন, সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন ১৭ বছর বয়সে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে। বলেছিলেন, “আমার দু’টো স্বপ্ন রয়েছে। প্রথম, বিশ্বকাপে খেলা। আর দ্বিতীয় সেটা জয় করা”। দু’টো স্বপ্নই সফল। সেই স্বপ্নই যুগের পর যুগ জাগিয়ে রাখবে শুধু ফুটবল খেলোয়াড় আর ফুটবলপ্রেমীদের নয়, বিপ্লবে বিশ্বাসীদেরও!

(দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা সম্পর্কিত অন্যান্য প্রতিবেদন পড়তে পারেন এখানে ক্লিক করে: মারাদোনা)

Continue Reading

প্রবন্ধ

সামনে ভোট, বরাদ্দ-ব্যবসা তো জমবেই!

কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তালিকায় এক নম্বরে পশ্চিমবঙ্গ! তা না হলে ভোটপ্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সরকারের কাছে ‘হিসেব’ চাইবেন কী ভাবে?

Published

on

নরেন্দ্র মোদী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

গরিবের হয়ে গলা ফাটাচ্ছে সরকার! গরিবের ঘরে ঢুকে হাঁড়ির খবর নিচ্ছে সরকার! একের পর এক প্রকল্প-তহবিলের খবর দিচ্ছে সরকার! তা হলে কি ভোট এসে গেল?

করোনা-কোভিড করে চিৎকার চলুক, তারই মাঝে কড়া নেড়ে দিয়েছে ২০২১-এর বিধানসভা ভোট। সংবাদ মাধ্যমের ভাষায় ‘একুশের মহারণ’। মহারথীরা ময়দানে নেমে পড়েছেন। রঙ-বেরঙের পতাকা, সারি সারি মাথা আর সময়-সুযোগ পেলেই গরিবের জন্য দু’-চার কথা। এখন অবশ্য শুধু কথায় চিঁড়ে ভেজে না। ‘মাল’ খসাতে হয়। সেটা মোক্ষম বোঝেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। বিজেপি-বিরোধী রাজ্য সরকার সাড়ে চার বছর কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগ তুলে আসবে, আর তার পর ভোটের মুখে কেন্দ্রের হাত উপুড়। কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক একটি পরিসংখ্যান তো তেমনটাই বলছে।

১-এ পশ্চিমবঙ্গ!

করোনাভাইরাস মহামারি রুখতে ২০২০-র মার্চে দেশব্যাপী লকডাউন জারি করেছিল কেন্দ্র। ওই লকডাউন কার্যকর হওয়ার পর থেকে গ্রামোন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। গ্রামীণ পরিকাঠামো এবং কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে এই মেয়াদে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে যে তহবিল বরাদ্দ করেছে, তা থেকে সব থেকে বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের জন্য। ভালো কথা! কিন্তু করোনা প্রভাবিত রাজ্যগুলির মধ্যে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্যগুলির তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ তো প্রথম স্থানে নেই! তা হলে বরাদ্দের তালিকায় কেন পশ্চিমবঙ্গ?

Loading videos...

আবার এমনও নয়, দেশের অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় সব থেকে পিছিয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। তা হলে কেন?

প্রথমত, বছর ঘুরলেই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট। এবং দ্বিতীয় ও শেষ কারণ, সারা দেশ জুড়ে অশ্বমেধের ঘোড়া ছোটালেও এখনও রাজ্যটিতে ক্ষমতা কায়েম করতে পারেনি কেন্দ্রের শাসক দল। হিসেবটা কী করে এতটা সহজ হল?

কারণ, এই মেয়াদে রাজ্যগুলির জন্য কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিহার। যেখানে অক্টোবর-নভেম্বর (২০২০)-এর বিধানসভা ভোট হয়ে গেল। ১০ নভেম্বর এগিয়ে যাওয়া আর পিছিয়ে থাকার টানটান উত্তেজনা শেষে কুর্সি দখলে রেখেছে বিজেপি এবং মিত্রশক্তি।

কে কত পেল?

গ্রামোন্নয়নমন্ত্রকের পরিসংখ্যান বলছে, মার্চ-নভেম্বর (২০২০) মেয়াদে সব মিলিয়ে ছ’টি প্রকল্পে ৪৯ হাজার ২৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যে জুটেছে ৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। বিহারের জন্য বরাদ্দ ৫ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। এর পরে যথাক্রমে রয়েছে মধ্যপ্রদেশ (৪ হাজার ৯৭৪ কোটি), উত্তরপ্রদেশ (৪ হাজার ৬৩৬ কোটি) এবং ওড়িশা (৪ হাজার ৫৩৫ কোটি)।

বিহার ভোটের পাট চুকেছে। মধ্যপ্রদেশেও বিজেপি সরকারের ভাগ্য নির্ধারণে ২৫টি আসনে উপ-নির্বাচনে বিজেপি সরকারের স্থায়িত্ব মজবুত হয়েছে। অন্য রাজ্যগুলির বরাদ্দ-বণ্টনে ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক কারণও হেলাফেলার নয়। তবে এই বরাদ্দের তালিকায় একেবারে শেষ জায়গায় রয়েছে গোয়া। তাদের জন্য এই মেয়াদে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ২.১ কোটি টাকা। এখানেও যেমন কাজ করেছে জনসংখ্যার অঙ্ক।

খাতের পরিচয়

মূলত ছ’টি খাতেই এই তহবিল বরাদ্দ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। যেগুলির মধ্যে রয়েছে মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাসিস্ট্যান্টস (এমএনআরইজিএ), প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা (পিএমজিএসওয়াই), শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি রুর্বন মিশন, ন্যাশনাল সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম, ন্যাশনাল রুরাল লাইভলিহুড মিশন (এনআরএলএম) এবং প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (পিএমএওয়াই)।

পশ্চিমবঙ্গের মতোই বছর ঘুরলেই ভোট অসমেও। পিএমজিএসওয়াই প্রকল্পে সেখানে বরাদ্দের পরিমাণ সব থেকে বেশি (১ হাজার ২৮৫ কোটি)। আবার পিএমএওয়াই প্রকল্পে সব থেকে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ (৩ হাজার ৭৫১ কোটি)। ছিটেফোঁটা ব্যতিক্রম যে নেই, তাও নয়। ২০২১-এ বিধানসভা ভোট তামিলনাড়ুতেও। কিন্তু পিএমএওয়াই প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ মেলেনি এই মেয়াদে। আবার গোয়া, গুজরাত, হরিয়ানা অথবা তেলঙ্গনাও এই প্রকল্পে কোনো তহবিল পায়নি।

অন্য দিকে ন্যাশনাল সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম-এর অধীনে সব থেকে বেশি বরাদ্দ জুটেছে বিহারের ভাগ্যে। উত্তরপ্রদেশ পেয়েছে ১ হাজার ২১৮ কোটি, কিন্তু জনসংখ্যা অনেক কম হলেও বিহার পেয়েছে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। উত্তরপ্রদেশের পরে তৃতীয় স্থানেই পশ্চিমবঙ্গ (৬৫৩ কোটি)।

আরও যে ভাবে

ঘূর্ণিঝড়, বন্য, ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত পশ্চিমবঙ্গ-সহ ছয় রাজ্যের জন্য জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিল থেকে মোট ৪ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় উম্পুনের ক্ষতিপূরণবাবদ পশ্চিমবঙ্গকে আরও ২ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে ওই খাতে। ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শনে এসে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ফলে সব মিলিয়ে হল ৩ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। কিন্তু এটা কি যথেষ্ট?

রাজ্যের শাসক দল বলছে, মোটেই নয়। গত ১৩ নভেম্বর কেন্দ্রের তরফে এই ঘোষণার পর তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় স্পষ্টতই জানিয়ে দেন, উম্পুন বিধ্বস্ত অঞ্চল পরিদর্শনে এসে প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার ধারেকাছে পৌঁছোয়নি এই বরাদ্দ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, উম্পুনের তাণ্ডবে রাজ্যে ১ লক্ষ ২ হাজার ৪৪২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

বকেয়া এবং বঞ্চনা

লকডাউনের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, কেন্দ্রের কাছে রাজ্যের ৫৩ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।

তৃণমূলের জাতীয় মুখপাত্র ডেরেক ও ব্রায়েন জানান, গত এক বছরে কেন্দ্রের সাহায্যে চলা প্রকল্পগুলিতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া। রাজ্যের রাজস্ব আদায় বাবদ প্রাপ্য, খাদ্য ভরতুকি এবং জিএসটি বাবদ বকেয়ার তালিকাও দীর্ঘ। যা নিয়েই বঞ্চনার অভিযোগ তুলছে রাজ্য সরকার।

এ দিকে ভোট এসে গেল!

বিহারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে যে ভাবে বিহারের মানুষ করোনাকে এড়িয়ে ভোট দিয়েছেন (বিজেপিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছেন), তাতে তাঁদের ধন্যবাদই প্রাপ্য। পশ্চিমবঙ্গেও ভোট আসছে। মনে হয় না করোনা এখনই ‘টাটা বাইবাই’ করবে। তারই মধ্যে ভোটপ্রচারে নেমে পড়েছে শাসক-বিরোধী সকলেই। বরাদ্দ-ব্যবসাও সমানে চলবে। তা না হলে বাংলায় ভোটপ্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সরকারের কাছে ‘হিসেব’ চাইবেন কী ভাবে?

আরও পড়তে পারেন: শহর ছেড়ে তুমি কি চলে যেতে পারো তিন ভুবনের পারে

Continue Reading

প্রবন্ধ

সৌমিত্র, কবে যে চলে এলে গৃহস্থের রান্নাঘর থেকে বৈঠকখানা হয়ে শীতের ছাদে আলোচনায়

সবাই চাইছিল, তুমি এক টানে সব খুলে বেরিয়ে আসবে, যেমন করে টান দিয়েছিলে হীরকরাজার মূর্তিতে। কিন্তু না, সব মায়া কাটিয়ে চলে গেলে তুমি।

Published

on

পাপিয়া মিত্র

ক্লাসের প্রথম হওয়া ছাত্রীটিকে ঘিরে সহপাঠীদের জটলা। কী হল… তার পরে… বল বল। মানে ওই যে দেবদাস যখন গাছের তলায় শুয়ে রয়েছে আর ওই যে পাতাগুলো, মানে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে… পাশ থেকে একজন বলল, ঝুরঝুর করে। হ‍্যাঁরে, গাছতলায় শুয়ে রয়েছে পারুর দেবদা। উফ্ জাস্ট ভাবতে পারছি না। হয়তো অষ্টম শ্রেণি। ও দেখে ফেলেছে আর…।

অনেকেই শুরু করে দিয়েছে শরৎচন্দ্র পড়তে। যাদের উপায় আছে তারা লুকিয়ে পড়ছে আর যাদের সেটুকু নেই তাদের থেকে জেনে নেওয়ার জন্য স্কুল কামাই নেই।

Loading videos...
‘দেবদাস’।

সাধারণ প্রেক্ষাগৃহে রমরমিয়ে চলছে দেবদাস। সৌমিত্র-উত্তম অভিনীত। সুপ্রিয়া-সুমিত্রা অভিনীত। কেমন হল রে? কেউ বলছে, আহা উত্তমের কী গাওয়া – শাওন রাতে যদি…। তখন পাড়ার জলসা থেকে মঞ্চের অনুষ্ঠানেও। আর প্রেমে ব‍্যর্থ হওয়া ছেলের দল তো চিহ্নিত হয়ে গিয়েছিল, মদ খাই সব ভুলতে। কী নিরহঙ্কার সরল প্রেমে আপ্লুত দুই যুবক-যুবতী, যেন আমার আপনার ঘরের দেওর ননদটি। সেই কিশোরীবেলার প্রেমিকটিকে অজান্তেই নিজের করে নেওয়া। নানা হলের সিনেমার বিজ্ঞাপন দেখা খবরের কাগজে, সেটাও খানিক লুকিয়েচুরিয়ে।

একটা বুদ্ধিদীপ্ত, ছিপছিপে, লম্বা, মাথাভর্তি চুল আর সব আভিজাত‍্য এসে শেষ হয়েছে খোদাই করা নাসিকায়। এমন এক নায়কের কী কী সিনেমা চলছে, কোন কোন হলে, কান খাড়া থাকত বাড়ির বড়োদের কথায়। সেটা তো মোবাইলের যুগ নয় যে গুগল আন্টিকে জিজ্ঞেস করে নেওয়া যাবে। জানার ইচ্ছে, দেখার তাগিদ, শোনার আগ্রহ, খবর পেলেই হল, বই খাতা নোটস আনার অছিলায় গল্প গিলে আসা।

‘তিন ভুবনের পারে’।

আসলে সব সংসার তখন খুব একটা স্বাধীনচেতা ছিল না। সৌমিত্র চট্টোপধ‍্যায়ের বই দেখার থেকে গৃহস্থ বেশি পছন্দ করত উত্তমকুমারের সিনেমা দেখতে। কিন্তু এ-ও ঠিক কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রী আর এক শ্রেণির মানুষের কাছে সৌমিত্র হয়ে উঠেছিলেন এক আদর্শ নাগরিক।

কিন্তু রোগের কাছে কেন হারিয়ে গেল খিদদার ‘ফাইট কোনি, ফাইট’ চিৎকার? কেন বসন্তবিলাপের শ‍্যামের আগুন লাগার উত্তপ্ত গান নিভে গেল? ওই তো যেন শোনা যাচ্ছে চারুবৌঠানকে নিয়ে গাইছে ‘আমি চিনিগো চিনি তোমারে’। ওই তো দেখছি, উদ্ধত সন্দীপ দাঁড়িয়ে আছে বিমলার কাছে। ময়ূরবাহন আর সাড়া দেবে না। তোমার ঘোড়া যে ছটফট করছিল ঝিন্দের পাহাড়িপথে তোমাকে নিয়ে ঘুরবে বলে। তোমার কাজল, তোমার মুকুল, তোমার ক‍্যাপটেন স্পার্ক, তোমার পোস্ত, তোমার তোপসে আর তোমার ফেলুদার কাহিনি লেখার অপেক্ষায় ছিলেন লালমোহনবাবু কিন্তু তুমি চলে গেলে। তোমার মাথার কাছে শ্বাস ফেলছিল হীরকরাজা। তুমি তো তাকে ছেড়ে দাওনি।

‘চারুলতা’।

‘তিন ভুবনের পারে’, ‘জীবন সৈকতে’, ‘স্ত্রী’, ‘প্রথম কদম ফুল’, ‘পরিণীতা’, ‘বাঘিনী’, ‘বাক্স বদল’, ‘মাল‍্যদান’, ‘মণিহার’-সহ অনেক ছবি একে একে গৃহস্থের রান্নাঘর থেকে বৈঠকখানা হয়ে শীতের ছাদে আলোচনায় চলে এল। কোথাও মনকাড়া গান, কোথাও টানটান গল্প। কোথাও তুমি অধ‍্যাপক, কোথাও তুমি গাড়ির ড্রাইভার। কোথাও তুমি বেকার ইঞ্জিনিয়ার, কোথাও তুমি ডাক্তার। গৃহস্থের কাছে তুমি বোকা বোকা হাসির নায়ক হলেও তোমাকে কেউ কোনো দিন গাছের ডালপালা ধরে নাচতে দেখেনি। এখানেই তোমার চরিত্রের বিশেষত্ব। তোমার বুদ্ধিদীপ্ত মুখের অভিব‍্যক্তি সামনে এনে দিল অন্য ধরনের চলচ্চিত্র। ভেঙে মুচকে দিল ‘অশনি সংকেত’, ‘গণদেবতা’, ‘গণশত্রু’, ‘অরণ‍্যের দিনরাত্রি’, ‘শাখাপ্রশাখা’, ‘হুইল চেয়ার’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘একটি জীবন’, ‘আবার অরণ্যে’, ‘পাতালঘর’, ‘সংসার সীমান্তে’র মতো কিছু উদাহরণ। গৃহস্থের অন্য নায়কের সঙ্গে তুলনা টানায় ছেদ পড়ল। তুলনাহীন ফেলুদাকে চিনতে শুরু করে দিল ‘সোনার কেল্লা’ আর ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ দিয়ে। প্রদোষ মিত্র, তুমি অবশেষে চির ঘুমের দেশে চলে গেলে।

তোমাকে দেখে শিখতে হয়েছে নিজের জন্য জায়গা রাখা। তুমি বুঝতে শিখিয়েছ পূর্ণ সংসার করেও একা থাকার দরকার, অন্তত নিজেকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য। শব্দহীন চোরা স্রোতে ভেসে ওঠে ফেলে আসা প্রেমবেলা। ‘বেলাশেষে’ দেখে অনেকেই ভেবেছে এ-ও হয়। হয়তো হতে পারে ভেবে অনেকের কপালে ভাঁজ পড়েছে। কেননা সেখানে জীবনের প্রান্তে এসে স্ত্রীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার বাসনা। এক ছেলে চার কন‍্যা নাতি-নাতনির ভরা সংসারে অনাবিল আনন্দের পাশাপাশি পেয়েছি ‘পোস্ত’কে। যেখানে একা দাদুঠাকুমা থাকতে চাইছে পোস্তকে নিয়ে।

তুমি যত এগিয়ে এসেছ, তুমি ততটাই গৃহস্থের ঘরের বাবা, জেঠু, শ্বশুর, দাদু, ঠাকুরদা হয়ে উঠেছ। এই করোনা-আবহে এখনকার প্রযুক্তির দৌলতে তোমার কত সিনেমা দেখেছি জান? তোমার ফিরে আসার পথের বাঁকে নন্দিনীরা অপেক্ষা করছিল। তুমি ফিরলে না।

‘জয় বাবা ফেলুনাথ’।

তোমার প্রতিদিন পড়ার অভ্যাস যে গীতবিতান, তার পাতা উড়ছে হেমন্তের মৃদু হাওয়ায়। তোমার সঞ্চয়িতা অপেক্ষা করছিল কোন কবিতা আবার রেলগাড়ির কামরায় আবৃত্তি করতে করতে যাবে। সকলের আকুল প্রার্থনা ছিল, উঠে পড় উদয়ন পণ্ডিত। তুমি যে মুক্তির স্বাদ দিয়েছিলে পাঠশালার ছেলেদের। ওরা তোমার জন্য বই খুলে বসেছিল। সবাই চাইছিল, তুমি এক টানে সব খুলে বেরিয়ে আসবে, যেমন করে টান দিয়েছিলে হীরকরাজার মূর্তিতে। কিন্তু না, সব মায়া কাটিয়ে চলে গেলে তুমি।

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

প্রয়াত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, থামল ৪০ দিনের ‘ফাইট’!

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
ক্রিকেট1 min ago

রানের বন্যা! ভারত আর অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে আসল ফারাক গড়ে দিলেন স্টিভ স্মিথ

রাজ্য5 mins ago

শুভেন্দু অধিকারীর ইস্তফা-কাণ্ডে কড়া প্রতিক্রিয়া অধীররঞ্জন চৌধুরীর

examination
শিক্ষা ও কেরিয়ার35 mins ago

পরের বছর থেকে মাতৃভাষায় পড়া যাবে ইঞ্জিনিয়ারিং: শিক্ষামন্ত্রক

রাজ্য1 hour ago

শুভেন্দু অধিকারীর সিদ্ধান্তকে ‘স্বাগত’ জানালেন মুকুল রায়

দেশ2 hours ago

কোভিড হাসপাতালে আগুন: গুজরাত সরকারের রিপোর্ট চাইল সুপ্রিম কোর্ট

দেশ2 hours ago

জাইডাস ক্যাডিলার কোভিড-টিকার অগ্রগতি পরিদর্শনে গুজরাত যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

রাজ্য3 hours ago

এখনই দলের বিধায়কপদ ছাড়ছেন না শুভেন্দু অধিকারী?

Ali Zaker
বাংলাদেশ4 hours ago

স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শব্দসৈনিক বরেণ্য অভিনেতা আলী যাকের আর নেই

কেনাকাটা

কেনাকাটা1 day ago

শীতের নতুন কিছু আইটেম, দাম নাগালের মধ্যে

খবর অনলাইন ডেস্ক: শীত এসে গিয়েছে। সোয়েটার জ্যাকেট কেনার দরকার। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে কিনতে যাওয়া মানেই বাড়ি এসে এই ঠান্ডায়...

কেনাকাটা3 days ago

ঘর সাজানোর জন্য সস্তার নজরকাড়া আইটেম

খবর অনলাইন ডেস্ক: ঘরকে একঘেয়ে দেখতে অনেকেরই ভালো লাগে না। তাই আসবারপত্র ঘুরিয়ে ফিরে রেখে ঘরের ভোলবদলের চেষ্টা অনেকেই করেন।...

কেনাকাটা6 days ago

লিভিংরুমকে নতুন করে দেবে এই দ্রব্যগুলি

খবর অনলাইন ডেস্ক: ঘরের একঘেয়েমি কাটাতে ও সৌন্দর্য বাড়াতে ডিজাইনার আলোর জুড়ি মেলা ভার। অ্যামাজন থেকে তেমনই কয়েকটি হাল ফ্যাশনের...

কেনাকাটা1 week ago

কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস, দাম একদম নাগালের মধ্যে

খবর অনলাইন ডেস্ক: কাজের সময় হাতের কাছে এই জিনিসগুলি থাকলে অনেক খাটুনি কমে যায়। কাজও অনেক কম সময়ের মধ্যে করে...

কেনাকাটা3 weeks ago

দীপাবলি-ভাইফোঁটাতে উপহার কী দেবেন? দেখতে পারেন এই নতুন আইটেমগুলি

খবর অনলাইন ডেস্ক : সামনেই কালীপুজো, ভাইফোঁটা। প্রিয় জন বা ভাইবোনকে উপহার দিতে হবে। কিন্তু কী দেবেন তা ভেবে পাচ্ছেন...

কেনাকাটা4 weeks ago

দীপাবলিতে ঘর সাজাতে লাইট কিনবেন? রইল ১০টি নতুন কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আসছে আলোর উৎসব। কালীপুজো। প্রত্যেকেই নিজের বাড়িকে সুন্দর করে সাজায় নানান রকমের আলো দিয়ে। চাহিদার কথা মাথায় রেখে...

কেনাকাটা2 months ago

মেয়েদের কুর্তার নতুন কালেকশন, দাম ২৯৯ থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক: পুজো উপলক্ষ্যে নতুন নতুন কুর্তির কালেকশন রয়েছে অ্যামাজনে। দাম মোটামুটি নাগালের মধ্যে। তেমনই কয়েকটি রইল এখানে। প্রতিবেদন...

কেনাকাটা2 months ago

‘এরশা’-র আরও ১০টি শাড়ি, পুজো কালেকশন

খবর অনলাইন ডেস্ক : সামনেই পুজো আর পুজোর জন্য নতুন নতুন শাড়ির সম্ভার নিয়ে হাজর রয়েছে এরশা। এরসার শাড়ি পাওয়া...

কেনাকাটা2 months ago

‘এরশা’-র পুজো কালেকশনের ১০টি সেরা শাড়ি

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজো কালেকশনে হ্যান্ডলুম শাড়ির সম্ভার রয়েছে ‘এরশা’-র। রইল তাদের বেশ কয়েকটি শাড়ির কালেকশন অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন...

কেনাকাটা2 months ago

পুজো কালেকশনের ৮টি ব্যাগ, দাম ২১৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : এই বছরের পুজো মানে শুধুই পুজো নয়। এ হল নিউ নর্মাল পুজো। অর্থাৎ খালি আনন্দ করলে...

নজরে