হিন্দি বলয়ে ভাঙনের শুরু শেষ বছরে, উনিশের বুকে আঠারো আসুক নেমে

0
debarun roy
দেবারুণ রায়

সব ভালো যার শেষ ভালো। বৃহত্তম গণতন্ত্রে মানুষের সহজাত প্রবণতা “পরিবর্তন”।তাই নানা দুঃখ-দারিদ্র্যজর্জর  বছরের শেষ মাসটা একটা জোরালো ফ্ল‍্যাশ দিয়ে গেল। এই ফ্ল‍্যাশ যুগপৎ এক ঝলক আলো ও বড় খবর। একেবারে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া আলোর  ফ্ল‍্যাশ, সাড়াজাগানো সংবাদ। হিন্দি বলয়ের তাৎপর্যের ঘটনা, বিজেপির গড় বলে  চিহ্নিত তিনটি রাজ‍্য থেকে পাততাড়ি গোটালো বিজেপি। রাজস্থান, মধ‍্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ের গৈরিক রাজের অবসান হল। বিশেষ করে মধ‍্যপ্রদেশ।

বঙ্গে যেমন বাম ঘাঁটি ছিল, তেমনি মধ‍্যপ্রদেশে গেরুয়ারাজ।আসনের সংখ‍্যাতত্ত্ব ভোট শতাংশকে অর্থহীন করে দিয়ে কমলফুলকে গদি থেকে এক ঝটকায় সরিয়ে, সেই আসনে বসিয়ে দিল কমলনাথকে। ‍২২ রাজ‍্যে কায়েম হওয়ার পর অহংকারে দু’নম্বর, অমিত পরাক্রমশালী শাহ আদাজল খেয়ে নেমেছিলেন। নিদহারা বহু নিশিযাপনের ফলে প্রচারের চার্টার্ড বিমানের সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়েও সামলে নেন। ভেবেছিলেন, এ ভাবেই পতনের পথে হবে নতুন উত্থান। কিন্তু তা আর হল কই ? অচ্ছে দিন এল না। আম আদমির  বরাত তো ফিরলোই না । সেই সঙ্গে ‘অচ্ছে দিনে’র বচ্চে লোগেরাও হাড়ে হাড়ে বুঝল কত ধানে কত চাল। দলের অন্দরের ক্ষোভ উপচে এল ঠাকুর দালানে।উঠল কথা ঔদ্ধত্য আর অহংকার নিয়ে।  তুললআরএসএস ।উত্তর প্রদেশে সপা, বসপার অঘোষিত হাত ধরাধরিগোরখপুরের গদি উল্টে  ফুল পুরে ফুলপ্রুফ হলেও বজায় ছিল অহংকার। “বেড়াল-কুকুরের জোট” বলতেও বাঁধেনি। মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান তার জবাব দিল বিনা জোটেই বিজেপির বিসর্জনে। কাজ হল না মোদী-ম‍্যাজিক কিংবা শাহ-জাদুতে। জনতার আদালতে খারিজ হল অচ্ছে দিনের মোদী-শাহ টোটকা। মে্রুকরণের মেডিসিন যত ভেজাল কিংবা মেয়াদ পেরনো বলে প্রমাণ হয়ে গেল। প্রায় তিন দশকের পুরনো দাওয়াই প্রজন্মের ধাক্কা খেল। ‘মোদী মোদী’ রব শুনে ২০১৪-য় যার উদয়, হিন্দি হৃদয় তাকেই বিদায় দিল নগদ ভোটে ‘১৮-য়। উনিশের জোটে জোয়ারের আশা। বিরোধী ভাষায়, “এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে ।”

যদিও কঠিন পরীক্ষা নিয়েছে ‘১৮। যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে/ সব সঙ্গীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া/ তবু বিহঙ্গ ওরে বিহঙ্গ মোর/এখনইঅন্ধ বন্ধ কোরনা পাখা…..। এই আপ্তবাক‍্যে ভর করেই ‘১৮-র দিনযাপন। একে একে নিভেছে দেউটি। বিগত দিনের মানবজমিন চাষ করেছেন যাঁরা, সেই নবতি দশকে নৌকা যাঁদের উজানের টানে ছিল দীর্ঘদিন, তাঁরা আর ভাটির টানে ফিরে আসেননি । দেশ কাল আরেক প্রস্ত দরিদ্র হয়েছে তাঁদের ছাড়া। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী, ড. অশোক মিত্র, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ  চক্রবর্তী এবং সকলের শেষ শট নিয়ে অন্তিম দৃশ্য ফেড আউট হতে হতে ক‍্যামেরার পেছন থেকে সামনে এলেন মৃণাল সেন। সেই শট ফ্রিজ হয়ে রইল তাঁর অনন্তযাত্রায়। এঁরা প্রত‍্যেকেই বহুমুখী প্রতিভায় ধনী ছিলেন।জীবনেরও চালচিত্র  নিখুঁত অঙ্কনেঋদ্ধ করেছেন । সেলুলয়েডের শোভা হয়ে থাকতে নারাজ পদাতিক শান্তিনিকেতনের দুটি  হতদরিদ্র আদিবাসী গাঁয়ে বৈদ্যুতিক আলো এনে শতাব্দীর অন্ধকার ঘুচিয়ে ছিলেন মৃণাল সেন, তাঁর সাংসদ তহবিলের টাকায়। বল্লভপুরডাঙা আর সরকারডাঙা এই দুই পাশাপাশি গ্রাম। ওঁর চলে যাওয়ার কথা শুনে ইস্তক গাঁয়ের মায়েরা  তাঁকে একবার দেখার আশায়প্রহর গুনছেন । ৬৫ বছরের চম্পা হেমব্রম নীল আকাশের নীচে একটা মানুষের কথাই জানেন। মৃণাল ওঁদের কাছে আলোর পথযাত্রী।কখনও যে গাঁয়ে আসেননি।ওঁরা কেউ কখনও ওর ছবি একটাও দেখেননি। কিন্তু মৃণাল সেন ওঁদের একদিন প্রতিদিন।

বয়সে কম কিন্তু প্রস্থানে এগিয়ে , জীবন যুদ্ধের মতোই অগ্রণী  স্টিফেন হকিং। মহাশূন্যে র রহস্যসন্ধানে ব্রতী এই ‘১৮-তেই অলীকযানের যাত্রী। পাড়ি দিলেন মহাকাশে ব্ল‍্যাকহোল খুঁজতে।

ভারতীয় রাজনীতির ব্ল‍্যাকহোল খুঁজতে কিন্তু মহাকাশে যেতে হয়নি। স্বাধীনতা যত প্রবীণ হয়েছে ততই ঘোর কেটেছে ভারতবাসীর। ঘোর সংকটে ত্রাতা ভেবে নিরন্ন , রুগ্ন, কর্মহীন , দিশাহীন দেশবাসীবাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরতে গিয়ে দেখেছে ওটা জাদুছড়ি। কোথায় দুকোটির চাকরি, কিংবা স্বপ্নের জলযান ?  সবই ফুসমন্তর, জুমলার জয়জয়কার। সবকিছুই এহোবাহ‍্য করে এলো তিন তালাক, এবং তারও তিন মাতব্বর ! যিনি একদা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ফেজ টুপি, বলেছিলেন, ইসলাম তুষ্টি করবনা, গর্ব সে কহো হম হিন্দু হ‍্যায়, তাঁকেই দেখা গেল, ইসলামী আদবে, শেরওয়ানি-পাজামা এবং সেই অচ্ছুৎ টুপি পরে মসজিদি কেতায় আদাব-কুর্নিশে লা-জবাব  উপস্থিতিতে মুসলিম মজলিশে। কে বলবে ইনি সেই মোদী ! আসলে গুজরাতের গৎ আর ভারতের ভাব তো এক নয়। যেখানে যেটা খায়। তাই তো “হিন্দুহৃদয়সম্রাট”থেকে” ঘর ঘর মোদী। “কংগ্রেসমুক্ত ভারত গড়তে হলে তো কংগ্রেসের  বিকল্প হতে হবে। শুধু তিলক, তরাজুতে চিঁড়ে ভিজবে না।তাই বারাণসীর  ব্রাহ্মণ‍্যবাদের বুলিতে আটকে না থেকে  প‍্যান ইণ্ডিয়ান  নেতা হতে হবে। রফার রাফাল নিয়ে গায়ে কাদা লাগলেও কিছু প্লাস পয়েন্টও জুটছে । সেটা হল অনিল অম্বানির  কৃতজ্ঞতা।  আহা কর্পোরেটের কলতান ছাড়া কি শাসকদল মানায়। এই যে অর্থশাস্ত্রী মৌনমোহন, তাঁকে যোগ্য প্রধানমন্ত্রী মনে করার মোক্ষম যুক্তি ছিল তিনি কর্পোরেটপ্রিয়। ১০ বছরে তিনি ছিবড়ে হলেন বলেই তো ভাইব্র‍্যান্ট গুজরাতের মোদী ভাইয়ের ডাক পড়ল। সংঘ পরিবারের সবচেয়ে পরখ করা মিত্র।’মিত্রোঁ’ মুদ্রায়খ‍্যাত হলেন তিনি।

তো তুষ্টিকরণ বলতে বলতে তিনি যখন টুপি পরে মজলিশ মাতিয়ে দেন , তখন কোনও খুঁত ধরে না বিরোধীরা। অথচ যত দোষ রাহুল ঘোষ। রাহুল গুজরাতি মন্দিরে গিয়ে পৈতে জড়ালে , গোত্র উচ্চারণ করলে মড়াকান্না, শাপান্ত এবং বাপান্ত। গান্ধী পরিবারের বাপ-মা তুলে স্বস্তিবাচন। পাঁচ রাজ‍্যের নির্বাচন এই অনৈতিক রাজনীতির শিং ভেঙে দিয়েছে। বার্তা দিয়েছে, ভারতমাতা কি জয় বললেই ভারতভাগ্যবিধাতা হওয়ার ছাড়পত্র মেলেনা। মেলেনা রাজনৈতিক বিরোধীদের ‘দেশদ্রোহী’ স্ট‍্যাম্প লাগানোর এক্তিয়ার।  মেষশাবক আর নেকড়ের গল্পের মতো “তুই না করিস তোর বাপ জলঘোলা করেছিল “, এমন ধাঁচের সওয়াল সাজাচ্ছে যারা তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বদলে বৃটিশের খয়েরখাঁদের উত্তরাধিকার। জাতীয় আইকনহীন দল সর্দার পটেলকে অকংগ্রেসি  হিন্দুত্ববাদী  সাজিয়ে নেহরু বিরোধী নেতা হিসেবে প্রজেক্ট করতে মরিয়া সংঘ পরিবারের কর্তারা। অথচ ‘দেশ ও দলের জন্য জওহর কতটা কষ্ট স্বীকার করেছেন’ -সেকথা তিনিই জানেন, এ কথা বলছেন স্বয়ং সর্দার। ঐতিহাসিক তথ্য সাক্ষী। একই উদ্দেশ্যে গুজরাতে পটেলের আকাশচুম্বী বিদেশি মূর্তি প্রতিষ্ঠা হল ‘মেক ইন ইন্ডিয়ার’ প্রবক্তার হাতে। যেমন লালকেল্লা থেকে আজাদ হিন্দ ফৌজের স্মরণে বক্তৃতা ও আন্দামানে প্রথম স্বাধীনতার স্মৃতিচারণের মাধ্যমে আরও একবার আইকনসংকট মোচনের প্রয়াস। কংগ্রেসে নেহরুর সমান্তরাল শিবিরের নেতা হিসেবে সর্দার ও নেতাজিকে তুলে ধরার সমস্যা হল পটেল ও সুভাষচন্দ্রের  নৈতিক বৈপরীত্য। তবুও গেরুয়া শিবির অক্লান্ত। তাহলে বাজপেয়ী-আডবাণী বৈপরীত্য বা মোদীর সঙ্গে বিজেপির প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের নীতিগত সংঘাতের কী হবে ? এই সমান্তরাল স্রোতধারা তো চলতেই থাকে। কিন্তু দল  তো তাতে ভাঙে না। বরং আরও পোক্ত হয় ঐক্য। একই ভাবে ভারতের প্রাচীনতম দল কংগ্রেসের ভেতরেও লাগাতার চলেছে স্রোত ও পাল্টাস্রোত। এর ফলে পরিশ্রুত হয়েছে রাজনীতির মূল স্রোতস্বিনী। অভিজ্ঞ হয়েছে বৃহত্তম গণতন্ত্রের কুশীলবরা। সেই সূত্রে সাধারণ মানুষ। প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে নতুন শতক ও সহস্রাব্দ। আঠারোর শুরু দুঃসহ দিন দিয়ে। কিন্তু আঠারো বছর বয়সেই অহরহ বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি। গুজরাত বিধানসভার ভোট সেই দুঃসাহস দেখালো। গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার পালা শেষ। এ বার শেষ বোঝাপড়া শহরে, ঊনিশের লোকসভায়। হার্দিক, অল্পেশ তো আছেনই, সেই সঙ্গে ভারতের রাজনীতির নয়া অভিজ্ঞান জিগ্নেশ মেবাণী। আরও একবার সময় বলছে, এ দেশের বুকে , মানে উনিশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।

উৎক্ষিপ্ত গেরুয়া মহল। হালফিলের সব কুচকাওয়াজ খারিজ করেছে হিন্দি ওরফে গো-বলয়। রামমন্দিরের ইটচাপা দেওয়া দঙ কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি খুঁড়ে বের করছে মানুষ। সব সমীক্ষায় কর্মসংস্থান আর অর্থনীতি মূল মুদ্দা। কিন্তু সরকারি দল বলছে কাশ্মীর, পাকিস্তান, হিন্দু-মুসলমান। রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা , ব‍্যাংক বেসরকারি। হাতে তুলে দেওয়া রুখতে, কৃষকের আত্মহত্যা ঠেকাতে সংসদ অভিযান হচ্ছে। আর সংসদে আসছে তিন তালাক বিল। বিল নিয়ে বৈঠক এড়াচ্ছে সরকার। রাজ‍্যসভায় পাশ নয়, বিল নিয়ে সাম্প্রদায়িক রং চড়াতে তৎপর কেউ কেউ। বাকিরা প্রশ্ন করছেন, তিন তালাক রুখুন। কিন্তু এক চালাকের কী হবে ? বিনা তালাকেও তো বৌ- বিসর্জন হয়েছে কালে কালে। তার কী হবে ?

কে শোনে ধর্মের কথা ? ধর্ম তো শুধু ভোটের তুরুপ। তাই রাষ্ট্রধর্ম রক্ষার আসন্ন লগ্নে  ভক্তদের বাতাসা ছুঁড়ে দিচ্ছেন মন্দির ছেড়ে মসনদে বসা মহন্ত। তাঁর মুখে বীজ মন্ত্র, “ইয়ে তো পহলি ঝাঁকি হ‍্যায়, কাশী মথুরা বাকি হ‍্যায়”।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here