কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে ‘পোকা’ হয়ে যাব না তো?

লকডাউনের জেরে কমছে দূষণ। ঘরের দেওয়ালে দেখা মিলছে এ রকমই কিছু পতঙ্গের। নিজস্ব ছবি
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে গ্রেগর সামসার মতো হাল হবে না তো? সেই রাতারাতি ‘পোকা’ হয়ে যাওয়া ‘দ্য মেটামরফোসিস’-এর নায়ক(!) যে ভাবে পতঙ্গে পরিণত হয়ে শুয়েছিল নিজের বিছানায়।

এই লকডাউনের বাজারে আচমকা মনে পড়ে গেল ফ্রান্‌ৎস কাফকা (Franz Kafka) আর তাঁর সামসাকে। প্রতি দিন রাতে যে বিশাল বপুর দুশ্চিন্তা নিয়ে চোখে ঘুম নামে, তাতে সকালে উঠে নিজের প্রকৃতি সম্পর্কে এ রকমই কিছু এলোমেলো দিবাস্বপ্ন খোলাচোখে উঠে আসে সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি অথবা ফ্রি কলের অবসরে।

কখনও মনে হয়, এ সব কল্পনার সীমা ডিঙোনো কোনো আজগুবি ভাবনা। আবার এটাও মনে হয় এমন আকস্মিক রূপান্তরের পথ দেখাচ্ছে নাকি নোভেল করোনাভাইরাস (Coronavirus) নামে এক অদৃশ্য শত্রু! বিজ্ঞানকে বাহনে পরিণত করা এই মহা-আধুনিক মানবসভ্যতা যদি একটা জীবাণুর কাছে এ ভাবে কুপোকাত হয়ে যায়, তা হলে সবই সম্ভব, মানে কিছুই তো অসম্ভব নয়।

কী জানি কেমন একটা অদ্ভুত মিল রয়েছে এই করোনা লকডাউন আর কাফকার মেটামরফোসিসের যন্ত্রণার মুহূর্তগুলোর সঙ্গে। কাফকার সামসার মধ্যেও ছিল দুশ্চিন্তা, দুঃস্বপ্ন, নিঃসঙ্গতা আর বিচ্ছিন্নতা। আর করোনার ঠেলায় সামাজিক দূরত্ব তৈরি করতেও অবলম্বন সেই পৃথক হয়ে থাকা, বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা – দুইয়ের যোগফলে হরেক কিসিমের দুশ্চিন্তা, দুঃস্বপ্ন, নিঃসঙ্গতা।

সামসার চাকরির চাপ আর সংসারের প্রতি তার দায়দায়িত্ব নিয়ে গিজগিজ করত ভবিষ্যতের জটিল অঙ্ক। লকডাউনে ক্রমশ পকেট খালি হতে হতে সেই সব অঙ্কই যেন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। কোন কোম্পানি কত জন কর্মী ছাঁটাই করল, কত জনের কত শতাংশ বেতন কাটল, সে সব খবর ওয়েবসাইট খুললেই। তবে লকডাউন অসীম নয়। কিন্তু যে হারে দেশের বিভিন্ন অংশে উন্নয়নমূলক কাজগুলি আচমকা বন্ধ হল, কাজ হারাল কয়েক লক্ষ হাত, সেই হাতে কাজ ফিরতে কত দিন সময় লাগবে, কলকারখানাগুলো আবার কবে স্বাভাবিক হবে, অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সামাল দিতে সংস্থাগুলো নিজেদের উৎপাদনের পরিধি কতটা ছড়াবে, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ছাড়া বাকি জিনিসের চাহিদা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সে সব বিস্তর গবেষণার বিষয়। এ সবের প্রশ্নের উত্তর দিতে চাইছেন না অর্থনীতির দিকপালরাও।

আসল কাজটা তো জনসাধারণের স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা। … কোনো প্রস্তুতিই যে ছিল না, সেটা স্পষ্ট। তা না হলে একটা রোগের ঠেলায় কেন এ ভাবে কোমায় চলে যাবে অর্থনীতি?

উলটে তাঁরা বলছেন, ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দাকেও ছাপিয়ে যেতে পারে করোনা-সংকট। এক যুগ আগে নির্দিষ্ট কয়েকটা দেশের আর্থিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে মন্দার শিকার হয় বিশ্বঅর্থনীতি। কিন্তু সেটা ছিল নেহাতই উৎপাদন অথবা পরিষেবা ক্ষেত্রে গরমিলের একটা দুর্ভাগ্যজনক ফলাফল। কিন্তু এটা মহামারি আর তার জেরে লকডাউনের কারণে আদিম যুগের মানুষের গুহাবাসের মতো জীবনযাপন। গুহার মধ্যে থাকো, দিনে এক-দু’ বার শিকার করতে যাওয়ার মতো বাজারে যাও। কিন্তু কোথায় সেই বৃহৎ অরণ্য। বেরোলেই শিকার মিলবে অগাধ। এখন ফেলো কড়ি, মাখো তেল। যার তেল নেই, তার চরকা অচল। সরকারের মাথা গুনতি করে দেওয়া নামমাত্র অনুদানে কদ্দিন চলে? এক দিকে স্বাস্থ্য পরিষেবার উপর করোনার ভীষণ চাপ, অন্য দিকে লকডাউনের জেরে অর্থনৈতিক উৎসের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়া – কুরে খাওয়ার কারণ কিন্তু এগুলোও।

আমরা বলছি, করোনা-সংক্রমণ এবং কোভিড-১৯ (Covid-19) এক নজিরবিহীন আক্রমণ। এই পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করার মন্ত্র তাই অধরা। কিন্তু আসল কাজটা তো জনসাধারণের স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা। সেটা করোনা হতে পারে, অথবা কয়েক দশক আগের সার্স। এই আক্রমণের রকমফের হলেও কোনো প্রস্তুতিই যে ছিল না, সেটা স্পষ্ট। তা না হলে একটা রোগের ঠেলায় কেন এ ভাবে কোমায় চলে যাবে অর্থনীতি?

বাজে কথা, মানুষ কখনও পোকা হতে পারে! ও সব গল্প-নাটকেই সম্ভব। কিন্তু আমেরিকা থেকে ইউরোপ, এ ভাবে যে একটা আনুবীক্ষণিক জীবাণুর কাছে হাঁটু মুড়ে বসে পড়তে পারে, সে কথা তো মাস তিনেক আগেও ভাবাই যেত না। ভাবা যেত না, মহাশক্তিধর দেশ আমেরিকার মহাপরাক্রমশালী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশবাসীর উদ্দেশে বলছেন, ‘এপ্রিলের দুই সপ্তাহ আরও যন্ত্রণা অপেক্ষা করে আছে’। শত্রুপক্ষকে নয়, প্রিয় দেশবাসীর উদ্দেশে ট্রাম্পের এই সতর্কবার্তা আমেরিকানরা শোনার পর ঠিক কী ভাবে হজম করছেন, সেটার আঁখো-দেখা-হাল না মিললেও অনুভবের ঊর্ধ্বে নয়।

করোনার ঠেলায় সামাজিক দূরত্ব তৈরি করতেও অবলম্বন সেই পৃথক হয়ে থাকা, বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা – দুইয়ের যোগফলে হরেক কিসিমের দুশ্চিন্তা, দুঃস্বপ্ন, নিঃসঙ্গতা।

আমার দেশের প্রধান অবশ্য তেমন কোনো ঘোর আশঙ্কার কথা এখনও শুধোননি। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ করে, তিনি কোনো বিষয়কে যতটা না খতিয়ে দেখেন, তার থেকে বেশি মানুষকে মাতিয়ে রাখতে চান। কখনও থালা বাজান, কখনও লাইট নেভান ইত্যাদি। তবে জাতির উদ্দেশে ভাষণ থেকে ভিডিও-কথনে তিনিও লড়ছেন। একা নন, দেশের ১৩০ কোটি মানুষকে নিয়ে লড়ছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যৌথ ভাবে লড়ার কথাও ঘোষণা করেছেন। মানুষকে সুরাহা দিতে আর্থিক অনুদান থেকে খাদ্যশস্য সরবরাহ – সবই সাধ্যমতো করছেন। এখন লড়াইটা প্রতি দিন বেঁচে থাকার। ভবিষ্যতে কী হবে, সে সব ভাবনা এখন না ভাবলেও চলবে। কিন্তু কোয়ারান্টিন, আইসোলেশন করে করোনাকে আটকানো গেলেও ভবিষ্যতকে আটকে রাখা অসম্ভব। সে নিজের মতো করেই এগিয়ে আসছে। এ মুহূর্তের ভবিষ্যৎ, খানিক পরেই বর্তমান। নিয়ম মেনে তার পরেই অতীত।

করোনায় যাঁরা মারা গেলেন, তাঁরা অতীত হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমানে জীবিত থাকা সামসারা নিজেদের ভবিষ্যতকে দুশ্চিন্তার থাবা থেকে কিছুতেই আড়াল করতে পারছি না। রোগ সারাতে ওষুধ খেতে হয়, কড়া ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কড়া। করোনা ঠেকাতে ওষুধ এখন লকডাউন। সব মিলিয়ে এই লকডাউনের সাইড এফেক্টে পোকা হয়ে যাওয়ার সেই দুঃস্বপ্নটা যেন কিছুতেই এড়ানো যাচ্ছে না!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.