jayanta mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

রোববার রাত আটটা চল্লিশের ধরনামঞ্চ। কলকাতা থেকে কয়েক ঘণ্টা বাদেই পর দিন সকালে পৌঁছে গেল দিল্লিতে। সটান সংসদ ভবনের ভিতরে। এর পরেও কি আর বলা যায়, দিল্লি বহুত দূর!

গত ১৯ জানুযারি ব্রিগেড সমাবেশের পোশাকি নামকরণ ছিল ‘ঐক্যবদ্ধ ভারত’ বা ‘ইউনাইটেড ইন্ডিয়া’। এই ভারত বা ইন্ডিয়া বলতে বোঝায় কেন্দ্রের শাসক-বিরোধী ভারতকেই। তবে সেটা যে আদতে ভারতই, তার প্রমাণ মিলেছিল সে দিনের মঞ্চ থেকেই। আঁচ পেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও।

কলকাতায় যখন ওই সমাবেশ চলছে, তখন দমন ও দিউতে একটি দলীয় অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই তিনি বিরোধীদের মহাজোটকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করতে ছাড়েননি। গত শনিবার উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগর আর পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুরে ঘুরে যাওয়ার পর সেই আক্রমণ আর ভাষায় সীমাবদ্ধ রইল না বলেই ধরে নেওয়া যেতে পারে।

কেন্দ্রের হাতে সিবিআই কী ভাবে নাচছে, তা ওই সংস্থার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বতেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। লোকসভা ভোটের হাতে গোনা ক’মাস আগে এ হেন সিবিআই লেলিয়ে দিয়ে মমতাকে জব্দ করার বিশেষ কৌশল ব্যুমেরাং হয়েই ফিরতে পারে মোদীর কাছে, সে সম্ভাবনাও ঝেড়ে ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। কী ভাবে?

তার আগে সংক্ষেপে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যেতে পারে, ‘ঐতিহাসিক’ সারদা চিটফান্ড কাণ্ডে।

  • ২০০৬ সালে এই সংস্থা খুলেছিলেন কর্ণধার সুদীপ্ত সেন। মোটা টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে থেকে টাকা তোলার ফাঁদ পেতেছিলেন তিনি।

  • পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, অসম ও ত্রিপুরায় ছিল ব্যবসার জাল ছড়ানো। তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর দহরম-মহরমের কথাও সর্বজনবিদিত।

  • প্রথম ধাক্কা ২০০৯ সালে। সে বছর সেবির তরফে সংস্থার আয়-ব্যয়ের হিসাব চেয়ে পাঠানো হয়।

  • দু-বছর বাদে, ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারকেও অবগত করে সেবি।

  • ২০১২ সালে সারদা গ্রুপে বাজার থেকে টাকা তোলার উপর নিষেধা়্জা জারি করে সেবি।

  • সেবির নিয়ম মানেনি সংস্থা। ২০১৩ সালে সংস্থার লেনদেন ভেঙে পড়ে।

  • ওই বছরই প্রায় চারশোর উপর এফআইআর দায়ের হয় সংস্থা, সুদীপ্ত এবং সংস্থার অন্যান্য ছয় আধিকারিকের বিরুদ্ধে। গ্রেফতার হন সুদীপ্ত-সহ অন্যরা।

  • ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টে পুরো ঘটনার তদন্তভার দেয় সিবিআইকে।

২০১৪ সালেই বিজেপির আকাশে নতুন সূর্যের আবির্ভাব। নরেন্দ্র মোদী। তিনি ওই বছরের লোকসভা ভোটের প্রচারে কলকাতার কাঁকুড়গাছির সভায় এসে দিদি আর দড়ি নিয়ে এমন সব জোকস বলেছিলেন, যা শুনে কিছু মানুষ ভেবে নিলেন/ছিলেন খোয়া যাওয়া টাকা ফিরল বলে!

২০১৪-য় দিল্লির তখ্‌তে বসলেন মোদী। তাঁর কোন পায়ের তলায় তিল রয়েছে, জানা না গেলেও, তিনি বেশ ভ্রমণ-রসিক মানুষ। ফলে বিদেশ-বিভুঁয়ে ঘুরতে ঘুরতে তিনি বেমালুম ভুলে গেলেন সারদার কথা।

এই ক-মাস আগে গত ১২ আগস্ট কলকাতার সভায় লোকবহর দেখে সে কথা ফের মনে করালেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। সামনে যে ভোট। গত ২৯ জানুয়ারি কাঁথিতে এসেও তিনি সিন্ডিকেট ট্যাক্সের মতো চিটফান্ড নিয়েও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আর গত শনিবার বাংলায় এসে মোদীর চিট-টিট তো স্মরণীয় হয়ে রয়ে গেল বঙ্গবাসীর কাছে।

কী আশ্চর্য, মমতার সংবিধান রক্ষার দাবিতে যে তাঁর ঐক্যবদ্ধ ভারত মঞ্চের দোসররা শামিল হবে তা জানা কথা, কিন্তু সিপিএম?

একটু খটকা লাগবেই! সিপিএম রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র দাবি করেছেন, বামফ্রন্টের ব্রিগেডের সাফল্য থেকে প্রচারের আলো ঘোরাতেই সিবিআই নিয়ে এই অতিসক্রিয় নাটকীয়তা। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বিজেপির সমালোচনা করে বলেন, ‘‘অন্যান্য স্বাধীন সংস্থার মতো সিবিআই-এর উপর মোদী সরকারের হস্তক্ষেপ এখন প্রমাণিত সত্য।’’

দেশের সংবিধানকে রক্ষা করার ডাক দিয়ে ধরনায় বসেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। দেশের অখণ্ডতা, সম্প্রীতি-সহ যাবতীয় সাংবিধানিক দিকগুলিও তা হলে নিরাপদ হবে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, শুধু কি বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীই এক মাত্র উপলব্ধি করলেন, দেশের সংবিধান বিপদের মুখে?

ধরনায় বসা ইস্তক দেশের অন্যান্য রাজ্যের যে নেতাদের সঙ্গে তাঁর ফোনালোচনা হয়েছে, বা বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যমে মমতার স্বপক্ষে যাঁদের বক্তব্য দেখা গিয়েছে, প্রত্যেকেরই কথার সুর মিলে গিয়েছে মমতার সঙ্গে। এইচ ডি দেবেগৌড়া, অহমেদ পটেলের মতো প্রবীণ বা অখিলেশ যাদব, অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো নবীন প্রজন্মের সেই একই কথা।

ভিমা কোরেগাঁও হলে যাঁরা চুপ করে থাকতে পারেন, তাঁরা এখন আর নীরবতা অবলম্বন করতে পারছেন না। উত্তরপ্রদেশের অখিলেশ বা মায়াবতীর পিছনে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা লেলিয়ে দেওয়ার ঘটনা তো ক-দিন আগেরই। কে দোষী আর কে নির্দোষ, তা প্রমাণ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সত্য উদ্ঘাটনের তাগিদটা ঠিক ভোটের আগেই এতটা চাগাড় দিয়ে উঠল, সেটাই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে জনমানসে।

ইচ্ছে না থাকলেও নাম নিতেই হয় কলকাতার নগরপাল রাজীব কুমারের। তিনি না কি জানেন, সুদীপ্তর লাল ডায়েরি আর পেন ড্রাইভ কোথায় রয়েছে। ইতিউতি উড়ে বেড়ানো খবর থেকেই এটা জানা যায়। সেই কারণেই হয়তো সিবিআই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রয়োজনে গ্রেফতারের ভাবনা নিয়েই তাঁর বাড়িতে হানা দিয়েছিল। কিন্তু অসফল। সিবিআই-ও যে অসফল হতে পারে, সেটা প্রমাণ হওয়ার থেকেও বড়ো বেদনাদায়ক সিবিআইয়ের শিকারকে বাঁচাতে রাস্তায় বসে মুখ্যমন্ত্রীর ধরনা।

কই তৃণমূলের সাংসদ কুনাল ঘোষ, তাপস পাল, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা মন্ত্রী মদন মিত্রকে সিবিআই জেলের ঘানি টানালেও মমতা ধরনায় বসেননি তো? তা হলে রাজীবে এত কেন চড়া সুর মমতার?

এই অস্ত্রটাই তিনি পেলেন সিবিআই ভায়া হয়ে মোদীর কাছ থেকে। রাজীব কুমার কোনো দলীয় নেতা নন। তিনি পুলিশ প্রশাসনের কর্তা। তাঁকে সামনে রেখে যা হবে সবটাই ‘সাংবিধানিক’। ‘টোটালি’ অ-রাজনৈতিক। সেটা আপনি মানুন না মানুন, মেনে নিয়েছে বিজেপি বাদে গোটা দেশ!

(মুখ্যমন্ত্রীর ধর্নার ব্যাপারে যাবতীয় আপডেট পেতে ক্লিক করুন এখানে)

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here