বুদ্ধদেব গুহ: এক গুণমুগ্ধ পাঠকের শ্রদ্ধাঞ্জলি

0
বুদ্ধদেব গুহ

শম্ভু সেন

‘মুক্তির দশক’ শুরু হওয়ার পরে বছর তিনেক কেটে গিয়েছে। আমিও ১৮-এর গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বছর দুয়েক এগিয়ে গিয়েছি। থার্ড ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা পিছিয়ে গিয়েছে এক বছরেরও বেশি। তার ফলে আমাদের সান্ধ্য আড্ডাও (ভ্রাম্যমাণ ও বৈঠকী) চলছে বাধাহীন ভাবে। গড়িয়াহাট অঞ্চল আমাদের হাতের তালুর মতো চেনা। গড়িয়াহাট রোড, গোলপার্ক, সাদার্ন অ্যাভেনিউ, পূর্ণ দাস রোড, রাসবিহারী অ্যাভেনিউ নিয়মিত চষে বেড়াই। আর মাঝে মাঝে ইন্সটিটিউট অব কালচারের রেলিং-এ বসে পথচলতি সমবয়সি মেয়েদের দেখে নিরুচ্চার প্রেম নিবেদন করি।

Shyamsundar

এমনই সময়ে একদিন এক বন্ধু জিগগেস করল, ‘খেলা যখন’ পড়েছিস?

‘খেলা যখন’?

হ্যাঁ, বুদ্ধদেব গুহর উপন্যাস। ফাটাফাটি। পড়ে দেখিস।

ফাটাফাটি – কথার লবজো। কোনো কিছু ভালো লাগলে ও ভাবেই প্রকাশ করি আমরা।

বুদ্ধদেব গুহ – নামটা শোনা, তবে পড়ার সৌভাগ্য তখনও হয়নি। বাড়িতে একটা সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থাকায় রবীন্দ্র-বঙ্কিম-শরৎ-বিভূতির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। ষাটের দশকের শেষার্ধে ভবানীপুরের হলে ‘ছুটি’ আর ‘বালিকা বধূ’ দেখার সুবাদে বিমল করের ‘খড়কুটো’ আর ‘বালিকা বধূ’ পড়ে ফেলেছি। বড়োদের কাছে বার বার শুনে প্রেমেন্দ্র মিত্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার সঙ্গেও পরিচয় ঘটছে। পুরোনো শারদীয় বেতার জগৎ থেকে সমরেশ বসুর ‘শালঘেরির সীমানায়’ পড়ে ফেলেছি। জরাসন্ধ, বিমল মিত্র মায়ের খুব পছন্দের লেখক। মায়ের পাশাপাশি আমিও তার রস আস্বাদন করছি। রমাপদ-সুনীল-সিরাজ-শীর্ষেন্দুকেও একটু একটু করে চিনছি। কিন্তু বুদ্ধদেব গুহ তখনও আসেননি আমার জীবনে।

১৮ পেরোতেই তো পেয়ে গিয়েছিলাম ছাড়পত্র। ডিগ্রি পড়ার বাইরের পড়ার জন্য দ্বারস্থ হয়েছিলাম বালিগঞ্জ ইন্সটিটিউট লাইব্রেরির। বন্ধুর উপদেশের পরেই সেখান থেকেই সংগ্রহ করে নিলাম ‘খেলা যখন’।

গড়িয়াহাটের গানের স্কুলে লেখক সে দিনই প্রথম ভালো করে দেখেছিলেন তাঁকে – “দু’ দিকে দুই বিনুনী ঝুলিয়ে একটা বাসন্তী-রঙা শাড়ি পড়ে দু’কানে দু’টি রক্তরুবির দুল পরে সে বসেছিল”। ‘তার সমর্পণী উদাসীন ছিপছিপে অস্তিত্বে’ এমন কিছু ছিল যা সে দিনের আসরে বেসুরো করে দিয়েছিল লেখককে। শিক্ষক সুনীলদার কাছে ধরা পড়ে গেলেন তিনি। কিন্তু মেয়েটি কী ভাবছে? “আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম, সে হাসছে না বটে, কিন্তু তার পুরীয়া-ধানেশ্রী চোখে একটা দারুন দুষ্টু হাসি স্থির হয়ে আছে।”

সে দিনের ক্লাসে আরও কিছু গান তোলা হল – কিছু কোরাস, দু-একটা ডুয়েট।

তার পর সুনীলদা তাঁর ‘খুকী’টিকে গান ধরতে বললেন।

“সুনীলদা হারমোনিয়াম বাজালেন। সেই খুকী শুরু করল, ‘জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ, ধন্য হল ধন্য হল মানব জীবন’। গানটা শুনতে শুনতে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।”

সে দিন সেই ‘খুকী’র গান শুনতে শুনতে যুবক বুদ্ধদেবের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল, আর আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল তাঁর সেই অনুভূতির কথা ভাবতে ভাবতে।   

১৩৮ পাতার বইটা শেষ করতে বোধহয় এক লহমাও লাগেনি। কী ভাবে যেন একটা ভালো লাগায় জড়িয়ে গিয়েছিলাম উপন্যাসটার সঙ্গে। কেমন যেন একাত্ম বোধ করেছিলাম। নিজেকে লেখকের জায়গায় বসিয়ে কল্পনার জগতে দারুণ আনন্দে বিচরণ করেছিলাম। আর কাহিনির ঘটনাস্থলও যে গড়িয়াহাট, আমাদের প্রাণের প্রিয় গড়িয়াহাট।

সেই খুকীর নাম জানা হয়ে যায় পরের দিনই – বুলবুলি। লেখক তখন অ্যাকাউন্ট্যাসির ছাত্র, বাবারই কোম্পানিতে আর্টিকেল্‌ড ক্লার্ক। ঘরের দরজা বন্ধ করে হোল্ডিং কোম্পানির ব্যালান্স শিট মেলাতে গিয়ে মনে পড়ে যায় সেই রুবির দুল পরা বুলবুলির মুখ – “আমার সব গোলমাল হয়ে যায়।”

শেষ পর্যন্ত বছর খানেকের চেষ্টায় “সেই একরত্তি বেণী-ঝোলানো মিষ্টি গলার মেয়েটিকে” জয় করতে পেরেছিলেন লেখক, যদিও সেই মেয়ে অনেক আগেই নিজেকে সমর্পণ করে বসেছিলেন লেখকের কাছে, কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই প্রকাশ করতে পারেননি।

নিজের সঙ্গে অনেক লড়াই করে বুলবুলির হাতে কোনো রকমে একটা চিঠি ধরাতে পেরেছিলেন লেখক। সেই গড়িয়াহাটের মোড়েই। “তার পর শুরু হল তিতিক্ষা, প্রতীক্ষা;  ধৈর্যের পরীক্ষা। সি-এ পরীক্ষার চেয়েও কঠিন।”

এক দিন, দু’ দিন করে সাত দিন কেটে গেল, উত্তর এল না। অবশেষে এল ফোন, এক পরিচিতার – “বুলবুলিদি বলতে বলল যে, বুলবুলিদি ভাল চিঠি লিখতে পারে না বলে চিঠি লেখেনি।…বুলবুলিদি বলতে বলল যে, পরশুদিন ওর রেডিও প্রোগ্রাম আছে; ও ওখানে যাবে রাত সাড়ে সাতটায়, আপনি কি ওর সঙ্গে ওখানে দেখা করতে পারবেন?…বুলবুলিদি বলেছে ব্যাপারটা খুব জরুরি।” লেখকের হৃদপিণ্ডটা বুকের খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল।

সে সময় সমস্ত প্রোগ্রামই লাইভ-ব্রডকাস্ট হত। সে দিন রেডিও স্টেশনের ভিজিটার্স রুমে বসে থাকতে থাকতে রেডিওয় লেখক শুনলেন বুলবুলির গান – প্রথমে “ওগো কাঙাল, আমারে কাঙাল করেছ”, পরে “তোমায় নতুন করে পাব ব’লে”।

অবশেষে তিনি এলেন – “হঠাৎ চোখের কোণে দেখতে পেলাম দরজায় একটি ছায়া পড়েছে। আমি তবুও তাকালাম না। রিনিরিনে মিষ্টি গলায় কে যেন বলল, এই যে আমি এসেছি।”

পাশাপাশি দু’জনায়। রেডিও স্টেশনের লম্বা করিডোর ধরে পাশাপাশি হাঁটা। দু’জনেই নার্ভাস। কথা বলতে গিয়ে তোতলামি। শেষ পর্যন্ত দু’জনেরই আড় ভাঙল – “‘আমার চিঠির উত্তর তো দাওনি এখনও’।…এক পলকের জন্য মুখ তুলে বলল, ‘উত্তরটা কি আমার বলার উপর নির্ভর করেছিল? উত্তর কি আপনি জানতেন না?’…বললাম, ‘না। তবুও এটা একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তুমি কি ভাল করে ভেবেছ? এ ক’দিনে কি যথেষ্ট ভাবার সময় পেয়েছ?…’ও বলল, ‘ক’দিন মাত্র কেন? অনেক আগে থেকেই ভেবেছি। আপনার চিঠি পাবার অনেক আগে থেকেই ভাবাভাবি শেষ হয়ে গেছিল।’… ‘তাহলে আমাকে এতদিন কষ্ট দিলে কেন? আমাকে জানালে না কেন?’ ও অবাক হলো। মুখ তুলে বলল, ‘বাঃ, আমি কি জানাব? আমি তো মেয়ে। পুরুষ হয়েও আপনার যদি এত সংকোচ, এত লজ্জা, তো আমার বুঝি লজ্জা করত না? আপনি নিজে কবে বলবেন, সেই অপেক্ষায় ছিলাম’।…আমার দিকে একদৃষ্টে এক আশ্চর্য উজ্জ্বল অথচ নরম চোখে ও চেয়েছিল। যেমন চোখে কাউকে ভীষণ ভালোবেসে একমাত্র মেয়েরাই চাইতে পারে।”

আমার ঘোর কাটছিল না। এ রকম প্রেমোপাখ্যান পড়তে গিয়ে আমারও যেন সব গোলমাল হয়ে গেল। প্রেমে পড়ে গেলাম বুদ্ধদেব গুহর সাহিত্যে। আর ঋতু গুহর কণ্ঠকে আরও ভালোবেসে ফেললাম।

আমার কাছে বুদ্ধদেব গুহর সাহিত্যের দরজা খুলে যেতেই আমি বিস্মিত। তাঁর বহু কাহিনির পটভূমি তো আমার শৈশব, কৈশোর, প্রথম যৌবনের বারাণসী। রাঁচি মামার বাড়ি হওয়ার সুবাদে ছোটোনাগপুরের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল আমার বিচরণভূমি ছিল। বুদ্ধদেব গুহর ‘কোয়েলের কাছে’, ‘একটু উষ্ণতার জন্য’, ‘অভিলাষ’, ‘কোজাগর’ আমাকে নতুন করে চিনিয়েছিল আমার সুপরিচিত ছোটোনাগপুরকে। আমার ভ্রমণপিয়াসী মনের পিপাসা মিটিয়েছিল ‘বাংরিপোসির দু’রাত্তির’, ‘লবঙ্গীর জঙ্গলে’, ‘চরৈবেতি’, ‘গামহারডুংরী’, ‘জঙ্গলের জার্নাল’, ‘মান্ডুর রূপমতী’, ‘পঞ্চম প্রবাস’ ইত্যাদি। তাঁর লেখা পড়তে পড়তে বাদ যায়নি ‘মাধুকরী’, ‘চানঘরে গান’ ইত্যাদিও। আর আত্মজীবনী ‘ঋভু’ ও ঋজুদার অ্যাডভেঞ্চার তো আছেই।  

এ প্রসঙ্গে আমার মা-বাবার কথা বলাটা খুব একটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। রাঁচির ছোটোনাগপুর গার্লস হাইস্কুলের ক্লাস নাইনের মেধাবী ছাত্রীটির মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল বাঁকুড়ার গ্রামে। বাবা ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে স্ব-প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন। এর পর এক ফাঁকে বিয়ে করে তার দু’ বছর পর সপরিবার কলকাতায় আগমন। বাবার জীবনসংগ্রামের সঙ্গী ছিলেন মা। তাই মায়ের পুথিগত শিক্ষা আর এগোয়নি। কিন্তু মা তাঁর প্রিয় দু’টি বিষয় বাংলা সাহিত্য এবং অঙ্ক নিয়ে চর্চা চালিয়ে গিয়েছেন আমৃত্যু। আমাদের প্রথাগত শিক্ষার হাতেখড়ি মায়ের কাছে, আমাদের শিক্ষার ভিত তৈরি করে দিয়েছিলেন মা। আমরা স্কুল স্তরে অনেকটাই মায়ের গাইডেন্সে বড়ো হয়েছিলাম। আর মায়ের সাহিত্যক্ষুধা মেটাতে বাবা সচেষ্ট ছিলেন। তাই বাড়িতে বাংলা পত্রপত্রিকার কোনো অভাব ছিল না। আমার উদ্যোগে মা বুদ্ধদেব গুহতেও আকৃষ্ট হয়েছিলেন। আর তারই ফলস্বরূপ নিজের দুই নাতির নাম রাখেন ঋজু আর ঋভু।

রবিবার অনেক রাতে বুদ্ধদেব গুহর মৃত্যুসংবাদ যখন এল, মনে হল আমাদের পরিবার তার এক পরমাত্মীয়কে হারাল। আমি সত্যিই স্বজনহারা হলাম।

আরও পড়তে পারেন

নজরুলের ইতিহাস-চেতনায় ছিল সমকালীন এবং দূর ও নিকট অতীতের ইতিহাস

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন