Connect with us

কথাশিল্প

মানবাধিকার দিবসে স্মরণ: বিনা দোষে কারাগারে এগারো বছর

nilanjan-mandal

নীলাঞ্জন মণ্ডল

মুফতি আবদুল কায়ুম মনসুরি কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি নন। সাধারণ এক জন মানুষ। কিন্তু রাষ্ট্রের স্নেহস্পর্শে ২০০৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত তাঁর পরিচয় ছিল একজন ভয়ংকর ‘সন্ত্রাসবাদী’। তিনি নাকি ২০০২ সালে অক্ষরধাম মন্দিরে হামলার অন্যতম প্রধান ষড়যন্ত্রকারী, যিনি নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত।

শুধু উনি নন, ওঁর সঙ্গে পোটা (প্রিভেনশন অব টেরোরিস্ট অ্যাক্টিভিটিজ আইন) আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন আরও পাঁচ জনমুফতি আবদুল কায়ুম মনসুরি, আদম সুলেইমান আজমিরি এবং চাঁদ খান মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হনমহম্মদ সেলিম হানিফ শেখের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় আবদুল্লা এবং আলতাফ মালিকের যথাক্রমে দশ বছর ও পাঁচ বছর কারাদণ্ড হয়।

অক্ষরধাম মন্দিরে আক্রমণের ঘটনা নিশ্চয় আপনাদের স্মরণে আছে। ২০০২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ঘটনাটি ঘটে দুজন ফিদায়েঁগুলি চালিয়ে ৩৩ জনকে হত্যা করেন এবং ৮৬ জন জখম হন

১৬ মে, ২০১৪। লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হল। ওই দিনই গুজরাতের সবরমতি কারাগারে সকাল থেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন মুফতিসহ ছয় জন। কারণ ওই দিন সুপ্রিম কোর্টে তাঁদের মামলার রায় ঘোষণা হবে। বিকালবেলা রায়ের খবর পেলেন তাঁরা। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এ কে পট্টনায়েক এবং বিচারপতি ভি গোপালগৌড়ার বেঞ্চ অক্ষরধাম মামলায় অভিযুক্ত ছজনকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করে তাঁদের মুক্তির আদেশ দেন কারও বিরুদ্ধে পোটা প্রয়োগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের অনুমোদন প্রয়োজনতৎকালীন গুজরাত সরকারের অনুমোদন প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট তাদের রায়ে মন্তব্য করেন, ‘clear non-application of mind’। ২০০২ থেকে ২০১৪এর মে, এই সময়কালে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদী

মুক্তিলাভ করার পর মুফতি আবদুল কাইয়ুম তার দীর্ঘ এগারো বছরের বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে গুজরাতি ভাষায় একটি বই লিখেছেনবইটির নাম, ‘গ্যারা সাল সালাখো কে পিছে বইটি ইংরিজি, হিন্দি এবং উর্দুতে অনুবাদও হয়েছে বইটির ইংরাজি সংস্করণের নাম, ‘Eleven Years Behind the Bar’। বইটির প্রকাশক জমিয়ত উলেমা অমদাবাদ/জমিয়ত উলেমা মহারাষ্ট্র।

11 years behind the barsবইটি পড়তে পড়তে শিউরে উঠতে হয়। কী ভাবে নিরপরাধ মানুষকে সন্ত্রাসবাদীবানিয়ে দেওয়া হয় তার ধারাবিবরণী বইটিতে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ পুলিশের মধ্যে কী পরিমাণে বিদ্যমান তাও আমরা জানতে পারব বইটি থেকে।

মুফতির লেখা অনুযায়ী, ২০০৩এর ১৭ আগস্ট ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসে তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়। মুফতির কথায়, “আমি বাড়ির সবাইকে বিদায় জানিয়ে রওনা দিলাম। কে ভেবেছিল যে সে বিদায় দু’চার দিনের জন্য না হয়ে দীর্ঘ এগারো বছরের জন্য হবে।”

বইটি থেকে জানা যাচ্ছে, ২০০৩এর ১৭ আগস্ট থেকে মুফতিকে, ৬ আগস্ট থেকে আলতাফ মালিককে, ৯ আগস্ট থেকে আদম সুলেইমান আজমিরিকে, ১ আগস্ট থেকে সেলিম হানিফ শেখকে এবং ১৭ আগস্ট থেকে মৌলানা আবদুল্লাকে ক্রাইম ব্রাঞ্চের হেফাজতে বেআইনি ভাবে আটক রাখা হয় এবং নারকীয় অত্যাচার চালানো হয়। পুলিশের বিশেষ লেঠেলবাহিনী দিয়ে ধারাবাহিক ভাবে পিটিয়ে যাওয়া, যৌনাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেওয়া, পায়ুতে পেট্রল ইঞ্জেকশন দেওয়া কোনো রকম অত্যাচারই বাদ যায়নি। তাঁদের ধর্ম নিয়েও খুব আপত্তিকর কথাবার্তা বলা হত ক্রাইম ব্রাঞ্চের হেফাজতে থাকাকালীন।

মুফতি লিখছেন, “১৯ আগস্ট ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসার বানজারার ঘরে আমার ডাক পড়ল। যথারীতি চোখ বেঁধে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল। চোখের বাঁধন খুলতে দেখি সেখানে আদমভাই, মৌলবি আবদুল্লা, আবদুল রহমান পানারা, মুনাফ রেডিয়েটর, নাসির দোমান প্রমুখ উপস্থিত। এঁরা সবাই আমার মহল্লার এবং আমার ভালো বন্ধু।পরে জানতে পারি আমার মতোই তাঁদেরও তুলে আনা হয়েছে এবং বেআইনি ভাবে তাঁদের ক্রাইম ব্রাঞ্চের হেফাজতে আটক রাখা হয়েছে এবং অক্ষরধাম মন্দির হামলায় কোনো না কোনো ভূমিকায় তাঁদের যুক্ত করা হয়েছে।”

মুফতির বইটি থেকে আমরা জানতে পারছি, যে ক্রাইম ব্রাঞ্চের দফতরে তাঁকে চোখ বেঁধে রাখা হত। তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরের দিন বানজারার সামনে তাঁকে হাজির করা হয়। বানজারার নির্দেশে পুলিশের বিশেষ লেঠেলবাহিনী মুফতিকে মারতে শুরু করে। লেঠেলবাহিনীর পুলিশ খুবই হিংস্র প্রকৃতির। তাদের চেহারা স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা মেরেই চলে যতক্ষণ না ক্লান্ত হয়। এই বাহিনী ক্লান্ত হয়ে পড়লে বানজারা মার শুরু করে। বানজারা মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে আরেক অফিসার ভানর মার শুরু করে। এই ভাবে চলতে থাকে। এই রকম ধারাবাহিক শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারে তাঁরা যখন ভেঙে পড়েন এবং ক্রাইম ব্রাঞ্চের কথামতো কাজ করতে রাজি হন, তখন তাঁদেরই পছন্দমতো ভূমিকা বেছে নিতে বলা হয়। অর্থাৎ অক্ষরধাম মন্দিরে হামলায় কার কী ভূমিকা হবে সেটা তাঁদেরই ঠিক করতে বলা হয়। কাউকে কাউকে আবার অক্ষরধাম মন্দিরে হামলা, গোধরাকাণ্ড, এবং হারিণ পাণ্ড্য হত্যা মামলার মধ্যে যে কোনো একটি বেছে নিতে বলা হয়।

সুপ্রিম কোর্ট তাদের রায়ে বলে, “the story of prosecution crumbles at every juncture” (সরকারপক্ষের মামলাটি প্রতিটি সন্ধিস্থলে ভেঙে পড়ছে)

বিমানে মুফতিকে শ্রীনগরে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁকে বলা হয় সেখানে গিয়ে চাঁদ খান নামে একজনকে শনাক্ত করতে হবে, যাঁকে তিনি কোনো দিন দেখেনি। এ সমস্ত কিছুই ঘটছে হেফাজতে বেআইনি ভাবে আটক থাকা অবস্থাতেই। উনি লিখছেন যে এ ছাড়া ওঁর আর কোনো উপায় ছিল না।

অক্ষরধাম মন্দিরে হামলার ঘটনার তদন্ত শুরু করে গুজরাতের এটিএস (অ্যান্টি টেরোরিস্ট স্কোয়াড)। ২০০৩এর ২৮ আগস্ট তদন্তের দায়িত্ব হস্তান্তরিত হয় ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডি জি বানজারা ঘোষণা করেন, তিনি অক্ষরধাম মন্দিরে হামলার তদন্তের সমাধান করে ফেলেছেন। সব কিছু নিজেদের মতো করে সাজিয়ে ২৯ আগস্ট মুফতিসহ অন্যদের গ্রেফতার দেখানো হয় এবং ৩০ আগস্ট এঁদের ম্যাজিস্ট্রেট এস এস ওঝার এজলাসে হাজির করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট ক্রাইম ব্রাঞ্চের দাবিমতো পনেরো দিনের হেফাজতের দাবি মঞ্জুর করেন।

মুফতির বইটি থেকে আমরা জানতে পারছি, ক্রাইম ব্রাঞ্চ জানিয়েছিল যে তারা আক্রমণকারী দুই ফিদায়ের পকেট থেকে উর্দুতে লেখা দুটি চিঠি উদ্ধারকরেছে এবং চিঠি দু’টি থেকে তারা ষড়যন্ত্রের বিষয় অনেক কিছু জানতে পেরেছে। মুফতিকে দুটি উর্দু চিঠি দিয়ে তা ওঁর হাতের লেখায় নকল করতে বলা হয়। বারংবার তাঁকে দিয়ে ওই চিঠি দুটি নকল করানো হয়। আদালতে চিঠি দুটি মুফতির বিরুদ্ধে প্রমাণ রূপে পেশ করা হয়। যদিও আদালতে শেষ পর্যন্ত তা নাকচ হয়ে যায়।

তাঁকে যখন বেআইনি ভাবে পুলিশ হেফাজতে আটকে রাখা হয়েছিল তখন তাঁর পরিবারের লোকেরা হেবিয়াস কর্পাস করতে পারতেন, কিন্তু করেননি। কারণস্বরূপ তিনি লিখেছেন যে বেশ কয়েক জনের পরিবারের তরফ থেকে হেবিয়াস কর্পাস করা হয়েছিল। ফলস্বরূপ তাঁদের গোধরা কাণ্ড, হারিণ পাণ্ড্য হত্যা মামলা প্রভৃতি কোনো না কোনো একটা মামলায় যুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল।

হেফাজতে অত্যাচার করে স্বীকারোক্তির উপর ভিত্তি করে মামলা সাজানো হয়েছিল এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট তাদের রায়ে বলে, “the story of prosecution crumbles at every juncture” (সরকারপক্ষের মামলাটি প্রতিটি সন্ধিস্থলে ভেঙে পড়ছে)। তারা আরও বলে, “The confessional statements cannot be relied upon and the case of the prosecution fails. Accordingly, we hold there is no independent evidence on record to prove guilt of the accused beyond reasonable doubt in the face of retractions and grave allegations of torture and violation of human rights the accused have made against police,”

মুফতিসহ ছজন নির্দোষ প্রমাণিত হলেন কিন্তু তাদের জীবনের হারিয়ে যাওয়া ১১টা বছর কে ফিরিয়ে দেবে? প্রসঙ্গত জানাই আদালতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মুফতি মামলা করেছিলেন আদালত সেই আর্জি খারিজ করে দিয়েছেনকারণ “The law in India does not have any rules to asses damages to people who suffer false imprisonment.” যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে The Innocence Project নামে একটি প্রকল্প আছে।

Advertisement
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

প্রবন্ধ

শ্রাবণের এই রাখিপূর্ণিমাতেই জন্মেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ-শিষ্য স্বামী নিরঞ্জনানন্দ

শুভদীপ রায় চৌধুরী

সময়টা ১৮৮১-৮২ সালের কোনো এক দিন। দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করতে হাজির কলকাতার এক যুবক। বয়স ১৮-১৯। ঠাকুর সে সময় থাকতেন দক্ষিণেশ্বরে রানি রাসমণির প্রতিষ্ঠিত কালীবাড়িতে। তাঁর অদ্ভুত ঈশ্বরনির্ভর জীবন ও সহজ সরল ব্যবহার তখনকার কলকাতার অনেকেই জানতেন এবং তাতে আকৃষ্ট হয়ে তাঁর কাছে ছুটে আসতেন। লোকমুখে ঠাকুরের কথা শুনে সেই যুবকও তাঁকে দর্শন করবেন বলে দক্ষিণেশ্বরে এসেছেন। দেখলেন ঠাকুর ভক্তপরিবেষ্টিত হয়ে রয়েছেন। সন্ধে হতেই ভক্তরা একে একে চলে গেলে ঠাকুর তাঁর ভবিষ্যতের প্রিয় শিষ্যকে পাশে বসিয়ে অনেক কথা বললেন, যেন কত দিনের চেনা। ভবিষ্যতের সেই প্রিয় শিষ্য হলেন নিত্যনিরঞ্জন ঘোষ তথা স্বামী নিরঞ্জনানন্দ।   

তাঁর তরুণ ভক্তের শক্তি ভুল পথে ব্যয়িত হচ্ছে দেখে শ্রীরামকৃষ্ণ চিন্তিত হলেন। বললেন, “দ্যাখ নিরঞ্জন, ভূত ভূত করলে তুই ভূত হয়ে যাবি, আর ভগবান ভগবান করলে ভগবান হবি। তা কোনটা হওয়া ভালো?” নিরঞ্জন সরল ভাবেই উত্তর দিলেন, তা ভগবান হওয়াই ভালো।

ঠাকুর কেন হঠাৎ সে দিন নিরঞ্জনের ভূত-সঙ্গের কথা পেড়েছিলেন? একটু পেছনে ফিরে যাওয়া যাক।  

উচ্চ আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন নিত্যনিরঞ্জন ১২৬৯ বঙ্গাব্দের (১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ) শ্রাবণ পূর্ণিমার দিন রাজারহাট-বিষ্ণুপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে এই অঞ্চলটি কলকাতার মধ্যে অবস্থিত হলেও অতীতে এটি অবিভক্ত চব্বিশ পরগনার একটি গ্রাম ছিল। নিত্যনিরঞ্জনের বাবার নাম ছিল অম্বিকাচরণ ঘোষ। বারাসতের পণ্ডিত কালীকৃষ্ণ মিত্র ছিলেন নিরঞ্জনের মামা। মাতুলের কলকাতাস্থ বাড়িতে থেকে নিরঞ্জন লেখাপড়া করতেন।

স্বামী নিরঞ্জনানন্দ।

শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে আসার আগে নিরঞ্জন আহিরীটোলানিবাসী ডাক্তার প্যারীচাঁদ মিত্রের বাড়িতে একটি প্রেততত্ত্বান্বেষী দলের সঙ্গে পরিচিত হন। তারা নিরঞ্জনকে ভূত নামানোর মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করত। এই ভাবে ভূতুড়েদের দলে যাতায়াত করতে করতে একটি ঘটনায় নিরঞ্জনের মনে বৈরাগ্যের সঞ্চার হয়। দীর্ঘ ১৮ বছর অনিদ্রায় ভোগার পর জনৈক ধনী ব্যক্তি নিরঞ্জনের শরণাপন্ন হন। নিরঞ্জন পরে বলেছিলেন, তাঁকে ওই ভাবে দারুণ কষ্ট পেতে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, তা হলে আর এত ধনসম্পত্তির কী প্রয়োজন।

বৈরাগ্য থেকেই নিরঞ্জনের মনে আধ্যাত্মিক রাজ্যের দ্বার খুলে গিয়েছিল। তত দিনে শুনেছেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কথা। তাঁর অতুলনীয় ভগবৎপ্রেম ও আকর্ষণীয় উপদেশের কথা তখন লোকের মুখে মুখে প্রচার হচ্ছে। নিরঞ্জন ছুটে এলেন দক্ষিণেশ্বরে। সে দিন নিরঞ্জনকে ভুতুড়েসঙ্গ ত্যাগ করতে বলেছিলেন ঠাকুর এবং নিরঞ্জনে সেই সঙ্গ ত্যাগ করেছিলেন।

এর কয়েক দিন পরে নিরঞ্জন আবার এলেন দক্ষিণেশ্বরে। ঠাকুর ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে, বললেন, “ওরে নিরঞ্জন, দিন যে যায়রে – তুই ভগবান লাভ করবি কবে? দিন যে চলে যায়, ভগবানকে লাভ না করলে সবই যে বৃথা যাবে। তুই কবে তাঁকে লাভ করবি বল, কবে তাঁর পাদপদ্মে মন দিবি বল? আমি যে তাই ভেবে আকুল!” নিরঞ্জন অবাক হয়ে ভাবলেন, ইনি কে? আমার ভগবানলাভ হচ্ছে না বলে, দিন চলে যাচ্ছে বলে আমার জন্য এঁর এত আর্তি কেন? পরের জন্য এ কি অহৈতুকী ভালোবাসা! নিরঞ্জন এ রহস্য ভেদ করতে পারলেন না বটে, কিন্তু ঠাকুরের এই আবেগভরা কথায় তাঁর হৃদয় বিগলিত হল। সে দিন আর কলকাতায় ফিরে যেতে পারলেন না তিনি। সেই দিন তো ছার, পর পর তিন দিন নিরঞ্জন থেকে গেলেন দক্ষিণেশ্বরে।

নিরঞ্জনের সরলতা ঠাকুরকে প্রথম থেকেই মুগ্ধ করেছিল। একদিন শ্রীম তথা মাস্টারমশায়কে ঠাকুর বলেছিলেন, “তোমায় নিরঞ্জনের সঙ্গে দেখা করতে বলছি কেন? সে সরল ইহা সত্য কি না, এইটি দেখবে বলে।” ১৮৮৪-এর ১৫ জুন কাঁকুড়গাছিতে সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাগানবাড়িতে এক মহোৎসবে যোগ দেন ঠাকুর। এক সময় নিরঞ্জন এসে ঠাকুরকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন। ঠাকুর তাঁকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “তুই এসেছিস।” কাছেই ছিলেন মাস্টার (শ্রীম)। নিরঞ্জনকে দেখিয়ে তাঁকে বললেন,  “দেখ, এ ছোকরাটি বড় সরল। সরলতা পূর্বজন্মে অনেক তপস্যা না করলে হয় না। কপটতা পাটোয়ারী এসব থাকতে ঈশ্বরকে পাওয়া যায় না।”

নিরঞ্জনের সরলতা ও বৈরাগ্যের জন্য ঠাকুর তাঁর প্রতি অত্যন্ত স্নেহপরায়ণ ছিলেন। একদিন এই প্রসঙ্গে ঠাকুর বলেছিলেন, “দেখছ না নিরঞ্জনকে? তোর এই নে, আমার এই দে”- ব্যস, আর কোন সম্পর্ক নাই। পেছু টান নাই।”

নিরঞ্জনের স্বভাবে কিছুটা উগ্র ভাব থাকলেও তিনি ছিলেন খুবই সাহসী। আর ভেতরে ভেতরে ছিলেন কোমল প্রকৃতির এক মানুষ, অত্যন্ত সেবাপরায়ণ। ঠাকুরের দেহত্যাগের পর নরেন্দ্রনাথ-সহ গুরুভাইরা যখন আঁটপুরে যান তখন নিরঞ্জনও গিয়েছিলেন। স্নান করতে গিয়ে একদিন সারদাপ্রসন্ন (পরবর্তী কালে স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ) পুকুরে ডুবে যাচ্ছিলেন। তখন প্রাণের মায়া ত্যাগ করে নিরঞ্জন পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে উদ্ধার করেন। ১৮৮৮ সালে লাটু মহারাজের নিউমোনিয়া হলে নিরঞ্জন মহারাজ তাঁর সেবার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ভক্তপ্রবর বলরামবাবুর শেষ অসুখের সময়ও নিরঞ্জন প্রাণ ঢেলে তাঁর সেবা করেছিলেন।

গুরুভাইদের সঙ্গে স্বামী নিরঞ্জনানন্দ (একেবারে ডান দিকে)।

১৮৮৭ সালের প্রথম দিকে বরানগরে অন্য গুরুভ্রাতাদের সঙ্গে নিরঞ্জনও সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর নাম রাখেন ‘স্বামী নিরঞ্জনানন্দ’। সন্ন্যাস গ্রহণের পরেই তিনি শ্রীক্ষেত্র পুরীধামে গিয়ে ৮ এপ্রিল মঠে ফিরে আসেন। এর পর ১৮৮৯-এর নভেম্বরে আবার বেরিয়ে পড়েন স্বামী নিরঞ্জনানন্দ। প্রথমে দেওঘরে বৈদ্যনাথ দর্শন করেন। তার পর সেখান থেকে কাশীতে যান এবং বংশীদত্তের বাড়িতে কিছু দিন থেকে তপস্যা করেন। এ সময় তিনি মাধুকরী ভিক্ষা করে খেতেন। এরই মধ্যে স্বামী যোগানন্দের অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তিনি প্রয়াগে যান। সেই সুযোগে স্বামী নিরঞ্জনানন্দের কল্পবাসও হয়। পরে উত্তর ভারতের আরও কিছু তীর্থদর্শনে বেরিয়ে পড়েন তিনি এবং কোনো কোনো জায়গায় তপস্যাও করেন।  

কালীকিঙ্কর বোস তখনও স্বামী বিরজানন্দ হননি। ১৮৯১-৯২ সালে তখন তাঁর বয়স ১৮-১৯, বরানগর মঠে যাতায়াত শুরু করেছেন। সেই সময় নিরঞ্জন মহারাজকে প্রায়ই দেখতেন দক্ষিণেশ্বরের যেতে। সেখানে পঞ্চবটীতলায় ও ঠাকুরের ঘরে ধ্যান করতেন তিনি। মাঝেমধ্যে কালীকিঙ্করও তাঁর সঙ্গী হতেন। ১৮৯৩ সালে স্বামী নিরঞ্জনানন্দ আবার তীর্থদর্শনে এবং তপস্যার জন্য বেরিয়ে পড়লেন। ১৮৯৫ সালের প্রথম দিকে ঠাকুরের জন্মোৎসবের আগে তিনি আলমবাজার মঠে ফিরে আসেন।

স্বামী নিরঞ্জনানন্দ খুবই শৃঙ্খলাপরায়ণ ছিলেন। খবর পেলেন স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ব জয় করে ১৮৯৬-এর শেষ দিকে পশ্চিমের দেশ থেকে ভারতের উদ্দেশে রওনা হবেন। সেই খবর পেয়ে নিরঞ্জন মহারাজ বিশ্ববিজয়ী গুরুভাইকে অভ্যর্থনা জানাতে কলম্বো রওনা দেন। পরের বছর ১৫ জানুয়ারি স্বামীজি মহারাজ জাহাজ থেকে নামলে সর্ব প্রথম তাঁকে অভ্যর্থনা জানান নিরঞ্জন মহারাজ।

শুধুমাত্র ঠাকুরই নন, সারদাজননীর প্রতিও স্বামী নিরঞ্জনানন্দের অগাধ শ্রদ্ধাভক্তি ছিল। ঠাকুরের অদর্শনের পর শ্রীমাই ছিলেন তাঁর আশ্রয়স্থল। সবাইকে এই কথা মুক্তকণ্ঠে জানাতে দ্বিধাও করতেন না। অনেককে এই আশ্রয়ে তিনি পৌঁছেও দিয়েছেন। মা যে কেবল গুরুপত্নীই নন, তিনি যে জগজ্জননী আদ্যাশক্তি, এ কথা তিনি সর্ব সমক্ষে প্রচার করতেন।

১৯৫৩ সালের ২৪ আগস্ট স্বামী শিবানন্দ মহারাজের শিষ্য স্বামী সংশুদ্ধানন্দ মহারাজ কয়েক জন সন্ন্যাসী ও গৃহীভক্তকে নিয়ে রাজারহাট-বিষ্ণুপুরের ঘোষবাড়িতে আসেন। চণ্ডীমণ্ডপের ঠিক পূর্ব দিকের ঘরটিতে নিরঞ্জন ভূমিষ্ট হয়েছিলেন বলেই জানা যায়। সেই স্থানটিকে চিহ্নিত করে সেখানে ঠাকুর-মা-স্বামীজি ও স্বামী নিরঞ্জনানন্দের পট স্থাপন করে সকলে প্রণাম নিবেদন করেন। এর পর স্থানীয় ভক্তদের কঠোর পরিশ্রমে ‘শ্রীরামকৃষ্ণ-নিরঞ্জনানন্দ আশ্রম’-এর সূত্রপাত হয় ১৯৫৪ সালে। তখন বাৎসরিক উৎসব হত চণ্ডীমণ্ডপে ও আটচালায়।

ঘোষ পরিবারের মণিভূষণ ঘোষ দু’ শতক জমি আশ্রমকে দান করেন। সন্ন্যাসগ্রহণের পর নিরঞ্জন মহারাজ যখন শেষ বার আটচালায় এসেছিলেন সেই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন মণিভূষণ ঘোষ মহাশয়। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন স্নানযাত্রার দিন আশ্রমের নবনির্মিত মন্দিরের দ্বার উদ্ঘাটন করেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের পূজ্যপাদ শ্রীমৎ স্বামী ভূতেশানন্দজি।

নিরঞ্জন সম্পর্কে ঠাকুর বলেছিলেন, “ঈশ্বরকোটি, রামচন্দ্রের অংশে জন্ম।” রাখি পূর্ণিমার পুণ্য লগ্নে সেই পুণ্যপুরুষ স্বামী নিরঞ্জনানন্দের প্রতি রইল আমাদের প্রণাম।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:

শ্রীরামকৃষ্ণ-ভক্তমালিকা – স্বামী গম্ভীরানন্দ

বিশ্বচেতনায় শ্রীরামকৃষ্ণ – সম্পাদনায় স্বামী প্রমেয়ানন্দ, নলিনীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় ও স্বামী চৈতন্যানন্দ

শ্রীম কথিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত

Continue Reading

প্রবন্ধ

যোগকেন্দ্র-জিম খোলার এটাই কি যথার্থ সময়?

অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্র। সব কিছুই যখন একে একে খুলছে, তা হলে যোগকেন্দ্র অথবা জিম সেন্টার কেন নয়? লিখলেন ত্রিশিরা তঙ্কাদার

৫ আগস্ট থেকে যোগকেন্দ্র এবং জিম খোলার শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কোভিড-১৯ মহামারি (Covid-19 pandemic) পরিস্থিতিতে তৃতীয় ধাপের আনলক-এ শরীরচর্চার অন্যতম কেন্দ্রগুলি খোলার অনুমতি দেওয়ার পরেও দোটানায় ভুগছেন সেখানকার কর্তৃপক্ষ এবং সেখানে গিয়ে শরীরচর্চাকারী সদস্যরাও।

লকডাউনের জেরে বদ্ধঘরে থাকতে থাকতে এক দিকে যেমন স্থবিরতা আসছে শরীরে, তেমনই জড়তা জড়িয়ে ধরছে মনকেও। ঘরে বসে যতই শরীরচর্চা করা হোক না কেন, কেন্দ্রের মতো প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধান এবং যথোপযুক্ত পরিবেশ বাড়িতে অমিল। সারা পৃথিবীতে এমন কয়েক লক্ষ মানুষ রয়েছেন, যাঁরা ওষুধের পাশাপাশি শরীরচর্চাকেও রোগ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার উপাদান হিসেবে মেনে চলেন। ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের জেরে যোগকেন্দ্র অথবা জিমে না যেতে পারার কারণে তাঁদের শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। সঙ্গে মানসিক বিষণ্ণতা তো রয়েইছে। কিন্তু করোনা আক্রান্তের সংখ্যা যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখন এই কেন্দ্রগুলি খুলে দেওয়া হলে উল্টো ফল যদি হয়!

এ ধরনের কেন্দ্রগুলি মূলত বদ্ধঘরেই হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞরা আবার বলছেন, বদ্ধঘরে এক জনের থেকে আর এক জনের শরীরে ভাইরাস সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা বেশি। ফলে কোনো উপসর্গহীন আক্রান্ত আগাম না বুঝেই যদি কেন্দ্রে আসেন, সে ক্ষেত্রে তাঁর থেকে অন্য কারো সংক্রামিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। এ ক্ষেত্রে শর্ত হিসেবে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টিতেও সমান ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রটির দরজা-জানলা খোলা রেখে আয়তনের তুলনায় কতজন সদস্যকে অনুমতি দেওয়া হবে, সেটাও দেখার বিষয়।

অন্য দিকে মাস্ক পরার বিষয়টিতে এখন সবমহলের তরফে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যোগ অথবা জিমের ক্ষেত্রে মাস্ক পরা অবস্থায় শরীরচর্চা করা কতটা যুক্তযঙ্গত, তা নিয়েও বিশেষজ্ঞ মহল একমত হতে পারছে না। ব্যায়ামের সঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠানামার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধার সৃষ্টি করতে পারে, এমন কোনো মাস্ক পরে ব্যায়াম করলে হিতে বিপরীত হতে পারে কি না, সেটা নিয়েও চলছে জোর আলোচনা।

এ ব্যাপারে চলে আসছে আমেরিকা প্রসঙ্গও। আক্রান্তের সংখ্যা যখন চূড়োর দিকে দৌড়োচ্ছে, তখন জর্জিয়া, ওকলাহোমার বেশ কিছু জিম সদস্যদের জন্য দরজা খুলে দেয়। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই দেখা যায়, সংক্রমণ ছড়ানোর উৎস হয়ে উঠছে সেগুলি। কারণ, এ ধরনের কেন্দ্রগুলিতে যতই স্যানিটাইজেশন করা হোক না কেন, সর্বক্ষণ শারীরিক দূরত্ব, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা মুশকিলের কাজ। সেখানকার সরঞ্জামগুলো একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করেন। অন্য দিকে হংকং কিন্তু করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে জিমের দরজা সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করে দেয়।

তবে কেন্দ্রীয় সরকার যখন অনুমোদন দিয়েছে, তখন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শের পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা এক প্রকার নিশ্চিত। একটি মহল এমনও বলছে, দোকান-বাজার, গণপরিবহণ যখন সব কিছুই খোলা, তখন যোগ-জিম সেন্টার আর কী দোষ করল!

হু কী বলছে?

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সাম্প্রতিক একটি পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, বায়ু চলাচল অবরুদ্ধ কোনো ভিড়যুক্ত স্থান কোনো আক্রান্তের থেকে অন্যের শরীরে ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

একই সঙ্গে বলা হয়েছে, বদ্ধঘরের বিষয়টি ব্যতিরেকেও আরও একটি অন্যতম কারণ, শরীরচর্চার সময় গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস। গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা থেকে যায়। এমনিতেই ড্রপলেটের মাধ্যমে ভাইরাসের বেশকিছুটা দূরত্ব অগ্রসর হওয়ার প্রমাণও মিলেছে। ফলে জিমে গিয়ে আধঘণ্টা থেকে একঘণ্টা সময় অতিবাহিত করার বিষয়টিতে আশঙ্কা থেকে যেতে পারে।

আবার একই সঙ্গে সংস্থা দাবি করেছে, কোনো প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে আধঘণ্টার শরীরচর্চা অনাক্রম্যতা বজায় রাখতে সহায়ক।

সংকট বাড়ছে জিম-মালিকদের

কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা জারির পর উত্তরপ্রদেশ এবং হরিয়ানার মতো রাজ্য সরকারগুলিও আগামী ৫ আগস্ট থেকে জিম খোলার শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে।

জিম-মালিকরা বলছেন, মহামারিতে চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন তাঁরা। এমনিতে মাস চারেক সম্পূর্ণ বন্ধ, তার উপর বকেয়া বিল মেটানোরও কোনো লক্ষণ নেই। বাড়িভাড়া-সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। যোগ অথবা জিমের প্রশিক্ষকরা অনলাইনে প্রশিক্ষণ দিলেও সেখান থেকে আয় নামমাত্র।

এমন পরিস্থিতিতে অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই তাঁরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেন্দ্রগুলি চালু করতে আগ্রহী। কেউ কেউ স্থির করেছেন, কোনো সদস্যকে জিমে ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি দেওয়া হবে না। প্রতিটি সদস্যকে সুতির মাস্ক এবং গ্লাভস দেওয়া হবে এবং প্রশিক্ষকরা পিপিই কিট পরে থাকবেন। এ ক্ষেত্রে জিমের মালিকরা নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত সদস্য সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনলাইনে রেজিস্টার ব্যবস্থাও চালু করছেন। তবে তাঁদের এই উদ্যোগে সদস্যরা কতটা আগ্রহ দেখাবেন, সেটাই মূল প্রশ্ন।

Continue Reading

প্রবন্ধ

প্রয়োজন লোভ-লালসা, হিংসা-দ্বেষের কুরবানি

jahir raihan
জাহির রায়হান

অনেক ছোটো তখন, ‘নবি কাহিনী’ নামের একটি পুস্তকে পড়েছিলাম নবিদের জীবন কথা। সেখানেই ছিল নবি হযরত ইব্রাহিমের গল্প। নবি ইব্রাহিম পর পর তিন রাত্রে স্বপ্নে দেখলেন, ইব্রাহিমের সব চেয়ে প্রিয় বস্তু তাঁর প্রতি উৎসর্গ করার নিদান দিচ্ছেন সৃষ্টিকর্তা। ইব্রাহিম পড়লেন বিপদে। সর্বাপেক্ষা প্রিয় বস্তু কী? ধন-দৌলত বিষয় সম্পত্তি? স্ত্রী? আবার স্ত্রী অপেক্ষা প্রিয় তো সন্তান। তা হলে কি সন্তান? ঠিক, সম্ভবত তাঁর পুত্রকেই উৎসর্গে চাইছেন ওপরওয়ালা।

তিন দিনের দিন-রাতে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন হযরত ইব্রাহিম। সকালবেলায় পুত্র ইসলামকে নিয়ে গেলেন দূরের পাহাড়ে। ইসমাইলকে জানালেন বিগত রাত্রিগুলির স্বপ্নের কথা। সাগ্রহে সম্মতি দিলেন ইসমাইল। পিতা নিজের যন্ত্রণাবিদ্ধ মনকে দৃঢ় করে প্রবৃত্ত হলেন সন্তানকে খোদার প্রতি উৎসর্গ করতে। নিজের চোখ বাঁধলেন নবি, বেঁধে দিলেন পুত্রের চোখজোড়াও। কুরবানি শেষ হল। কী আশ্চর্য, চোখ মেলে দেখলেন ইব্রাহিম, পুত্র ইসমাইল অক্ষত দেহে দাঁড়িয়ে আছে পাশে, স্বর্গীয় হাসি তার চোখে মুখে, আর পরিবর্তে জবাই হয়ে ভূমিতলে শায়িত রয়েছে একটি নধর দুম্বা।

শিক্ষকতা করতে গিয়ে পড়াতে হল লিও টলস্টয় রচিত ‘How Much Land Does a Man Need?’ গল্পখানি। গল্পে ‘পাহম’ নামের এক গ্রাম্য কৃষক তার নিজের বর্তমান অবস্থায় খুশি নয়। জমি-জিরেত যা আছে তার মালিকানায় তাতে সে মনঃকষ্টে ভোগে, আসে না আত্নসন্তষ্টি। সুতরাং আর কিছুটা জমির চাহিদা মনের ভিতর ভিতর কুরে কুরে খায় তাকে, পড়ে দীর্ঘনিশ্বাস। মনের এই অস্থিরতায় ‘লোভ’ দখল নেয় পাহমের। ফলে যেখানে স্বল্প মূল্যে অধিক জমির হদিস মেলে, সেখানেই পাহম পৌঁছে যায় লোভের তাড়নায়। দিনে দিনে বাড়তে থাকে তার জমির পরিমাণ, পাশাপাশি বৃদ্ধি পায় আরও সম্পত্তির লালসা। তার পর একদিন এমন অঞ্চলে গিয়ে পড়ে যেখানে রয়েছে প্রচুর পতিত উর্বর জমি, কিন্তু চাষাবাদ করে না কেউ সেখানে। পাহম স্থানীয় মোড়লকে উপহার দিয়ে করে তুষ্ট। তাঁকে জানায় নিজের মনস্কামনা। মোড়ল অত্যন্ত খুশি মনে পাহমকে জমি বিক্রি করতে সম্মত হন। তাকে জানানো হয়, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়কালে যতখানি জমি পায়ে হেঁটে সে অতিক্রম করতে পারবে, যৎসামান্য দামের বিনিময়ে সবটুকু জমির মালিক হয়ে যাবে সে। তবে শর্ত একটাই, সূর্যোদয়ের সময় যে স্থান থেকে তার যাত্রা শুরু হবে, সূর্যাস্তের পূর্বেই ফিরতে হবে সে স্থানে।

পাহম যাত্রা শুরু করে, ধীরে ধীরে পদচালনা বাড়ায়, অনেক অনেক জমি, আরও আরও উর্বর মাটির নেশায় সে ছুটতে থাকে, তার তেষ্টা পায়, পায় ক্ষুধা, তবুও সে ছোটে। ছোটে গনগনে আগুনে-সূর্য মাথায় নিয়ে। এক মনে ছুটে চলে পাহম, ছুটে চলি আমরা, ছুটেই চলি, ক্লান্ত, শ্রান্ত, পরিশ্রান্ত, ক্লান্তিহীন আমরা ছুটছি, আরও আরও টাকা, প্রভাব, প্রতিপত্তি, ফ্ল্যাট, গাড়ি – আমরা ছুটছি। ছুটতে ছুটতে দেরি করে ফেলি বড্ড। এক সময় পাহমের মনে হয় খালি পায়ে আরও শীঘ্র সে পৌঁছে যাবে লক্ষ্যে। তার পর শুরু হয় সময়ের সঙ্গে অসম দৌড়, কে পৌঁছবে আগে লক্ষ্যে, সূর্যাস্ত না পাহম !! উফ….হ্যাঁ। শেষ পর্যন্ত পাহম পৌঁছে যায় লক্ষ্যে, বহমান সময় পরাজিত হয় তার কাছে। শেষ এক লাফে শরীর ছুড়ে দিয়ে সে ছুঁয়ে ফেলে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যকে। ‘লোভ’ হাততালি দিয়ে ওঠে খুশিতে, পাহম এখন অনেক অনেক জমির মালিক। কিন্তু পাহম আর ওঠে না, পড়েই থাকে নীরব নিথর হয়ে। তার চাকর কাছে গিয়ে দেখে, তার মালিক মৃত, প্রাণ ছেড়ে গেছে পাহমের দেহ। কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে চাকর সমাধিস্থ করে মনিবের মৃতদেহ। পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঠিক ‘সাড়ে তিন হাত’ জমি লেগেছিল পাহমের…।

উপরের গল্প দু’টির একটি লোভের, আর একটি ত্যাগের। ‘কুরবানি’ বাংলায় ব্যবহৃত একটি আরবি শব্দ, যার মমার্থ উৎসর্গ ও নৈকট্য অর্জন। প্রিয়তম সন্তান হযরত ইসমাইলকে উৎসর্গ করতে উদ্যত হয়ে আত্মত্যাগের পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হন নবি ইব্রাহিম। কিন্তু আধুনিক পৃথিবীতে এই ত্যাগ, সহিষ্ণুতা ও সহশীলতার দেখা মেলা ভার। লোভ, লালসা, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা ঘিরে ফেলেছে আমাদের মন ও মননকে। পাশবিক প্রবৃত্তির তাড়নায় আমরা নষ্ট করে ফেলছি আমাদের সুস্থির জীবনপ্রবাহকে। আত্মত্যাগের চেয়ে দখলে নেওয়ার স্বপ্নে আমরা বিভোর। যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট না হয়ে, যা নেই তার পিছনে ছুটে মরছে বর্তমান জনসমষ্টি। ফলে নিয়ন্ত্রণহীন এই আকাঙ্ক্ষা। এই চাহিদার কবলে পড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে জনজীবন তার আদিম সত্তা থেকে। কিন্তু এ ভাবে আর কতদিন?

‘ধর্ম’ আদতে কী

‘ধর্ম’ আদতে একটা বিশ্বাসের বিষয়। আর সব ধর্মের ক্ষেত্রে মানবকল্যাণ বোধ দিয়ে শুরু হয় এই বিশ্বাসটা। আপামর সাধারণ মানুষ এই কল্যাণবোধের প্রতি আকৃষ্ট হয়েই ধর্মকে গ্রহণ করতে প্রবৃত্ত হয় সাধারণত। কিন্তু গৃহীত ধর্মবিশ্বাসটি একটা আচার, প্রথা বা সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হয়ে গেলে কল্যাণবোধের জায়গাটা ক্রমশ হয়ে পড়ে অস্পষ্ট, পরে হয়ে যায় সম্পূর্ণ বিলীন। কোনো কিছু যখন অভ্যাস ও প্রথায় পরিণত হয় তখন সেটি যুক্তি ও বুদ্ধির ধার ধারে না অর্থাৎ যে কল্যাণবোধ ছিল ধর্মের মূল লক্ষ্য, সেই লক্ষ্যটাই হয় বিচ্যুত।

কথাটি সব ধর্মের ক্ষেত্রেই সমান প্রযোজ্য। প্রাক ইসলামি যুগ থেকেই চলে আসছে কুরবানি যার মূল বিষয়টাই হচ্ছে – ত্যাগ। অর্থাৎ প্রয়োজনে কতখানি ত্যাগ স্বীকারে আমি প্রস্তুত, তার পরীক্ষার জন্যই এই উৎসর্গীকরণের প্রচলন। কিন্তু হায়, ধর্মের মর্মে না গিয়ে শুধুই বাইরের খোলসটুকুতে মেতে আছি আমরা।

হযরত ইব্রাহিম লোকালয়ের বাইরে এক জনমানবহীন পাহাড়ে নিজের সর্বাপেক্ষা প্রিয় বস্তু আত্মজকে নিয়ে গিয়েছিলেন ত্যাগকে মান্যতা দিতে। অন্য দিকে পাহম লোভ-লালসার কবলে পড়ে হারিয়ে ফেলেছিল তার অমূল্য প্রাণ। আসুন ঈদুজ্জোহা’র পুণ্য প্রভাতে নিজের অন্তরের পশুরূপী লোভ-লালসাকে গোপনে কুরবানি দিই, ইসমাইলরূপী জীবনকে বাঁচিয়ে রাখি পাশবিক প্রবৃত্তির করাল কবল থেকে, সযত্নে।

                                     

Continue Reading
Advertisement
দেশ12 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ৫২৫০৯, সুস্থ ৫১৭০৬

গাড়ি ও বাইক6 hours ago

পেট্রোলচালিত গাড়ি ‘এস-ক্রস’ বাজারে নিয়ে এল মারুতি সুজুকি

দেশ10 hours ago

রুপোর ইট দিয়ে রামমন্দিরের শিলান্যাস করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

রাজ্য2 days ago

লকডাউনের সূচি ফের বদলাল রাজ্যে

ক্রিকেট1 day ago

বিতর্কের মধ্যেই আইপিএলের সঙ্গত্যাগ করল চিনা সংস্থা ভিভো

দেশ2 days ago

কমল নতুন আক্রান্তের সংখ্যা, বাড়ল সুস্থতার হার, রোগীবৃদ্ধির হারও সর্বনিম্ন স্তরে

ক্রিকেট11 hours ago

আইপিএলের নিয়মাবলি: গুচ্ছের টেস্টিং, চলা-ফেরায় নিয়ন্ত্রণ, একটি দলের জন্য একটি হোটেল

ক্রিকেট13 hours ago

অঘটন! ৩২৯ তাড়া করে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারাল আয়ারল্যান্ড

রবিবারের খবর অনলাইন

কেনাকাটা

things things
কেনাকাটা5 days ago

করোনা আতঙ্ক? ঘরে বাইরে এই ১০টি জিনিস আপনাকে সুবিধে দেবেই দেবে

খবরঅনলাইন ডেস্ক : করোনা পরিস্থিতিতে ঘরে এবং বাইরে নানাবিধ সাবধানতা অবলম্বন করতেই হচ্ছে। আগামী বেশ কয়েক মাস এই নিয়মই অব্যাহত...

কেনাকাটা1 week ago

মশার জ্বালায় জেরবার? এই ১৪টি যন্ত্র রুখে দিতে পারে মশাকে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: একে করোনা তায় আবার ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়েছে। এই সময় প্রতি বারই মশার উৎপাত খুবই বাড়ে। এই বারেও...

rakhi rakhi
কেনাকাটা2 weeks ago

লকডাউন! রাখির দারুণ এই উপহারগুলি কিন্তু বাড়ি বসেই কিনতে পারেন

সামনেই রাখি। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে মনের মতো উপহার কেনা একটা বড়ো ঝক্কি। কিন্তু সেই সমস্যা সমাধান করতে পারে অ্যামাজন। অ্যামাজনের...

কেনাকাটা2 weeks ago

অনলাইনে পড়াশুনা চলছে? ল্যাপটপ কিনবেন? দেখে নিন ৪০ হাজার টাকার নীচে ৬টি ল্যাপটপ

ইনটেল প্রসেসর সহ কোন ল্যাপটপ আপনার অনলাইন পড়াশুনার কাজে লাগবে জেনে নিন।

কেনাকাটা2 weeks ago

করোনা-কালে ঘরে রাখতে পারেন ডিজিটাল অক্সিমিটার, এই ১০টির মধ্যে থেকে একটি বেছে নিতে পারেন

শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বুঝতে সাহায্য করে এই অক্সিমিটার।

কেনাকাটা3 weeks ago

লকডাউনে সামনেই রাখি, কোথা থেকে কিনবেন? অ্যামাজন দিচ্ছে দারুণ গিফট কম্বো অফার

খবরঅনলাইন ডেস্ক : সামনেই রাখি। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে দোকানে গিয়ে রাখি, উপহার কেনা খুবই সমস্যার কথা। কিন্তু তা হলে উপায়...

laptop laptop
কেনাকাটা3 weeks ago

ল্যাপটপ কিনবেন? দেখে নিন ২৫ হাজার টাকার মধ্যে এই ৫টি ল্যাপটপ

খবরঅনলাইন ডেস্ক : কোভিভ ১৯ অতিমারির প্রকোপে বিশ্ব জুড়ে চলছে লকডাউন ও ওয়ার্ক ফ্রম হোম। অনেকেই অফিস থেকে ল্যাপটপ পেয়েছেন।...

কেনাকাটা3 weeks ago

হ্যান্ডওয়াশ কিনবেন? নামী ব্র্যান্ডগুলিতে ৩৮% ছাড় দিচ্ছে অ্যামাজন

খবরঅনলাইন ডেস্ক : করোনাভাইরাস বা কোভিড ১৯ এর সঙ্গে লড়াই এখনও জারি আছে। তাই অবশ্যই চাই মাস্ক, স্যানিটাইজার ও হ্যান্ডওয়াশ।...

কেনাকাটা4 weeks ago

ঘরের একঘেয়েমি আর ভালো লাগছে না? ঘরে বসেই ঘরের দেওয়ালকে বানান অন্য রকম

খবরঅনলাইন ডেস্ক : একে লকডাউন তার ওপর ঘরে থাকার একঘেয়েমি। মনটাকে বিষাদে ভরিয়ে দিচ্ছে। ঘরের রদবদল করুন। জিনিসপত্র এ-দিক থেকে...

কেনাকাটা4 weeks ago

বাচ্চার জন্য মাস্ক খুঁজছেন? এগুলোর মধ্যে একটা আপনার পছন্দ হবেই

খবরঅনলাইন ডেস্ক : নিউ নর্মালে মাস্ক পরাটাই দস্তুর। তা সে ছোটো হোক বা বড়ো। বিরক্ত লাগলেও বড়োরা নিজেরাই নিজেদেরকে বোঝায়।...

নজরে

Click To Expand