Connect with us

কথাশিল্প

মানবাধিকার দিবসে স্মরণ: বিনা দোষে কারাগারে এগারো বছর

মুফতি আবদুল কায়ুম মনসুরি কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি নন। সাধারণ এক জন মানুষ। কিন্তু রাষ্ট্রের স্নেহস্পর্শে ২০০৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত তাঁর পরিচয় ছিল একজন ভয়ংকর ‘সন্ত্রাসবাদী’। তিনি নাকি ২০০২ সালে অক্ষরধাম মন্দিরে হামলার অন্যতম প্রধান ষড়যন্ত্রকারী, যিনি নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত। শুধু উনি নন, ওঁর সঙ্গে পোটা (প্রিভেনশন অব টেরোরিস্ট অ্যাক্টিভিটিজ আইন) আদালতে […]

Published

on

nilanjan-mandal

নীলাঞ্জন মণ্ডল

মুফতি আবদুল কায়ুম মনসুরি কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি নন। সাধারণ এক জন মানুষ। কিন্তু রাষ্ট্রের স্নেহস্পর্শে ২০০৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত তাঁর পরিচয় ছিল একজন ভয়ংকর ‘সন্ত্রাসবাদী’। তিনি নাকি ২০০২ সালে অক্ষরধাম মন্দিরে হামলার অন্যতম প্রধান ষড়যন্ত্রকারী, যিনি নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত।

শুধু উনি নন, ওঁর সঙ্গে পোটা (প্রিভেনশন অব টেরোরিস্ট অ্যাক্টিভিটিজ আইন) আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন আরও পাঁচ জনমুফতি আবদুল কায়ুম মনসুরি, আদম সুলেইমান আজমিরি এবং চাঁদ খান মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হনমহম্মদ সেলিম হানিফ শেখের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় আবদুল্লা এবং আলতাফ মালিকের যথাক্রমে দশ বছর ও পাঁচ বছর কারাদণ্ড হয়।

অক্ষরধাম মন্দিরে আক্রমণের ঘটনা নিশ্চয় আপনাদের স্মরণে আছে। ২০০২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ঘটনাটি ঘটে দুজন ফিদায়েঁগুলি চালিয়ে ৩৩ জনকে হত্যা করেন এবং ৮৬ জন জখম হন

১৬ মে, ২০১৪। লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হল। ওই দিনই গুজরাতের সবরমতি কারাগারে সকাল থেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন মুফতিসহ ছয় জন। কারণ ওই দিন সুপ্রিম কোর্টে তাঁদের মামলার রায় ঘোষণা হবে। বিকালবেলা রায়ের খবর পেলেন তাঁরা। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এ কে পট্টনায়েক এবং বিচারপতি ভি গোপালগৌড়ার বেঞ্চ অক্ষরধাম মামলায় অভিযুক্ত ছজনকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করে তাঁদের মুক্তির আদেশ দেন কারও বিরুদ্ধে পোটা প্রয়োগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের অনুমোদন প্রয়োজনতৎকালীন গুজরাত সরকারের অনুমোদন প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট তাদের রায়ে মন্তব্য করেন, ‘clear non-application of mind’। ২০০২ থেকে ২০১৪এর মে, এই সময়কালে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদী

মুক্তিলাভ করার পর মুফতি আবদুল কাইয়ুম তার দীর্ঘ এগারো বছরের বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে গুজরাতি ভাষায় একটি বই লিখেছেনবইটির নাম, ‘গ্যারা সাল সালাখো কে পিছে বইটি ইংরিজি, হিন্দি এবং উর্দুতে অনুবাদও হয়েছে বইটির ইংরাজি সংস্করণের নাম, ‘Eleven Years Behind the Bar’। বইটির প্রকাশক জমিয়ত উলেমা অমদাবাদ/জমিয়ত উলেমা মহারাষ্ট্র।

11 years behind the barsবইটি পড়তে পড়তে শিউরে উঠতে হয়। কী ভাবে নিরপরাধ মানুষকে সন্ত্রাসবাদীবানিয়ে দেওয়া হয় তার ধারাবিবরণী বইটিতে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ পুলিশের মধ্যে কী পরিমাণে বিদ্যমান তাও আমরা জানতে পারব বইটি থেকে।

মুফতির লেখা অনুযায়ী, ২০০৩এর ১৭ আগস্ট ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসে তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়। মুফতির কথায়, “আমি বাড়ির সবাইকে বিদায় জানিয়ে রওনা দিলাম। কে ভেবেছিল যে সে বিদায় দু’চার দিনের জন্য না হয়ে দীর্ঘ এগারো বছরের জন্য হবে।”

বইটি থেকে জানা যাচ্ছে, ২০০৩এর ১৭ আগস্ট থেকে মুফতিকে, ৬ আগস্ট থেকে আলতাফ মালিককে, ৯ আগস্ট থেকে আদম সুলেইমান আজমিরিকে, ১ আগস্ট থেকে সেলিম হানিফ শেখকে এবং ১৭ আগস্ট থেকে মৌলানা আবদুল্লাকে ক্রাইম ব্রাঞ্চের হেফাজতে বেআইনি ভাবে আটক রাখা হয় এবং নারকীয় অত্যাচার চালানো হয়। পুলিশের বিশেষ লেঠেলবাহিনী দিয়ে ধারাবাহিক ভাবে পিটিয়ে যাওয়া, যৌনাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেওয়া, পায়ুতে পেট্রল ইঞ্জেকশন দেওয়া কোনো রকম অত্যাচারই বাদ যায়নি। তাঁদের ধর্ম নিয়েও খুব আপত্তিকর কথাবার্তা বলা হত ক্রাইম ব্রাঞ্চের হেফাজতে থাকাকালীন।

মুফতি লিখছেন, “১৯ আগস্ট ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসার বানজারার ঘরে আমার ডাক পড়ল। যথারীতি চোখ বেঁধে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল। চোখের বাঁধন খুলতে দেখি সেখানে আদমভাই, মৌলবি আবদুল্লা, আবদুল রহমান পানারা, মুনাফ রেডিয়েটর, নাসির দোমান প্রমুখ উপস্থিত। এঁরা সবাই আমার মহল্লার এবং আমার ভালো বন্ধু।পরে জানতে পারি আমার মতোই তাঁদেরও তুলে আনা হয়েছে এবং বেআইনি ভাবে তাঁদের ক্রাইম ব্রাঞ্চের হেফাজতে আটক রাখা হয়েছে এবং অক্ষরধাম মন্দির হামলায় কোনো না কোনো ভূমিকায় তাঁদের যুক্ত করা হয়েছে।”

মুফতির বইটি থেকে আমরা জানতে পারছি, যে ক্রাইম ব্রাঞ্চের দফতরে তাঁকে চোখ বেঁধে রাখা হত। তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরের দিন বানজারার সামনে তাঁকে হাজির করা হয়। বানজারার নির্দেশে পুলিশের বিশেষ লেঠেলবাহিনী মুফতিকে মারতে শুরু করে। লেঠেলবাহিনীর পুলিশ খুবই হিংস্র প্রকৃতির। তাদের চেহারা স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা মেরেই চলে যতক্ষণ না ক্লান্ত হয়। এই বাহিনী ক্লান্ত হয়ে পড়লে বানজারা মার শুরু করে। বানজারা মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে আরেক অফিসার ভানর মার শুরু করে। এই ভাবে চলতে থাকে। এই রকম ধারাবাহিক শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারে তাঁরা যখন ভেঙে পড়েন এবং ক্রাইম ব্রাঞ্চের কথামতো কাজ করতে রাজি হন, তখন তাঁদেরই পছন্দমতো ভূমিকা বেছে নিতে বলা হয়। অর্থাৎ অক্ষরধাম মন্দিরে হামলায় কার কী ভূমিকা হবে সেটা তাঁদেরই ঠিক করতে বলা হয়। কাউকে কাউকে আবার অক্ষরধাম মন্দিরে হামলা, গোধরাকাণ্ড, এবং হারিণ পাণ্ড্য হত্যা মামলার মধ্যে যে কোনো একটি বেছে নিতে বলা হয়।

সুপ্রিম কোর্ট তাদের রায়ে বলে, “the story of prosecution crumbles at every juncture” (সরকারপক্ষের মামলাটি প্রতিটি সন্ধিস্থলে ভেঙে পড়ছে)

বিমানে মুফতিকে শ্রীনগরে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁকে বলা হয় সেখানে গিয়ে চাঁদ খান নামে একজনকে শনাক্ত করতে হবে, যাঁকে তিনি কোনো দিন দেখেনি। এ সমস্ত কিছুই ঘটছে হেফাজতে বেআইনি ভাবে আটক থাকা অবস্থাতেই। উনি লিখছেন যে এ ছাড়া ওঁর আর কোনো উপায় ছিল না।

অক্ষরধাম মন্দিরে হামলার ঘটনার তদন্ত শুরু করে গুজরাতের এটিএস (অ্যান্টি টেরোরিস্ট স্কোয়াড)। ২০০৩এর ২৮ আগস্ট তদন্তের দায়িত্ব হস্তান্তরিত হয় ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডি জি বানজারা ঘোষণা করেন, তিনি অক্ষরধাম মন্দিরে হামলার তদন্তের সমাধান করে ফেলেছেন। সব কিছু নিজেদের মতো করে সাজিয়ে ২৯ আগস্ট মুফতিসহ অন্যদের গ্রেফতার দেখানো হয় এবং ৩০ আগস্ট এঁদের ম্যাজিস্ট্রেট এস এস ওঝার এজলাসে হাজির করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট ক্রাইম ব্রাঞ্চের দাবিমতো পনেরো দিনের হেফাজতের দাবি মঞ্জুর করেন।

মুফতির বইটি থেকে আমরা জানতে পারছি, ক্রাইম ব্রাঞ্চ জানিয়েছিল যে তারা আক্রমণকারী দুই ফিদায়ের পকেট থেকে উর্দুতে লেখা দুটি চিঠি উদ্ধারকরেছে এবং চিঠি দু’টি থেকে তারা ষড়যন্ত্রের বিষয় অনেক কিছু জানতে পেরেছে। মুফতিকে দুটি উর্দু চিঠি দিয়ে তা ওঁর হাতের লেখায় নকল করতে বলা হয়। বারংবার তাঁকে দিয়ে ওই চিঠি দুটি নকল করানো হয়। আদালতে চিঠি দুটি মুফতির বিরুদ্ধে প্রমাণ রূপে পেশ করা হয়। যদিও আদালতে শেষ পর্যন্ত তা নাকচ হয়ে যায়।

তাঁকে যখন বেআইনি ভাবে পুলিশ হেফাজতে আটকে রাখা হয়েছিল তখন তাঁর পরিবারের লোকেরা হেবিয়াস কর্পাস করতে পারতেন, কিন্তু করেননি। কারণস্বরূপ তিনি লিখেছেন যে বেশ কয়েক জনের পরিবারের তরফ থেকে হেবিয়াস কর্পাস করা হয়েছিল। ফলস্বরূপ তাঁদের গোধরা কাণ্ড, হারিণ পাণ্ড্য হত্যা মামলা প্রভৃতি কোনো না কোনো একটা মামলায় যুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল।

হেফাজতে অত্যাচার করে স্বীকারোক্তির উপর ভিত্তি করে মামলা সাজানো হয়েছিল এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট তাদের রায়ে বলে, “the story of prosecution crumbles at every juncture” (সরকারপক্ষের মামলাটি প্রতিটি সন্ধিস্থলে ভেঙে পড়ছে)। তারা আরও বলে, “The confessional statements cannot be relied upon and the case of the prosecution fails. Accordingly, we hold there is no independent evidence on record to prove guilt of the accused beyond reasonable doubt in the face of retractions and grave allegations of torture and violation of human rights the accused have made against police,”

মুফতিসহ ছজন নির্দোষ প্রমাণিত হলেন কিন্তু তাদের জীবনের হারিয়ে যাওয়া ১১টা বছর কে ফিরিয়ে দেবে? প্রসঙ্গত জানাই আদালতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মুফতি মামলা করেছিলেন আদালত সেই আর্জি খারিজ করে দিয়েছেনকারণ “The law in India does not have any rules to asses damages to people who suffer false imprisonment.” যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে The Innocence Project নামে একটি প্রকল্প আছে।

প্রবন্ধ

‘গায়কদের গায়ক’ অখিলবন্ধু ঘোষ: শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি

আজ ২০ অক্টোবর। আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে বাঙালি পেয়েছিল এমন এক সংগীতশিল্পীকে যিনি ছিলেন স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল, নিজস্বতায় ভরপুর, যাঁর সুর সংযোজনায় ছিল অভিনবত্ব, গায়কি ছিল অনন্য।

Published

on

অখিলবন্ধু ঘোষ।

“সময়টা মনে নেই, হুগলি জেলায় একটা কলেজে অনুষ্ঠানে গিয়েছি গান গাইতে। অখিলদাও গেছেন, আর ছিলেন হাস্যকৌতুক শিল্পী শীতল বন্দ্যোপাধ্যায়। অনেক দূরের পথ, সকালে রওনা হয়ে দুপুরে পৌঁছে খাওয়া-দাওয়া করে সবাই একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। সন্ধেবেলায় আমাদের জলসা। হঠাৎ কান্নার শব্দ, দেখি অখিলদা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। আমরা দুজন একেবারে অবাক। তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে জানলাম – টার্ফ রোডের বাড়িতে দোতলায় ময়না পাখিটাকে খেতে দিয়ে আসেননি, কী করে যে ভুলে গেছেন, বৌদিও আজকে বাড়ি নেই, পাখিটা বোধহয় মারা যাবে…। এমন মানসিকতা না থাকলে কেউ মরমী শিল্পী হতে পারে?”

ঠিকই চিনেছিলেন অনুজ সংগীতশিল্পী মৃণাল চক্রবর্তী। মরমী শিল্পী বলতে যা বোঝায়, ঠিক তা-ই ছিলেন অখিলবন্ধু ঘোষ। ‘শিপ্রা নদীর তীরে’, ‘কবে আছি কবে নেই’, ‘এমনি দিনে মা যে আমার’, ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা, আমি কাঁদি সাহারায়’, ‘ও বাঁশুরিয়া বাঁশি বাজায়ো না’ – প্রতিটি গানে এক বিরহী মনের হাহাকার আর অভিমান ছুঁয়ে যায় শ্রোতার মন।

তবে শুধু বিরহই কি তাঁর গানের একমাত্র সম্পদ ছিল? যখন শুনি ‘পিয়ালশাখার ফাঁকে ওঠে’, ‘ওই যে আকাশের গায়’, ‘যেন কিছু মনে কোরো না’, ‘সেদিন চাঁদের আলো’, ‘ঐ যাঃ! আমি বলতে ভুলে গেছি’ ইত্যাদি গান, তখন আমরা অন্য অখিলবন্ধুকে পাই। আসলে তাঁর গান ছিল স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল, নিজস্বতায় ভরপুর, সুর সংযোজনায় অভিনব, গায়কিতে অনন্য।

এ প্রসঙ্গে ‘ঐ যাঃ! আমি বলতে ভুলে গেছি’ গানটির কথা আলাদা করে বলতে হয়। গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গানটিতে নিজে সুর বসিয়ে অখিলবন্ধু রেকর্ড করেন ১৯৭১ সালে। গানের শুরুতেই ‘ঐ যাঃ!’ অংশটি অখিলবন্ধু এমন ভাবে বলেন যে গানের পরবর্তী অংশটি অর্থাৎ ‘আমি বলতে ভুলে গেছি’র সঙ্গে ঠিক ভাবে খাপ খেয়ে যায়। অর্থাৎ কিছু বলতে ভুলে গেলে ‘ঐ যাঃ!’ অংশটুকু আমাদের মুখ থেকে যে ভাবে বেরিয়ে আসা স্বাভাবিক, ঠিক সে ভাবেই বলেন অখিলবন্ধু। ঠিক এখানেই মিল খুঁজে পাওয়া যায় শচীন দেববর্মণের ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি’র গায়নে। এই গানটি শুরু করার আগে শচীনকর্তা ‘আঃ’ কথাটি বলে উঠতেন। অখিলবন্ধুর ‘ঐ যাঃ! আমি বলতে ভুলে গেছি’ গানে শচীনকর্তার ‘ডাকাতিয়া বাঁশি’র যে প্রভাব আছে তা অস্বীকার করা যায় না।

আর সেটা থাকাই তো স্বাভাবিক। প্রথমে সংগীতশিক্ষক মামা কালিদাস গুহ, তার পরে একে একে নিরাপদ মুখোপাধ্যায়, সংগীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তী, পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ী এবং কিছু দিন পণ্ডিত কে জি ঢেকন প্রমুখ গুণীজনের কাছে সংগীত শিক্ষায় তালিম নিলেও, অখিলবন্ধু মনে মনে শচীন দেববর্মণকেও গুরু বলে মানতেন। মৃণাল চক্রবর্তীও বলেছেন, “উনি চিরকাল শচীন দেববর্মণের ভক্ত।” 

শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নিয়েছিলেন তিনি। শাস্ত্রীয় সংগীতের সূক্ষ্ম কাজ অখিলবন্ধুর গলায় অনায়াসে খেলা করত, গানের মাঝে টুকরো তানকারিও করতেন। এক একটা মোড়, মুড়কী, গোটা গানের পরিবেশনে এমন প্রভাব ফেলত যে শ্রোতারা এক অনাবিল মুগ্ধতায় আবিষ্ট হয়ে যেতেন।

সংগীতজীবনের প্রথম দিকে বৈঠকী অর্ধ-রাগসংগীত বা রাগপ্রধান ধাঁচের গানেই বেশি আগ্রহ ছিল অখিলবন্ধুর। কিন্তু পরবর্তী কালে আধুনিক বাংলা গানে নিজস্ব ঘরানা সৃষ্টি করেন। রাগপ্রধান গানের জগতে তাঁর অবিস্মরণীয় কিছু সৃষ্টি হল ‘আজি চাঁদিনী রাতি গো’, ‘জাগো জাগো প্রিয়’, ‘বরষার মেঘ ভেসে যায়’, ‘আমার সহেলী ঘুমায়’ ইত্যাদি। বেশ কিছু নজরুলগীতিও তাঁর কণ্ঠে অন্য মাত্রা পেয়েছে। ১৯৬১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দু’টি রবীন্দ্রসংগীতও রেকর্ড করেন তিনি – ‘তুমি মোর পাও নাই পরিচয়’ এবং ‘যার মিলন চাও বিরহী”।    

সাংগীতিক ভাববিস্তারে অখিলবন্ধু ছিলেন সম্রাট। গানের কথার মধ্যে ঢুকে যেতেন তিনি। প্রতিটি শব্দের অর্থ ও ভাব বুঝে, তার অন্দরে প্রবেশ করে, তার পর তা উপহার দিতেন শ্রোতাদের। এ ব্যাপারে দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। গান গাওয়ার সময় তাঁর চোখদু’টি বন্ধ থাকত। একটা তদগত ভাব। সেই মুহূর্তে তিনি গানের মধ্যে ডুবে যেতেন। তাই শ্রোতাদের কাছে তাঁর সংগীত পরিবেশনা এক অনন্য মাধুর্য সৃষ্টি করত।

তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় গান ‘ও দয়াল বিচার করো’-এর পাশাপাশি শোনা যাক ‘ও বাঁশুরিয়া বাঁশি বাজায়ো না’। দু’টিই প্রেমের গান। কিন্তু দু’টি গানের আকুতি ভিন্ন মাত্রায় প্রকাশ পেয়েছে। একটিতে দয়ালের কাছে বিচার চাওয়া হচ্ছে, আর অন্যটিতে বাঁশিকে থামতে বলা হচ্ছে। কী অনায়াস দক্ষতায় ভিন্ন মাত্রার এই আকুতি শ্রোতাদের কাছে সাবলীল ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন অখিলবন্ধু তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।     

চিরকাল প্রচারের আড়ালে থেকে যাওয়া এই মানুষটি যোগ্য সঙ্গিনী পেয়েছিলেন দীপালি ঘোষকে। তাঁর সহধর্মিণী দীপালি ছিলেন তাঁর এক সময়ের ছাত্রী, তিনিও এক গুণবতী রত্ন, সুরকার। অখিলবন্ধুর বেশির ভাগ গান নিজের সুর দেওয়া হলেও, বেশ কয়েকটা গানে সুর দেন দীপালি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘যেন কিছু মনে কোরো না’, ‘সারাটি জীবন কী যে পেলাম’, ‘শ্রাবণ রাতি বাদল নামে’, ‘শ্রাবণ নিশীথে এসো’, ‘কেন ডাকো বারে বারে’ ইত্যাদি।

সুরসাধকের প্রয়াণ ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ। ৬৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। জীবনে তিনি তাঁর যোগ্যতার উপযুক্ত সম্মান পাননি। তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতো বিশিষ্ট শিল্পীরাও বলেছেন এ কথা। মৃত্যুতেও তিনি অবহেলার শিকার হয়েছেন। অন্ডালে একটি অনুষ্ঠান করে ফিরে এসেছিলেন সে দিন সকালে। দুপুরে হঠাৎ তাঁর শরীরটা খারাপ লাগতে থাকে। তাঁকে পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ চিকিৎসাহীন অবস্থায় পড়ে থাকার পর তাঁকে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

মৃণাল চক্রবর্তী তাঁর আত্মজীবনী ‘খোলা জানালার ধারে’-তে লিখেছেন, “লেখকদের জগতে যেমন একটা কথা আছে লেখকদের লেখক, অখিলদাকে আমি আধুনিক বাংলা গানের ক্ষেত্রে গায়কদের গায়ক বলে মনে করি।”

একেবারে খাঁটি কথা। অখিলবন্ধুর গায়কি ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, নিজস্ব। তাঁর গায়কি অনুসরণ করা একেবারেই সহজ ছিল না। মৃণাল চক্রবর্তীর অনুভবেরই প্রতিধ্বনি করে বলি, আধুনিক বাংলা গানে নিজের নির্জন স্বাক্ষর রেখে গিয়েছিলেন অখিলবন্ধু ঘোষ।

(তথ্য সংকলন: শম্ভু সেন)

ঋণ স্বীকার –

১। খোলা জানালার ধারে – মৃণাল চক্রবর্তী

২। শতবর্ষে অখিলবন্ধু – অভীক চট্টোপাধ্যায়, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮ অক্টোবর ২০২০

৩। অখিল বন্ধু ঘোষ মার্জিত শোভন সুরসৃষ্টি – সংকলক সন্দীপ মুখোপাধ্যায় – https://bangodarshan.com/

খবরঅনলাইনে আরও পড়তে পারেন

প্রগতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক সাংবাদিকতার অন্যতম প্রবর্তক ও পথপ্রদর্শক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

Continue Reading

কলকাতা

ওলা, সুইগি, উবেরের প্রথম মহিলা চালক রূপার দিদিগিরি

সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত নানান সামগ্রী সরবরাহের কাজের পর যাত্রী পরিবহণের কাজ করেন।

Published

on

Rupa Chowdhury
রূপা চৌধুরী।

অর্ণব দত্ত

পিচবোর্ডে ফুটো করে আলোর সরলরেখা বরাবর চলনের এক্সপেরিমেন্ট স্কুলে পড়ার সময় সকলকেই করতে হয়েছে।মানুষের জীবন আলোর বার্তাবহ। তাৎপর্যপূর্ণ এই কথাটাও সকলেই জানি। কিন্তু আলো কি সহজে আসে? নাকি পিচবোর্ডের সেই এক্সপেরিমেন্টের মতো পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে হয় জীবনে আলো প্রবেশ করাতে?

পরীক্ষানিরীক্ষা ছাড়া জীবনের কোনো মানেই হয় না। কিন্তু জীবনকে নিয়ে পরীক্ষা চালানোর সাহস ক’ জনের আছে? তা ছাড়া ব্যাপারটা শুধু সাহসের নয়, জীবনকে আলোকিত করা মুখের কথা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা গুণের সমাহার। যেমন, সহ্যশক্তি, সততার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মনোবলের মতো আনুষঙ্গিক বিষয়।

রূপা চৌধুরী (Rupa Chowdhury) সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই কথাগুলি বলতেই হল। রূপা লড়াইয়ের প্রতীক বলা যায়। রূপার জীবনসংগ্রামের কাহিনি শুধুমাত্র মহিলাদেরই নয়, প্রেরণা দিতে পারে যে কোনো লড়াকু মানুষকে।

বয়স ত্রিশ পেরিয়েছে রূপার।আর জীবনসংগ্রাম চালাতে গিয়ে এই বয়সেই দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। সুইগি (Swiggy), ওলা (Ola), উবেরের (Uber) প্রথম মহিলা ড্রাইভার তিনি। ২০১৮ সাল থেকে এ কাজ করছেন। বর্তমানে ওলা, উবেরের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহণের কাজও করেন। সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত নানান সামগ্রী সরবরাহের কাজের পর যাত্রী পরিবহণের কাজ করেন। বলা বাহুল্য, এ জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয় প্রতি দিন।

রূপার জীবনটা রুক্ষ হয়ে যায় বিয়ের পরপরই। রূপা জানালেন, ২০০৮ সালে অবস্থাপন্ন পাত্র খুঁজে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন বাবা। কিন্তু বিয়ের কিছু দিন পর থেকে বারাসতে শ্বশুরবাড়িতে লাগাতার অত্যাচারের শিকার হন। তত দিনে রূপা এক পুত্রসন্তানের মা বনে গিয়েছেন। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছিল। রূপা বললেন, “শেষে ছেলেকে কেড়ে নিয়ে ওরা আমায় তাড়িয়ে দিল।”

এ দিকে ২০০৬ সালে রূপার বিয়ের দু’ বছর আগে ওর মায়ের মৃত্যু হয়েছে। দুই দিদির মধ্যে একজন ২০১৮ সালে মারা গিয়েছেন। আর বাবার মৃত্যু হয়েছে ২০১৯ সালে।সাকুল্যে সাড়ে তিন বছর শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন রূপা। এর পর টের পান, তাঁকে নিজের লড়াই নিজেকেই লড়তে হবে।

রূপা জানালেন, প্রথম দিকে টুকিটাকি কাজ করতেন। যেমন মশলা বিক্রি। কিন্তু তাতে আয় এত সামান্য যে একা মানুষেরই দিন চলত না। কিন্তু তখনও বাবা আর দিদি বেঁচে। তাই ভরসা একটা ছিল। বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী।

লড়াকু রূপা।

রূপা জানালেন, এর পর কাজের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে ২০১৮ সালে তিনি ওলা, সুইগির সঙ্গে যুক্ত হন। রীতিমতো ইন্টারভিউ দিতে হয়েছিল। সম্বল বলতে ছিল মনের জোর আর একটি স্কুটি।

২০০৮ সালে বাবার দেখা পাত্রকে বিয়ের সময় কলেজে পড়ছিলেন রূপা। এর পরই জড়িয়ে পড়লেন নানা ঘাত-প্রতিঘাতের সঙ্গে। এক দিদি জীবিত। রূপা জানালেন, তিনি বোনের কোনো খবর রাখেন না।

বর্তমানে রূপা একটি বাড়িভাড়া নিয়ে বাঘাযতীন এলাকায় বসবাস করেন। একা থাকতে তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছে না? রূপার কথায়, পাড়ার লোকজন আমায় ভালোবাসেন, সম্মান করেন।

রূপা বললেন, “আমার দু’জন বন্ধুর কথা অবশ্যই লিখবেন।” অপর্ণা দাস আর শ্রেয়শ্রী ব্যানার্জি নামে দুই তরুণীর নাম জানালেন রূপা। এ-ও জানালেন, দু’ জনেই তাঁর বিপদের সাথী।

শিশুসন্তান সায়ন্তনের সঙ্গে মায়ের যোগাযোগ ঘটে মাঝেমাঝে। রূপা বললেন, সে কাজটা ফোনেই সারতে হয়। কারণ শ্বশুরবাড়িতে ঢোকার উপায় নেই। শ্বশুরবাড়িতে এত অত্যাচারিত হয়েও স্থানীয় পুলিশের অসহযোগিতায় তিনি ন্যায্য বিচার পাননি বলে অভিযোগ রূপার।

ইতিমধ্যেই রূপা পরিচিত মুখ। বিভিন্ন টিভিশোতে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছেন। আমন্ত্রিত হয়েছিলেন দিদি নম্বর ওয়ানেও। রূপার দিদিগিরি অনেক মানুষকে জীবনে চলার পথে অবশ্যই প্রেরণা দেবে।

রূপা ভালোবাসেন পাখি। রূপার বাড়িতে পা রাখলে অনেক পাখির গুঞ্জন শোনা যায়। ইচ্ছেডানায় ভর করে রূপাও তাঁর পোষ্যদের সঙ্গে পাড়ি দেন অনাগত ভবিষ্যতের দিকে।

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে এগিয়ে চলেছেন পার্ক সার্কাসের তিন মুসলিম তরুণী

Continue Reading

প্রবন্ধ

প্রগতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক সাংবাদিকতার অন্যতম প্রবর্তক ও পথপ্রদর্শক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

আজ ২৬ সেপ্টেম্বর। পূর্ণ হল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ২০০ বছর। এই পুণ্য দিনে তাঁর প্রতি খবর অনলাইনের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Published

on

শম্ভু সেন

“সাংবাদিক বলতে যা বোঝায়, বিদ্যাসাগর ঠিক তা ছিলেন না। কিন্তু বাংলা সাংবাদিকতার সঙ্গে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। যে কয়েকখানি পত্রপত্রিকার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সংস্রব ছিল তাঁর মধ্যে প্রধান হল:  (১) সর্ব্বশুভকরী পত্রিকা, (২) তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, (৩) সোমপ্রকাশ, এবং (৪) ইংরেজি পত্রিকা ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’।…এই ধরনের যে পত্রিকাগুলি বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করেছে, বিদ্যাসাগর ঠিক সেই পত্রিকাগুলির সঙ্গেই যখন সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তখন সাংবাদিকতাতেও তাঁর দান অস্বীকার করা যায় না।”

যশস্বী প্রাবন্ধিক বিনয় ঘোষ তাঁর ‘বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ’-এ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে এই মন্তব্য করেছেন।

বিদ্যাসাগরকে আমরা অসংখ্য অভিধায় অভিহিত করতে পারি – তিনি বিধবাবিবাহের প্রবর্তক, তিনি সমাজসংস্কারক, তিনি বাংলায় স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে পথিকৃৎ, তিনি বাংলা গদ্য-ভাষার জনক – আরও কত কী! কিন্তু বাংলা সাংবাদিকতায় তাঁর অমূল্য অবদানের বিষয়টি বোধহয় আমাদের স্মরণে চট করে আসে না।

সমাজসংস্কারের উদ্দেশ্যে ১২৫৬ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে উত্তর কলকাতার ঠনঠনিয়ায় বাবু রামচন্দ্র দত্তের বাড়িতে ‘সর্ব্বশুভকরী’ সভার প্রতিষ্ঠা হয়। সেই সভার তরফে মাসিক ‘সর্ব্বশুভকরী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১২৫৭ বঙ্গাব্দের ভাদ্রে (১৮৫০ সালের আগস্টে)। এই পত্রিকা প্রকাশের পিছনে মূল ভূমিকা ছিল বিদ্যাসাগরের। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাংলা সাময়িক-পত্র, প্রথম খণ্ড’-এ লিখেছেন, “প্রকৃতপক্ষে বিদ্যাসাগর ও মদনমোহনই পত্রিকাখানির প্রতিষ্ঠাতা। মতিলাল চট্টোপাধ্যায় নামে সম্পাদক ছিলেন।” এ সম্পর্কে বিনয় ঘোষ লিখেছেন, “সমাজসংস্কার ও সমাজকল্যাণের আদর্শ নিয়ে বাংলা পত্রিকা প্রকাশের প্রেরণা বিদ্যাসাগরই দিয়েছিলেন।”

এর আগেই বিদ্যাসাগর নেমে পড়েছেন সামাজিক আন্দোলনে। বিধবাদের দুরবস্থায় তাঁর চোখে জল আসে। কন্যাসন্তানদের বাল্যবিবাহ তাঁকে ব্যথিত করে। এ সব বন্ধ করতে লেখনী ধরলেন বিদ্যাসাগর। ১৮৫০ সালে বাঙালি সমাজ পেল এক মূল্যবান লেখা – ‘বাল্যবিবাহের দোষ’। লেখাটি প্রকাশিত হল মাসিক ‘সর্ব্বশুভকরী’ পত্রিকায়। রচনায় অবশ্য লেখকের নাম ছিল না। তবে ওই লেখা যে বিদ্যাসাগরেরই, তার উল্লেখ পাওয়া যায় মনীষী রাজনারায়ণ বসুর লেখা ‘আত্মচরিত’-এ এবং বিদ্যাসাগর-অনুজ শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের লেখা ‘বিদ্যাসাগর জীবনচরিত ও ভ্রমনিরাস’-এ।

শম্ভুচন্দ্র লিখেছেন, “হিন্দু-কলেজের সিনিয়র ডিপার্টমেন্টের ছাত্রগণ ঐক্য হইয়া ‘সর্ব্ব-শুভকরী’ নামক মাসিক সংবাদপত্রিকা প্রকাশ করেন। উক্ত সংবাদপত্রের অধ্যক্ষ বাবু রাজকৃষ্ণ মিত্র প্রভৃতি অনুরোধ করিয়া, অগ্রজকে বলেন যে, ‘আমাদের এই নূতন কাগজে প্রথম কি লেখা উচিত তাহা আপনি স্বয়ং লিখিয়া দিন। প্রথম কাগজে আপনার রচনা প্রকাশ হইলে, কাগজের গৌরব হইবে এবং সকলে সমাদরপূর্ব্বক কাগজ দেখিবে।’ উহাদের অনুরোধের বশবর্ত্তী হইয়া, তিনি প্রথমত বাল্যবিবাহের দোষ কি, তাহা রচনা করিয়াছিলেন।”

‘বাল্যবিবাহের দোষ’-এ বিদ্যাসাগর লিখলেন, “বিধবার জীবন কেবল দুঃখের ভার। এবং এই বিচিত্র সংসার তাহার পক্ষে জনশূন্য অরণ্যাকার। পতির সঙ্গে সঙ্গেই তাহার সমস্ত সুখ সাঙ্গ হইয়া যায়। এবং পতিবিয়োগদুঃখের সহ সকল দুঃসহ দুঃখের সমাগম হয়। উপবাস দিবসে পিপাসা নিবন্ধে কিম্বা সাংঘাতিক রোগানুবন্ধে যদি তাহার প্রাণাপচয় হয়, তথাপি নির্দ্দয় বিধি তাহার নিঃশেষ নীরস রসনাগ্রে গণ্ডূষমাত্র বারি বা ঔষধ দানেরও অনুমতি দেন না।”

বিদ্যাসাগর দিনের পর দিন পুথি ঘাঁটতে লাগলেন, বিধবাবিবাহের সমর্থনে যদি কোনো শাস্ত্রসম্মত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত সফল হলেন। নিজের আন্দোলনে পেলেন শাস্ত্রের সমর্থন। পরাশর-সংহিতার পাতা ওলটাতে ওলটাতে তিনি পেয়ে গেলেন – ‘নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ।/পঞ্চস্বাপৎসু নারীণাং পতিরন্যো বিধিয়তে’। অর্থাৎ ‘স্বামী যদি নিরুদ্দেশ হয়, মারা যায়, প্রব্রজ্যা বা সন্ন্যাস নেয়, ক্লীব বা জরাগ্রস্ত, পুরুষত্বহীন বা অক্ষম হয়, যদি পতিত হয়, তা হলে এই পঞ্চ প্রকার আপদে নারীর অন্য পতিগ্রহণ বিধেয়’। এই উক্তি স্বয়ং পরাশর মুনির।

‘বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ শীর্ষক বিদ্যাসাগরের একটি রচনা ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দের ফাল্গুন মাসে ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’য় প্রকাশিত হয়। এর এক মাস আগেই ১২৬০ বঙ্গাব্দের ১০ মাঘ তথা ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি রচনাটি পুস্তিকারূপে প্রকাশিত হয়েছিল।

ব্রাহ্ম সম্প্রদায়ের আন্দোলন জিইয়ে তোলার উদ্দেশ্যে ১২৪৬ বঙ্গাব্দের (১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দ) ৩ কার্তিক জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সভার মুখপত্র মাসিক ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’ প্রকাশিত হয় ১২৫০ বঙ্গাব্দের ১ ভাদ্র (১৮৪৩ সালের ১৬ আগস্ট)। সম্পাদক হন অক্ষয়কুমার দত্ত। পত্রিকা পরিচালনার জন্য দেবেন্দ্রনাথ ১৮৪৮ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির ধাঁচে পেপার কমিটি তথা প্রবন্ধ নির্বাচনী সভা গঠন করেন।

তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা।

শোভাবাজারের রাজা রাধাকান্ত দেবের দৌহিত্র আনন্দকৃষ্ণ বসু ছিলেন বিদ্যাসাগরের অকৃত্রিম বন্ধু। এই আনন্দকৃষ্ণই ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্তের লেখা-সহ পত্রিকার বিভিন্ন বিষয়ে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে আলোচনা করতেন। সেই সূত্রে অক্ষয়কুমারের লেখা পড়ে সেই সব লেখায় কিছু ত্রুটির কথা আনন্দকৃষ্ণকে বলেছিলেন বিদ্যাসাগর। আনন্দকৃষ্ণ সেগুলি সংশোধন করে দিতে বলেন। সম্পাদক বা লেখকের অনুমতি বিনা কোনো লেখার উপর কলম চালানোয় বিশ্বাসী ছিলেন না বিদ্যাসাগর। তাই গোড়ার দিকে এ কাজে রাজি হননি তিনি। কিন্তু আনন্দকৃষ্ণের পীড়াপীড়িতে বিদ্যাসাগর ওই সব ত্রুটি সংশোধন করে দেন এবং অক্ষয়কুমার অত্যন্ত আনন্দিত হন। পরে শোভাবাজার রাজবাড়িতে অক্ষয়কুমারের সঙ্গে আলাপ হয় বিদ্যাসাগরের। এবং সেই আলাপ প্রগাঢ় বন্ধুত্বে পরিণত হয়।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং অক্ষয়কুমার দত্তের অনুরোধে বিদ্যাসাগর ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র লেখক গোষ্ঠীতে যুক্ত হন। পরে পেপার কমিটির সদস্য হন। ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র প্রায় সমস্ত লেখার সম্পাদনা তিনিই করতেন। তিনি ওই পত্রিকার ঘোষিত সম্পাদক না হয়েও সম্পাদনায় অন্যতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন। প্রত্যক্ষ ভাবে সাংবাদিকতায় যুক্ত না থেকেও সংবাদ বা তথ্য পরিবেশনা, পরিমার্জনায় তিনি ছিলেন অগ্রদূত। তাঁর লেখনীতে সমৃদ্ধ হয়েছিল ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’। পরবর্তী সময়ে ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র নীতি নির্ধারণের প্রশ্নে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের মতবিরোধ হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পত্রিকা সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্তের সঙ্গেও মতবিরোধ হয়েছিল দেবেন্দ্রনাথের। তার জেরে তাঁকেও ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’ ছাড়তে হয়েছিল।           

ইতিমধ্যে বিদ্যাসাগরের প্রথম পুস্তিকা প্রকাশিত হওয়ার পর দেশের গোঁড়া পণ্ডিতগোষ্ঠী তীব্র প্রতিবাদ করে কয়েকটি পুস্তিকা প্রচার করেন। সেই সব পণ্ডিতের মতামত খণ্ডন করার জন্য ১৮৫৫ সালের অক্টোবরে বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ নিয়ে দ্বিতীয় পুস্তিকা প্রকাশ করলেন – ‘বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব। দ্বিতীয় পুস্তক।’ বিস্তর শাস্ত্রবাক্য উদ্ধার করে বিদ্যাসাগর নিঃসংশয়ে প্রমাণ করলেন যে কলিযুগে বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত কর্তব্য কর্ম, বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত। বাংলা তথা সারা ভারতবর্ষে আলোড়ন পড়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ১৮৫৬ সালে ২৬ জুলাই বিধবাবিবাহ আইন পাশ হল।

শুধু বিধবাবিবাহ প্রচলনই নয়, সমাজসংস্কারক হিসাবে বাল্যবিবাহ রদ, বহুবিবাহ নিষিদ্ধ, নারীশিক্ষার প্রসার প্রভৃতি সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে নিয়োজিত করেছিলেন বিদ্যাসাগর। আর এ সব কর্মকাণ্ড সঠিক পথে চালানোর ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে তা তিনি পরিষ্কার বুঝতেন।

‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র পরে বাংলা সাময়িকপত্রের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ এক নতুন ধারা প্রবর্তন করে ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকা। ১৮৫৮ সালের ১৫ নভেম্বর (১২৬৫ বঙ্গাব্দের ১ অগ্রহায়ণ) সাপ্তাহিক সংবাদপত্র রূপে প্রকাশিত হয় ‘সোমপ্রকাশ’। এই পত্রিকা প্রকাশেরও আদত পরিকল্পনা বিদ্যাসাগরের। শুধু তা-ই নয়, প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত লেখাগুলিও তাঁর।

‘সোমপ্রকাশ’ যে বিদ্যাসাগরেরই পরিকল্পনা তা জানিয়ে ১৮৬৫ সালের ৯ জানুয়ারি ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ লিখেছে, “The Shoma Prokash was first published by Pundit Eswar Chunder Vidyasaghur, and we believe the first number was written by him…”।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখেছেন, “বিদ্যাসাগর মহাশয়ের আর এক কীর্ত্তি সোমপ্রকাশ। বিদ্যাসাগর মহাশয় দেখিতেন – যে-সকল বাংলা কাগজ ছিল, তাহাতে নানা রকম খবর থাকিত; ভাল খবর থাকিত, মন্দ খবরও থাকিত। লোকের কুৎসা করিলে কাগজের পসার বাড়িত, অনেক সময় কুৎসা করিয়া তাহারা পয়সাও রোজগার করিত। বিদ্যাসাগর মহাশয় দেখিলেন যদি কোনো কাগজে ইংরেজীর মত রাজনীতি চর্চ্চা করা যায়, তাহা হইলে বাংলা খবরের কাগজের চেহারা ফেরে। তাই তাঁহারা কয়েকজন মিলিয়া সোমপ্রকাশ বাহির করিলেন; সোমবারে কাগজ বাহির হইত বলিয়া নাম হইল সোমপ্রকাশ।”  

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পরিকল্পনামতো ‘সোমপ্রকাশ’ ছিল রাজনৈতিক সমাজসচেতন পত্রিকা। এই পত্রিকায় লেখার জন্য সম্ভাব্য লেখকদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রয়োজনমতো লেখা পাওয়া যেত না। তাই বিভিন্ন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার মধ্যেই স্বয়ং বিদ্যাসাগরকেই অনেক লেখা লিখতে হত এবং নানা পরামর্শ দিয়ে পত্রিকা সচল রাখতেন। বিহারীলাল সরকার লিখেছেন, “বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বয়ং সোমপ্রকাশে লিখিতেন।”

বিনয় ঘোষ লিখেছেন, “সোমপ্রকাশের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ, এবং নির্ভীক প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রত্যেক বিষয়ের আলোচনা ও সমালোচনা করা হতো। আলোচনার মানও এত উন্নত ছিল যে আজকের দিনেও সোমপ্রকাশের রচনাবলী পড়লে একেবারে আধুনিক রচনা বলে মনে হয়। একথা পরিষ্কার বোঝা যায় যে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরই সর্বপ্রথম এই ধরনের একখানি বলিষ্ঠ প্রগতিশীল বাংলা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পত্রিকার আবশ্যকতা বোধ করেছিলেন, এবং তাঁর প্রীতিভাজন বন্ধু দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণকে সেই পত্রিকা সঠিকভাবে নির্দিষ্ট পথে পরিচালনার ব্যাপারে সর্বপ্রকারে সাহায্য করেছিলেন।”

সোমপ্রকাশ পত্রিকা

এ বার হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ইংরেজি পত্রিকা ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকার কথায় আসা যাক। তখনকার দিনে নীলকর সাহেবদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ লিখত এবং একটি বিরাট আন্দোলনও সংঘটিত করেছিল। কাগজ চালানোর জন্য হরিশ্চন্দ্র পরিশ্রম করতেন এবং এর সঙ্গে ছিল তাঁর অতিরিক্ত মদ্যপানের নেশা। এরই ফলস্বরূপ ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুন মাত্র ৩৭ বছর বয়সে হরিশ্চন্দ্র প্রয়াত হন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিহিংসাপরায়ণ নীলকর সাহেবরা নানা কৌশলে এবং আইনের প্যাঁচে ফেলে ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ প্রেস এবং অন্যান্য সম্পত্তি নিজেদের করায়ত্ত করে হরিশ্চন্দ্রের অসহায় বিধবা পত্নীকে পথে বসানোর চেষ্টা করে। এই সংবাদ বিদ্যাসাগরের কানে পৌঁছোয়। তাঁর অনুরোধে তাঁর অত্যন্ত স্নেহভাজন কালীপ্রসন্ন সিংহ (হুতোম প্যাঁচা) পাঁচ হাজার টাকায় সব কিছু কিনে হরিশ্চন্দ্রের অসহায় পরিবার এবং ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকাটি বাঁচান। কালীপ্রসন্নের ইচ্ছায় তাঁর বন্ধু শম্ভুচন্দ্র মুখোপাধ্যায় পত্রিকার ম্যানেজিং এডিটর হন। কিন্তু বেশি দিন থাকতে পারলেন না তিনি। কালীপ্রসন্ন তখন পত্রিকার ভার বিদ্যাসাগরের হাতে অর্পণ করেন।

বিদ্যাসাগর তখন নানা কাজে ব্যস্ত। তাই অল্প কিছুদিন তিনি কুঞ্জলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে পত্রিকা সম্পাদনার কাজ চালিয়ে নিলেন। তার পর যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর ও বিদ্যাসাগর ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’-এর সম্পাদন-ভার মাইকেল মধুসূদনকে নিতে অনুরোধ করলেন। মাইকেল দায়িত্ব নিলেন, কিন্তু তিন মাস পর বিলেত চলে গেলেন ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য। বিদ্যাসাগর তখন ২৩-২৪ বছরের তরুণ কৃষ্ণদাস পালকে পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব দিলেন। কৃষ্ণদাস তখন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনে চাকরি করেন। সংবাদপত্র পরিচালনা, সম্পাদনা বা সাংবাদিকতায় তিনি অনভিজ্ঞ ছিলেন। তাই কৃষ্ণদাস নামে সম্পাদক হলেও বিদ্যাসাগরকেই সব কিছু করতে হত। বিদ্যাসাগরের অধীনে থেকেই সম্পাদকের কাজ করতেন কৃষ্ণদাস।

কৃষ্ণদাস পালের জীবনীকার রামগোপাল সান্যাল লিখেছেন, “কৃষ্ণদাস শ্রদ্ধেয় পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অনুগ্রহে হিন্দুপেট্রিয়টের সম্পাদকতা প্রাপ্ত হন।… কৃষ্ণদাস তখন বালক। সুতরাং বিদ্যাসাগর মহাশয় কৃষ্ণদাসের উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস না করিয়া নিজের ইচ্ছানুরূপ প্রবন্ধাদি তাহাকে দিয়া লিখাইয়া লইয়া হিন্দুপেট্রিয়ট চালাইতে লাগিলেন।…কৃষ্ণদাস বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অধীনে থাকিয়া হিন্দুপেট্রিয়ট চালাইতে বোধ হয় ইচ্ছুক ছিলেন না। তাই তিনি তলায় ব্রিটিস ইন্ডিয়ান সভার সভ্যদিগকে উক্ত কাগজের স্বত্বাধিকারী হইবার জন্য উত্তেজিত করিতে লাগিলেন। কালীপ্রসন্ন সিংহ মহাশয়ের নিকট প্রস্তাব হইতে লাগিল যে, হিন্দুপেট্রিয়ট বিদ্যাসাগরের অধীনে না রাখিয়া উহা কতিপয় ট্রস্টির হস্তে সমর্পিত হউক।…এই কথা চলাচালি হইতে হইতে বিদ্যাসাগর সময় পরিশেষে জানিতে পারিলেন যে, কালীপ্রসন্ন বাবুর নিকট এ প্রস্তাব হইতেছে। তেজস্বী ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ বিদ্যাসাগর এইরূপ লুকোচুরির মধ্যে থাকিবার লোক নহেন। তিনি অবিলম্বে হিন্দুপেট্রিয়টের কর্ত্তৃত্ব পরিত্যাগ করিলেন।”

বিনয় ঘোষের কথা দিয়েই এই নিবন্ধ শেষ করি। তিনি লিখেছেন, “নিজে সম্পাদক না হয়েও এবং সাংবাদিকের কাজ যথাযথভাবে না করে, বাংলা সাংবাদিকতাকে ক্ষুদ্রতার গণ্ডি থেকে মুক্ত ক’রে বিদ্যাসাগর বৃহত্তর ও সুস্থতর সমাজ-জীবনের দর্পণস্বরূপ করে তুলেছিলেন। বাংলাদেশে এই কারণে তাঁকে বলিষ্ঠ ও প্রগতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক সাংবাদিকতার অন্যতম প্রবর্তক ও পথপ্রদর্শক বলা যায়।”

খবর অনলাইনে আরও পড়তে পারেন

স্বামীজির সেই ঐতিহাসিক শিকাগো বক্তৃতা আজ যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক

Continue Reading

Amazon

Advertisement
রাজ্য2 hours ago

অসুস্থ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ছবি টুইটারে পোস্ট করে সমালোচনার মুখে রাজ্যপাল জগদীপ ধানখড়

Narendra Modi in Maan Ki Baat
দেশ2 hours ago

পুজো মণ্ডপে আগের মতো ভিড় হয়নি, উৎসবে মানুষ সংযত থাকছেন: নরেন্দ্র মোদী

দেশ3 hours ago

দৈনিক মৃতের সংখ্যা ফের ছ’শোর নীচে, সুস্থতার হার বেড়ে প্রায় ৯০ শতাংশ

দেশ4 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ৫০১২৯, সুস্থ ৬২০৭৭

currency notes
শিল্প-বাণিজ্য4 hours ago

মোরাটোরিয়াম: কয়েক দিনের মধ্যেই অ্যাকাউন্টে বাড়তি সুদের টাকা ফেরত পাবেন গ্রাহক

দেশ5 hours ago

কোভ্যাকসিনের ট্রায়াল শেষ হতে পারে এপ্রিলের পর, তবে জরুরি ব্যবহারের সম্ভাবনা তার আগেই!

বিদেশ5 hours ago

কোভিড আক্রান্ত হওয়ার পর ক্ষমা চেয়ে নিলেন পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট

ক্রিকেট14 hours ago

নাটকীয় প্রত্যাবর্তন! হারের দরজা থেকে জয় ছিনিয়ে নিল পঞ্জাব

দেশ4 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ৫০১২৯, সুস্থ ৬২০৭৭

রাজ্য3 days ago

সপ্তমীর দুপুরে সুন্দরবনে আঘাত হানবে অতি গভীর নিম্নচাপ, ভারী বর্ষণে ভাসতে পারে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী জেলা

ক্রিকেট2 days ago

হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভরতি কপিল দেব

কলকাতা2 days ago

কাশীবোস লেনে ‘দেবীঘট’, হাতিবাগানে ‘অসমাপ্ত’, নলীন সরকারে ‘পুজো এবার কাঠামোতে’, নর্থ ত্রিধারার ‘শ্রদ্ধার্ঘ্য’, সিকদারবাগানে ‘উৎসব’

covaxin
দেশ3 days ago

ভারত বায়োটেকের ‘কোভ্যাকসিন’কে তৃতীয় দফার পরীক্ষার জন্য ছাড়পত্র

ক্রিকেট3 days ago

মনীশ, বিজয়ের রেকর্ড জুটিতে রাজস্থানকে হারিয়ে দিল হায়দরাবাদ

কলকাতা2 days ago

মহাসপ্তমীতে কলকাতা মহানগরীর অচেনা ছবি

ক্রিকেট2 days ago

ব্যাটে-বলে দাপট মুম্বইয়ের, ছিন্নভিন্ন চেন্নাই

কেনাকাটা

কেনাকাটা2 weeks ago

মেয়েদের কুর্তার নতুন কালেকশন, দাম ২৯৯ থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক: পুজো উপলক্ষ্যে নতুন নতুন কুর্তির কালেকশন রয়েছে অ্যামাজনে। দাম মোটামুটি নাগালের মধ্যে। তেমনই কয়েকটি রইল এখানে। প্রতিবেদন...

কেনাকাটা3 weeks ago

‘এরশা’-র আরও ১০টি শাড়ি, পুজো কালেকশন

খবর অনলাইন ডেস্ক : সামনেই পুজো আর পুজোর জন্য নতুন নতুন শাড়ির সম্ভার নিয়ে হাজর রয়েছে এরশা। এরসার শাড়ি পাওয়া...

কেনাকাটা3 weeks ago

‘এরশা’-র পুজো কালেকশনের ১০টি সেরা শাড়ি

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজো কালেকশনে হ্যান্ডলুম শাড়ির সম্ভার রয়েছে ‘এরশা’-র। রইল তাদের বেশ কয়েকটি শাড়ির কালেকশন অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন...

কেনাকাটা4 weeks ago

পুজো কালেকশনের ৮টি ব্যাগ, দাম ২১৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : এই বছরের পুজো মানে শুধুই পুজো নয়। এ হল নিউ নর্মাল পুজো। অর্থাৎ খালি আনন্দ করলে...

কেনাকাটা4 weeks ago

পছন্দসই নতুন ধরনের গয়নার কালেকশন, দাম ১৪৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজোর সময় পোশাকের সঙ্গে মানানসই গয়না পরতে কার না মন চায়। তার জন্য নতুন গয়না কেনার...

কেনাকাটা4 weeks ago

নতুন কালেকশনের ১০টি জুতো, ১৯৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজো এসে গিয়েছে। কেনাকাটি করে ফেলার এটিই সঠিক সময়। সে জামা হোক বা জুতো। তাই দেরি...

কেনাকাটা1 month ago

পুজো কালেকশনে ৬০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে চোখ ধাঁধানো ১০টি শাড়ি

খবর অনলাইন ডেস্ক: পুজোর কালেকশনের নতুন ধরনের কিছু শাড়ি যদি নাগালের মধ্যে পাওয়া যায় তা হলে মন্দ হয় না। তাও...

কেনাকাটা1 month ago

মহিলাদের পোশাকের পুজোর ১০টি কালেকশন, দাম ৮০০ টাকার মধ্যে

খবরঅনলাইন ডেস্ক : পুজো তো এসে গেল। অন্যান্য বছরের মতো না হলেও পুজো তো পুজোই। তাই কিছু হলেও তো নতুন...

কেনাকাটা1 month ago

সংসারের খুঁটিনাটি সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে এই জিনিসগুলির তুলনা নেই

খবরঅনলাইন ডেস্ক : নিজের ও ঘরের প্রয়োজনে এমন অনেক কিছুই থাকে যেগুলি না থাকলে প্রতি দিনের জীবনে বেশ কিছু সমস্যার...

কেনাকাটা1 month ago

ঘরের জায়গা বাঁচাতে চান? এই জিনিসগুলি খুবই কাজে লাগবে

খবরঅনলাইন ডেস্ক : ঘরের মধ্যে অল্প জায়গায় সব জিনিস অগোছালো হয়ে থাকে। এই নিয়ে বারে বারেই নিজেদের মধ্যে ঝগড়া লেগে...

নজরে