রোদ্দুর রায় গালাগালি দিলে রাষ্ট্রের কিছু যায়-আসে না, কিন্তু সমাজ?

0
রোদ্দুর রায়। ছবি: ইউটিউব থেকে
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

রোদ্দুর রায় গালাগালি দেয়। কোথায়? সোশ্যাল মিডিয়ায়। কারা দেখে? সাধারণ মানুষ। লাভ হয় কার? রোদ্দুরের তো বটেই, ওই সব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেরও। সেগুলোকে কে স্বীকৃতি দিয়েছে? রাষ্ট্র। সরকারের অনুমোদন পেয়েই তারা ব্যবসা করছে। বিনিময়ে সরকারকে নানা ট্যাক্স দেয় তারা। তা হলে রোদ্দুর রায় যদি কাউকে গালাগালি দেয়, একাংশ হামলে পড়ে দেখে, সেই ভিডিও ভাইরাল হয়, তা থেকে ওই সব সংস্থার লাভ হয়, তাতে রাষ্ট্রের তেমন কিছু আসে-যায় কি? কিন্তু সমাজ?

বাক্‌স্বাধীনতার ব্যবহার-অপব্যবহার

অনলাইন ক্লাসে সড়গড় এখনকার খুদে পড়ুয়ারাও। সোশ্যাল মিডিয়া তাদের হাতের তালুর মতো চেনা। রোদ্দুরের গালাগালির স্বাদ থেকে তারাও বঞ্চিত হবে কেন! তাই বলে কি রাস্তা-ঘাটে, হাটে-বাজারে, এমনকী ঘরের ভিতরে কেউ গালাগালি করে না? করে। শিশুকে নিয়ে তেমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে বিব্রত বোধ করেন না অভিভাবক? কানে ঢুকে গেলেও অস্বস্তিতে পড়া অভিভাবক এমন একটা ভাব দেখান যেন তিনি কিছুই শোনেননি। মনে মনে বলেন, “সোনা, তুমিও কিছুই শোনোনি”।

প্রতিবাদের অধিকার রয়েছে রোদ্দুরেরও। এতদিন নানা বিষয় নিয়ে ডজন ডজন প্রতিবাদের ভিডিও তৈরি করেছে। আবার বেশকিছু এমন ভিডিয়োয় রয়েছে, যেগুলো ঠিক কী কারণে তৈরি, তা বলতে পারবে রোদ্দুর এবং তার গুণমুগ্ধরা। কিন্তু এখন সে প্রতিবাদের আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মুখ্যমন্ত্রীকে গালিগালাজ করেই। কে কী ভাবে প্রতিবাদ করবে, তার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম-রীতি-আইন নেই। বাকস্বাধীনতা অত্যন্ত জটিল বিষয়। তার ব্যবহার-অপব্যবহারের সীমারেখাও গভীর চর্চার বিষয়। তবে রাষ্ট্রের ক্ষমতা যার হাতে, সেই-ই নিজের মতো করে টেনে দেয় ‘লক্ষ্মণরেখা’। সংবিধান, পুলিশপ্রশাসন, আইন-আদালত ইত্যাদির প্রয়োগও হয় তার মর্জিমাফিক।

আপনি কি যেখানে-সেখানে করেন?

সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নিজের মতো করে প্রতিবাদ করেছে রোদ্দুর। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার মানসিকতা নিয়ে অসংখ্য মানুষ তাকে সমর্থনও জানিয়েছে। কিন্তু ইউটিউব ভিডিয়োর কমেন্ট বক্সে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, একটা বড়ো অংশের দর্শক প্রতিবাদকে সমর্থন করলেও ভাষাচয়ন নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। কেন নয়? গালাগালিগুলো কানে ঢোকার পর হয়তো মনের কোথাও একটা টোকা মেরেছে। সময়ের জ্বরে আপনি মানুন না-মানুন, শালীনতা আর অশালীনতার ফারাক আছে, থাকবেই। সেটা সবাই জানে।

কেউ বলছে, রোদ্দুর জনতার মুখপাত্র। কোটি জনতার মনের কথা খোলামেলা ভাবে বলার জন্য ধন্যবাদও জানিয়েছে অনেকে। কিন্তু কোন জনতা? পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা যে ‘বাচ্চা বাচ্চা’গুলো (রোদ্দুরের কথায়) পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মায়ের বয়সি মহিলার মুখে সামনে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দু’-চার অক্ষরের গালাগালি বেমালুম বলে চলে, সেই জনতা? তা হলে বলে রাখা ভালো, এই জনতাও কিন্তু বাড়ি ফিরে ‘সুশীল বালক’ হয়ে যায়। বাস্তবে, রোদ্দুরের মুখ থেকে খিস্তিখেউর শুনে যারা উদ্বাহু হয়ে সমর্থন করছে, তারাও কোনো না কোনো একটা জায়গায়, কোনো না কোনো একটা পরিস্তিতিতে এমন নিকৃষ্টমানের শব্দ উচ্চারণ থেকে বিরত থাকে। কারণ, কম-বেশি প্রত্যেকেই স্থান-কাল-পাত্রকে ধর্তব্যের মধ্যে রাখে। তাই যেখানে-সেখানে, যেমন-তেমন ভাষা প্রয়োগ করে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘বলে চলে গেলাম, দায় শেষ’ গোছের চরিত্রদের সংখ্যা কম না হলেও একটা জায়গায় গিয়ে তারাও সীমার ভেদাভেদ করে। কারণ যতই হোক, সেও সামাজিক জীব।

রোদ্দুরও ভালো মতোই জানত, সে কী বলছে? কেন বলছে? এর পরে কী হতে পারে? সব কিছুর আগাম প্রস্তুতি নিয়েই এমন ভিডিও। এর আগেও এমন অনেক ভিডিও করেছে। তার অনুগামী-অনুরাগীর সংখ্যাও কম নয়। তার মোক্সাবাদের শিকড় অনেক গভীরে। কিন্তু সে সবের খুঁটিনাটি বোঝার দরকার নেই। সমালোচনার সঙ্গে বাড়তি কিছু গালাগালি। চাটনির মতো। কেউ বারণ করেনি গালাগালি করতে। কিন্তু কোথায় করছি, কাকে করছি, সেই বিবেচনা বোধ না থাকলে তাকে তো অসুস্থ মানসিকতার ব্যক্তি হিসেবেই দেগে দেওয়া হয়।

সামাজিক মাধ্যমে সবার জন্যেই অবারিত দ্বার। কে কোনটা দেখবে আর কোনটাকে সরিয়ে দেবে, সেটা নিজের নিজের বিষয়। কিন্তু সর্বজনীন প্ল্যাটফর্মে এবং এক মহিলাকে উদ্দেশ্য করে যখন কোনো কাঁচা অশালীন মন্তব্য করছি, সেটা তো বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠবেই। ঠিক আছে, এর আগে বিশ্বকবিকে নিয়েও তো অনেক কটুকাটব্য করেছে রোদ্দুর। তখন তো এত কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি! হয়তো নেওয়া উচিত ছিল। তা হলে জল এতদূর গড়াত না। কিন্তু রোদ্দুর তো নিজেও সেই জায়গা থেকে এখন দূরে সরেছে। শেষ ক’দিন ধরে তার নিশানায় রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষে বসা এক মহিলা।

একপ্রকারের শ্লীলতাহানির সমান!

মানবাধিকার কর্মীদের একাংশের দাবি, রোদ্দুরের গ্রেফতারি আদতে মতপ্রকাশের অধিকারের উপর আক্রমণ। তার নি:শর্ত মুক্তি দাবি করে জারি হয়েছে প্রেস বিজ্ঞপ্তিও। আবার মানবাধিকার কর্মীদের আরেক গোষ্ঠীর যুক্তি, অতীতের একটি মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী, এহেন কুরুচিকর মন্তব্য একপ্রকার শ্লীলতাহানির মধ্যেই পড়ে।

ভারতের মতো দেশে আইন কোনো কোনো বিষয়ে বিশেষ সুরক্ষা দেয় শুধুমাত্র মহিলাদের। যেমন ধরা যাক, কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ আইন। আইনুযায়ী, কোনো যৌনতাবাচক কথা যদি কোনো মহিলাকে অস্বস্তিতে ফেলে, তবে ফ্লার্টিং ও যৌন হেনস্তা হিসেবে গণ্য হয়। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিন বছরের কারবাস, জরিমানা অথবা দুই শাস্তি হিসেবে ধার্য হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে হলেও বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটেও এই আইনের গ্রহণযোগ্যতা অনস্বীকার্য নয়।

বিরোধিতারও মাত্রা হয়

রাষ্ট্রবিজ্ঞান জ্ঞান অথবা পুলিশ, আইন-আদালত নিয়ে যথেষ্ট দখলদারি রয়েছে রোদ্দুরের। ভিডিও দেখার পর তার ভক্তরাও এ কথা বলে থাকে। নতুন একটা কায়দায় জনচেতনা গড়ে তোলার কারিগর হিসেবে চিহ্নিত করা হয় তাকে। তবে সেই কায়দায় কাদা ভরতি। রাজনীতিকরাও কাদা ছোড়াছুড়ি করে। অমিত শাহ থেকে শুরু করে শুভেন্দু অধিকারীরা তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। হাততালি পান। তাই বলে তাঁদের মন্তব্যে আলটপকা শব্দ (বেগম-টেগম বাদ দিলে) ঢুকে পড়ে বলে শোনা যায় না। শোনা যায়, এঁরাই তো এখন মমতার সবচেয়ে বড়ো সমালোচক। তা হলে কি রোদ্দুরকেও তাঁদের মতো হতে হবে?

মাথার দিব্বি দেয়নি কেউ। কিন্তু সমাজকে দ্রুত বিগড়ে দেওয়ার হাজারও উপকরণ এখন হাতের নাগালেই। সে সবকেই মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে আর একশ্রেণির প্রতিবাদী মানসিকতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বাক্‌স্বাধীনতার অপব্যবহার করছে রোদ্দুর। কে কত বড়ো প্রতিবাদী, নয়া বাদের জনক, সেটা প্রমাণ করতে প্রতিষ্ঠান অথবা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাপ্রাপ্তদের সমালোচনা বড়ো অস্ত্র। তাই বলে সামাজিক দায়বদ্ধতা অস্বীকার করে নিছক খিস্তিখেউরের মধ্যে দিয়ে সাময়িক ভাবে ‘রক্তগরম’ একাংশের সমর্থন মিললেও মিলতে পারে, ছাপ ফেলা যায় না। মজার কথা, ভিডিওগুলো দেখে মনে হয়, হয়তো রোদ্দুর নিজেও এ সব জানে। ফলে তারই পরিকল্পনা-প্রস্তুতি মতোই সবকিছু এগোচ্ছে! এর পরে কোনো অমলকান্তি এই রোদ্দুর হতে চাইলে, আটকাচ্ছে কে?

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন