Connect with us

কথাশিল্প

রবিবারের পড়া: জিরাফেও আছে, ধর্মেও আছে

Published

on

দীপঙ্কর ঘোষ

ঘোষের মিষ্টির দোকানের ভেতরে দুইখান বেঞ্চি পাতা। মিষ্টি-প্রদর্শনীর বাক্সের ওপরে একটা আলো জ্বলছে, তার আভায় আড্ডা জমে ক্ষীর। এটা মুক্ত আড্ডা। এখানে সর্বজ‍্যেষ্ঠ মানুষটি হলেন হীরকবাবু – ব্রহ্মতালু কেশহীন, দীর্ঘনাসা, কোটরগত উজ্জ্বল দু’টি চোখ, গালে খোঁচাখোঁচা পাকা দাড়ি। হাতে ও হেনরি তামাকের প‍্যাকেট আর সবুজ প‍্যাকেটে সিগারেটের মিহি কাগজ। প্রায়শই স্বহস্তরচিত সিগারেট একটা হলুদ রঙের লাইটার দিয়ে ধরাচ্ছেন। নানা বিষয়েই ওঁর বক্তব্য থাকে। বাকিদের পরিচয় যথাস্থানে উন্মোচিত হবে।

প্রবল ভক্ত থেকে তীব্র অতিবাম নারী পুরুষ, সবাই এই আড্ডায় যোগ দিয়ে থাকেন। এমত সময়ে কপালে তিলক কেটে সদ‍্য ‘ধার্মিক’ কিন্তু প্রাক্তন বামপন্থী নিতাইবাবু সাইকেলে করে আড্ডা সরগরম করতে হাজির হলেন। সাইকেল থেকে নেমেই ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে ঘোষের পো-কে একটা বিনা চিনি কালো চায়ের আদেশ করে বেঞ্চির শূন্যস্থান পূরণ করলেন।

Loading videos...

পরম ভক্ত ঝুলনকৃষ্ণ সাড়া দিলেন – “জয় গুরু। ধর্মের অভাবে আজ দেশের নারীজাতির এই দুরবস্থা। পাড়ায় পাড়ায় ধর্ষণ, নারীহত‍্যা। উফ্‌! খবরের কাগজ খুললে গা বমি বমি করে।”

নিতাইবাবু বেঞ্চিতে পা গুটিয়ে বসে বললেন, “একবার রামরাজত্ব এলে সব বন্ধ হয়ে যাবে। টোটাল স্টপ।” অতিবাম গৌরহরি নাসিকায় একটা খুরখুর শব্দ করে বললেন, “রাম? হুঁঃ।”

কথার পৃষ্ঠে কথা ওঠে। এবড়োখেবড়ো চুল কাটা ভূমিকাদেবী বললেন, “রাবিশ, যত সব পুরষতান্ত্রিক ধ‍্যানধারণা।” গলায় কন্ঠি পরা, কপালে তিলক কাটা পরম ভক্ত শ্রীমতী মন্দাক্রান্তা দেবী বললেন, “রাধে মাধব, রাধে মাধব। আজ আমরা পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ‍্যতা ত‍্যাগ করে বিলাইতি কায়দায় ধোঁয়া ফুঁকছি আর পোশাকের কী ছিরি মাগো মা। ধর্ষণ হবে না তো কী? সত্যি সত্যিই রামরাজত্ব‌ই ভালো ছিল”, বলে পিচিক করে নিতাইবাবুর কেয়ারি করা চুলের ওপর দিয়ে পরম কৌশলে পানের অবশিষ্টাংশ উড়িয়ে দিলেন। নিতাইবাবু সযত্নে একবার মাথায় হাত বুলিয়ে মাথার নিরাপত্তা বিষয়ে নিশ্চিন্ত হলেন।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: সখী ভালোবাসা কারে কয়?

হীরক তখন একটি জনসনের কানখুঁচুনি সাইজের সিগারেট বানিয়ে হলুদ লাইটার দিয়ে ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন – ফুসসসসসস। গৌরহরি এই শব্দটা শুনে বললেন, “মামু কিছু বলছো না?”

হীরকবাবু নীল ধোঁয়া অন্তরিভূত করে বললেন, “সীতার বাবা কে ছিলেন গো?” মহম্মদ মিরাজুল একটুও না ভেবে উত্তর দিলেন, “জনক রাজা।” ভূমিকাদেবীর আবার চুলে হাইলাইট আর কবিতা করা মিরাজুলের প্রতি একটু ইয়ে আছে। উনি মুখে হাত চাপা দিয়ে খুকখকিয়ে হেসে বললেন, “মামু হেইডা আপনে কী জিগাইলেন? হক্কলেই জানে জনক রাজা।”

হীরকবাবু বাধা দিয়ে বললেন, “সীতা একটি পরিত‍্যক্তা কন‍্যাশিশু। কাশ্মীরি রামায়ণে কথিত আছে, সীতামাইয়া রাবণ এবং মন্দোদরীর সন্তান। হয়তো কন্যা বলেই পরিত‍্যক্তা হয়েছিল, হয়তো আত্মজা বলেই রাবণ অপহরণ করেও ধর্ষণ করেনি।”

হীরকবাবু নিভন্ত সিগারেটে পুনরায় অগ্নিসংযোগ করে বলতে থাকেন, “রামের সঙ্গে সীতার বিবাহ ব‍্যাপারটাও কিঞ্চিৎ সন্দেহজনক।” নিতাই বলেন, “সে আবার কী কথা? হরধনু ভঙ্গ হল। মামু তুমি কি সেকু হয়ে গেলে নাকি?” হীরকবাবু ঠান্ডা মাথায় চায়ের ঠান্ডা অবশিষ্টাংশে সিগারেটের শেষ পর্ব নিমজ্জিত এবং পিষ্ট করে বলেন, “মহাভারত মানো? যেটায় শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা রচনা করেছিলেন? ওটা দ্বাপর যুগের ঘটনা। দ্বাপর যুগে ঋষি শ্বেতকেতু বিবাহ-প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেন। তার আগেই অর্থাৎ বহু কাল আগে ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র আবির্ভূত হন। অর্থাৎ শ্রীরামচন্দ্রের আমলে বিবাহ চালু হয়নি। আমাদের এই দু’টো পৌরাণিক উপাখ্যানে যদি বিশ্বাস রাখতে হয় তা হলে কোনটাকে বিশ্বাস করব সেটা বিচার্য তো বটেই। তাই না?”

গৌরহরি শ্বেতকেতুর ব্যাপারটা জানেন না। বলেন, “মামু, শ্বেতকেতু কে?” হীরকমামা একটু উদাস হয়ে বাতাসে ভেসে ওঠা গন্ধ শোঁকেন, “ও ঘোষবাবু আজকে কি ফুলকপির সিঙাড়া নাকি?” মিরাজুল হাঁক পাড়েন, “ও চাচা…এক দুই তিন…মোট সাতখান সিঙাড়া দ‍্যাও দেহি।”

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: খাবারের কোনো ধর্ম নেই, খাবার নিজেই একটি ধর্ম

মামু এক কামড় বসিয়ে বলেন, “আহা অমৃত…তবে বড্ড গরম! তোমরা আরুণির নাম জানো? গুরুর আদেশে যে ছাত্রটা ভাঙা আলের ওপর শুয়ে জলের স্রোত থেকে গুরুর ফসল বাঁচিয়েছিল?” সকলেই ঘাড় নেড়ে জানায়, শুনেছে। “এই আল ভেদ করে উঠে আসার কারণে গুরু আয়াধধৌম ওনার নামকরণ করেন উদ্দালক। এই উদ্দালকের তথাকথিত সন্তান হচ্ছে শ্বেতকেতু। তখন নারী ছিল গাভীর সমান। যে কোনো পুরুষ এসে নারীকে ভোগ করে যেতে পারত।”

গৌরহরির মতো লিবারেলও এই কথাটা শুনে মন্দাক্রান্তার মতোই চমকে ওঠেন, “তাই?”

“উদ্দালকের এক কামার্ত শিষ‍্যের ঔরসে শ্বেতকেতুর জন্ম হয়। এর পর একদিন এক ব্রাহ্মণ শ্বেতকেতু আর তার পিতা উদ্দালকের সামনে দিয়েই তার অনিচ্ছুক মাকে ভোগ করতে নিয়ে যায়।” মন্দাক্রান্তা, ভূমিকা এবং তৎসহ সমবেত সক্কলে মায় মিষ্টির দোকানের ঘোষবাবু পর্যন্ত আঁতকে ওঠেন। মামু নির্বিকার বলে যেতে থাকেন, “শ্বেতকেতু সর্ব বেদ শিক্ষান্তে বিশিষ্ট ঋষি হ‌ওয়ার পর বিবাহপ্রথা চালু করেন। পরদার গমন অথবা পরপুরুষ গমনে সমান শাস্তি নির্দিষ্ট করা হয়।”

ভূমিকাদেবী খুশি হয়ে হাততালি দিয়ে বলেন, “চমৎকার ব‍্যবস্থা। নারী, পুরুষের সমান বিচার।” মামু নতুন করে একটি সূক্ষ্ম সিগারেট বানাতে বানাতে বলেন, “আমি তো শুধুমাত্র হিন্দু পুরাণ নিয়ে আলোচনা করছি। তবে সব ধর্মেই নারী কেবলমাত্র  ভোগের বস্তু, এটা মোটামুটি স্বীকৃত। কেননা নারীদের শারীরিক শক্তি কম আর নারীকে শাস্তি দেওয়ার সহজতম উপায় তাকে গর্ভবতী করে দেওয়া। তাতে পৌরুষের গর্ব‌ও বজায় থাকে, সুখ‌ও হয়, আবার নারীকে অপমান করাও হয়। তবে ভূমিকা শোনো, নারীদের এই সমতা কিন্তু পৌরাণিক যুগেই ফের হরণ করা হয়।”

নিতাইবাবু বলে ওঠেন, “সেটা আবার কী ঘটনা?” “সেটা…মানে… একটু শ্লীলতার সীমা অতিক্রম করে যায় – বলব?” সকলেরই উদ্‌গ্রীব মুখ দেখে মামু পুনরায় আরম্ভ করেন, “সে যুগটা ছিল সমস্ত সামাজিক রীতিনীতির বাইরে – আসলে ধর্ম তো কোনো আগল মানে না, তাই না? ঋষি উতিথ‍্যর স্ত্রী মমতা যখন গর্ভবতী তখন দেবপুরোহিত বৃহস্পতি, যিনি আবার উতিথ‍্যর আপন ভাই, মমতাকে সম্ভোগেচ্ছা প্রকাশ করেন। এবং মমতার প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও তাঁকে ভোগ করেন। এটাই পুরাণে লেখা আছে। গর্ভস্থ দীর্ঘতমা পায়ে করে বৃহস্পতির বীর্য ঠেলে বার করে দেন। ফলত বৃহস্পতি সম্পূর্ণ সুখ পান না। এর ফলে বৃহস্পতির অভিশাপে দীর্ঘতমা জন্মান্ধ হয়ে জন্ম নেন। কিন্তু মমতার আশীর্বাদে মাতৃগর্ভ থেকেই সব শাস্ত্রবিশারদ হয়ে জন্মান। ওনার সঙ্গে প্রদ্বেষী নাম্নী এক বিদূষী মহিলার বিয়ে হয়। কিন্তু দীর্ঘতমা গোধর্ম পালন করতেন, তাই প্রদ্বেষী অত‍্যন্ত ক্ষুব্ধ হন।”

মিরাজুল মুখব‍্যাদান করে বলেন, “গোধর্ম? সেটা আবার কী? হাম্বা হাম্বা করে ডাকত?” ভূমিকা একা নয়, সকলেই সোৎসাহে প্রশ্ন করেন, “গোধর্ম কী জিনিস মামু?” কেবলমাত্র মন্দাক্রান্তা দেবী বিড়বিড় করতে থাকেন, “দেবগুরু বৃহস্পতি ধর্ষণ করেন? বৃহস্পতি? বৃহস…।” মন্দাক্রান্তা দেবী আর ভাষা খুঁজে পান না।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: সবার উপরে মানুষ সত্য

মামু নতুন সিগারেট মুখে ঠেকাতেই গৌরহরিবাবু একটা প্রজ্জ্বলিত দিয়াশলাই কাঠি সিগারেটের অগ্রে ধারণ করেন। মামু একগাদা ধোঁয়া ছেড়ে বলেন, “ইয়ে মানে গোধর্ম মানে হল যত্রতত্র প্রকাশ‍্যে যৌনক্রিয়া করা। শুধু বৃহস্পতি কেন, দেবরাজ ইন্দ্র থেকে কেউই এই রোগ থেকে মুক্ত ছিলেন না।”

ভূমিকাদেবী স্বগতোক্তি করেন, “এক্সহিবিশনিজম অ্যাট দ‍্যাট এরা…ও মাই গশ।” ঝুলনকৃষ্ণ কেবল বলতে পারেন, “খাইসে।” হীরকবাবু বলে চলেন, “প্রদ্বেষী বলে তুমি অন্ধ, আমি সংসার চালাতে কাহিল হয়ে পড়ছি তার ওপর তোমার এই ঢংয়ের গোধর্ম। তুমি বিদেয় হ‌ও। এ বার দীর্ঘতমা ভয়ানক রেগেমেগে বলে, আজ থেকে নারী বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে থাকতে বাধ্য হবে এবং স্বামীর মৃত্যুর পরেও ওই স্বামীর কথা ভেবে জীবন যাপন করতে হবে। ব‍্যস স্বাধীনতাহরণ!”

ভূমিকাদেবী বলেন, “এই ধর্ম, এই বিশ্বাস আবার ফিরে আসবে? আবার মানুষ যেমন খুশি মেয়েদের অপমান করবে? আমরা আবার ফিরে যাব সেই প্রাচীনতম অসভ‍্যতার যুগে?”

ঘোষবাবু মামুর জন্য বিনা অনুরোধে এককাপ চা নিয়ে আসেন। চায়ে চুমুক দিয়ে হীরকমামা বলেন, “না না, প্রাচীনতম সভ‍্যতা হল মেসোপটেমিয়া, প্রায় খ্রিস্টপূর্ব আট হাজার বছরের পুরোনো, তার পর হরপ্পা, তার পর রোমান, সিরিয়ান, গ্রিস, ইঙ্কা, মায়া, অ্যাজটেক,  মিশরীয় – এরা সব আগে পরে আছে। আর যে ভারতীয় সভ‍্যতার কথা আমরা বলি, সেটা আনুমানিক তিনশো খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু। ধর্ম চিরকালই নারীদের ব‍্যবহার করেছে। এ ছাড়াও জৈবপ্রবৃত্তির ব‍্যাপারটাও আছে। শিম্পাঞ্জি গোত্রের কিছু প্রাণীর ভেতরে ধর্ষণের তথ্য পাওয়া যায়।”

এতক্ষণ নীরব থাকা অভ্রদিতা বলে, “তা হলে কি শিক্ষা বোধ রুচি তৈরি করে পাশবিক প্রবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসা আর…”। ওর পাশে মুঠোফোনে সদাব‍্যস্ত তমোনাশ বলে, “আর ধর্মের সঠিক ব‍্যবহার – প্রাচীন ধর্মভাবনা থেকে বেরিয়ে আসা…তাই না মামু?”

হীরকমামা উত্তর না দিয়ে সিগারেটের লাল অগ্নিবিন্দু জ্বেলে একটু কুঁজো ভঙ্গিতে অন্ধকার ভেদ করে গৃহাভিমুখী হলেন।

প্রবন্ধ

সামনে ভোট, বরাদ্দ-ব্যবসা তো জমবেই!

কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তালিকায় এক নম্বরে পশ্চিমবঙ্গ! তা না হলে ভোটপ্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সরকারের কাছে ‘হিসেব’ চাইবেন কী ভাবে?

Published

on

নরেন্দ্র মোদী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

গরিবের হয়ে গলা ফাটাচ্ছে সরকার! গরিবের ঘরে ঢুকে হাঁড়ির খবর নিচ্ছে সরকার! একের পর এক প্রকল্প-তহবিলের খবর দিচ্ছে সরকার! তা হলে কি ভোট এসে গেল?

করোনা-কোভিড করে চিৎকার চলুক, তারই মাঝে কড়া নেড়ে দিয়েছে ২০২১-এর বিধানসভা ভোট। সংবাদ মাধ্যমের ভাষায় ‘একুশের মহারণ’। মহারথীরা ময়দানে নেমে পড়েছেন। রঙ-বেরঙের পতাকা, সারি সারি মাথা আর সময়-সুযোগ পেলেই গরিবের জন্য দু’-চার কথা। এখন অবশ্য শুধু কথায় চিঁড়ে ভেজে না। ‘মাল’ খসাতে হয়। সেটা মোক্ষম বোঝেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। বিজেপি-বিরোধী রাজ্য সরকার সাড়ে চার বছর কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগ তুলে আসবে, আর তার পর ভোটের মুখে কেন্দ্রের হাত উপুড়। কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক একটি পরিসংখ্যান তো তেমনটাই বলছে।

১-এ পশ্চিমবঙ্গ!

করোনাভাইরাস মহামারি রুখতে ২০২০-র মার্চে দেশব্যাপী লকডাউন জারি করেছিল কেন্দ্র। ওই লকডাউন কার্যকর হওয়ার পর থেকে গ্রামোন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। গ্রামীণ পরিকাঠামো এবং কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে এই মেয়াদে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে যে তহবিল বরাদ্দ করেছে, তা থেকে সব থেকে বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের জন্য। ভালো কথা! কিন্তু করোনা প্রভাবিত রাজ্যগুলির মধ্যে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্যগুলির তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ তো প্রথম স্থানে নেই! তা হলে বরাদ্দের তালিকায় কেন পশ্চিমবঙ্গ?

Loading videos...

আবার এমনও নয়, দেশের অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় সব থেকে পিছিয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। তা হলে কেন?

প্রথমত, বছর ঘুরলেই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট। এবং দ্বিতীয় ও শেষ কারণ, সারা দেশ জুড়ে অশ্বমেধের ঘোড়া ছোটালেও এখনও রাজ্যটিতে ক্ষমতা কায়েম করতে পারেনি কেন্দ্রের শাসক দল। হিসেবটা কী করে এতটা সহজ হল?

কারণ, এই মেয়াদে রাজ্যগুলির জন্য কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিহার। যেখানে অক্টোবর-নভেম্বর (২০২০)-এর বিধানসভা ভোট হয়ে গেল। ১০ নভেম্বর এগিয়ে যাওয়া আর পিছিয়ে থাকার টানটান উত্তেজনা শেষে কুর্সি দখলে রেখেছে বিজেপি এবং মিত্রশক্তি।

কে কত পেল?

গ্রামোন্নয়নমন্ত্রকের পরিসংখ্যান বলছে, মার্চ-নভেম্বর (২০২০) মেয়াদে সব মিলিয়ে ছ’টি প্রকল্পে ৪৯ হাজার ২৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যে জুটেছে ৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। বিহারের জন্য বরাদ্দ ৫ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। এর পরে যথাক্রমে রয়েছে মধ্যপ্রদেশ (৪ হাজার ৯৭৪ কোটি), উত্তরপ্রদেশ (৪ হাজার ৬৩৬ কোটি) এবং ওড়িশা (৪ হাজার ৫৩৫ কোটি)।

বিহার ভোটের পাট চুকেছে। মধ্যপ্রদেশেও বিজেপি সরকারের ভাগ্য নির্ধারণে ২৫টি আসনে উপ-নির্বাচনে বিজেপি সরকারের স্থায়িত্ব মজবুত হয়েছে। অন্য রাজ্যগুলির বরাদ্দ-বণ্টনে ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক কারণও হেলাফেলার নয়। তবে এই বরাদ্দের তালিকায় একেবারে শেষ জায়গায় রয়েছে গোয়া। তাদের জন্য এই মেয়াদে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ২.১ কোটি টাকা। এখানেও যেমন কাজ করেছে জনসংখ্যার অঙ্ক।

খাতের পরিচয়

মূলত ছ’টি খাতেই এই তহবিল বরাদ্দ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। যেগুলির মধ্যে রয়েছে মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাসিস্ট্যান্টস (এমএনআরইজিএ), প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা (পিএমজিএসওয়াই), শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি রুর্বন মিশন, ন্যাশনাল সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম, ন্যাশনাল রুরাল লাইভলিহুড মিশন (এনআরএলএম) এবং প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (পিএমএওয়াই)।

পশ্চিমবঙ্গের মতোই বছর ঘুরলেই ভোট অসমেও। পিএমজিএসওয়াই প্রকল্পে সেখানে বরাদ্দের পরিমাণ সব থেকে বেশি (১ হাজার ২৮৫ কোটি)। আবার পিএমএওয়াই প্রকল্পে সব থেকে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ (৩ হাজার ৭৫১ কোটি)। ছিটেফোঁটা ব্যতিক্রম যে নেই, তাও নয়। ২০২১-এ বিধানসভা ভোট তামিলনাড়ুতেও। কিন্তু পিএমএওয়াই প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ মেলেনি এই মেয়াদে। আবার গোয়া, গুজরাত, হরিয়ানা অথবা তেলঙ্গনাও এই প্রকল্পে কোনো তহবিল পায়নি।

অন্য দিকে ন্যাশনাল সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম-এর অধীনে সব থেকে বেশি বরাদ্দ জুটেছে বিহারের ভাগ্যে। উত্তরপ্রদেশ পেয়েছে ১ হাজার ২১৮ কোটি, কিন্তু জনসংখ্যা অনেক কম হলেও বিহার পেয়েছে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। উত্তরপ্রদেশের পরে তৃতীয় স্থানেই পশ্চিমবঙ্গ (৬৫৩ কোটি)।

আরও যে ভাবে

ঘূর্ণিঝড়, বন্য, ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত পশ্চিমবঙ্গ-সহ ছয় রাজ্যের জন্য জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিল থেকে মোট ৪ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় উম্পুনের ক্ষতিপূরণবাবদ পশ্চিমবঙ্গকে আরও ২ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে ওই খাতে। ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শনে এসে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ফলে সব মিলিয়ে হল ৩ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। কিন্তু এটা কি যথেষ্ট?

রাজ্যের শাসক দল বলছে, মোটেই নয়। গত ১৩ নভেম্বর কেন্দ্রের তরফে এই ঘোষণার পর তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় স্পষ্টতই জানিয়ে দেন, উম্পুন বিধ্বস্ত অঞ্চল পরিদর্শনে এসে প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার ধারেকাছে পৌঁছোয়নি এই বরাদ্দ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, উম্পুনের তাণ্ডবে রাজ্যে ১ লক্ষ ২ হাজার ৪৪২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

বকেয়া এবং বঞ্চনা

লকডাউনের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, কেন্দ্রের কাছে রাজ্যের ৫৩ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।

তৃণমূলের জাতীয় মুখপাত্র ডেরেক ও ব্রায়েন জানান, গত এক বছরে কেন্দ্রের সাহায্যে চলা প্রকল্পগুলিতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া। রাজ্যের রাজস্ব আদায় বাবদ প্রাপ্য, খাদ্য ভরতুকি এবং জিএসটি বাবদ বকেয়ার তালিকাও দীর্ঘ। যা নিয়েই বঞ্চনার অভিযোগ তুলছে রাজ্য সরকার।

এ দিকে ভোট এসে গেল!

বিহারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে যে ভাবে বিহারের মানুষ করোনাকে এড়িয়ে ভোট দিয়েছেন (বিজেপিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছেন), তাতে তাঁদের ধন্যবাদই প্রাপ্য। পশ্চিমবঙ্গেও ভোট আসছে। মনে হয় না করোনা এখনই ‘টাটা বাইবাই’ করবে। তারই মধ্যে ভোটপ্রচারে নেমে পড়েছে শাসক-বিরোধী সকলেই। বরাদ্দ-ব্যবসাও সমানে চলবে। তা না হলে বাংলায় ভোটপ্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সরকারের কাছে ‘হিসেব’ চাইবেন কী ভাবে?

আরও পড়তে পারেন: শহর ছেড়ে তুমি কি চলে যেতে পারো তিন ভুবনের পারে

Continue Reading

প্রবন্ধ

সৌমিত্র, কবে যে চলে এলে গৃহস্থের রান্নাঘর থেকে বৈঠকখানা হয়ে শীতের ছাদে আলোচনায়

সবাই চাইছিল, তুমি এক টানে সব খুলে বেরিয়ে আসবে, যেমন করে টান দিয়েছিলে হীরকরাজার মূর্তিতে। কিন্তু না, সব মায়া কাটিয়ে চলে গেলে তুমি।

Published

on

পাপিয়া মিত্র

ক্লাসের প্রথম হওয়া ছাত্রীটিকে ঘিরে সহপাঠীদের জটলা। কী হল… তার পরে… বল বল। মানে ওই যে দেবদাস যখন গাছের তলায় শুয়ে রয়েছে আর ওই যে পাতাগুলো, মানে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে… পাশ থেকে একজন বলল, ঝুরঝুর করে। হ‍্যাঁরে, গাছতলায় শুয়ে রয়েছে পারুর দেবদা। উফ্ জাস্ট ভাবতে পারছি না। হয়তো অষ্টম শ্রেণি। ও দেখে ফেলেছে আর…।

অনেকেই শুরু করে দিয়েছে শরৎচন্দ্র পড়তে। যাদের উপায় আছে তারা লুকিয়ে পড়ছে আর যাদের সেটুকু নেই তাদের থেকে জেনে নেওয়ার জন্য স্কুল কামাই নেই।

Loading videos...
‘দেবদাস’।

সাধারণ প্রেক্ষাগৃহে রমরমিয়ে চলছে দেবদাস। সৌমিত্র-উত্তম অভিনীত। সুপ্রিয়া-সুমিত্রা অভিনীত। কেমন হল রে? কেউ বলছে, আহা উত্তমের কী গাওয়া – শাওন রাতে যদি…। তখন পাড়ার জলসা থেকে মঞ্চের অনুষ্ঠানেও। আর প্রেমে ব‍্যর্থ হওয়া ছেলের দল তো চিহ্নিত হয়ে গিয়েছিল, মদ খাই সব ভুলতে। কী নিরহঙ্কার সরল প্রেমে আপ্লুত দুই যুবক-যুবতী, যেন আমার আপনার ঘরের দেওর ননদটি। সেই কিশোরীবেলার প্রেমিকটিকে অজান্তেই নিজের করে নেওয়া। নানা হলের সিনেমার বিজ্ঞাপন দেখা খবরের কাগজে, সেটাও খানিক লুকিয়েচুরিয়ে।

একটা বুদ্ধিদীপ্ত, ছিপছিপে, লম্বা, মাথাভর্তি চুল আর সব আভিজাত‍্য এসে শেষ হয়েছে খোদাই করা নাসিকায়। এমন এক নায়কের কী কী সিনেমা চলছে, কোন কোন হলে, কান খাড়া থাকত বাড়ির বড়োদের কথায়। সেটা তো মোবাইলের যুগ নয় যে গুগল আন্টিকে জিজ্ঞেস করে নেওয়া যাবে। জানার ইচ্ছে, দেখার তাগিদ, শোনার আগ্রহ, খবর পেলেই হল, বই খাতা নোটস আনার অছিলায় গল্প গিলে আসা।

‘তিন ভুবনের পারে’।

আসলে সব সংসার তখন খুব একটা স্বাধীনচেতা ছিল না। সৌমিত্র চট্টোপধ‍্যায়ের বই দেখার থেকে গৃহস্থ বেশি পছন্দ করত উত্তমকুমারের সিনেমা দেখতে। কিন্তু এ-ও ঠিক কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রী আর এক শ্রেণির মানুষের কাছে সৌমিত্র হয়ে উঠেছিলেন এক আদর্শ নাগরিক।

কিন্তু রোগের কাছে কেন হারিয়ে গেল খিদদার ‘ফাইট কোনি, ফাইট’ চিৎকার? কেন বসন্তবিলাপের শ‍্যামের আগুন লাগার উত্তপ্ত গান নিভে গেল? ওই তো যেন শোনা যাচ্ছে চারুবৌঠানকে নিয়ে গাইছে ‘আমি চিনিগো চিনি তোমারে’। ওই তো দেখছি, উদ্ধত সন্দীপ দাঁড়িয়ে আছে বিমলার কাছে। ময়ূরবাহন আর সাড়া দেবে না। তোমার ঘোড়া যে ছটফট করছিল ঝিন্দের পাহাড়িপথে তোমাকে নিয়ে ঘুরবে বলে। তোমার কাজল, তোমার মুকুল, তোমার ক‍্যাপটেন স্পার্ক, তোমার পোস্ত, তোমার তোপসে আর তোমার ফেলুদার কাহিনি লেখার অপেক্ষায় ছিলেন লালমোহনবাবু কিন্তু তুমি চলে গেলে। তোমার মাথার কাছে শ্বাস ফেলছিল হীরকরাজা। তুমি তো তাকে ছেড়ে দাওনি।

‘চারুলতা’।

‘তিন ভুবনের পারে’, ‘জীবন সৈকতে’, ‘স্ত্রী’, ‘প্রথম কদম ফুল’, ‘পরিণীতা’, ‘বাঘিনী’, ‘বাক্স বদল’, ‘মাল‍্যদান’, ‘মণিহার’-সহ অনেক ছবি একে একে গৃহস্থের রান্নাঘর থেকে বৈঠকখানা হয়ে শীতের ছাদে আলোচনায় চলে এল। কোথাও মনকাড়া গান, কোথাও টানটান গল্প। কোথাও তুমি অধ‍্যাপক, কোথাও তুমি গাড়ির ড্রাইভার। কোথাও তুমি বেকার ইঞ্জিনিয়ার, কোথাও তুমি ডাক্তার। গৃহস্থের কাছে তুমি বোকা বোকা হাসির নায়ক হলেও তোমাকে কেউ কোনো দিন গাছের ডালপালা ধরে নাচতে দেখেনি। এখানেই তোমার চরিত্রের বিশেষত্ব। তোমার বুদ্ধিদীপ্ত মুখের অভিব‍্যক্তি সামনে এনে দিল অন্য ধরনের চলচ্চিত্র। ভেঙে মুচকে দিল ‘অশনি সংকেত’, ‘গণদেবতা’, ‘গণশত্রু’, ‘অরণ‍্যের দিনরাত্রি’, ‘শাখাপ্রশাখা’, ‘হুইল চেয়ার’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘একটি জীবন’, ‘আবার অরণ্যে’, ‘পাতালঘর’, ‘সংসার সীমান্তে’র মতো কিছু উদাহরণ। গৃহস্থের অন্য নায়কের সঙ্গে তুলনা টানায় ছেদ পড়ল। তুলনাহীন ফেলুদাকে চিনতে শুরু করে দিল ‘সোনার কেল্লা’ আর ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ দিয়ে। প্রদোষ মিত্র, তুমি অবশেষে চির ঘুমের দেশে চলে গেলে।

তোমাকে দেখে শিখতে হয়েছে নিজের জন্য জায়গা রাখা। তুমি বুঝতে শিখিয়েছ পূর্ণ সংসার করেও একা থাকার দরকার, অন্তত নিজেকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য। শব্দহীন চোরা স্রোতে ভেসে ওঠে ফেলে আসা প্রেমবেলা। ‘বেলাশেষে’ দেখে অনেকেই ভেবেছে এ-ও হয়। হয়তো হতে পারে ভেবে অনেকের কপালে ভাঁজ পড়েছে। কেননা সেখানে জীবনের প্রান্তে এসে স্ত্রীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার বাসনা। এক ছেলে চার কন‍্যা নাতি-নাতনির ভরা সংসারে অনাবিল আনন্দের পাশাপাশি পেয়েছি ‘পোস্ত’কে। যেখানে একা দাদুঠাকুমা থাকতে চাইছে পোস্তকে নিয়ে।

তুমি যত এগিয়ে এসেছ, তুমি ততটাই গৃহস্থের ঘরের বাবা, জেঠু, শ্বশুর, দাদু, ঠাকুরদা হয়ে উঠেছ। এই করোনা-আবহে এখনকার প্রযুক্তির দৌলতে তোমার কত সিনেমা দেখেছি জান? তোমার ফিরে আসার পথের বাঁকে নন্দিনীরা অপেক্ষা করছিল। তুমি ফিরলে না।

‘জয় বাবা ফেলুনাথ’।

তোমার প্রতিদিন পড়ার অভ্যাস যে গীতবিতান, তার পাতা উড়ছে হেমন্তের মৃদু হাওয়ায়। তোমার সঞ্চয়িতা অপেক্ষা করছিল কোন কবিতা আবার রেলগাড়ির কামরায় আবৃত্তি করতে করতে যাবে। সকলের আকুল প্রার্থনা ছিল, উঠে পড় উদয়ন পণ্ডিত। তুমি যে মুক্তির স্বাদ দিয়েছিলে পাঠশালার ছেলেদের। ওরা তোমার জন্য বই খুলে বসেছিল। সবাই চাইছিল, তুমি এক টানে সব খুলে বেরিয়ে আসবে, যেমন করে টান দিয়েছিলে হীরকরাজার মূর্তিতে। কিন্তু না, সব মায়া কাটিয়ে চলে গেলে তুমি।

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

প্রয়াত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, থামল ৪০ দিনের ‘ফাইট’!

Continue Reading

প্রবন্ধ

পরমাণু চুক্তি, মনমোহন সরকারের উপর থেকে বামেদের সমর্থন প্রত্যাহার এবং জো বাইডেন

২০০৮ সালে মার্কিন সেনেটের মার্কিন-ভারত অসামরিক পরমাণু চুক্তির অনুমোদনের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন জো বাইডেন!

Published

on

২০১৩-য় ভারত সফরে বাইডেন। ফাইল ছবি
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হোক বা বিহারের বিধানসভা ভোট, অন্তর্জালের বিশ্বে সব কিছু নিয়েই আগ্রহ তুঙ্গে! তবে আমেরিকার সদ্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত জো বাইডেনকে (Joe Biden) নিয়ে বাঙালির মাত্রাহীন উৎসাহে (অথবা আদিখ্যেতায়) আবার চোখ টাটাচ্ছে একাংশের। ব্যঙ্গ করে কেউ তাঁকে বলছেন ‘যতীন বৈদ্য’, কেউ আবার নাম দিয়েছেন ‘জয় ব্যানার্জি’। কিন্তু ভারতের সঙ্গে মার্কিন রাজনীতির তুখোড় ব্যক্তিত্ব বাইডেনের সম্পর্কও খুব একটা খাটো নয়।

১৯৭৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সেনেটর ছিলেন বাইডেন। তার পর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন দেশের ৪৭তম ভাইস-প্রেসিডেন্টের। অর্থাৎ, ভুঁইফোঁড় রাজনীতিক তিনি নন। তার উপর সেনেটর থাকাকালীন তিনি ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির চেয়ারম্যান। এই সময়ে মার্কিন-ভারত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং সিদ্ধান্তের অংশীদার বাইডেন। বিশেষত, ২০০৮ সালে মার্কিন-ভারত অসামারিক পরমাণু চুক্তির প্রসঙ্গ না টানলেই নয়!

সেনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে বাইডেন ২০০৮ সালে মার্কিন সেনেটে মার্কিন-ভারত অসামরিক পরমাণু চুক্তি (US-India Civil Nuclear Agreement) অনুমোদনের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় বেশ কয়েকটি আইন প্রণয়নের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন প্রথম সারির প্রবক্তা।

Loading videos...

ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন এই পরমাণু চুক্তি সম্পাদনের জন্য তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ (George W. Bush) এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের (Manmohan Singh) অধীনে আলোচনা শুরু করেছিল, তখন সেনেটে বাইডেন ছিলেন ভারতের পক্ষে সমালোচক।

২০০৮-এর প্রথম দিকে মার্কিন কংগ্রেস ভারতের সঙ্গে এই চুক্তি অনুমোদনের আগে বাইডেন আরও দুই সেনেটর চক হেগেল এবং জন কেরির সঙ্গে ভারত সফরে এসেছিলেন। বাইডেন ছিলেন এই চুক্তির ধারাবাহিক প্রবক্তা এবং অবশ্যই এটির সাফল্যের নেপথ্যেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

একই সঙ্গে তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে রীতিমতো ঝড় তুলেছিল এই ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছোয় যেন, কেন্দ্রের সরকার হুড়মুড়িয়ে পড়ে যায়। ২০০৪ সালের লোকসভা ভোটে ক্ষমতায় আসে ইউপিএ। ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে বামপন্থীদের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী হন ডা. মনমোহন সিং। কিন্তু বছর চারেক নরমে-গরমে কাটলেও আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু চুক্তিকে কেন্দ্র করে ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করে বামপন্থী দলগুলি। চুক্তি থেকে পিছু না হঠলে তাঁরা সরকার থেকে সমর্থন তুলে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।

রাজ্য, শহর-গ্রামে বামপন্থীরা ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির কুফল তুলে ধরে ব্যাপক প্রচারে নামেন। কিন্তু কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার নিজের অবস্থানে অনড়। এর পর ২০০৮ সালের ৯ জুলাই, চার বাম নেতা প্রকাশ কারাত, এবি বর্ধন, দেবব্রত বিশ্বাস এবং চন্দ্রচূড়নের স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিবৃতিতে ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি সম্পাদনের প্রতিবাদে ইউপিএ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করা হয়।

তা হলে কি সরকার পড়ে গেল? না! সে যাত্রায় সরকার শুধু টিকে গেল তেমনটা নয়, ২০০৯ সালে ফের লোকসভা ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হলেন মনমোহন। আর পশ্চিমবঙ্গের মতো আঁতুড়ঘরে ক্ষয় শুরু হল বামপন্থীদের। ২০০৯-এর সেমিফাইনালে গুটিয়ে অর্ধেক হয়ে যাওয়া বামফ্রন্ট ২০১১-র বিধানসভায় রাইটার্স বিল্ডিং থেকেই ‘ভ্যানিশ’!

হয়তো একেই বলে, ধান ভানতে শিবের গীত! তবে ভারত-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্কে বাইডেনের ভূমিকা মোটেই ফেলনার নয়। আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের আকাঙ্ক্ষার ঘোর সমর্থক বাইডেন। এশিয়ার সমস্ত বড়ো অর্থনীতির দেশগুলিকে নিয়ে নতুন একটি কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান আগেই জানিয়েছিলেন বাইডেন। যেখানে ভারতের জন্যও নির্দিষ্ট আসনের দাবি ছিল তাঁর।

ভাইস-প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০১৩ সালের ২২ জুলাই আবার এক বার ভারত সফরে আসেন স্ত্রী জিল বাইডেনকে নিয়ে। চার দিনের ওই সফরে একাধিক কর্মসূচিতে যোগ দেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দিল্লিতে গান্ধী স্মৃতি মিউজিয়াম ঘুরে দেখেন। শুধু তা-ই নয়, মুম্বইয়ে দেশের প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতিদের সঙ্গে একটি গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন। উল্লেখযোগ্য ভাবে, বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের একটি অনুষ্ঠানে সে বার তিনি ভাষণও দেন।

আমেরিকার ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান – উভয়ের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখার নজির রয়েছে ভারতীয় রাষ্ট্রনেতাদের। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) গভীর বন্ধুত্ব প্রায়শই আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। তবে বাইডেনের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্ক মোটের উপর মন্দ নয়।

২০১৪ সালে আমেরিকা সফরে গেলে মোদীর জন্য মধাহ্নভোজনের আয়োজন করেন বাইডেন। বছর দুয়েক বাদে ফের সফরে মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেন মোদী, নেতৃত্ব দেন বাইডেন। আসলে ওবামা-বাইডেন প্রশাসনের হাত ধরে ভারতের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্ক মসৃণ পথে এগিয়ে যাওয়ার যে অভীপ্সা, সেটাই ট্রাম্পের লম্বা ছায়ার নীচেই লালিত-পালিত হচ্ছে বাইডেনকে আঁকড়ে ধরে।

নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল, বাইডেন হোয়াইট হাউসের দখল নেওয়ার পর এইচ-১বি সহ সমস্ত উচ্চ দক্ষতাযুক্ত ভিসায় রাষ্ট্র অনুমোদনের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিতে চলেছেন। আবার এমনটাও শোনা গিয়েছে, অন্তত পাঁচ লক্ষ প্রবাসী ভারতীয়কে স্থায়ী ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব দিতে পারেন নতুন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। ভারতের জন্য সুখকর হতে পারে এমনই কিছু খবর উড়ে বেড়াচ্ছে। তবে বাপু, না আঁচালে বিশ্বাস নেই!

আরও পড়তে পারেন: ‘এক সঙ্গে কাজের অপেক্ষায়’, জো বাইডেনকে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন নরেন্দ্র মোদী

Continue Reading
Advertisement
মালদা44 mins ago

মালদহের মানিকচকে ভেসেল উলটে ৮টি ট্রাক পড়ল গঙ্গায়, বেশ কিছু মানুষ নিখোঁজ

ফুটবল2 hours ago

পেনাল্টি কাজে লাগিয়ে প্রথম ম্যাচে ৩ পয়েন্ট ঘরে তুলল হায়দরাবাদ

রাজ্য6 hours ago

রাজ্যের নতুন সংক্রমণ নেমে এল সাড়ে তিন হাজারের ঘরে, কমল দৈনিক মৃত্যুও

বন্ধন ব্যাঙ্ক
শিল্প-বাণিজ্য6 hours ago

এবার কলকাতা মেট্রোর স্মার্ট কার্ডে থাকবে বন্ধন ব্যাঙ্কের লোগো

বিদেশ9 hours ago

যুদ্ধ বাধাতে পারেন ‘দুর্বল’ জো বাইডেন, আশঙ্কা করছে চিন

দেশ9 hours ago

অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ প্রয়াত

বিনোদন10 hours ago

মাদক মামলায় জামিন পেলেন ভারতী সিংহ ও হর্ষ লিম্বাচিয়া

বাঁকুড়া10 hours ago

ডিসেম্বর থেকে ‘দুয়ারে দুয়ারে সরকার’, নয়া প্রকল্পের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

কেনাকাটা

কেনাকাটা3 days ago

লিভিংরুমকে নতুন করে দেবে এই দ্রব্যগুলি

খবর অনলাইন ডেস্ক: ঘরের একঘেয়েমি কাটাতে ও সৌন্দর্য বাড়াতে ডিজাইনার আলোর জুড়ি মেলা ভার। অ্যামাজন থেকে তেমনই কয়েকটি হাল ফ্যাশনের...

কেনাকাটা5 days ago

কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস, দাম একদম নাগালের মধ্যে

খবর অনলাইন ডেস্ক: কাজের সময় হাতের কাছে এই জিনিসগুলি থাকলে অনেক খাটুনি কমে যায়। কাজও অনেক কম সময়ের মধ্যে করে...

কেনাকাটা3 weeks ago

দীপাবলি-ভাইফোঁটাতে উপহার কী দেবেন? দেখতে পারেন এই নতুন আইটেমগুলি

খবর অনলাইন ডেস্ক : সামনেই কালীপুজো, ভাইফোঁটা। প্রিয় জন বা ভাইবোনকে উপহার দিতে হবে। কিন্তু কী দেবেন তা ভেবে পাচ্ছেন...

কেনাকাটা4 weeks ago

দীপাবলিতে ঘর সাজাতে লাইট কিনবেন? রইল ১০টি নতুন কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আসছে আলোর উৎসব। কালীপুজো। প্রত্যেকেই নিজের বাড়িকে সুন্দর করে সাজায় নানান রকমের আলো দিয়ে। চাহিদার কথা মাথায় রেখে...

কেনাকাটা2 months ago

মেয়েদের কুর্তার নতুন কালেকশন, দাম ২৯৯ থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক: পুজো উপলক্ষ্যে নতুন নতুন কুর্তির কালেকশন রয়েছে অ্যামাজনে। দাম মোটামুটি নাগালের মধ্যে। তেমনই কয়েকটি রইল এখানে। প্রতিবেদন...

কেনাকাটা2 months ago

‘এরশা’-র আরও ১০টি শাড়ি, পুজো কালেকশন

খবর অনলাইন ডেস্ক : সামনেই পুজো আর পুজোর জন্য নতুন নতুন শাড়ির সম্ভার নিয়ে হাজর রয়েছে এরশা। এরসার শাড়ি পাওয়া...

কেনাকাটা2 months ago

‘এরশা’-র পুজো কালেকশনের ১০টি সেরা শাড়ি

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজো কালেকশনে হ্যান্ডলুম শাড়ির সম্ভার রয়েছে ‘এরশা’-র। রইল তাদের বেশ কয়েকটি শাড়ির কালেকশন অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন...

কেনাকাটা2 months ago

পুজো কালেকশনের ৮টি ব্যাগ, দাম ২১৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : এই বছরের পুজো মানে শুধুই পুজো নয়। এ হল নিউ নর্মাল পুজো। অর্থাৎ খালি আনন্দ করলে...

কেনাকাটা2 months ago

পছন্দসই নতুন ধরনের গয়নার কালেকশন, দাম ১৪৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজোর সময় পোশাকের সঙ্গে মানানসই গয়না পরতে কার না মন চায়। তার জন্য নতুন গয়না কেনার...

কেনাকাটা2 months ago

নতুন কালেকশনের ১০টি জুতো, ১৯৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজো এসে গিয়েছে। কেনাকাটি করে ফেলার এটিই সঠিক সময়। সে জামা হোক বা জুতো। তাই দেরি...

নজরে