Connect with us

কথাশিল্প

ভারতে বিমুদ্রাকরণের পিছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা / ২

(প্রথম পর্বের পর) দ্য বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্স Loading videos… বিশ্ব জুড়ে নগদের বাজারকে সঙ্কুচিত করার লক্ষ্যে ২০১২-তে এই সংস্থা তৈরি হয়, যার অন্যতম সদস্য ইউএসএআইডি। নিউইয়র্কে ইউনাইটেড নেশনস ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে এর সচিবালয়। এই কারণেই বোধহয় পূর্ববর্তী দু’টি বছরের একটিতে গেটস্‌-ফাউন্ডেশন এবং আরেকটিতে মাস্টার কার্ড- ফাউন্ডেশন রাষ্ট্রপুঞ্জের এই ছোট্টো দরিদ্র সংগঠনটিকে উদার ভাবে সাহায্য […]

Published

on

(প্রথম পর্বের পর)

দ্য বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্স

Loading videos...

বিশ্ব জুড়ে নগদের বাজারকে সঙ্কুচিত করার লক্ষ্যে ২০১২-তে এই সংস্থা তৈরি হয়, যার অন্যতম সদস্য ইউএসএআইডি। নিউইয়র্কে ইউনাইটেড নেশনস ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে এর সচিবালয়। এই কারণেই বোধহয় পূর্ববর্তী দু’টি বছরের একটিতে গেটস্‌-ফাউন্ডেশন এবং আরেকটিতে মাস্টার কার্ড- ফাউন্ডেশন রাষ্ট্রপুঞ্জের এই ছোট্টো দরিদ্র সংগঠনটিকে উদার ভাবে সাহায্য করেছিল।

নগদকে সঙ্কুচিত করলে যাদের লাভ সব চেয়ে বেশি সেই সব বৃহৎ মার্কিন-প্রতিষ্ঠান এই অ্যালায়েন্সের সদস্য। এই প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে রয়েছে মাস্টার কার্ড ও ভিসা-র মতো ক্রেডিট কার্ড কোম্পানি এবং সেই সব মার্কিন প্রতিষ্ঠান যাদের নাম মার্কিন গোয়েন্দা সার্ভিসেসের ইতিহাস বইগুলোতে অনেক বারই উঠে এসেছে যেমন ফোর্ড ফাউন্ডেশন, ইউএসএআইডি ইত্যাদি। গেটস্‌-ফাউন্ডেশনও একটি উল্লেখযোগ্য সদস্য। ই বে-র ওমিডিয়ার নেটওয়ার্ক-এর প্রতিষ্ঠাতা পিয়ের ওমিডিয়ার এবং ‘সিটি’ এই অ্যালায়েন্সের গুরুত্বপূর্ণ অর্থ-জোগানদার। অ্যালায়েন্স সদস্যদের বেশির ভাগই নগদের উপর নির্ভরতা নির্মূল করার উদ্দেশ্যে তৈরি ইউএসএআইডি-ভারত উদ্যোগের অন্যতম অংশীদার। এই উদ্যোগ এবং ক্যাটালিস্ট-কর্মসূচি ‘দ্য বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্স’-এর আর একটু বিস্তৃত সংস্করণ, যেখানে যোগ দিয়েছে ভারত ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের বেশ কিছু সংস্থা যাদের নগদ অর্থনীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভালো রকম ব্যবসায়িক স্বার্থ নিহিত আছে।

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার আইএমএফ-শিকাগো সন্তান

ভারতে নগদ বাজার সঙ্কোচনের জন্য এই সমঝোতার পরিকল্পনা কিন্তু রাতারাতি হয়নি। রঘুরাম রাজন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর থাকার সময়কাল (২০১৩, সেপ্টেম্বর– ২০১৬, সেপ্টেম্বর) জুড়েই এই পরিকল্পনা চলছিল। রাজন ছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পদ ছেড়ে আবার ফিরে গিয়েছেন সেখানে। ২০০৩ সাল থেকে ২০০৬ সাল অবধি রাজন ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের মুখ্য অর্থনীতিক ছিলেন। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ‘গ্রুপ অফ থার্টি’-রও সদস্য রাজন। এটি একটি সন্দেহজনক সংগঠন। এরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে গোপনে নানা রকম চিন্তাভাবনা, আর পরিকল্পনা বিনিময় করে এবং সেই সব আলোচনার কোনো সূচি রাখা হয় না। নগদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষেত্রে এই গোষ্ঠী যে অন্যতম সমন্বয়-কেন্দ্র হিসাবে কাজ করেছে, সেই বিষয়টি ক্রমশ সামনে আসতে শুরু করেছে। কেন রগফ, ল্যারি সামার্স-এর মতো নগদ-বিরোধী যুদ্ধের সৈনিকরাও এই গোষ্ঠীর সদস্য।  

আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার আরও উঁচু ধাপে ওঠার ইচ্ছা থাকার যথেষ্ট কারণ রাজনের আছে। তাই ওয়াশিংটনের খেলার অন্যতম খেলোয়াড় হওয়াও তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক। এর আগে আমেরিকান ফিনান্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাজন এবং অর্থনৈতিক গবেষণায় প্রথম ফিশার-ব্ল্যাক পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়াও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে অর্থনৈতিক গবেষণার জন্য ইনফোসিস পুরস্কার, আর্থিক অর্থনীতির জন্য ডয়েশ ব্যাঙ্ক পুরস্কার এবং ইকনমিকসের সব চেয়ে ভালো বই লেখার জন্য ফিনান্সিয়াল টাইমস/গোল্ডম্যান স্যাকস পুরস্কার। ন্যাসকমের ‘বর্ষসেরা ভারতীয়’-র সম্মান এবং ‘ইউরোমানি’ ও ‘দ্য ব্যাঙ্কার’-এর ‘বর্ষসেরা সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কার’ সম্মানও জুটেছে তাঁর। আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে ক্রিস্টিন ল্যাগার্ডের সম্ভাব্য উত্তরসূরির তালিকায়ও জ্বলজ্বল করছে তাঁর নাম। তবে আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থার আরও অনেক উচ্চ পদেও যেতে পারেন তিনি।

দেশের শীর্ষ ব্যাঙ্কের গভর্নর হিসেবে আর্থিক ক্ষেত্রের শীর্ষ স্থানীয়দের কাছে রাজন খুবই সম্মাননীয় ও পছন্দের মানুষ ছিলেন, কিন্তু বিনিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারে যতই তাঁর আগ্রহ থাকুক উৎপাদন ক্ষেত্রের মানুষজনদের কাছে তিনি ছিলেন রীতিমতো অপছন্দের।  তার কারণ অবশ্য তাঁর ‘সীমাবদ্ধ’ অর্থনৈতিক নীতি। এই নীতির তিনিই প্রবক্তা এবং জোরদার সমর্থক। শাসক দলের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রচণ্ড সমালোচিত হওয়ার পর জুন মাসেই তিনি ঘোষণা করেন সেপ্টেম্বরে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় তিনি আর দায়িত্ব নেবেন না। পরে তিনি ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-কে বলেছিলেন, তিনি থাকতে চেয়েছিলেন, তবে পুরো মেয়াদের জন্য নয় এবং এই ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আপত্তি ছিল।   এই প্রসঙ্গে প্রাক্তন বাণিজ্য ও আইনমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম স্বামী বলেছিলেন, রঘুরাম রাজনের গভর্নরশিপ শেষ হওয়ায় খবরে দেশের শিল্পপতিরা খুশি- “আমি তো এটা চেয়েইছিলাম। প্রধানমন্ত্রীকে পরিষ্কার করে বলেও ছিলাম। ওঁর (রাজনের) যাঁরা লক্ষ্য তাঁরা মূলত পশ্চিমী…। আমার কাছে দলে দলে লোক আসত, বলত কিছু একটা করুন…।”   

দুর্ঘটনা, যা ঘটারই ছিল

ভারতের অধিকাংশ ব্যাঙ্কনোট অবৈধ ঘোষণা করার এই যে যুদ্ধ, তার প্রস্তুতিতে যদি রাজন জড়িয়ে থাকেন এবং এ বিষয়ে যে কোনো সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই তা রাজনের ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগ ও নগদ ব্যবস্থাপনায় ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে বলাই যায়, তাহলে এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে এই গোটা ঘটনার পিছনে তাঁর থাকাই স্বাভাবিক। যাদের উপকারের নামে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির দোহাই দেওয়া হয় সেই বেশির ভাগ গ্রামীণ ও দরিদ্র ভারতবাসীই যে নোট বাতিলের উদ্যোগে সব চেয়ে বেশি দুর্দশায় পড়বেন, এই ব্যাপারটায় এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিস্মিত করে না। ইউএসএআইডি এবং তার অংশীদাররা গোটা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে। ‘বিয়ন্ড ক্যাশ’ রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ভারতে এখনও ৯৭ শতাংশ লেনদেন নগদেই হয়, এবং মাত্র ৫৫ শতাংশ মানুষ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন। এই ৫৫ শতাংশের মধ্যে “মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ গত তিন মাস ধরে ব্যবহার করছেন।”

এটা সবটাই ভালো ভাবে জানা ছিল এবং একেবারে স্থিরনিশ্চিত ছিল যে, বাজারের বেশির নগদ রাতারাতি বিলোপ করলে দেশের বহু ছোটো ব্যবসায়ী এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের (যেখানে আশেপাশে কোনো ব্যাঙ্ক নেই)  উৎপাদক ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হবে, এমনকি অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। যখন নোট বাতিল হল তখন পরিষ্কার হয়ে গেল, নগদকে পিছনে ঠেলে ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আশ্বাস কতটা মিথ্যে। বাজার অর্থনীতিতে প্রত্যেকের যোগদান কাম্য হলে লেনদেনের ক্ষেত্রে ভারতের মতো দেশে নগদের কোনো বিকল্প হয় না।

নগদের ওপর এই আঘাত ভিসা, মাস্টারকার্ড ও পেমেন্ট পরিষেবা প্রদানকারী অন্যান্য সংস্থা, যাদের দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের মতো অস্তিত্বের কোনো সংকটে পড়তেই হল না, তাদের কাছে বড়োই লাভজনক হল। ‘পরীক্ষামূলক অঞ্চলেও’ ডিজিটাল পেমেন্ট ‘বেড়ে গেল’।  চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে বিপুল পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হলেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাঁরা সেই ক্ষতি বহন করতে সক্ষম, তাঁরাই পরবর্তীতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেনদেনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিলেন। ব্যাঙ্ক এবং এটিএম থেকে টাকা তোলার ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করায় উপভোক্তারাও এখন কার্ড ব্যবহার করার সুযোগ খুঁজবেন, যাতে উপকার হবে মাস্টারকার্ড, ভিসা-সহ ‘বেটার দ্যান ক্যাশ’ জোটের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সদস্যদের।

বিশ্ব জুড়ে নগদের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের কেন এই যুদ্ধ

বিশ্ব জুড়ে নগদের ব্যবহার সংকুচিত করার জন্য মার্কিন সরকারের প্রবল আগ্রহের অন্যতম কারণ হল বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি ও পেমেন্ট ব্যবসার নিয়ন্ত্রক মার্কিন কোম্পানিগুলির স্বার্থ রক্ষা। কিন্তু সেটাই একমাত্র কারণ নয়। সম্ভবত সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণও নয়। আরেকটি কারণ হল, ডিজিটাল পেমেন্টের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের মাধ্যমে নজরদারি করার ক্ষমতা। ব্যাঙ্কের মাধ্যমে সমস্ত আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং এ সংক্রান্ত অধিকাংশ ডিজিটাল ডেটা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এবং তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলির নখদর্পণে রাখাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। আর্থিক তথ্যই হল সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান তথ্য।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, মুদ্রার গুরুত্বের বিচারে ডলারের স্থান ও মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় মার্কিন কোম্পানিগুলির প্রতিপত্তি, নগদহীন অর্থনীতির বিশ্ববাজারে মার্কিন সরকারকে ক্রমশ সর্বক্ষমতাশালী করে তুলেছে। অন্য সব দেশকেই স্থানীয় কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের পরিবর্তে মাথা নোয়াতে হচ্ছে মার্কিন আইনের কাছে। কী ভাবে তা ঘটছে তা পরিষ্কার হয়ে যায় সম্প্রতি ‘ফ্রাঙ্কফুর্টার আলগেমাইনে ৎসাইটুং’ নামে এক জার্মান সংবাদপত্রে প্রকাশিত হাড় হিম করা এক প্রতিবেদন থেকে। জানা যায়, ইরানের সঙ্গে আইনসঙ্গত ভাবে ব্যবসা করা সত্ত্বেও এক জার্মান সংস্থার কর্মচারীদের মার্কিন প্রশাসনের তৈরি জঙ্গি-তালিকায় রাখা হয়েছে। এর অর্থ হল, বেশির ভাগ আর্থিক ব্যবস্থা থেকে তাদের দূরে রাখা হয়েছে, এমনকি কিছু রসদ বহনকারী কোম্পানিও তাদের তৈরি আসবাব পরিবহন করছে না। আরও দৃষ্টান্ত আছে। মার্কিন অনুরোধে জার্মানির এক বড়ো ব্যাঙ্ক থেকে বহিষ্কার করতে হয়েছে বেশ কিছু কর্মচারীকে, যাঁরা কোনো রকম অবৈধ বা অন্যায় কাজকর্মে জড়িত নন।

এ রকম অসংখ্য উদাহরণ আছে। প্রতিটি আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্ককে মার্কিন সরকারের আদেশানুসারে চলতে বাধ্য করতে পারে আমেরিকা। আদেশ না মানলে রয়েছে আমেরিকায় বা ডলারে বাণিজ্য করার লাইসেন্স বাতিলের হুমকি। এটা হওয়া আর ব্যাঙ্ক বন্ধ করে দেওয়া, দু’টোর মধ্যে খুব একটা তফাত নেই। ডয়েশ ব্যাঙ্কের কথাই ভাবুন। ১৪০০ কোটি ডলার জরিমানা দিয়ে তারা ব্যবসা থেকে পাততাড়ি গোটাবে, নাকি ৭০০ কোটি ডলারে রাজি করিয়ে বাঁচার চেষ্টা করবে, এই নিয়েই মার্কিন ট্রেজারির সঙ্গে কয়েক মাস ধরে আলাপআলোচনা চালাতে হল তাদের। শেষ পর্যন্ত ৭০০ কোটি দিয়ে বাঁচল। একটা দেশের হাতে যখন অন্য দেশের ব্যাঙ্ককে দেউলিয়া করার ক্ষমতা থাকে এবং সেই দেশটা বেশ বড়ো দেশ, তখন সেই দেশের সরকারকেও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তার থাকবে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং সেই সংক্রান্ত তথ্যের মাধ্যমে আধিপত্য করার ক্ষমতা ইতিমধ্যেই রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। বিশ্ব জুড়ে নগদের ব্যবহার যত কমবে, আমেরিকার হাতে এই ক্ষমতা ততই পুঞ্জিভূত হবে। কারণ নগদের ব্যবহার এই ক্ষমতাকে অনেকটাই নড়বড়ে করে দিতে পারে। (শেষ)

সৌজন্যে : গ্লোবাল রিসার্চ

Advertisement
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

প্রবন্ধ

স্বামী নিত্যসত্যানন্দ মহারাজের সঙ্গে সেই কুড়িটা মিনিট কোনো দিনও ভুলব না

খুব বেশি হলে কুড়িটা মিনিট সময় কাটিয়েছিলাম স্বামীজির সঙ্গে। কিন্তু তাতেই কত আপন করে নিয়েছিলেন তিনি। মনে হচ্ছিল কত দিনের পরিচিত।

Published

on

রয় ভিলার সামনে স্বামী নিত্যসত্যানন্দজি মহারাজ।

শ্রয়ণ সেন

“এই ব্যাটা, অত প্রণামটনাম করতে হবে না! এমনিই আশীর্বাদ করলুম।”

Loading videos...

আজও খুব স্পষ্ট ভাবে মনে পড়ছে কী সুন্দর আর মজার ছলে কথাটা আমায় বলেছিলেন স্বামী নিত্যসত্যানন্দ মহারাজ। এখনও পরিষ্কার ভাবে মনে পড়ছে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার সেই দিনটা।

২০২০-এর জানুয়ারি। দার্জিলিংয়ের রায় ভিলায় বেড়াতে গিয়েছি। এই বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন সিস্টার নিবেদিতা। সেটি বর্তমানে রামকৃষ্ণ মিশনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা নিবেদিতা শিক্ষা-সংস্কৃতি কেন্দ্র। আর তারই দায়িত্বে ছিলেন স্বামী নিত্যসত্যানন্দ মহারাজ।

‘ছিলেন’ কেন বললাম? কারণ, রবিবার সন্ধ্যায় মন খারাপ করা খবরটি পেলাম।

রামকৃষ্ণলোকের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন স্বামী নিত্যসত্যানন্দ মহারাজ। অত্যন্ত আকস্মিক ভাবে সবাইকে কাঁদিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি।

সংবাদটা বিশ্বাস করতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। মাত্র এক বছর আগেই যে মানুষটা আমাদের সঙ্গে মজার ছলে কিছুটা সময় কাটালেন, ‘ভূতকোঠি’ থেকে নিবেদিতা-সাধনার কেন্দ্র গড়ে ওঠার গল্প শোনালেন, যে মানুষটার সঙ্গে গত জানুয়ারিতেও প্রায় সাক্ষাৎ হয়েই যাচ্ছিল, তিনি আকস্মিক ভাবে চলে গেলেন কেন? কী-ই বা তাড়া পড়েছিল তাঁর।

২০১৩ সালে যে বাড়িটায় ‘রামকৃষ্ণ মিশন নিবেদিতা এডুকেশনাল অ্যান্ড কালচারাল সেন্টার’ (Ramakrishna Mission Nibedita Educational and Cultural Centre) গড়ে ওঠে, সেই রায়ভিলা তার আগে পর্যন্ত স্থানীয়দের কাছে ভূতকোঠি নামে পরিচিত ছিল।

–“প্রথম যখন এসেছিলেন, আপনাদের ভয় করেনি?”

–“না। আসলে জানেন তো, যারা দুষ্টুমি করে, আমার মতে তারা ভীতু হয় বেশি। তাই এরা আমাদের কোনো বাধা দেয়নি।”

— “সাত বছর হল আপনারা এসেছেন, স্থানীয়দের মনোভাব কেমন বুঝছেন?”

স্বামীজি তখন বলেছিলেন, প্রথমে স্থানীয়দের সন্দেহ ছিল। ‘ভূতকোঠি’তে আবার কী শুরু হচ্ছে, এই নিয়ে ভয়ডরও ছিল। কিন্তু মিশনের কাজ শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই সেই ভয় কেটে যায়।

ওই আড্ডার মধ্যেই পেছন থেকে এসে স্বামীজির গাল টিপে জড়িয়ে ধরল এক কিশোরী।

— “এঁরা বোধহয় নিজেদের বাড়িতে ভালোবাসা খুব একটা পায় না, না?”

— “ভালোবাসার অভাব তো ছিলই। সেটা আমরা পূরণ করার চেষ্টা করছি। মনে হচ্ছে সফলও হচ্ছি।”

এই কেন্দ্রের জন্যই এই আশেপাশের খুদেদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হয়ে গিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রায় ৭০ জনের পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন এখানকার মহারাজরা। স্কুল থেকে সোজা এখানে চলে আসে খুদেগুলো। বিভিন্ন বিষয়ে পড়ানোর পাশাপাশি আদর্শ মানুষ কী ভাবে হবে, সেই পাঠও দেওয়া হয়। আর এই সবই হচ্ছিল স্বামী নিত্যসত্যানন্দের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়।

বাঙালি সমতল আর নেপালি দার্জিলিংয়ের মধ্যে তাঁরা একটা সেতুবন্ধনের কাজ করছে বলেও জানিয়েছিলেন স্বামী নিত্যসত্যানন্দ, আর সেই ব্যাপারে তাঁরা অনেকটাই সফল হয়েছেন।

এ ছাড়া নানা রকম ত্রাণকাজ তো রয়েছেই। দার্জিলিংয়ের সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে। বৃষ্টি-ধস-ভূমিকম্প কত কী লেগে থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে প্রথমেই ত্রাণের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে মিশন। এ ছাড়া চা-বাগানগুলিতে রোজই ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়।

খুব বেশি হলে কুড়িটা মিনিট সময় কাটিয়েছিলাম স্বামীজির সঙ্গে। কিন্তু তাতেই কত আপন করে নিয়েছিলেন তিনি। মনে হচ্ছিল কত দিনের পরিচিত।

গত মাসে যখন দার্জিলিং গিয়েছিলাম, ইচ্ছে ছিল একবার স্বামীজির সঙ্গে দেখা করে আসি। কিন্তু সেটা হয়নি। কিন্তু তখন একবারও মনে হয়নি যে তাঁর সঙ্গে আর কোনো দিনও দেখা হবে না।

শুনলাম স্বামীজি নাকি ধ্যান করতে করতে দেহত্যাগ করেছেন। তাঁকে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। কে বলতে পারে, হয়তো আগে থেকেই বুঝে গিয়েছিলেন এমন সময় আসতে চলেছে তাঁর। এই কারণেই বোধহয় এঁরা মহাপুরুষ!

স্বামী নিত্যসত্যানন্দ মহারাজ হয়তো শরীরে থাকলেন না। কিন্তু দার্জিলিংয়ের রায় ভিলা জুড়ে তিনিই থাকবেন। তাঁর দেখানো পথেই যে নিবেদিতা-সাধনার কেন্দ্রটি চলবে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।

Continue Reading

কথাশিল্প

অনাথ ও পরিত্যক্ত কৈশোরের ‘মা’ সুপর্ণা, কাজের স্বীকৃতিতে পেয়েছেন রাজ্য সরকারের পুরস্কার

নতুন বছরের শুরুতেই অনাথ অথবা পরিত্যক্ত ছেলেমেয়েদের লাগাতার বায়না মেটাতে নিজের প্রায় শতাধিক ছবি বিলি করতে হয়েছে সুপর্ণাকে।

Published

on

suparna kantha
নিপীড়িত নিঃসহায় ছেলেমেয়েদের অবলম্বন সুপর্ণা কণ্ঠ। নিজস্ব চিত্র।

কৃষ্ণ আজাদ

একজন মানুষ সর্বসাধারণের কাছে গর্বের ধন হয়ে ওঠেন যখন তিনি মানুষের পাশে থাকেন। সরকারি চাকরি যাঁরা করেন তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধেই অভিযোগ হল, ওঁরা সময়ের কাজ সময়ে করেন না, অনীহা অথবা উদাসীনতার কারণে। এ ব্যাপারে অতীত থেকে বর্তমান, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করেছেন। কিন্তু মানুষের এই অভিযোগ দূর হয়নি। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সরকারি কর্মীদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, মানুষের কাজ যেন আটকে না থাকে।

Loading videos...

সুপর্ণা কণ্ঠ একজন সরকারি কর্মী। রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের (West Bengal health department) অ্যাডোলেসেন্স হেলথ্‌ কাউন্সেলর (Adolescence Health Counsellor)। গত ১২ বছর ধরে সুপর্ণার কাজের ক্ষেত্র জয়নগর গ্রামীণ (Jaynagar Rural Hospital) হাসপাতাল। মাসের অনেকটা সময় কাজ করেন প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতেও।

ব্রিটিশরা ভারতীয়দের হাতে শাসনক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে স্বদেশে ফিরে গিয়েছে কয়েক দশক আগে। ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশের গ্রামগুলি শোচনীয় পরিস্থিতিতে ছিল। গ্রামকে গ্রাম মানুষ উজাড় হয়ে যেত মড়কে। গ্রাম্য নারীপুরুষ আধুনিক সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। গ্রামজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ছিল অশিক্ষা, দারিদ্র্য। সেই পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ বদল আজও হয়নি।

শহর গ্রামের কাছাকাছি এসেছে। আর এতে বিপদও বেড়েছে। শহরের রঙিন হাতছানি অনেক গ্রামবাসীকে বিপথগামী করছে, জালে পড়ছেন গ্রামবাসীরা। ফলে নেশার উৎপাত, মেয়েদের প্রতি অবহেলা, অপরাধমূলক কাজ থেকে শুরু করে পুরোনো দিনের সমস্যাগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও নতুন নতুন বিপদ।

সুপর্ণাকে সরকারি স্বীকৃতি – ‘স্বাস্থ্য সম্মান’। নিজস্ব চিত্র।

নাবালিকা বিবাহ, নারীপাচার, নবজাত সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়া, সন্তানকে ফেলে বাবা, মা দু’ জনেরই আর একটি বিয়ে করে পালিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা শুধু বাংলার নয়, সারা দেশেরই সমস্যা।

হেলথ্‌ কাউন্সেলরের চাকরিতে যোগ দিয়েই সরকারি কর্মী হিসেবে উল্লিখিত সমস্যাগুলো কোন পথে মোকাবিলা করা যায় তা নিয়ে ভেবেছেন সুপর্ণা। খাতায় কলমে নয়, এর বাস্তব সমাধানে সদা তৎপর সুপর্ণা। জয়নগর গ্রামীণ হাসপাতালের হেলথ্‌ কাউন্সেলর সুপর্ণা ইতিমধ্যে বেশ কিছু নাবালিকা বিবাহ রুখে দিয়েছেন, প্রসূতি-মৃত্যু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়ে সফল হয়েছেন, স্কুলছুট ছেলেমেয়েদের ফের জীবনের মূল স্রোতে ফিরিয়ে এনেছেন, মাদকাসক্ত হয়ে পড়া নাবালকদের সুস্থ জীবন উপহার দিয়েছেন, অনাথ নাবালক, নাবালিকাদের বুকে জড়িয়ে সাহচর্য দিয়েছেন।

সুপর্ণা জানালেন, বয়স্ক পুরুষ ও মহিলাদের জীবনেরও নানা সমস্যার কথা শুনতে হয় তাঁকে। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেন। কুলতলি ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ ভালোবাসেন সুপর্ণাকে।

আদতে কলকাতার মেয়ে সুপর্ণা লেখাপড়া করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। লেখাপড়ার বিষয় ছিল সোশিওলজি। এর পর কিছু দিন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় চাকরি করেছেন। পরে সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়ে স্বাস্থ্য দফতরের কাজটা পেয়ে যান।

সুপর্ণার কথায়, “ছোটোবেলা থেকেই সেবামূলক কাজ করার খুব ইচ্ছে ছিল। এক সময় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সুযোগ পেয়ে পড়িনি। তার পরিবর্তে সোশিওলজি পড়লাম। এটা পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হল, আমার মনে হয়েছে এই বিষয়টা নিয়ে পড়লে ভবিষ্যতে সামাজিক কাজ করতে পারব। সেই চেষ্টা খানিক সফল হয়েছে বলতে পারেন।”

পিতৃ-মাতৃহীন অথবা বাবা-মা পরিত্যাগ করেছে যে সমস্ত ছেলেমেয়েকে, কাউন্সেলর হিসেবে সুপর্ণা তাদের পরিচর্যা করেন, নিছক সরকারি কর্মী হিসেবে দায় সারতে নয়। আপনি আচরি ধর্ম পালন করে কাজ না করা অথবা কর্তব্য পালনে উদাসীনতার যে বদনাম সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধে রয়েছে, স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে সুপর্ণা সেই বদনাম অনেকটা ঘুচিয়েছেন।

সুপর্ণার ছবি হাতে। নিজস্ব চিত্র।

কথাটা বাড়িয়ে বলা নয়। নতুন বছরের শুরুতেই অনাথ অথবা পরিত্যক্ত ছেলেমেয়েদের লাগাতার বায়না মেটাতে নিজের প্রায় শতাধিক ছবি বিলি করতে হয়েছে সুপর্ণাকে। সুপর্ণা বললেন, “স্কুল খুললেই আরও ৪০০ জন ছাত্রীকে আমার ছবি দিতে হবে। না হলে ওরা বায়না ছাড়বে না। ওদের মা নেই। ওরা বলেছে, দিদি তোমার একটা ছবি দাও। মায়ের মতো আপনজন তুমি।”

কাজের স্বীকৃতিতে সরকারি এবং বেসরকারি একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন সুপর্ণা। রাজ্য নারী ও শিশু কল্যাণ দফতর সুপর্ণাকে পুরস্কৃত করেছে।

প্রত্যেক মানুষের জীবনেই বিভিন্ন সমস্যা থাকে। নিশ্চয়ই জীবনের নিয়মে নানা ঘাত-প্রতিঘাত সামলাতে হয় সুপর্ণাকেও। কিন্তু সামলান কী ভাবে?

সুপর্ণা বললেন, “আমি নিজেও মায়ের সঙ্গে থাকি। আমার মা আমার প্রিয়তম বন্ধু। মাকেই খুলে বলি মনের কথা। এতে ভার লাঘব হয়। এ ছাড়া সেলফ কাউন্সেলিং তো আছেই।”

আরও পড়ুন: ওলা, সুইগি, উবেরের প্রথম মহিলা চালক রূপার দিদিগিরি

Continue Reading

প্রবন্ধ

‘কয়েকটা টাকার বিনিময়ে নেতাজির স্মৃতি ধুলোয় মিশিয়ে দেব?’, বলেছিলেন পদমবাহাদুর

মুখে বড়ো বড়ো কথা বললেও, নেতাজির আদর্শে চলার ব্যাপারে আমরা লবডঙ্কা। কবে আমরা ওঁর আদর্শে চলব, ঠিক পদমবাহাদুরের মতো?

Published

on

কার্শিয়াঙের নেতাজি মিউজিয়ামে নেতাজির আবক্ষ মূর্তি।

শ্রয়ণ সেন

আবার সেই পথে। এই তো ঠিক এক বছর আগে ২০২০-এর জানুয়ারিতে ঘুরে গিয়েছিলাম এখান থেকে। এই জানুয়ারিতে দার্জিলিঙের পথে গিদ্দা পাহাড়ের পাশ দিয়ে যেতে যেতে স্মৃতিতে ডুব দিলাম। মনের মধ্যে ভেসে উঠল পদমবাহাদুর ছেত্রীর মুখটা আর ওঁর কথাগুলো।

Loading videos...

“তখন ওরা কত করে আমায় বলল বাড়ির ইটগুলো বিক্রি করে দিতে, এতে আমার টাকা হবে। কিন্তু আমি ওদের কথা শুনিনি। আমার তখন একটাই লক্ষ্য, যে করেই হোক, ওদের হাত থেকে বাড়িটা বাঁচাতেই হবে।”

বেশ গর্ব করেই কথাগুলো বলেছিলেন পদমবাহাদুর। নেতাজি ইনস্টিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ তথা নেতাজি মিউজিয়ামের দেখভালের পুরো দায়িত্ব তাঁর ওপরে। তিন বছরের দুরন্ত নাতিকে সঙ্গে নিয়ে পুরো বাড়িটা আমাদের ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই বাড়িটার অবদান হয়তো আমরা অনেকেই জানি না। কারণ এই বাড়িতে খুব বেশি কারও পা-ও পড়ে না।

নেতাজি ইনস্টিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ

“খুলা হ্যায়, খুলা হ্যায়।”

মূল ফটক দিয়ে বাড়ির দিকে এগোতেই আমাদের উদ্দেশ করে বলেছিল মিষ্টি অথচ দুরন্ত সেই শিশুটি। শীতের দিনের মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে দাদুর কোলে বসেছিল নাতি। আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল, মিউজিয়াম খোলা আছে, ভেতরে যেতে পারি।

বাইরে জুতো খুলে প্রবেশ করলাম। এটা তো ঠিকই, যে কোনো পবিত্র স্থানে প্রবেশ করতে গেলে জুতো খুলতেই হবে। নেতাজিকে ভালবাসেন, এমন যে কোনো মানুষের কাছে এই বাড়ি একটা সাধনাস্থল।

নেতাজির বহু বিরল ছবি, তাঁর ব্যবহৃত বিভিন্ন আসবাবপত্র আর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে লেখা চিঠি এখানে সযত্নে রাখা আছে।

১৯২২ সালে রলি ওয়ার্ড নামক এক ব্যক্তির কাছ থেকে কার্শিয়াংয়ের গিদ্দাপাহাড়ে অবস্থিত এই বাড়িটি কিনে নেন নেতাজির দাদা, তথা স্বাধীনতাসংগ্রামী শরৎচন্দ্র বসু।

১৯৩৩ থেকে ১৯৩৫, এই বাড়িতেই ব্রিটিশ সরকারের হাতে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল শরৎ বসুকে। এর পরের বছরেই নেতাজির পালা। এই বাড়িতে তাঁকে সাত মাসের জন্য বন্দি করে রাখা হয়।

দ্বিতীয় বার যখন এই বাড়িতে নেতাজি আসেন, তখন তিনি বন্দি নন। সেটা ১৯৩৭ সালের অক্টোবর। হরিপুরা কংগ্রেসের ভাষণ এই বাড়িতে বসেই লিখেছিলেন নেতাজি। এখান থেকে গান্ধীজি ও জওহরলাল নেহরুকে চিঠিও লিখেছিলেন।

নেতাজি মিউজিয়ামে প্রবেশদ্বার।

এই বাড়িতে থাকাকালীনই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি চিঠি পেয়েছিলেন নেতাজি। তাতে ‘বন্দেমাতরম’ গানের প্রসঙ্গও ছিল।

চিঠির একটি অংশে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “…যে রাষ্ট্রসভা ভারতবর্ষের সকল ধর্ম-সম্প্রদায়ের মিলনক্ষেত্র, সেখানে এই গান সর্বজনীন ভাবে সঙ্গত হতেই পারে না।”

এই বাড়িতে বহু দুর্লভ ছবির পাশাপাশি নেতাজি-কেন্দ্রিক প্রচুর চিঠিরও সংগ্রহ রয়েছে। সব চিঠি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ার মতো সময় ছিল না। ‘বন্দেমাতরম’ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চিঠির ব্যাপারটি একটি সংবাদমাধ্যম থেকে জেনেছিলাম। ওই চিঠির উত্তরও রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছিলেন নেতাজি। কিন্তু তাঁর সেই জবাবের হাতের লেখা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

কার্শিয়াংয়ের বাসিন্দাদের সঙ্গে নেতাজি কত যে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন, তার প্রমাণও রয়েছে এখানে রক্ষিত বহু চিঠিতে।

নেতাজিকে নিয়ে এমন দুর্লভ ছবির সম্ভার ভারতে আর কোথাও আছে বলে মনে করতে পারি না।

নেতাজি এখানে থাকাকালীন প্রাতর্ভ্রমণে বেরোতেন। পাগলাঝোরায় প্রাতর্ভ্রমণরত নেতাজি, এমনই একটি ছবি রয়েছে। বসু পরিবারের সঙ্গে নেতাজির ছবি যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই পটেলের সঙ্গে তোলা ছবিও।

এ ছাড়া নেতাজির ব্যবহার করা খাট, চেয়ার-টেবিল সবই সযত্নে রাখা হয়েছে। কার্শিয়াংয়ের ‘পয়েন্টস’ ভ্রমণের মধ্যেই নেতাজির এই বাড়ি পড়ে। কিন্তু এখানে আসতে হবে আলাদা ভাবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময়ে দিয়ে ভালো করে দেখতে হবে। তবেই মনের শান্তি পাওয়া যাবে।

১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাড়িটি বসু পরিবারের অধীনে ছিল। এর পর বাড়িটি পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার অধিগ্রহণ করে। সংস্কার করে তা কলকাতার ‘নেতাজি ইনস্টিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ’-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়।

নেতাজির দুর্লভ ছবি, চিঠিপত্র আর ব্যবহৃত আসবাবপত্র নিয়ে এই সংগ্রহশালাটি উদ্বোধন হয় ২০০৫ সালে। ২০১৮ সালে সেই সংগ্রহশালার সংস্কারের কাজও হয়েছে।

নেতাজির এই বাড়িটার সঙ্গেই নিজেকে একাত্ম করে দিয়েছেন পদমবাহাদুর। তাঁর কথাবার্তা, আচার আচরণে বোঝা যায়, আশির কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া এই বৃদ্ধ নেতাজিকে কখনও না দেখলেও তাঁকে রোজ অনুভব করেন।

শত চেষ্টা করেও পদমবাহাদুরকে ক্যামেরার সামনে আনা গেল না।

শরৎ বসুর রোপণ করা ক্যামেলিয়া গাছ।

১৯৭৩ থেকে এই বাড়িটার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন পদমবাহাদুর। তখন দিনপ্রতি দু’ টাকা হাজিরায় বসুদের কাছ থেকে এই বাড়িটির দেখভালের দায়িত্ব পান।

-“তব মহিনে মে ষাট (৬০) রুপ্যায় মিলতা থা।” গলায় গর্ব ঝরে পড়েছিল। 

এর পর বাড়িটা কত ঝড়ঝাপটার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে, তবুও তিনি ছিলেন তাঁর লক্ষ্যে অবিচল।

কথা প্রসঙ্গেই উঠে এসেছিল ১৯৮৬ সালের গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের কথা। সুবাস ঘিসিংয়ের নেতৃত্বে সেই আন্দোলন মারাত্মক ধ্বংসাত্মক চেহারা নেয়। গত ১৫ বছরে গোর্খাল্যান্ড নিয়ে যে আন্দোলন হয়েছে, সুবাস ঘিসিংয়ের জঙ্গি আন্দোলনের কাছে সে সব নেহাতই শিশু।

তখনই পদমবাহাদুরের কাছে আন্দোলনকারীদের প্রস্তাব আসে এই বাড়ির এক একটা ইট বিক্রি করে দিয়ে বিনিময় টাকা নেওয়ার। আর প্রকারান্তরে সে টাকার কিছুটা অংশ আন্দোলনকারীদের দিয়ে দেওয়া।

পদম কিন্তু ছিলেন তাঁর লক্ষ্যে অবিচল। আন্দোলনকারীদের কথা কানেই তোলেননি তিনি। সোজা জানিয়ে দেন, নেতাজির স্মৃতিকে এ ভাবে ধুলোয় মিশে যেতে তিনি দেবেন না।

তাঁর কথায়, “মাত্র কয়েকটা টাকার জন্য নেতাজিতে বিকিয়ে দেব! আমি গরিব হতে পারি, লোভী নই।”

আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আপশোশ, কার্শিয়াংয়ের এক নেপালি বৃদ্ধ নেতাজির আদর্শে চলতে পারেন, কিন্তু আমরা পারি না। আজ ১২৫ বছরে পড়লেন নেতাজি। মুখে বড়ো বড়ো কথা বললেও, নেতাজির আদর্শে চলার ব্যাপারে আমরা লবডঙ্কা। কবে আমরা ওঁর আদর্শে চলব, ঠিক পদমবাহাদুরের মতো?

ছবি: লেখক

আরও পড়ুন: সুভাষের খোঁজে সুভাষগ্রাম ও অন্যত্র

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
Covid situation kolkata
রাজ্য4 hours ago

গত ২৪ ঘণ্টায় গোটা রাজ্যে কারও মৃত্যু হল না কোভিডে

বিজেপিতে যোগ দিলেন শ্রাবন্তী
বিনোদন4 hours ago

বিজেপিতে যোগ দিলেন অভিনেত্রী শ্রাবন্তী, ভোটে কি দাঁড়াবেন?

weather monsoon
রাজ্য6 hours ago

গরমে নাজেহাল রাঢ়বঙ্গ, পারদ কিছুটা কমল কলকাতায়

রাজ্য6 hours ago

বিজেপিকে রুখতে তৃণমূলকে সমর্থন, স্পষ্ট জানালেন তেজস্বী যাদব

দেশ7 hours ago

মুম্বইয়ে ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পেছনেও চিনের হাত, মার্কিন সংস্থার রিপোর্টে তীব্র চাঞ্চল্য

রাজ্য7 hours ago

অমিত শাহের বঙ্গসফর বাতিল

শিক্ষা ও কেরিয়ার8 hours ago

৮ লক্ষ যুবক-যুবতীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজের সুযোগ করে দিচ্ছে কেন্দ্রের এই প্রকল্প, জানুন বিস্তারিত

দেশ9 hours ago

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নিলেন দুই মুখ্যমন্ত্রী

রাজ্য2 days ago

ব্রিগেড সমাবেশ: দরকারে ‘শান্তিনিকেতন’ বাড়ি নিলাম করে প্রতারিত মানুষের টাকা ফেরত, হুঁশিয়ারি মহম্মদ সেলিমের

BJP TMC Congress CPIM
রাজ্য2 days ago

পশ্চিমবঙ্গে ফিরতে পারে তৃণমূল সরকার, কী বলছে সমীক্ষা

ভ্রমণের খবর2 days ago

দোলেই ভোট! পর্যটন ব্যবসায়ে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কায় হতাশ রাঢ়বঙ্গ

ফুটবল2 days ago

পাঁচ গোল করেও ওড়িশার কাছে ছয় গোলের মালা পরল ইস্টবেঙ্গল

রাজ্য2 days ago

কলকাতায় তেজস্বী যাদব, হতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ

রাজ্য2 days ago

দক্ষিণবঙ্গে ক্রমশ বাড়ছে গরম, কলকাতায় তাপমাত্রা ছুঁল ৩৬ ডিগ্রি

দঃ ২৪ পরগনা1 day ago

প্রার্থী তালিকা ঘোষণার আগেই দেওয়াল লিখে চমক এসইউসি-র

দেশ3 days ago

নতুন করে কোভিড আক্রান্তের ৫০ শতাংশের বেশি একটি রাজ্যেই

কেনাকাটা

কেনাকাটা3 weeks ago

সরস্বতী পুজোর পোশাক, ছোটোদের জন্য কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সরস্বতী পুজোয় প্রায় সব ছোটো ছেলেমেয়েই হলুদ লাল ও অন্যান্য রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবিতে সেজে ওঠে। তাই ছোটোদের জন্য...

কেনাকাটা3 weeks ago

সরস্বতী পুজো স্পেশাল হলুদ শাড়ির নতুন কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই সরস্বতী পুজো। এই দিন বয়স নির্বিশেষে সবাই হলুদ রঙের পোশাকের প্রতি বেশি আকর্ষিত হয়। তাই হলুদ রঙের...

কেনাকাটা1 month ago

বাসন্তী রঙের পোশাক খুঁজছেন?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই আসছে সরস্বতী পুজো। সেই দিন হলুদ বা বাসন্তী রঙের পোশাক পরার একটা চল রয়েছে অনেকের মধ্যেই। ওই...

কেনাকাটা1 month ago

ঘরদোরের মেকওভার করতে চান? এগুলি খুবই উপযুক্ত

খবরঅনলাইন ডেস্ক: ঘরদোর সব একঘেয়ে লাগছে? মেকওভার করুন সাধ্যের মধ্যে। নাগালের মধ্যে থাকা কয়েকটি আইটেম রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার...

কেনাকাটা1 month ago

সিলিকন প্রোডাক্ট রোজের ব্যবহারের জন্য খুবই সুবিধেজনক

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী এখন সিলিকনের। এগুলির ব্যবহার যেমন সুবিধের তেমনই পরিষ্কার করাও সহজ। তেমনই কয়েকটি কাজের সামগ্রীর খোঁজ...

কেনাকাটা1 month ago

আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আজ রইল আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার সময় যে দাম ছিল...

কেনাকাটা1 month ago

রান্নাঘরের এই সামগ্রীগুলি কি আপনার সংগ্রহে আছে?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: রান্নাঘরে বাসনপত্রের এমন অনেক সুবিধেজনক কালেকশন আছে যেগুলি থাকলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যেতে পারে। এমনকি দেখতেও সুন্দর।...

কেনাকাটা1 month ago

৫০% পর্যন্ত ছাড় রয়েছে এই প্যান্ট্রি আইটেমগুলিতে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলির মধ্যে বেশ কিছু এখন পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫০% বা তার বেশি ছাড়ে। তার মধ্যে...

কেনাকাটা1 month ago

ঘরের জন্য কয়েকটি খুবই প্রয়োজনীয় সামগ্রী

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় ও সুবিধাজনক বেশ কয়েকটি সামগ্রীর খোঁজ রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদনটি লেখার সময় যে দাম ছিল তা-ই...

কেনাকাটা2 months ago

৯৯ টাকার মধ্যে ব্র্যান্ডেড মেকআপের সামগ্রী

খবর অনলাইন ডেস্ক : ব্র্যান্ডেড সামগ্রী যদি নাগালের মধ্যে এসে যায় তা হলে তো কোনো কথাই নেই। তেমনই বেশ কিছু...

নজরে