Connect with us

কথাশিল্প

ভারতে বিমুদ্রাকরণের পিছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা / ২

(প্রথম পর্বের পর)

দ্য বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্স

বিশ্ব জুড়ে নগদের বাজারকে সঙ্কুচিত করার লক্ষ্যে ২০১২-তে এই সংস্থা তৈরি হয়, যার অন্যতম সদস্য ইউএসএআইডি। নিউইয়র্কে ইউনাইটেড নেশনস ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে এর সচিবালয়। এই কারণেই বোধহয় পূর্ববর্তী দু’টি বছরের একটিতে গেটস্‌-ফাউন্ডেশন এবং আরেকটিতে মাস্টার কার্ড- ফাউন্ডেশন রাষ্ট্রপুঞ্জের এই ছোট্টো দরিদ্র সংগঠনটিকে উদার ভাবে সাহায্য করেছিল।

নগদকে সঙ্কুচিত করলে যাদের লাভ সব চেয়ে বেশি সেই সব বৃহৎ মার্কিন-প্রতিষ্ঠান এই অ্যালায়েন্সের সদস্য। এই প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে রয়েছে মাস্টার কার্ড ও ভিসা-র মতো ক্রেডিট কার্ড কোম্পানি এবং সেই সব মার্কিন প্রতিষ্ঠান যাদের নাম মার্কিন গোয়েন্দা সার্ভিসেসের ইতিহাস বইগুলোতে অনেক বারই উঠে এসেছে যেমন ফোর্ড ফাউন্ডেশন, ইউএসএআইডি ইত্যাদি। গেটস্‌-ফাউন্ডেশনও একটি উল্লেখযোগ্য সদস্য। ই বে-র ওমিডিয়ার নেটওয়ার্ক-এর প্রতিষ্ঠাতা পিয়ের ওমিডিয়ার এবং ‘সিটি’ এই অ্যালায়েন্সের গুরুত্বপূর্ণ অর্থ-জোগানদার। অ্যালায়েন্স সদস্যদের বেশির ভাগই নগদের উপর নির্ভরতা নির্মূল করার উদ্দেশ্যে তৈরি ইউএসএআইডি-ভারত উদ্যোগের অন্যতম অংশীদার। এই উদ্যোগ এবং ক্যাটালিস্ট-কর্মসূচি ‘দ্য বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্স’-এর আর একটু বিস্তৃত সংস্করণ, যেখানে যোগ দিয়েছে ভারত ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের বেশ কিছু সংস্থা যাদের নগদ অর্থনীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভালো রকম ব্যবসায়িক স্বার্থ নিহিত আছে।

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার আইএমএফ-শিকাগো সন্তান

ভারতে নগদ বাজার সঙ্কোচনের জন্য এই সমঝোতার পরিকল্পনা কিন্তু রাতারাতি হয়নি। রঘুরাম রাজন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর থাকার সময়কাল (২০১৩, সেপ্টেম্বর– ২০১৬, সেপ্টেম্বর) জুড়েই এই পরিকল্পনা চলছিল। রাজন ছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পদ ছেড়ে আবার ফিরে গিয়েছেন সেখানে। ২০০৩ সাল থেকে ২০০৬ সাল অবধি রাজন ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের মুখ্য অর্থনীতিক ছিলেন। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ‘গ্রুপ অফ থার্টি’-রও সদস্য রাজন। এটি একটি সন্দেহজনক সংগঠন। এরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে গোপনে নানা রকম চিন্তাভাবনা, আর পরিকল্পনা বিনিময় করে এবং সেই সব আলোচনার কোনো সূচি রাখা হয় না। নগদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষেত্রে এই গোষ্ঠী যে অন্যতম সমন্বয়-কেন্দ্র হিসাবে কাজ করেছে, সেই বিষয়টি ক্রমশ সামনে আসতে শুরু করেছে। কেন রগফ, ল্যারি সামার্স-এর মতো নগদ-বিরোধী যুদ্ধের সৈনিকরাও এই গোষ্ঠীর সদস্য।  

আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার আরও উঁচু ধাপে ওঠার ইচ্ছা থাকার যথেষ্ট কারণ রাজনের আছে। তাই ওয়াশিংটনের খেলার অন্যতম খেলোয়াড় হওয়াও তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক। এর আগে আমেরিকান ফিনান্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাজন এবং অর্থনৈতিক গবেষণায় প্রথম ফিশার-ব্ল্যাক পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়াও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে অর্থনৈতিক গবেষণার জন্য ইনফোসিস পুরস্কার, আর্থিক অর্থনীতির জন্য ডয়েশ ব্যাঙ্ক পুরস্কার এবং ইকনমিকসের সব চেয়ে ভালো বই লেখার জন্য ফিনান্সিয়াল টাইমস/গোল্ডম্যান স্যাকস পুরস্কার। ন্যাসকমের ‘বর্ষসেরা ভারতীয়’-র সম্মান এবং ‘ইউরোমানি’ ও ‘দ্য ব্যাঙ্কার’-এর ‘বর্ষসেরা সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কার’ সম্মানও জুটেছে তাঁর। আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে ক্রিস্টিন ল্যাগার্ডের সম্ভাব্য উত্তরসূরির তালিকায়ও জ্বলজ্বল করছে তাঁর নাম। তবে আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থার আরও অনেক উচ্চ পদেও যেতে পারেন তিনি।

দেশের শীর্ষ ব্যাঙ্কের গভর্নর হিসেবে আর্থিক ক্ষেত্রের শীর্ষ স্থানীয়দের কাছে রাজন খুবই সম্মাননীয় ও পছন্দের মানুষ ছিলেন, কিন্তু বিনিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারে যতই তাঁর আগ্রহ থাকুক উৎপাদন ক্ষেত্রের মানুষজনদের কাছে তিনি ছিলেন রীতিমতো অপছন্দের।  তার কারণ অবশ্য তাঁর ‘সীমাবদ্ধ’ অর্থনৈতিক নীতি। এই নীতির তিনিই প্রবক্তা এবং জোরদার সমর্থক। শাসক দলের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রচণ্ড সমালোচিত হওয়ার পর জুন মাসেই তিনি ঘোষণা করেন সেপ্টেম্বরে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় তিনি আর দায়িত্ব নেবেন না। পরে তিনি ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-কে বলেছিলেন, তিনি থাকতে চেয়েছিলেন, তবে পুরো মেয়াদের জন্য নয় এবং এই ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আপত্তি ছিল।   এই প্রসঙ্গে প্রাক্তন বাণিজ্য ও আইনমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম স্বামী বলেছিলেন, রঘুরাম রাজনের গভর্নরশিপ শেষ হওয়ায় খবরে দেশের শিল্পপতিরা খুশি- “আমি তো এটা চেয়েইছিলাম। প্রধানমন্ত্রীকে পরিষ্কার করে বলেও ছিলাম। ওঁর (রাজনের) যাঁরা লক্ষ্য তাঁরা মূলত পশ্চিমী…। আমার কাছে দলে দলে লোক আসত, বলত কিছু একটা করুন…।”   

দুর্ঘটনা, যা ঘটারই ছিল

ভারতের অধিকাংশ ব্যাঙ্কনোট অবৈধ ঘোষণা করার এই যে যুদ্ধ, তার প্রস্তুতিতে যদি রাজন জড়িয়ে থাকেন এবং এ বিষয়ে যে কোনো সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই তা রাজনের ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগ ও নগদ ব্যবস্থাপনায় ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে বলাই যায়, তাহলে এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে এই গোটা ঘটনার পিছনে তাঁর থাকাই স্বাভাবিক। যাদের উপকারের নামে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির দোহাই দেওয়া হয় সেই বেশির ভাগ গ্রামীণ ও দরিদ্র ভারতবাসীই যে নোট বাতিলের উদ্যোগে সব চেয়ে বেশি দুর্দশায় পড়বেন, এই ব্যাপারটায় এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিস্মিত করে না। ইউএসএআইডি এবং তার অংশীদাররা গোটা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে। ‘বিয়ন্ড ক্যাশ’ রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ভারতে এখনও ৯৭ শতাংশ লেনদেন নগদেই হয়, এবং মাত্র ৫৫ শতাংশ মানুষ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন। এই ৫৫ শতাংশের মধ্যে “মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ গত তিন মাস ধরে ব্যবহার করছেন।”

এটা সবটাই ভালো ভাবে জানা ছিল এবং একেবারে স্থিরনিশ্চিত ছিল যে, বাজারের বেশির নগদ রাতারাতি বিলোপ করলে দেশের বহু ছোটো ব্যবসায়ী এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের (যেখানে আশেপাশে কোনো ব্যাঙ্ক নেই)  উৎপাদক ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হবে, এমনকি অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। যখন নোট বাতিল হল তখন পরিষ্কার হয়ে গেল, নগদকে পিছনে ঠেলে ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আশ্বাস কতটা মিথ্যে। বাজার অর্থনীতিতে প্রত্যেকের যোগদান কাম্য হলে লেনদেনের ক্ষেত্রে ভারতের মতো দেশে নগদের কোনো বিকল্প হয় না।

নগদের ওপর এই আঘাত ভিসা, মাস্টারকার্ড ও পেমেন্ট পরিষেবা প্রদানকারী অন্যান্য সংস্থা, যাদের দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের মতো অস্তিত্বের কোনো সংকটে পড়তেই হল না, তাদের কাছে বড়োই লাভজনক হল। ‘পরীক্ষামূলক অঞ্চলেও’ ডিজিটাল পেমেন্ট ‘বেড়ে গেল’।  চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে বিপুল পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হলেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাঁরা সেই ক্ষতি বহন করতে সক্ষম, তাঁরাই পরবর্তীতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেনদেনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিলেন। ব্যাঙ্ক এবং এটিএম থেকে টাকা তোলার ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করায় উপভোক্তারাও এখন কার্ড ব্যবহার করার সুযোগ খুঁজবেন, যাতে উপকার হবে মাস্টারকার্ড, ভিসা-সহ ‘বেটার দ্যান ক্যাশ’ জোটের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সদস্যদের।

বিশ্ব জুড়ে নগদের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের কেন এই যুদ্ধ

বিশ্ব জুড়ে নগদের ব্যবহার সংকুচিত করার জন্য মার্কিন সরকারের প্রবল আগ্রহের অন্যতম কারণ হল বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি ও পেমেন্ট ব্যবসার নিয়ন্ত্রক মার্কিন কোম্পানিগুলির স্বার্থ রক্ষা। কিন্তু সেটাই একমাত্র কারণ নয়। সম্ভবত সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণও নয়। আরেকটি কারণ হল, ডিজিটাল পেমেন্টের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের মাধ্যমে নজরদারি করার ক্ষমতা। ব্যাঙ্কের মাধ্যমে সমস্ত আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং এ সংক্রান্ত অধিকাংশ ডিজিটাল ডেটা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এবং তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলির নখদর্পণে রাখাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। আর্থিক তথ্যই হল সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান তথ্য।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, মুদ্রার গুরুত্বের বিচারে ডলারের স্থান ও মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় মার্কিন কোম্পানিগুলির প্রতিপত্তি, নগদহীন অর্থনীতির বিশ্ববাজারে মার্কিন সরকারকে ক্রমশ সর্বক্ষমতাশালী করে তুলেছে। অন্য সব দেশকেই স্থানীয় কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের পরিবর্তে মাথা নোয়াতে হচ্ছে মার্কিন আইনের কাছে। কী ভাবে তা ঘটছে তা পরিষ্কার হয়ে যায় সম্প্রতি ‘ফ্রাঙ্কফুর্টার আলগেমাইনে ৎসাইটুং’ নামে এক জার্মান সংবাদপত্রে প্রকাশিত হাড় হিম করা এক প্রতিবেদন থেকে। জানা যায়, ইরানের সঙ্গে আইনসঙ্গত ভাবে ব্যবসা করা সত্ত্বেও এক জার্মান সংস্থার কর্মচারীদের মার্কিন প্রশাসনের তৈরি জঙ্গি-তালিকায় রাখা হয়েছে। এর অর্থ হল, বেশির ভাগ আর্থিক ব্যবস্থা থেকে তাদের দূরে রাখা হয়েছে, এমনকি কিছু রসদ বহনকারী কোম্পানিও তাদের তৈরি আসবাব পরিবহন করছে না। আরও দৃষ্টান্ত আছে। মার্কিন অনুরোধে জার্মানির এক বড়ো ব্যাঙ্ক থেকে বহিষ্কার করতে হয়েছে বেশ কিছু কর্মচারীকে, যাঁরা কোনো রকম অবৈধ বা অন্যায় কাজকর্মে জড়িত নন।

এ রকম অসংখ্য উদাহরণ আছে। প্রতিটি আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্ককে মার্কিন সরকারের আদেশানুসারে চলতে বাধ্য করতে পারে আমেরিকা। আদেশ না মানলে রয়েছে আমেরিকায় বা ডলারে বাণিজ্য করার লাইসেন্স বাতিলের হুমকি। এটা হওয়া আর ব্যাঙ্ক বন্ধ করে দেওয়া, দু’টোর মধ্যে খুব একটা তফাত নেই। ডয়েশ ব্যাঙ্কের কথাই ভাবুন। ১৪০০ কোটি ডলার জরিমানা দিয়ে তারা ব্যবসা থেকে পাততাড়ি গোটাবে, নাকি ৭০০ কোটি ডলারে রাজি করিয়ে বাঁচার চেষ্টা করবে, এই নিয়েই মার্কিন ট্রেজারির সঙ্গে কয়েক মাস ধরে আলাপআলোচনা চালাতে হল তাদের। শেষ পর্যন্ত ৭০০ কোটি দিয়ে বাঁচল। একটা দেশের হাতে যখন অন্য দেশের ব্যাঙ্ককে দেউলিয়া করার ক্ষমতা থাকে এবং সেই দেশটা বেশ বড়ো দেশ, তখন সেই দেশের সরকারকেও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তার থাকবে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং সেই সংক্রান্ত তথ্যের মাধ্যমে আধিপত্য করার ক্ষমতা ইতিমধ্যেই রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। বিশ্ব জুড়ে নগদের ব্যবহার যত কমবে, আমেরিকার হাতে এই ক্ষমতা ততই পুঞ্জিভূত হবে। কারণ নগদের ব্যবহার এই ক্ষমতাকে অনেকটাই নড়বড়ে করে দিতে পারে। (শেষ)

সৌজন্যে : গ্লোবাল রিসার্চ

Continue Reading
Advertisement
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

কথাশিল্প

জলবায়ু পরিবর্তন আর লকডাউনেই আরও শক্তিশালী আর ধ্বংসাত্মক রূপ উম্পুনের

শ্রয়ণ সেন

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও শক্তিশালী এবং ধ্বংসাত্মক হচ্ছে ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড় উম্পুন তারই একটা উদাহরণ। এমনই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে উম্পুনের শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি এ বার লকডাউনও একটা বড়ো কারণ বলেই মনে করা হচ্ছে।

কী ভাবে জলবায়ু পরিবর্তন আরও শক্তিশালী করে তুলছে ঘূর্ণিঝড়কে?

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বিশ্ব উষ্ণায়ণের কারণে সমুদ্রে জলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে অনেকটাই বেড়ে যাচ্ছে। জলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বাড়ানোর পক্ষে যথেষ্ট অনুকূল। এর ফলে ঝড়ের পাশাপাশি বাড়ছে বৃষ্টির দাপটও। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হচ্ছে। উম্পুনের দিন কলকাতায় মাত্র তিন ঘণ্টায় ১৮০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল গড়ে।

এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রে জলের স্তরও বাড়ছে। ফলে ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। নোনা জল ঢুকে যাচ্ছে স্থলভাগের বেশ গভীরে। হেক্টরের পর হেক্টর কৃষিজমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

এর পাশাপাশি বায়ুদূষণের এবং ঘূর্ণিঝড়ের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটাও খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।

কোভিড ১৯-এর কারণে যে লকডাউন চলছে, তাতে বায়ুদূষণের মাত্রা অনেকটাই কমে গিয়েছে। ঘূর্ণিঝড় উম্পুনের রাতারাতি শক্তিবৃদ্ধিতে এটা একটা বড়ো কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও এই বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনও রয়েছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।

বাতাসে ভাসমান ধূলিকণার কারণে ভূপৃষ্ঠে সূর্যের তাপ বেশি পৌঁছোতে পারে না। এর কারণে ঘূর্ণিঝড় শক্তি বাড়াতে কিছুটা হলেও অক্ষম হয়। কিন্তু সেই ধূলিকণা যদি না থাকে তা হলে বাধাহীন ভাবে সূর্যের তাপ পৌঁছোবে ভূপৃষ্ঠে। শক্তি বাড়াতে সক্ষম হবে ঘূর্ণিঝড়।

ঘূর্ণিঝড় উম্পুনের রাতারাতি শক্তিবৃদ্ধির পেছনে এটা একটা কারণ বলেই মনে করছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা।

আরও একটা ধারণা হল, ভাসমান ধূলিকণার কারণে তৈরি হওয়া মেঘের জন্য বৃষ্টি নামে সহজে। এই ব্যাপারটিও ঘূর্ণিঝড়ের শক্তিবৃদ্ধির জন্য প্রতিকূল।

ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব ট্রপিক্যাল মেটেরিওলজির গবেষক রক্সি ম্যাথু কল এই প্রসঙ্গে বলেছেন, “গবেষণায় দেখা দিয়েছে যে উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রের তাপমাত্রা অনেকটাই বেশি। এটা ভয়ংকর এবং ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড় তৈরি করার ক্ষেত্রে অনেকটাই অনুকূল।”

তিনি যোগ করেন, “মে মাসের প্রথম দু’ সপ্তাহে বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা ৩২-৩৪ ডিগ্রিতে উঠে গিয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই সমুদ্রের তাপমাত্রা এতটা বেড়েছে। অতীতে বঙ্গোপসাগরে এ রকম তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়নি। এর ফলেই অল্প সময়ের মধ্যেই উম্পুন গভীর নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড় হয়ে রাতারাতি সুপার সাইক্লোন হয়ে গিয়েছিল।”

ভুবনেশ্বরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলোজির অধ্যাপক ভি ভিনোজ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গোটা বিশ্বেই সমুদ্রের জলস্তরের তাপমাত্রা বেড়েছে।

তাঁর কথায়, “ভারতের চার দিকে যে মহাসাগরীয় অঞ্চল রয়েছে, সেখানেও তাপমাত্রা বাড়ছে। প্রাক-বর্ষার সময়কালে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হওয়ার পেছনে এটা অন্যতম কারণ।”

তবে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি বায়ুদূষণ আচমকা কমে যাওয়া যে উম্পুনের শক্তি বাড়ানোর পেছনে একটা বড়ো কারণ ছিল, সেটা তিনিও মনে করেন।

তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বাড়ছেই। এ বার তার সঙ্গে যোগ হয়েছে লকডাউন। এই দুইয়ের সাঁড়াশি চাপেই ১৯৯৯ সালের পর এই প্রথম সুপার সাইক্লোনের জন্ম দিয়েছে বঙ্গোপসাগর।”

তবে লকডাউনের ব্যাপারটা নিয়ে আরও কিছুটা গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন ভিনোজ।

Continue Reading

কথাশিল্প

করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঘরে বাইরে এই সতর্কতাগুলি অবশ্যই মেনে চলুন

coronavirus

খবর অনলাইন ডেস্ক: শুরু হয়েছে চতুর্থ দফার লকডাউন (lockdown 4.0)। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেওয়া হয়েছে ছাড়ও। প্রধানমন্ত্রী যেমন বলেছেন, সুরক্ষা বজায় রেখেই জীবনে এগিয়েও যেতে হবে। অর্থাৎ শুরু করতে হবে কাজকর্মও। ঘরের বাইরে পা দিলেই মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতি দিনই হবে। এই পরিস্থিতিতে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন কী ভাবে?

শারীরিক দূরত্ব রাখা (social distancing), মাস্ক ব্যবহার, সাবানজলে হাত ধোয়া ও অ্যালকোহল-যুক্ত স্যানিটাইজার ব্যবহার করা – এই বিধিগুলি মেনে চলতেই হবে। তার সঙ্গে মেনে চলতে হবে আরও বেশ কয়েকটি নিয়ম।

১। মোবাইল

এখন থেকে মোবাইল যতটা সম্ভব দূরে রাখুন। প্রয়োজন ছাড়া মোবাইল নিয়ে বেরোবেন না। বেরোতে হলেও খুব দরকার ছাড়া মোবাইল ব্যাগ থেকে বার করবেন না। বাড়ি ফিরে মোবাইলটি ভালো করে স্যানিটাইজ করুন। কভারটা ভালো করে সাবান, গরম জলে ধুয়ে শুকিয়ে নিন। এক টুকরো তুলোয় স্যানিটাইজার বা অ্যান্টিসেপটিক লোশন দিয়ে মোবাইল ভালো করে পরিষ্কার নিন।

২। ব্যাগ

গরম জলে সাবান গুলে বাজারের ব্যাগ ধুয়ে শুকিয়ে নিন। অফিস বা স্কুল-কলেজের ব্যাগের ক্ষেত্রে সাবান জলে তুলো অথবা কাপড়ের টুকরো ভিজিয়ে ভালো করে মুছে নিতে হবে। স্যানিটাইজার অথবা পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট কিংবা কোনো জীবাণুনাশক তরল দিয়ে ভালো করে মুছে পরিষ্কার করতে হবে প্রতি বার ব্যবহারের পরই।

৩। মেকআপ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন কিছু মাস লিপস্টিক, কাজল, নেলপলিশ ব্যবহার করবেন না। মেকআপ বন্ধ রাখুন। কারণ করোনার জীবাণু চেপে বসতে পারে মেকআপের সঙ্গে। নখের খাঁজে জীবাণু থাকতে পারে। নেলপলিশ লাগালে নখের কোণ ভালো করে পরিষ্কার করা যায় না। তাই নেলপলিশ বাদ। বাইরে বেরোলে হালকা সানস্ক্রিন লোশন ব্যবহার করতে পারেন। তবে ফিরে এসে খুব ভালো করে পরিষ্কার নেবেন।
তবে অনেকেরই একটা সমস্যা হচ্ছে। বার বার হাত ধোয়ার ফলে ত্বক খসখসে হয়ে চামড়া উঠছে। সে ক্ষেত্রে প্রতি বার সাবান দেওয়ার পর হাতে-পায়ে-মুখে হালকা ধরনের ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করতে পারেন।

পড়ুন – করোনা আক্রান্তের সংখ্যায় নতুন রেকর্ড, বাড়ছে সুস্থতাও

৪। মাস্ক

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক লেয়ারের মাস্ক নয়, একাধিক লেয়ার বা স্তরের মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। এক লেয়ারের মাস্ক হলে ওপরে আরও একটা পরা যেতে পারে। অথবা মাস্কের ওপরে রুমাল।
গরমকালে মুখের ঘামে মাস্ক ভিজে যেতে পারে। ব্যাগে দ্বিতীয় সেট মাস্ক রাখুন। ফাঁকা জায়গায় গিয়ে হাত স্যানিটাইজ করে মাস্ক বদল করে নিন।
ইউজ অ্যান্ড থ্রো মাস্ক গরমজলে সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে, রোদে শুকিয়ে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বার ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু দেখতে হবে ধোয়ার পর মাস্ক ব্যবহারযোগ্য থাকছে কিনা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতানুযায়ী, দামী মাস্কও দীর্ঘমেয়াদী নয়। সামান্য কিছু দিন বাদে তা-ও বাতিলযোগ্য। সে ক্ষেত্রে দামী মাস্কের ওপর ইউজ অ্যান্ড থ্রো মাস্ক ব্যবহার করা মনে হয় বুদ্ধিমানের। আর প্রতি বার এই দামী মাস্ক ব্যবহারের পর কম করে এক ঘণ্টা রোদে দেওয়া ভালো। পারলে স্যানিটাইজ করে নিন।

৬। মাথা

শরীরের যে কোনো জায়গা ছুঁয়ে সেই হাত, নাক-মুখ-চোখে দিলে থাকে সংক্রমণের ভয়। তাই সুরক্ষিত রাখতে হবে মাথার চুলও। হেড মাস্ক বা ওড়না, টুপি, স্কার্ফজাতীয় কিছু দিয়ে মাথা পুরো ঢেকে বেরোন। আর এ সব ব্যবহার না করলে বাড়ি ফিরে গরম জলে ভালো করে শ্যাম্পু করে নিন। ঠান্ডা লাগা এড়াতে বেরোনোর আগে স্নান না করে ফিরে এসে একবারই স্নান করুন।

৭। মুখমণ্ডল

গরমের দিনে ঘাম হবে। ঘাম আরও বাড়বে মাস্ক, হেড মাস্ক ব্যবহার করলে। মুখমণ্ডলের কোনো অংশে যদি সংক্রমিত মানুষের ড্রপলেট পড়ে তা হলে তা ঘামের মাধ্যমে নাকে-মুখে ঢোকা অস্বাভাবিক নয়। তাই অবশ্যই রুমাল বা টিস্যুপেপার ব্যবহার করুন। টিস্যুপেপার হলে, ব্যবহার করে তা ঢাকনাওয়ালা আবর্জনাপাত্রে ফেলে দিন। আর যদি ফেস শিল্ড ব্যবহার করেন তা হলে তো কথাই নেই।

৮। গ্লাভস

বাইরে বেরোলে অবশ্যই গ্লাভস পরুন। গ্লাভস নখের ফাঁকে জীবাণু ঢোকা থেকে রক্ষা করবে। তা ছাড়া মুখে নাকে হাত দেওয়ার প্রবণতাও আটকানো যাবে।

৯। মোজা

গরমকালে মোজা পরা ঝকমারি। কিন্তু পরলে ভালো। অসাবধানতার কারণে যাতে পা দূষিত না হয় তার জন্যই পরতে হবে মোজা। বাড়ি এসে মোজাটা গরমজলে কাপড়কাচা গুঁড়ো সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন।

১০। জুতো

পারলে পা ঢাকা জুতো পরুন। বাড়ি ফিরে স্যানিটাইজার স্প্রে করে জুতো স্যানিটাইজ করুন। কিংবা অন্তত এক ঘণ্টা রোদে রেখে দিন। প্ল্যাস্টিক বা রবারের জুতো পরলে সাবানজলে ভালো করে ধুয়ে নিন।

আরও – কোভিড ১৯ আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ৬,৭৬৭, সুস্থ ২,৬৫৭

১১। গয়না

এখন কিছু দিন হাতে, কানে বা গলায় কোনো গয়না না পরাই ভালো। কারণ ধাতব জিনিসে জীবাণু অনেক বেশি সময় পর্যন্ত জীবিত থাকে। তা ছাড়া গয়নার গলি-ঘুপচি পরিষ্কার করাও দুষ্কর।

১২। গরমজল

বেশি সময়ের জন্য বাইরে থাকতে হলে অবশ্যই ফ্লাস্কে গরমজল নিয়ে বেরোন। গরমজল একটু করে বার বার খেলে তা গলা ও মুখের মধ্যেকার জীবাণু নাশ করে।

১৩। ব্যাগের সামগ্রী

এই পরিস্থিতিতে যতটুকু বা যেগুলো না নিলেই নয় শুধু সেগুলোই ব্যাগে রাখুন। যেগুলো ধোয়া যায় বাড়ি ফিরে সেগুলো গরমজলে কাপড়কাচা গুঁড়ো সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন। আর কাপড় বা তুলোয় স্যানিটাইজার নিয়ে ভালো করে অন্যগুলো মুছে নিন।

১৪। বাইরে থেকে আনা সামগ্রী

বাইরে থেকে আনা সামগ্রীর যেগুলো ধোয়ার যোগ্য, সেগুলো ভালো করে ধুয়ে নিন। আর না হলে ভালো করে স্যানিটাইজার দিয়ে মুছে নিন। সম্ভব হলে সেই সামগ্রী কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা না ধরে রেখে দিন। সুবিধা থাকলে কম করে এক ঘণ্টা রোদে রেখে দিলে ভালো।

১৫। গাড়ি

দু’ চাকা হোক বা চার চাকা, যাতায়াত শুরু হলে গাড়িকে প্রতি বার কীটনাশক স্প্রে/স্যানিটাইজার স্প্রে দিয়ে স্যানিটাইজ করবেন। অথবা গরম জলে সাবান গুলে ধোয়া যেতে পারে।

১৬। লিফট

লিফট ব্যবহার যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন। সম্ভব না হলে হাতের যে অংশ খুব একটা ব্যবহার হয় না, তা দিয়ে বোতাম চাপুন। এ ক্ষেত্রে কনুই, হাতের কবজি বা আঙুলের পেছন ব্যবহার করতে পারেন। কিংবা ছোটো কাঠি, টুথপিক, টিসুপেপার বা কাগজের টুকরোও ব্যবহার করা যায়। এগুলো অবশ্যই ঢাকনাওয়ালা আবর্জনাপাত্রে ফেলে দিতে হবে। তবে হাতের যে অংশই ব্যবহার করুন, তা ভালো করে ধুয়ে নেবেন।

১৭। জামাকাপড়

গরমে যত কষ্টই হোক, আপাতত গা-ঢাকা জামাকাপড় পরুন। ফুলহাতা, পিঠবন্ধ, পা-ঢাকা জামাকাপড় পরলে শরীরের বেশির ভাগ অংশই ঢাকা থাকে। ফলে শরীরের কোনো অংশে সরাসরি ড্রপলেটের মারফত জীবাণুর সংযোগ ঘটবে না। তবে যা-ই পরুন, বাড়ি ফিরে পোশাকআশাক ভালো করে গরমজলে ধুয়ে নিন।

১৮। বাইরের খাবার

এখন আপাতত বাইরের খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। ভালো করে রান্না করা খাবারে জীবাণু থাকে না ঠিক কথা। কিন্তু ওই খাবার কী ভাবে কে প্যাক করছে, তাতে কোনো ভাবে কোনো ব্যক্তির ড্রপলেট মিশেছে কিনা, যাতে প্যাক করে খাবার আনা হচ্ছে সেগুলি যথাযথ স্যানিটাইজড কিনা তা জানা নেই। তাই আপাতত আগামী বেশ কিছু দিন বাইরের খাবার এড়িয়ে চলাই স্বাস্থ্যসম্মত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেখুন – কেন্দ্রের ঘরোয়া উড়ান চালু করার পরিকল্পনায় একাধিক রাজ্যের ‘না’

Continue Reading

প্রবন্ধ

একুশের পাশাপাশি আমাদের একটা উনিশেও আছে

শম্ভু সেন

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, রফিক, সফিক, জব্বার, বরকতরা। তাঁদের সেই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। সেই আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার মর্যাদা তো আদায় করে নিয়েই ছিল, উপরন্তু সেই আন্দোলন আরও এক বৃহত্তর আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল। যার পরিণতিতে ১৯৭১-এ জন্ম হল বাংলাদেশের। কালক্রমে ২১ ফেব্রুয়ারি পেল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সম্মান।

কিন্তু ১৯ মে দিনটাকে আমরা ভুলতে বসেছি। এই দিনের ইতিহাস আমাদের এমনিতেই স্মরণে থাকে না, তার ওপর আবার এখন চলছে বিশ্বব্যাপী করোনা-ত্রাস। যা-ই হোক, করোনা রুখতে ঘরবন্দি আমরা আপাতত ফিরে যাই সে দিনটায়।  

সে-ও ছিল এক রক্তঝরা দিন। ঠিক ৫৯ বছর আগে ১৯৬১ সালের এই দিনেই বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন এগারো জন ভাষা সৈনিক – দশ জন তরুণ, এক জন তরুণী।

ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা আর বরাক উপত্যকা নিয়ে আজকের অসম। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা অসমিয়া হলেও করিমগঞ্জ, কাছাড়, শিলচর, হাইলাকান্দি নিয়ে গড়া বরাক উপত্যকা হল বাঙালিদের এলাকা। দেশবিভাগের এক বছর পর রেফারেন্ডামের মাধ্যমে সুরমা ভ্যালি (বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ) পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু বৃহত্তর সিলেটের তিন-চতুর্থাংশ নিয়ে গঠিত বরাক ভ্যালি থেকে যায় অসমে। ১৯৬০ সালের ২১ ও ২২ এপ্রিল অসম প্রদেশ কংগ্রেস অসমিয়াকে রাজ্য ভাষা করা নিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করে। মাস দুয়েক পরে মুখ্যমন্ত্রী বিমলাপ্রসাদ চালিহা বিধানসভায় ঘোষণা করেন অসমিয়াকে রাজ্যভাষা করা নিয়ে সরকার শীঘ্রই একটি বিল আনছেন।

২ জুলাই শিলচরে ‘নিখিল আসাম বাংলা ও অন্যান্য অনসমিয়া ভাষা সম্মেলন’ ডাকা হয়। ভাষার প্রশ্নে হস্তক্ষেপ করার জন্য কেন্দ্রকে অনুরোধ করা হল। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় শুরু হল ‘বঙ্গাল খেদাও’। বাংলাভাষীরা দলে দলে অসম ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে শুরু করলেন। ১৯৬০ সালের ১৫ আগস্ট। কলকাতা পালন করল শোক দিবস। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা উত্তেজনায় ফেটে পড়ল। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু গোবিন্দবল্লভ পন্থকে শান্তিদূত করে পাঠালেন অসমে। পন্থজি ফর্মুলা দিলেন। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা তা সরাসরি নাকচ করে দিল। কাছাড়বাসীরা ছুটলেন দিল্লি। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার নির্বিকার। ১৯৬০ সালের ২৪ অক্টোবর রাজ্যভাষা বিল পাশ হয়ে গেল অসম বিধানসভায়। নতুন আইনে সমগ্র অসমে সরকারি ভাষা হল অসমিয়া। শুধুমাত্র কাছাড়ে জেলাস্তরে রইল বাংলা ভাষা।

বরাক উপত্যকা প্রতিবাদে সরব উঠল। ভাষার প্রশ্নে এক মন এক প্রাণ হয়ে শপথ নিল ‘জান দেব, তবু জবান দেব না’। মাতৃভাষার মর্যাদা যে কোনো মূল্যে রক্ষা করার শপথ নিলেন বরাকের বাঙালিরা। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি করিমগঞ্জ রমণীমোহন ইনস্টিটিউটে কাছাড় জেলা সম্মেলন আহ্বান করা হল। সম্মেলন থেকে জন্ম হল কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদের। সম্মেলনে দাবি তোলা হল, ‘বাংলাকে অসমের অন্যতম রাজ্য ভাষা হিসাবে মানতে হবে’। অসম সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ১৩ এপ্রিলের মধ্যে জবাব চাওয়া হল।

অসম সরকার নিরুত্তর। সরাসরি লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হল বরাক। ১৪ এপ্রিল শিলচর, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জের মানুষজন সংকল্প দিবস পালন করলেন। ২৪ এপ্রিল থেকে বরাক উপত্যকায় শুরু হল পদযাত্রা। পদযাত্রীরা ২ মে পর্যন্ত ২০০ মাইল পরিক্রমা করে বরাকের গ্রামে গ্রামে বাংলা ভাষার দাবির সমর্থনে প্রচার চালিয়ে গেলেন। ছাত্রসমাজের ডাকে ১৮ মে করিমগঞ্জ শহরে যে শোভাযাত্রা বেরোল, তা যেন এক গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নিল। মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার দাবিতে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা যোগ দিল শোভাযাত্রায়। আর সেই শোভাযাত্রার মোকাবিলা করতে সারা জেলা ছেয়ে গেল পুলিশ আর মিলিটারিতে। জারি হল ১৪৪ ধারা। করিমগঞ্জ সংগ্রাম পরিষদের নেতা রথীন্দ্রনাথ সেন, নলিনীকান্ত দাস ও বিধুভূষণ চৌধুরী এবং ছাত্রনেতা নিশীথরঞ্জন দাসকে গ্রেফতার করা হল।

ভাষা শহিদ কমলা ভট্টাচার্য

১৯ মে। ভোর চারটে থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত বরাক উপত্যকায় হরতালের ডাক দিল কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ। ডাক উঠল, ট্রেনের চাকা ঘুরবে না, বিমানের পাখা ঘুরবে না, অফিসের তালা খুলবে না। ভোর হতেই সত্যাগ্রহীরা রেললাইন অবরোধ করলেন, রানওয়ের ওপর শুয়ে পড়লেন, দল বেঁধে দাঁড়ালেন বিভিন্ন অফিসের সামনে। সত্যাগ্রহে উত্তাল হয়ে উঠল শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, পাথারকান্দি, বদরপুর সহ গোটা বরাক উপত্যকা।

বেলা দু’টো, দুপুর গড়িয়ে চলেছে। ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে শিলচর রেলস্টেশন মুখর। হঠাৎ গুলির আওয়াজ। ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে এল ‘শান্তিরক্ষক’দের রাইফেল থেকে। রক্তে ভেসে গেল শিলচর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম। ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দিতে দিতে গুলিতে লুটিয়ে পড়ল ১১টি তাজা প্রাণ। ১৯৬১-এর ১৯ মে জন্ম দিল আরও ১১ জন ভাষা-শহিদের – কমলা ভট্টাচার্য, শচীন্দ্রচন্দ্র পাল, কানাইলাল নিয়োগী, হিতেশ বিশ্বাস, সুকোমল পুরকায়স্থ, তরণী দেবনাথ, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, সুনীল সরকার, কুমুদরঞ্জন দাস, সত্যেন্দ্র দেব এবং বীরেন্দ্র সূত্রধর।

১৬ বছরের কমলা দু’ দেশের বাংলা ভাষা আন্দোলনে একমাত্র নারী শহিদ। কমলাদের আত্মবলিদান বৃথা যায়নি। ১৯৬০ সালের অসম ভাষা আইন সংশোধন করা হয়। শহিদের রক্তভেজা বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পেল।

’৫২-এর পরে ’৬১। একই ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে ন’ বছরের ব্যবধানে দু’টি আন্দোলন দু’টি ভিন্ন দেশে। বিশ্বের ইতিহাসে এ এক বিরল ঘটনা। আমরা, বাঙালিরা যেন মনে রাখি, একুশের পাশাপাশি আমাদের একটা উনিশেও আছে। ১৯ মে – কমলাদের আত্মত্যাগের দিন।

Continue Reading

ট্রেন্ড্রিং