সুন্দরবনের সেই মুখগুলি/ কালী

0
Utpalendu Mondal
উৎপলেন্দু মণ্ডল

কালী এসেছিল সন্ধের আগে। তখন আশ্বিন মাস। ধান গাছে সবে খোঁর এসেছে। নিদারুণ অভাব চার দিকে। বাবার কাছে এসেছে কিছু টাকা ধার নিতে। আগে কিছু টাকা নিয়েছিল – রাত পেরোলেই সে বনে যাবে। বাড়িতে কিছু টাকা রেখে যাবে। আপদ-বিপদ কখন আসে। কখন মরণ আসে কেউ জানে না। কালী বাবার সঙ্গে গল্প করল। দু’ ছিলিম তামাক খাওয়া হয়ে গেল। বাবা আর টাকা দেয় না। গোয়ালবাড়িতে গিয়েছে – গরু বাছুর গোঠ গোয়ালে তুলতে। কালী নিরাশ হয়ে আমার কাছে বিড়ি চায়। বাবার আলমারিতে সব সময় লাল সুতোর বলাই বিড়ি থাকে। আমি বিড়ি নিয়ে রান্নাঘরের দিকে তাকাই। মা ভাত বসিয়ে দিয়ে সন্ধে দিচ্ছে। একটু পরেই আমাকে ডাকবে। শাঁখ বাজানোর জন্য। এ দিকে আমাকে টানছিল কালীপদ।

ঘুঁটের আগুনে বিড়ি ধরায় কালীপদ। ঘোর সন্ধেবেলায় বাইসেপ-ট্রাইসেপের শিরা উপশিরা দেখা যাচ্ছে। ঘুঁটের আগুনে আমার চোখ জ্বালা করছিল। এ দিকে মা ডাকছিল – ভাতের হাঁড়িতে ভাত ফুটছিল দেখে এসেছিলাম। মা বলল, উনুনে একটা ঘুঁটে দিয়ে আয়। আর হাতা দিয়ে একটু ঘেঁটে দিস। না হলে হাঁড়িতে লেগে যাবে। মা আরও সব কী যেন বলছিল। এ দিকে কালী আমাকে গল্পে মজিয়ে রেখেছে। উনুনে জ্বাল না দিলে…আমি চলে যাচ্ছি…আমাকে দু’টো ভাত দিবি…

  • ভাত তো হয়নি।
  • ফ্যানা ভাত তো
  • তাই দাও

মাকে বলতে গজ গজ করল। কিন্তু ভর সন্ধেবেলা এক জন না খেয়ে চলে যাবে। মা বলল, আর একটু জ্বাল দিয়ে ওই ফ্যানা ভাত দিয়ে দে।

  • কী দিয়ে দেব?
  • টক দিয়ে দে।

গুড়ের কলসিতে সারা বছরের জন্য তেঁতুল রাখা থাকে। গাছের তেঁতুল। দানা কেটে শুকিয়ে ফেলে রাখা হয়। সুন্দরবনের সব লোক শেষপাতে তেঁতুল খায়। নোনা জল ও নোনা হাওয়ার জন্য গ্রামের বুড়োবুড়িরা বলে তেঁতুল দিয়ে ভাত খেলে শরীর ঠান্ডা থাকে।

হারিকেন জ্বালানো হয়নি। বাজারে কেরোসিন অমিল। বাবা বকবে। লম্ফর আলোয় কালী বসে। সামনে এক থালা ফ্যানা ভাত। তেঁতুল আর লবণ দিয়ে অনবরত চটকাতে থাকে। বাড়ির লবণ আর গাছের তেঁতুল। এই সময়ে এটাই অমৃত। ভয় পাচ্ছিলাম বাবা না এই সময়ে ঢুকে পড়ে। তবে টাকা দেওয়ার ভয়ে বাবা ঢুকবে না। সেজো জ্যাঠামশায়ের বাড়িতে গিয়ে বাবা এখন গল্প করছে। আমি মনে মনে বলছিলাম – কালীদা তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।

সন্ধ্যার অন্ধকারে বাইসেপ-ট্রাইসেপ নাড়িয়ে মুখগহ্বরে চালান করে দিচ্ছে। লম্ফর আলোর বাইরে আরও অন্ধকার। নিজের হাতটাও দেখা যায় না। কাল এই সময়ে যে বনবিরি এলাকায় থাকবে।

দ্রুত খাওয়া শেষ করে কালী। পুকুরে হাতমুখ ধুয়ে হাত মুছতে মুছতে চলে যায়। আমাদের পুকুর পার দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

কিছু দিন পরে শুনি কালী বাঘের পেটে।

আমার মা বলেছিল, সাপের লেখা, বাঘের দেখা।

আগের পর্বগুলি পড়তে এখানে ক্লিক করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here