Utpalendu Mondal
উৎপলেন্দু মণ্ডল

ষাট-সত্তরের দশক, সেই এক সময় ছিল। মাঘ মাসের শ্রীপঞ্চমীতে চিঁড়ে কোটা দিয়ে শুরু হত। তার পর চলত সমানে ধানভানা। তিন জন লাগে ধান ভানতে। দু’জন পার (পা দিয়ে চাপ দেওয়া) দেবে আর একজন গড়ের কাছে বসে ধানভানার সময় গড়ের মধ্যে সন্তর্পণে হাত চালিয়ে আলে দিত। সব ধান যাতে সমান ভাবে ঢেঁকির পাড় লাগে।

এই সব ক্রিয়াকর্মের ভিতর দিয়ে চলত পরচর্চা। গুনগুন সুরে দুখের যাত্রা। না হলে জরিনাবিবির গান অথবা কীর্তনের, বিবেকের সুর। এই সুরের মধ্যে ভেসে থাকত নতুন ধান আর নতুন চালের গন্ধ। সদ্য তৈরি হওয়া চাল যার গায়ে ধানের গন্ধ। সদ্য তৈরি হওয়া চাল, যার গায়ে ধানের কোটিন। বিশেষ করে আতপ চাল খুব মিষ্টি লাগত। আমাদের মতো নাংটা-ভুটুংরা আশেপাশে ঘুরঘুর করত।

ধারাবাহিক/ পর্ব- ১১

গীতা ছিল আমাদের বয়সি। ওর মা যে হেতু গড় আগলাত, সদ্য ধানভানা চাল কুলো দিয়ে ঝেড়ে পাত্রে তুলত। গীতার মা খুব ভারী চেহারার মহিলা। মুখের মধ্যে সব সময় গুন্ডির পান থাকত। এই এলাকায় কিংবদন্তি ছিল আকঁড়া চাল। অর্থাৎ সদ্য ঢেঁকিছাঁটা চাল। যাতে ধানের কুঁড়ো মেশানো থাকত। সেই চাল যদি কেউ খায়, তবে সে দ-য়ে পড়বে। মানে নদী কিংবা পুকুরে পড়ে যাবে।

ঘটনা যে ঘটেনি, তা-ও নয়। এর আগে রতিকান্ত সর্দারের দলবল আমাদের বাড়িতে কাজ করতে এসেছিল। সারা দিন কাজ করার পর ঢেঁকিঘরের পাশে বসে মা-কাকিমাদের সঙ্গে গল্পসল্প করছিল। ওদেরই কোনো বাচ্চা, গড়ের আকঁড়া চাল খেয়েছিল। আমাদের নদীর ও পারে ওদের বাড়ি। নদীটা পার হতে পারলেই চরের খাসজমিতে ওদের ঘর। ঘটনাটা সত্যি ঘটল। গোটা ঘটনাটা নিমেষে ঘটল। নৌকা জলের ঘূর্ণির মধ্যে পড়ে গেল। অনেকেই সাঁতরে উঠেছিল।

সেই বাচ্চাটা, যার নাক অবিরত শিকনি ভর্তি, তার মলিন মুখটা এখনও মনে পড়ে। গীতার মা এই ঘটনার কথা মনে রেখেই বোধহয়, মেনে যাতে ভয়ে আর চাল খেতে না আসে, সে কারণে কষিয়ে দিল এক চড়। প্রতিক্রিয়া – গড়ের মধ্যে গীতার হাত। একেবারে চিত্রকরের ডানহাত। রক্তারক্তি। ভাগ্য ভালো মাথায় লাগেনি। চিরকালের মতো হাতের মধ্যমা বেঁকে গেল।

অমন লবঙ্গলতিকার মতো আঙুল দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোল। আমরা গাঁদাফুলের রস লাগালাম। হাতে ন্যাঙড়া দিয়ে বেঁধেছিলাম। রক্ত আর কান্না তাতেও বন্ধ হল না। আসলে ঢেঁকিঘরের পাশে বড়ো পুকুর। আমাদের দাদারাও এ-পার ও-পার করতে পারে না। গীতার মায়ের আশঙ্কা ছিল, পুকুরে টুকুরে যদি পড়ে যায় ছোট্ট মেয়ে। নিজের সন্তানের খারাপ আর কে চায়। ফলত নতুন চাল। ঢেঁকিছাঁটা চালের মিষ্টতা আর আস্বাদন করা গেল না। গীতা এখন কাজের মাসি। সকালবেলা সোনারপুর থেকে ছ’টা কুড়ির গ্যালোপিন লোকাল ধরে। বালিগঞ্জে সাতবাড়ি তোলা কাজ সেরে আবার ট্রেন…।

মুছে যায় শৈশবের গন্ধ। চোখে ভাসে ঢেঁকিঘর থেকে গানের গুনগুনানি। আলো (আতপ) চালের মিষ্টতা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। পান খাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতে শুধুই নোনতা!

আগের পর্বগুলি পড়তে এখানে ক্লিক করুন

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here