সুন্দরবনের সেই মুখগুলি/ দিদি

Utpalendu Mondal
উৎপলেন্দু মণ্ডল

সাবু-বার্লি খেয়ে খেয়ে মুখে অরুচি। বাইরে তখন ঋতু বিপর্যয়ের প্রকৃতি। আকাশের নীল শূন্যতা আর দিদির মুখের দিকে তাকাতাম। কী নিদান দেয়? দিদি ছিল নিঃসন্তান। ভাগনে-ভাগনিরা সব দিদির তত্ত্বাবধানে মানুষ। কড়া শাসন। সন্ধে হলেই হ্যারিকেনের ধুসর আলোয় পড়তে বসা। দু’চোখে যেন বাজবরুণের আঠা দেওয়া। কিছুতেই খোলা থাকতে চাইত না। দিদির মেজদির ছেলে নিখিল- এক মাত্র সে সব সময় ‘নর নরৌ নরা’ করে যেত। সান্ধ্যগুঞ্জন একমাত্র ওই বজায় রাখত। তার পরেও নিঃসন্তান দিদির কাছে আমরা ধরা পড়তাম।

ধারাবাহিক/ পর্ব- ১২

ওই সান্ধ্য অন্ধকারে বাঁজা কাঁঠালতলায় দিদির দাড়িওলা ধাড়ি ছাগল বাঁধা থাকত। সে মাঝে মাঝে দাড়ি নাড়াত। সন্ধেবেলায় দিদির একপাল হাঁস ঘরে তোলার দায়িত্ব ছিল আমাদের ওপর।

শীতকাল পড়লেই নতুন ক্লাসে ওঠা। তার জন্য বই কেনা। বই কিনলে মলাট দেওয়ার কথা। দিদিই একমাত্র পারত বই মলাট দিতে। এ সময় আমরা একেবারে সুবোধ বালক। অনেক কাকুতি-মিনতি করে তবে দিদিকে রাজি করাতাম। সংসারে হাজার কাজের মধ্যে এই সব করে দিত।

এ হেন দিদির অনেকগুণ ছিল। কলুনপাড়ার অনেক গরিবগুর্বো লোককে দু’ মুখো সময় মানে আশ্বিন-কার্তিক মাসে টাকা-পয়সা ধার দিত। ফসল ওঠার পর তাগাদা করতে দেখেছি।

কালের নিয়মে আমরা এক দিন বড়ো হয়ে গেলাম। তার বোনঝিরাও। দিদি বড়ো একলা হয়ে গেল। এক মাত্র ভাই, আমাদের দাদার বিয়ে হল। সে চাকরি নিয়ে বাইরে চলে গেল। আমরা ও জ্যাঠামশাই আর জেঠিমাকে নিয়ে দিদি ‘একলা’।

এই একলা সময়ে দিদির আবার ডাক আসে। শ্বশুরবাড়ির ডাক। যাব না, যাব না করে চলে গেল। টাকা-পয়সা, গয়নাগাঁটি নিয়ে চলে যাবে দিদি। যাওয়ার আগে জ্যাঠামশাইয়ের বাড়ি ডাকাতি হল। তাতে দিদির ক্ষতি হল বেশি। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের মতো জীবন তো মেলে না। কয়েক বছর যেতেই জামাইবাবু মারা গেলেন। জ্যাঠামশাই কয়েক বিঘা জমি দিয়েছিলেন দিদির নামে। দিদি সে জমি নৃপেন ডাক্তারের কাছে বেচে দিল।

কিন্তু সব টাকা দিল না। এর মধ্যে জ্যাঠামশাই-জেঠিমা মারা গেল। বাড়ি ভাইয়ের জিম্মায়। তিনি আবার লিজ দিয়ে পগার পার। টাকা-পয়সা নিতে এসে নৃপেনদের বাড়িতেই থাকে। নৃপেনের প্রচুর পয়সা। তবু পয়সা দিতে চায় না। এই রকম একদিন এসেছে। বৈশাখের খর রোদ্দুর। দু’টো গাঙ পেরিয়ে এসেছিল, বুঝতে পারেনি আকাশে মেঘ জমেছে। তার পরের দিনই আয়লা। সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।

মাঠঘাট জলে ভর্তি। নদীর বাঁধ ভেঙে মাঠে জল। দুর্যোগ কেটে গেল- কোন এক সকালে নৃপেন ডাক্তারের পুকুরে দিদির সলিল সমাধি। ময়না তদন্তও হল না। তার একদা ভাইরা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখল। একদা ‘সুবর্ণলতা’ এ ভাবেই চলে গেল।

আগের পর্বগুলি পড়তে এখানে ক্লিক করুন

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.