সুন্দরবনের সেই মুখগুলি/ ভোট না-দেওয়া বুড়ি

0

উৎপলেন্দু মণ্ডল: তখন ভরা চৈত্র। আর কয়েক দিন পরে শিবের গাজন। অনেকেই শিব পুজোর তোড়জোড় করছে। কিন্তু চৈত্রের দুপুরে গাঙভেড়িতে আর ওঠা যাচ্ছে না। যেহেতু বঙ্গোপসাগর কাছেই। মাঝে মাঝেই ঝোড়ো হাওয়া বয়। সে সময় গাঙভেড়িতে উঠলেই চোখে মুখে ধুলো, নগ্ন পায়ে যেন ঝাঁটার কাঠি মারছে।

বাধ্য হয়ে আমাদের দলটা গাঙভেড়ি ছেড়ে দিয়ে বিলান রাস্তা ধরে। প্রত্যেক বাড়ি গিয়ে বলতে হচ্ছে আমরা ভালো লোক। আমাদের ভোট দিও। ভরা দুপুর চারপাশ এক্কেবারে খাঁ খাঁ করছে। মাঠে গবাদি পশু নেই। সবাই গাছের তলায়, না হলে গোয়াল ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে।

ধারাবাহিক/ পর্ব-১৩

এই সময়টা ভোট কর্তারা চাইছিল। দুপুরের এই সময় গ্রামঘরে মধ্যাহ্নভোজনের পরে সবাই বিশ্রাম নেয়। বাড়ির মেয়েদের তখনও খাওয়াদাওয়া চলতে থাকে। তাদের ভোটও তো কম নয়। প্রতীক বোঝাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। তখন জোড়া বলদ আর কাস্তে-হাতুড়ির আমল। মাটির দেওয়ালে জোড়া বলদ দাঁড়িয়ে। কোদাল বেলচা ও কাস্তে-হাতুড়ির চিহ্নও মাটির দেওয়াল।

ভোট দানে নিরানন্দ গ্রামে একটু হইচই। বিকেল হলেই, আমরা যে কোনো পার্টির দলে যোগ দিয়ে বলতাম দলে দলে যোগ দিন। এই গ্রাম পরিক্রমায় একটি আনন্দ ছিল।

গ্রামের মাঝখানে পোড়ো বাড়িতে থাকত বুড়ি। সবাই বলত মালতীর মা। মালতীর কবে বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বুড়ি মনে হয় কোনও দিন মেয়ের বাড়িতে রাত কাটায়নি। শ্বশুরের ভিটে সে কিছুতেই ছাড়বে না। ভোটও দিত না কোনও দিন। আমরা দেখতাম বুড়ি বারান্দায় বসে থাকত। বসে চাটাই বুনত। না হলে কাঁথা সেলাই করত। সামনে বসা পাড়ার নেড়িকুত্তা। নাতিপুতিদের জন্য আম-কুল শুকাত। আমরা মাঝে মাঝেই শুকনো কুল নিয়ে আসতাম।

ঘরের পেছনে কয়েকটি খেজুর গাছ। প্রত্যেকটি গাছে খেজুরের কাঁধি। জ্যৈষ্ঠ মাস পড়লেই পাকতে শুরু করবে। আমরা ভোট রঙ্গের লোকরা ঝাঁকড়া কুল গাছটার নিচে দাঁড়াই। বুড়ি বারান্দায়। গাঙ্‌বাতাড়ি হাওয়ায় বসে আছে। কুকুরটা জিভ বার করে আমাদের দেখছিল।

[ আগের পর্বগুলি পড়ুন এখানে ক্লিক করে ]

আমাদের দলনেতা বুড়িকে পান সাজতে বলে। উদ্দেশ্য জমিয়ে ভোট ভিক্ষা করা। সূর্যকান্তদা মুখে মতিহার তামাক নিয়ে বলে, “আমরা খুব ভালো লোক। এ বার তোমার বাড়ির সামনের রাস্তাটা করিয়ে দেব। বর্ষাকালে বড়ো কষ্ট হয়”।

বুড়ি নিবিষ্ট ভাবে শুনে বলে – “হ্যাঁ জানি, যারা নোকের গাছের খেজুর খায় তারা খুব ভালো নোক”। আমি আর খোকনদা দাঁড়াই না। হ্যাঁ, গত বছর বুড়ির গাছের খেজুর আমরাই চুরি করে খেতাম। বাইরে রোদ পড়ে গেছে । আমরা পা বাড়াই বাড়ির দিকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here