সুন্দরবনের সেই মুখগুলি/ কালীপদ আর রতিকান্ত

0
Utpalendu Mondal
উৎপলেন্দু মণ্ডল

প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা। দু’জনেই প্রান্তিক মানুষ। এক জনের নাম কালী। কালী সর্দার। রোগা-পাতলা, কুচকুচে কালো। বর্ষার শেষ। মাটি এখনও ভালো করে শুকায়নি। কালী এসেছে। কাজটাজ যদি কিছু হয়। তার নাকি কাল রাতে খাওয়া হয়নি। সে অবস্থায় সে আসতেই বাবা বাগান পরিষ্কার করতে দেয়। তারপর মাটি কেটে ওল,কচু তোলা হবে। কালী নদীর ওপারে থাকে। আমাদের পেতম মাঝির ভাই। খালি পেটে প্রায় চার কেজি ওজনের কোদাল দিয়ে সে মাটি কাটতে থাকে। নরম ক্ষেতের মাটি। কার্তিকের হিম তখনও লতায়-পাতায়। সামনে দীর্ঘায়ত এক খেজুর গাছ। সাড়া গায়ে তে-পাতা আলু গাছে ছেয়ে আছে। ওর মধ্যে দিনের বেলায়ও বাদুড় থাকে। আর কয়েক দিন পরে খেজুর গাছও ঝাড়া হবে। শীতকালে ভালোই রস দেয়।

ধারাবাহিক/ পর্ব-১৪

প্রায় রোবটের মতো মাটি কাটতে থাকে কালীপদ। আমি ঝোপ বুঝে মাটির মধ্যে লুকিয়ে থাকা কচু, ওল তুলতে থাকি। মাঝখানে একটু জিরিয়ে নেয়। আমাকে বিড়ি আনতে বলে। তখন সবচেয়ে ভালো বিড়ির প্যাকেট ২৫ পয়সা। জনের দাম দেড় টাকা, দু’ বেলা খাওয়া। তবে ভাত খাওয়ার সময় দেখলাম এক থালা ভাত লবণ দিয়ে শেষ করে ফেলল। ভাদ্রের দুপুরে সে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। গামছাটা মাথায় বাঁধা।

রোগা, শীর্ণ, কঙ্কালসার দেহ রতিকান্তর। সে প্রায় আড়াই হাত গামছা পরে মাঠ ভেঙে আসছিল। মাঠ ভর্তি জল। বিলের মাছ চলে আসছে উজানে। রতিকান্ত একটার পর একটা কই মাছ গুঁজে রাখছে। দু’পা এগোতেই কোমরে কানকো মেরে আবার নিচে। ধরণী প্রপাত তলে। আমি বকতেই সে কোমরের কই মাছ আমাকে দিয়ে দেয়।

রতিকান্তর ভাত খাওয়ার সময় দেখতাম, একগ্রাস ভাত মুখে ঢোকানোর আগে একটা করে বিচি কলার দানা নিত। আজকের দিনে এ সব ভাবা যায় না।

[ আগের পর্বগুলি পড়ুন এখানে ক্লিক করে ]

এরও কয়েক বছর পরে ১৯৭৯ সাল নাগাদ। ‘গঙ্গা’খ্যাত রাজেন তরফদার গোসাবায় এসেছিলেন। ‘নাগপাশ’ শুটিং এখানেই হয়। আমরা হস্টেলের ছেলেরা দু’-এক জন এক্সট্রার পার্ট পেতাম। ‘নাগপাশে’ মাস্টারমশাইয়ের চরিত্রে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক অভিনয় করতে এসেছিলেন। তিনিও বোধ হয় এক্সট্রা ছিলেন। কেন না তিনি আমাদের সঙ্গে বসেছিলেন। পিছনে বেকন বাংলো। তার পাদদেশে আমরা পাত পেড়ে বসেছি। আমিও এক্সট্রা। এক সঙ্গে খেতে বসেছি। হঠাৎ দেখলাম বৃদ্ধ অসহায় গলায় বলছেন, একটা পেঁয়াজ চাইলাম তাও তো দিলে না। বিচি কলা দিয়ে কি খাওয়া যায়?

তখনই বুঝলাম বিচি কলার মাহাত্ম্য।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here