দেওয়ালে কোদাল-বেলচা, লোক কোদাল চেনে, কিন্তু বেলচা দেখবে কী করে!

0
Sundarban
Utpalendu Mondal
উৎপলেন্দু মণ্ডল

ভোট দেবেন কেমন করে/ গাই-বাছুরে ছাপ মেরে। তখন গাই-বাছুরের যুগ। কংগ্রেস। বাম বলতে আরএসপি। দেওয়ালে কোদাল-বেলচা। সাতজেলে মোল্লাখালিতে দেওয়ালে আলকাতরা আর আলতায় অলঙ্করণ। আমাদের ওখানকার লোক কোদাল চেনে, কিন্তু বেলচা দেখবে কী করে। গ্রামে তো কারখানা নেই। চারপাশে ধানক্ষেত। তখন ধানকাটার সময়। সে কারণে সন্ধের অন্ধকারে গাঙভেড়ি দিয়ে মিছিল। সান্ধ্য নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধুই শোনা যেত জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ। মাইক ছিল না। শঙ্কু আকৃতির চোঙই ছিল সস্তার প্রচারযন্ত্র।

কংগ্রেসওয়ালাদের খুব বেশি মিছিলে দেখা যেত না। আমাদের মিছিলে যেতে দেওয়া হতো না। ধানকাটা প্রায় শেষ, কারুর কারুর বাকি আছে। ভোটের দিনেও আয়োজন বলতে তেমন কিছুই ছিল না। আমরা ছোটোরা ভোটের আগের দিন ভোটকর্মীদের দেখতে যেতাম। অনেকেই স্কুলে থাকত, পাড়ার লোক রান্না করে নিয়ে যেত। বেশিরভাগটাই প্রাইমারি-হাইস্কুলের মাস্টারমশাইরা আসতেন। গ্রামের চৌকিদারও থাকত। তখন ভোট মানে এতটা হাড্ডাহাড্ডি লড়াই নয়। পঞ্চায়েত ভোটের আগে দিল্লি কিংবা রাজ্যের ভোট নিয়ে হাঙ্গামা কম হয়েছে! শুধু গরিব লোকের পার্টির লোকজনদের কংগ্রেস খুব একটা পাত্তা দিত না। অনেক সময় এজেন্টকেও বসতে দিত না। তবে লাল পতাকাকে যে ভয় পেত না তেমনটাও নয়। মাঝে মাঝে আওয়াজ দিত- লাঙল যার, জমি তার। অনেক রায়তী সম্পত্তির উপরেও শত্রুতা করে জমির উপর লাল পতাকা মেরে দিত।

রায়মঙ্গলের ওপার থেকে কাজ করতে এসেছিল কাশীনাথ। খোঁড়া মানুষ। ভোট দিতে যেত না। বরং মিছিল দেখলে ভয় পেত। গরিব লোকের পার্টি তাকে একবার বলেছিল, যে গ্রামের লোক, সে গ্রামে থাকবে, এ গ্রামে নয়। দিনের বেলা মিছিল হল ঘরের মধ্যে, রান্না ঘরে লুকিয়ে বসে থাকত।

উত্তরপাড়ার বেসিক স্কুলে প্রত্যেক বছর ভোট। পুরুতরা সকাল বেলা ভোট দিতে গেছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার আগে মা-কাকিমাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। একটা বিল পাড়ি দিলে তবে বেসিক স্কুল। সাদা দেওয়াল। দরজার সামনে পুলিশ দাঁড়িয়ে একেবারে ছবির মতোন। মেয়েদের বোঝানোর দায়িত্বে আমরা। কিন্তু আমাদের এত সব ব্যাখ্যা বিফলে গেল। কাকিমা ভোট দিতে গিয়ে গাই-বাছুর খুঁজে পায় না। আমরা জানলার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কাকিমা আমাদের খোঁজে। শেষমেশ গাই-বাছুর বা জোড়া বলদ না পেয়ে টেবিলে ছাপ মেরে চলে আসে।

[ আগের পর্বগুলি পড়ুন এখানে ক্লিক করে ]

এখন ছাপ্পা ভোট, বুথ ঘেরাও- কত কিছুরই না অভিযোগ ওঠে। কিন্তু ভোট কেন্দ্রে গিয়ে প্রতীক খোঁজা বোধহয় আর দেখতে হয় না!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here