Sunderban
Utpalendu Mondal
উৎপলেন্দু মণ্ডল

তখন চারদিকে ফসল বিলাসী হাওয়া, উত্তুরে কনকনে। গা’র কাপড় উড়িয়ে নিয়ে যায়। লম্বা কালো আগের দিন বড়ো বড়ো ধানের বোঝা বইছিল। পাটনাই ধানের খড়। লম্বা। বাতাস গোঁত্তা খায়। ব্যালেন্স করে পথ চলাই দায়। সামনে-পিছনে ফাঁকা মাঠ- হাওয়ার দাপট বাড়ে। এ দিকে মাঠে ফসলও রাখা যায় না। রাখলে পোকায় কাটে। ধানের শিষের অর্ধাংশ আপনিই ঝরে পড়ে মাটিতে। ধান উঠে গেলে কুড়ুনি না হলে ইঁদুরের খাদ্য হয়।

ধারাবাহিক/ তৃতীয় পর্ব

লম্বা কালো দাউলে খাটছিল বাউদের জমিতে। বাউদের চরঘেরীতে সে বার পাটনাই যেন ঝেড়ে হয়েছিল। দাউলে একশোটা খড়ে, কুড়িটা বিচালি খড় পাবে। খুৎকাতর পেটে সবে নতুন চাল। তাও জ্বালানির অভাবে ধান সেদ্ধ হচ্ছে না। আতপ চালের ভাত। নতুন সুবাস। খাওয়াও বেশি হয়ে যায়। পেট ভুটভাট করে। কিন্তু পরের দিন আবার শস্যপ্রয়াস। বেলা যায় শীতের সংক্ষিপ্ত। রৌদ্রদগ্ধ দিন। মধ্যের পর সাঁঝো অন্ধকার। ধানের গোলা দেখা যায় না। সে কারণে কলুনপাড়ায় কালো লম্বা লম্বা পা ফেলে ধানের বোঝা বয়। হাওয়ায় ঠেলে নিয়ে যায় সে বোঝা। নবীন বাউলে খালের মুখে লম্বা বাঁশের লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ধানের বোঝা ঠিক ঠিক তার উঠানে পৌঁছাছে কি না। দাউলেদের বোঝা আলাদা রাখা হয়। পরে আবার ধান গুনতি করে- ওদের পাওনা মিটিয়ে দিতে হবে।

ভাঙা খালের মুখে এসময় বিল মাছাদের উৎপাত। ধানের গুঁড়ো ভেজে খ্যাপলা জাল ফেললেই সরপুঁটি, মৌরালা, শোলকই। এত দিন ধান মাঠে চরে বেড়াত। এখন মাঠ শুকনো। কালো ভেবেছিল, ধান যা পাবে, বোঝাটা বাড়িতে ফেলে দিয়ে খ্যামন জাল দেবে। ছেলে-মেয়েগুলো কদিন ধরে কচুরমুখির ঝোল খাচ্ছে। এ সময় খাবে না তো কবে খাবে!

নবীন বাউলে গত সপ্তাহে সাত জেলের হাট থেকে পঞ্চমিষ্টি এনেছে।  পূর্বপুরুষদের নতুন ভাত, পঞ্চমিষ্টি বাড়িয়ে দিয়ে তবে নতুন চালের ভাত খেতে হয়। এ দিকে পুরনো চাল বাড়ন্ত। সংসারে এক গাদা পুষ্যি। ছেলেগুলো মনে হয় মানুষ হল না। ওদের পড়ালেখার জন্য বসিরহাটের মাস্টার রেখেছে। নদীর ও পারে তারানগর স্কুলে পড়ায়। মাস্টার পণ্ডিত লোক। সব সময় বই নিয়ে বসে থাকে। এক বার মনে হয় বলে- মাস্টার ধানগুলো ফুরিয়ে দাও। কিন্তু বলতে সাহস হয় না।

আরও পড়ুন: সুন্দরবনের সেই মুখগুলি/ পাগলাহরি

সাঁঝ রাস্তা এখন আর দেখা যায় না। দু’পাশে ধানের আলোয় যা দেখা। মাথায় বোঝা, বড়ো বোঝা। এ বার শেষ ক্ষেপ। নবীন বাউলে তাড়াতাড়ি ওর ধান ফুরিয়ে দেয়। চল্লিশ-পঞ্চাশটা আঁটি নিয়ে সে বাড়ির দিকে তাড়াতাড়ি হাঁটে। বাড়িতে ছেলেপুলেগুলো কলকল করে ওঠে।

-বাবা আসতেছে। বাবা আয়েছে।

রাতেই খাওয়া-দাওয়ার পর সামান্য পেট ব্যথা। তার পর সব শেষ। স্কুলে যাওয়ার সময় গাঙ ভেড়ির নীচে চিতা দেখলাম। মাটির ঘট ভাঙা। মাঝখানে কয়েকটা পোড়া কাঠ। জোয়ারের জলের অপেক্ষায়।

পরীক্ষা দিয়ে ফেরার সময় সন্ধ্যা হয়। চার দিকে শান্ত নীরবতা। বাতাসে হিম পড়ছে। কুয়াশার এই সব মাঠে তাকে আর খুঁজে পাবে না কেউ!

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here