সুন্দরবনের সেই মুখগুলি/ নিতাই মাঝি

নিতাইদা ত্রিমোহনায় খেয়া দিত। ঘাটে পৌঁছলে শিঙা বাজাত। চুল কাটত কিন্তু দাড়ি রাখত। এক্কেবারে হেমিংওয়ের রেপ্লিকা।

0
Sunderban
Utpalendu Mondal
উৎপলেন্দু মণ্ডল

ও সাধের ভাগনেরে
তুমি কেন মামা হইলা না
তুমি যদি হইতা রে মামা…

নিতাইদা ত্রিমোহনায় খেয়া দিত। ঘাটে পৌঁছোলে শিঙা বাজাত। চুল কাটত কিন্তু দাড়ি রাখত। এক্কেবারে হেমিংওয়ের রেপ্লিকা। ওর নৌকো থেকে মামা-ভাগনের গান ভেসে আসত। নৌকোর অবস্থা কোনো কালেই ভালো ছিল না। হালুইতে বগ বগ করে জল উঠত। ভাঙন কূলের শক্ত মাটি দিয়ে হালুইয়ের ফুটো সারাত। শীত-বর্ষায় নিতাইদাকে দেখি শেষ বিকালে কী রকম দার্শনিক হয়ে যেত।

ধারাবাহিক/৬

তখন পাঁচ পয়সা করে খেয়া। গ্রামের লোক ফসল উঠলে এক পঞ্জা করে ধান দিত। নিতাইদা বৈষ্ণব। আবাদ করার সময় থেকে সে খেয়া দিচ্ছে। সে বার গোসাবা থেকে ফিরছি। প্রচণ্ড রোদ্দুর। গাছের ছায়ায় বসে। আমাদের গ্রামের অনেক লোকও ছিল। কান্তপাড়ার অমল খুব গালমন্দ করেছিল। নৌকোয় উঠতেই নিতাইদা বলেছিল, “দ্যাখব-দ্যাখব আমি চলে গেলে কে তোদের ওই ত্রিমোহনায় খেয়া দেয় দ্যাখব”। সত্যি সত্যি নিতাইদার ছেলে একদিন বাবা-মাকে নিয়ে শহরে পাড়ি দিল। ওর ছেলে এল না এই লাইনে। ভরা জোয়ারে দেখেছি বড়ো বড়ো ঢেউ কাটিয়ে নিতাইদা নির্লিপ্ত ভাবে পাড়ি দিচ্ছে। কোনো ছোকরা বিরহী নোনা হাওয়ায় ভাসিয়ে দিচ্ছে-

আওলা চুলে বাতাসে ওড়ে
ঘোমটা নাই মাথায় রে।
কে কাঁদে ওই নদীর কিনারে…

নিতাইদা চলে যাওয়ার পর সত্যি সত্যি খেয়া বন্ধ হয়। তিন পারে আর যাত্রী অপেক্ষা করে না। তারা অন্য পথ বেছে নিয়েছে। নিতাইমাঝির খবরও কেউ রাখে না। নিতাইদা মাঝে মাঝে নৌকো গাইতে যেত। পুরোনো নৌকো দুই তক্তার ফাঁকে ফাঁকে পাটের দড়ি ছোট্টো বাটালি দিয়ে ভরাট করত। তখন ঘরে ঘরে নৌকো। ভাটার সময় নদীর চর শুকিয়ে ফুটিফাটা। এই সময় নৌকো উপুড় করে রাখে। নৌকো আর ভূমির সমান্তরালে গড় কাঠ অনেকটা পিপের মতো দেওয়া হয়। অনেক দিন লাগে নৌকো গাইতে।

এ সময়ই গল্প করত নিতাইদা। নৌকোয় সব সময় থাকার জন্য হাত-পায়ে হাজা হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু অদ্ভুত তার হাত পায়ের গড়ন-বেষ্টন। হাতে-পায়ের নখ যেন কাতলা মাছের আঁশ বসানো। প্রখর সূর্যের কিংবা চাঁদের আলো সেই হাত-পায়ে খেলে বেড়াত। এক মুখ দাড়ি নিয়ে আমাদের সঙ্গে ‘পরন কথা’র গল্পে মেতে থাকত। তখন আর বিদ্যাধরী যেন বিদ্যাধরী থাকত না। ধানী ঘাস ছাওয়া চরে নেমে আসত মগদস্যুরা। বারো ভূুঁইয়ারা গাঙ শালিখের বেশে ততক্ষণে ভিড় জমিয়েছে। নিতাইদা তখন ঠুকঠুক বাটালির আওয়াজ তুলেছে। সপ্তমীর চাঁদ তখন পুনরাগমনে…। আমরাও বাড়ির পথে, নিতাইদাও।

আগের পর্বগুলি পড়ুন এখানে ক্লিক করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here