সুন্দরবনের সেই মুখগুলি/শুক্রিমালি

0
Sunderban
Utpalendu Mondal
উৎপলেন্দু মণ্ডল

কোন ছোটো বেলা থেকে দেখছি শুক্রিমালিকে। গোঁবি ধান সবে মাছরাঙা দিয়েছে। আমরা ছাত্রবন্ধু নিয়ে ধান পাহারা দিচ্ছি। শুক্রিমালি হামাগুড়ি দিয়ে ধানখেত থেকে বেরুচ্ছি। হাতেনাতে ধরতে, বলে – শালুক খুঁজতে গিয়েছিল। কিন্তু ওর মুখের দু’কোণে ধানের দুধ। একান্তই দয়া পরবশ হয়ে আমরা ছেড়ে দিই। শুক্রির বর অধর। অলস। ছিঁছকে চোর। ধরা পড়লে আমরা আমরা হাতের সুখ মেটাতাম। বড়রা ছেড়ে দিতে বলত – হাজার হোক পাড়ার জামাই। ঘাস জমিতে ঘর বেঁধে থাকত। অধর পর পর তিন মেয়ের জনক। এ দিকে বউ ভিক্ষে করে বেড়ায়।

গরান কাঠ চেলা করে তার আগুনে পেঁয়াজি ভাজতে ভাজতে ওর ভাই অজিত মালি বলেছিল, “আমরা মালি না মল্লিক। পঙ্কজ মল্লিক আমাদের বাড়ির লোক”। সত্যিই ওদের এক সময় জমিজমা ছিল। অভাবে পড়ে যোদ্ধারদের কাছে বিক্রি করে। ভাইরাও সব লোকের বাড়িতে কাজকাম করে। শুক্রি ভিক্ষা চাইতে এলে মা-কাকিরা প্রায়ই ওর বরের নিন্দা করত। খিন খিনে খনা গলায় বলত, পিটিয়ে মেরে দেয় না কেন? মারতে আর হয়নি। কী ভাবে কেমন করে যেন অধর মারা গেল, আমাদের অধরা রয়ে গেল অধর। অধরের করুণ মুখ। কাজ করত না বলে সবাই তাঁকে উলটোপালটা কথা বলত। এক ফসলি দেশ, কাজই বা পাবে কোথায়! জীবন রসিক অধর শেষে পুত্র সন্তান উপহার দিয়ে উপরে চলে গেল।

ধারাবাহিক/ পর্ব-৮

বিপুল তরঙ্গে জীবন বয়ে যায়। শুক্রির অভাব ঘোঁচে না। তার কন্যাদের বিবাহ হয়। আবার পিতৃগৃহে ফেরত আসে। আমাদের গ্রামে খুব বেশি ভিক্ষা করত না। হয়তো বা লজ্জার কারণে। বেশি দিন আর মাধুকরী করতে হয়নি। সেও স্বর্গে চলে যায়। আক্ষেপ, সে কোনো বিধবা ভাতা পায়নি।

ওর ছেলে বড়ো হয়। বাবার ঘর ভালো করে বাঁধে। বেশ আট চালা ঘর। সামনে খ্যাপলা জাল। গাব দেওয়া। শুকোচ্ছে। বাবার নাম বদলাবার জন্য যেন ওর জন্ম। মরিচঝাঁপি ওলাদের কাছে একটি ডিঙি নৌকো কিনল। বাগদা মারাদের কল্যাণে নদীর মাছ পোনা অবস্থায় মারা যেত। তার মধ্যেও অধরের ছেলে মাছ পেত। সেই মাছ নিয়ে বাজারে বিক্রি করত।

আয়লার আগের বছর আকস্মিক ভাবে বড়ো একটি ডাঙাল মাছ পায়। গ্রামের লোকরা বলল, ভাগা দিয়ে গ্রামে বেচে দে। রাজি হল না শুক্রীর ছেলে। সাড়ে চার হাত ডিঙি নৌকো নিয়ে ক্যানিংয়ে চলে যায়। ইচ্ছে করেই ভটভটিতে গেল না। যেতে যেতে মাছ পচে উঠল। ক্যানিংয়ে যখন পৌঁছালো তখন মাছের আড়ত বন্ধের মুখে। আড়তওলাও অবাক।

এই হচ্ছে শুক্রিমালির ছেলে, যে কাঠ ফাটা রোদে বিকেলের আলো মেখে খনখনে গলায় বলত – এক খুঁচি চাল দেবে মা। নোনা বাতাসে হারিয়ে যায় সেই মেয়েলি সকরুণ সুর। অধর যত অলস ছিল তার অভাব পুরণ করল ওর ছেলে। তবু অধর অধরই থেকে গেল। ইঁদুর-দৌড়ের দিনে – অধরকে আর কোথায় পাব?


আগের পর্বগুলি পড়তে এখানে ক্লিক করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here