Utpalendu Mondal
উৎপলেন্দু মণ্ডল

ছোটোবেলায় বাঘা নটোকে দেখলে ভয় পেতাম। বাঁ কান আর মাথায় বাঘ-মশায়ের ভালোবাসার দৃশ্যমান ছাপ। তার সঙ্গে খুব একটা কথা বলতাম না। বিকেল হলে দেখতাম আমাদের সরকারি খালের কানায় বসে কুঁচো মাছ ধরছে। ঘোর সন্ধ্যায় বসে থাকত। কী অমাবস্যা কী পূর্ণিমা। তাকে প্রায়ই দেখা যেত। গাং ভেড়ির নীচে দো-চালা ঘর। আমরা ওর বাড়ির পাশ দিয়ে স্কুল যেতাম। তত দিনে ওর বউ মারা গিয়েছে। ছেলেও বড়ো হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেই ছেলে বাপকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ছেলেটা ভালো বাঁশি বাজাত। শুনেছিলাম যাত্রাদলে বাঁশি বাজাত। বুড়ো বাপ তাঁর মতো করে চলত। অদ্ভুত ব্যাপার- বাঘা নটো পাড়ায় কারুর সঙ্গে কথা বলত না। জানা যায়নি ওর বন্ধু-বান্ধবদের কথা। যারা ওকে বাঁচিয়েছিল, সেই সব বন্ধুদেরও আমরা কোনো দিন দেখিনি।

আসলে বাঘা নটো এসেছিল রিফিউজি হয়ে। পরের দিকে সরকারি খাস জমি পেয়েছিল তারা। তার আগেই বাঘা নটো তার নিজের গলায় দড়ি দিয়েছিল। ওর প্রতিবেশী ছিল বসুদেব মিস্ত্রি, ঋষিবরের ভুপেন। লম্বাকালো ধীরেন কাকা। এরা সবাই মিলে নদীর বারচরে বাঘা নটোর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করল।

বান গাছের কয়েকটা ডালপালা কেটে চিতা সাজানো হল। পোড়া কাঠ ভেসে গেল জোয়ারের জলে। বাঘবাহাদুর চলে গেলেন। কিন্তু গিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দিল বাঘের দিন আসছে। এর কয়েক বছর পরেই শুরু হয়েছিল ব্যাঘ্র প্রকল্পের কাজ।

ধারাবাহিক/ প্রথম পর্ব

ভাগ্য ভালো ব্যাঘ্র প্রকল্পের কাজ  তিনি দেখে যেতে পারেনি। মাস খানেকের মধ্যে বর্ষা নামল। ওর ছিটে বেড়ার ঘর মাটির সঙ্গে মিশে গেল। আমরা স্কুল ফেরতা ওর ঘরের মেঝেতে খেলতাম। প্রতিবেশীরা ভয় দেখাত, কারণ ওখানে বর্ষার সবজি চাষ করবে। ঘরের পঁটা একটু উঁচু বলে, তা ছাড়া মাটি মিঠে হওয়ার কারণে সত্যিই ওখানে পুঁই শাক হয়েছিল। ওর ঘরের কাঠামো দিয়ে লাউয়ের মাচা বানানো হয়েছিল। তাতে ফিন ফাইন জ্যোৎস্নায়  লাউয়ের ডগা আমাদের আমন্ত্রণ জানাত। কিন্তু রাতের কুহেলি মায়ায় আমরা যে ভয় পেতাম কিন্তু তাঁর নীচে ঢ্যামনা সাপ শঙ্কর লাগাত। হলদে পোড়া মাছ ধরে গলাধঃ করত। ব্যাঙ তো ধরতই। ব্যাঙের চিঁ চিঁ শব্দে খেয়া ফেরত লোক ভয় পেত। হাততালি দিয়ে ভয় তাড়াত। মুখে বলত আস্তিকমনি। গ্রাম দেশে প্রচলিত আছে, আস্তিকমনির নাম করলে সাপ চলে যায়। কিন্তু মনের সাপ কি যায়? অনবরত খুবলে যায়।

(চলবে)

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here