নিউজ পোর্টালের খবরকে খুব সহজেই ‘ফেক নিউজ’ বলে দেগে দেওয়া যায়!

প্রতীকী ছবি
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

নিউজ মানে খবর, খবর করে নিউজপেপার, নিউজ চ্যানেল, নিউজ পোর্টাল ইত্যাদি। কিন্তু ফেক নিউজ বলতে মোটেই এতটা সহজ নয়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় হরেক রকমের প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। সেই সমস্ত প্ল্যাটফর্মে কোনো একটা কিছু লিখে পোস্ট করা, সেটাকে জনে জনে শেয়ার করা, এখন সেটাও না কি ‘নিউজ’। সোশ্যাল মিডিয়ায় আচমকা ফেক নিউজের বহর বাড়ছে বলে সরকারি ভাবেও দাবি করা হচ্ছে। এই ফেক নিউজ বলতে ভুয়ো খবর। তবে শুধু মাত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা ‘ফেক নিউজ’ই নয়, এখন নাক ঘুরিয়ে নিশানায় নিউজ পোর্টালের খবরও।

কতগুলো খুব সহজ কথা এতটা চওড়া করে বলার কারণ, করোনাভাইরাস (Coronavirus) প্রাদুর্ভাবকে কেন্দ্র করে ভুয়ো খবরের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে সরব হচ্ছে কেন্দ্র, রাজ্য সরকার, এমনকি সেলেব্রিটিরাও। কখনও অভিযোগ উঠছে, রাজনৈতিক দলের আইটি সেল ভুয়ো খবর ছড়াচ্ছে। কখনও অভিযোগ উঠছে, সংবাদ মাধ্যম হিসাবে পরিচিতরাও ভুয়ো খবর ছড়াচ্ছে। কিন্তু অভিযোগের নিশানায় বর্তমানের অতি প্রয়োজনীয় নিউজ পোর্টালগুলি। তাদের পরিবেশিত খবরের লিঙ্ক সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার হয়।

এ কথা অস্বীকার করার কথা নয়, রাজনৈতিক দলের মদতপুষ্ট কিছু নিউজ পোর্টালও রয়েছে। কিন্তু নিউজ পোর্টাল জন্মানোর অনেক আগে থেকেই পেড নিউজ বলে একটা কথা চালু রয়েছে। খবরের কাগজ অথবা বৈদ্যুতিন খবরের চ্যানেল পেড নিউজে হাত পাকিয়েছে অনেক দিন আগেই। কিন্তু এখন সোশ্যাল মিডিয়া আর ফেক নিউজের চক্করে ওয়েবসাইট-নির্ভর পোর্টালগুলিকে কাঠগড়ায় তোলার অদৃশ্য প্রয়াস নজর এড়াচ্ছে না। কী ভাবে?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগেই জানিয়ে দিয়েছে, খবরের কাগজের মাধ্যমে মোটেই করোনাভাইরাস ছড়ায় না। অনেকে বিশ্বাস করছে, অনেকে নয়। খবরের কাগজের এজেন্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, তাঁদের অনেক গ্রাহকই কাগজ নেওয়া বন্ধ করে দিচ্ছেন। যদিও কাগজ থেকে ভাইরাস ছড়ানো সম্ভব নয়, এমন বোঝার মতো বুদ্ধি ওই গ্রাহকদেরও রয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

বিষয়টির দিকে নজর রেখে সরকারি এবং বেসরকারি ভাবে খবরের কাগজের ক্রেতাদের ভয় কাটানোর চেষ্টা চলছে। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাতেই হয়। কিন্তু বেশ কিছু উদ্যোগে যেন অন্য রকমের আভাস মিলছে। পুঁজির প্রয়োগে কোনো একটা মহলকে চাপে রাখার চেষ্টা খালি চোখে ধরা পড়ছে। কিছু সচেতনতা বার্তায় স্পষ্ট করেই বলা হচ্ছে, টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রে প্রকৃত খবর পাওয়া যাবে। সোশ্যাল মিডিয়ার ভুয়ো খবরে বিশ্বাস করবেন না।

ঘুরে ফিরে আসে ফের সেই সোশ্যাল মিডিয়ার খবর। ফেসবুক বা হোয়াটঅ্যাপের মতো বহু-ব্যবহৃত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে কোনো মন্তব্য লিখে পোস্ট করলেই সেটা নিউজ বা খবর হয়ে যায় না। মিথ্যে এবং যাচাই-না-করা কোনো তথ্য যদি হোয়াটসঅ্যাপের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া অবশ্যই আইনবিরুদ্ধ কাজ। করোনা মহামারির জেরে দেশের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৫ এবং এপিডেমিক ডিজিজেস অ্যাক্ট, ১৮৯৭ নিয়েও জোর চর্চা চলছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, ওই সামাজিক মাধ্যমগুলিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওয়েব পোর্টালগুলির খবরের লিঙ্ক শেয়ার করা হয়। এখন লকডাউন বলে যাঁরা অসীম সময় কাটাতে ঘরে টিভির সামনে বসে রয়েছেন, তাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ার খবর বলতে এই পোর্টালগুলির খবরকেই বোঝেন। কারণ বাসে-ট্রেনে বা অফিসে তো টিভি সেট সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া যায় না। খবরের কাগজও সেই সকালেই হাতে পাওয়া যায়। দিনের বাকি সজাগ সময়ে তাঁদের কাছে খবরের উৎস এই সোশ্যাল মিডিয়াই। ডেস্কটপ তো বটেই, পকেটের মোবাইলেও পাওয়া যায় নিউজ পোর্টাল। যে কারণে ওই অংশটির কাছে সোশ্যাল মিডিয়ার খবর বলতে, ওয়েবসাইট-নির্ভর নিউজ পোর্টাল অথবা টিভি চ্যানেলের খবরের লিঙ্ক। এই লিঙ্কগুলি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়ের গতিতে শেয়ার হয়ে অগুনতি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। একটা মহলের সমস্যা যেন সেখানেই।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নিরিখে কয়েকটা উদাহরণ তুলে ধরা যেতেই পারে। গত ২১ মার্চ রেল জানায়, দু’টি পৃথক ট্রেনের ১২ জন যাত্রীর শরীরে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়েছে। খবরটি পাওয়া যায় রেল মন্ত্রকের নিজস্ব টুইটার হ্যান্ডেল থেকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, খবরটি ফেসবুকে পড়তেই সেটাকে ফেক নিউজ বলে গালমন্দ শুরু করে দিলেন কয়েক জন। অথচ দেখুন ওই খবরের ভিতরে রেলমন্ত্রকের টুইটগুলি ছবির আকারে দেওয়া রয়েছে। তাও সেটা ফেক নিউজ হয়ে গেল।

সেই খবরই কিছুক্ষণ বাদে বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্ব সহকারে দেখানো হল, পরের দিন সকালে খবরের কাগজে যত্ন করে ছাপা হল। তখন কিন্তু ফেক নিউজ তকমা সাঁটা সম্ভব হল না। কারণ কে আর টিভি চ্যানেলের অফিসে ফোন করবে, অথবা কে আর সংবাদপত্রের অফিসে চিঠি পাঠিয়ে প্রতিবাদ করবে, তেমনটা নয়।

কারণটা হল, ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে খুব সহজেই প্রতিক্রিয়া দেখানো যায়। ফেক নিউজ, পেড নিউজ বলে দেগে দেওয়া যায়। উল্টোদিকে টিভি চ্যানেলে বা খবরের কাগজে সে সব একটু কষ্টকর, ব্যয় এবং সময়সাধ্যও বটে!

অন্য দিকে সাম্প্রতিক সময় করোনাভাইরাস মহামারির জেরে ফেক নিউজ বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে বিভিন্ন মহলের তরফে। গত ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কোনো রকমের গুজবে বিশ্বাস না করার আবেদন জানিয়েছিলেন। গুজব কিন্তু গুজবই, ভারতে বিশাল সংখ্যক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী সেই গুজবের শিকার হয়ে চলেছেন। অনেক সময় তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে সংবাদ মাধ্যমের যোগ না থাকতেও পারে।

এর পর গত ২৪ মার্চ প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (পিআইবি) খোলসা করে দেয়, কোভিড-১৯ (Covid-19) মহামারির জেরে দেশের আর্থিক জরুরি অবস্থা জারি নিয়ে ভুয়ো খবর (Fake News) ছড়ায়। অনেকাংশে যার দায় এড়াতে পারে না তথাকথিত সংবাদ মাধ্যমও। অনুমানভিত্তিক এবং সূত্র উদ্ধৃত করা সেই খবর আসলে ভুয়ো ছিল। ক’ দিন আগে এক মার্কিন সমীক্ষক সংস্থা জানায়, বর্তমান পরিস্থিতির নিরিখে ভারতের লকডাউন সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করা যেতে পারে। জিঞ্জাসা চিহ্ন মেরে সেই খবর বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যমে এমন ভাবে সম্প্রচারিত হল, যেন সরকার ওই রকম সিদ্ধান্তই নিতে চলেছে। সেই খবর কানে-মুখে ঘুরতে ঘুরতে মানুষের কাছে তেমন ভাবেই পৌঁছোল। তাই বলে গুজব কী করে নিউজ হবে!

শুধু করোনা কেন, যে কোনো বিষয়েই ভুয়ো খবর ছড়ানো শুধু অপরাধযোগ্য নয়, ক্ষমারও অযোগ্য। অনেক সময় আবার জ্ঞাতসারেই এই কাজটি করা হয়ে থাকে। সেটা যে কোনো ধরনের সংবাদ মাধ্যমেই হতে পারে। শুধুমাত্র নিউজ পোর্টালের ঘাড়ে ফেক নিউজের ‘বেতাল’কে চাপিয়ে দিয়ে কী লাভ। নিউজ পোর্টাল প্রতিটা মুহূর্তে আপডেট হয়ে থাকে। ফলে কোনো সূত্রের আভাসও খবর হিসাবে সেখানে প্রকাশিত হয়। পরে ঘটনাক্রমের আপটেড হলে খবরও আপডেট হয়ে থাকে। কী বড়ো পুঁজি, কী ছোটো – সব জায়গাতেই একই দশা। বড়ো পুঁজির পোর্টালগুলির মাথায় কোনো সংবাদপত্র থাকতে পারে, টিভি চ্যানেল থাকতে পারে। ছোটোগুলির সে সবের বালাই নেই। তাদের জোর লড়াই চালিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে হয়। ফলে কোনো কোনো সময় ‘বিপ্লব’ দেখাতে গিয়ে দু-একটা ফাউল হয়েই যায়। কিন্তু এই মাধ্যমের সুবিধা এটাই, লালকার্ড দেখা মানেই মাঠের বাইরে নয়, জার্সি বদল করে ফের পুরো দমে খেলা যায় – মানে আপডেট করেও খবরটিতে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরা যায়।

আর যে পোর্টালগুলির কাজই হল, ফাউল করে বিপক্ষকে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া, সেগুলি নিজেদের ভূমিকাতেই অনড় থাকে। বাংলা ভাষায় ওয়েব পোর্টালের প্রায় এক দশক পার করে আসা পাঠকের একটা বড়ো অংশ ভালোই চেনেন এবং বোঝেন ওই ধরনের পোর্টালগুলিকে। কেউ কেউ অবশ্য ওই ধরনের পোর্টালগুলিকে আলাদা করতে পারেন না। ফলে ওই ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ভুয়ো খবর ছড়ানোর পোর্টালগুলির সঙ্গে তাঁরা প্রকৃত অর্থে সংবাদ মাধ্যমের নীতি-নৈতিকতা মেনে চলা পোর্টালগুলিকে গুলিয়ে ফেলেন। এটা অবশ্যই পাঠকদের কোনো ভুল নয়। তাঁদের বিভ্রান্ত করা হয়।  কারও কারও উদ্দেশ্য থাকলেও থাকতে পারে। সেটা শুধু নিউজ পোর্টাল কেন, পেপার-চ্যানেলও হতে পারে। তাই বলে সমস্ত নিউজ পোর্টালকেই ভুয়ো খবরের কারখানা হিসাবে চিহ্নিত করার কারণ নেই। বিশেষত, বর্তমানের কঠিন সময় যখন একাধিক নিউজ পোর্টাল পাঠকদের কাছে প্রতিটা মুহূর্তের আপডেট পৌঁছে দিচ্ছে, তখন ‘প্রকৃত খবর শুধু সংবাদপত্র আর টিভির নিউজ চ্যানেলে পাওয়া যায়’ জাতীয় সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনে সেই উদ্দেশ্যই প্রতিফলিত হয় না কি!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.