Connect with us

কথাশিল্প

নিউজ পোর্টালের খবরকে খুব সহজেই ‘ফেক নিউজ’ বলে দেগে দেওয়া যায়!

Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

নিউজ মানে খবর, খবর করে নিউজপেপার, নিউজ চ্যানেল, নিউজ পোর্টাল ইত্যাদি। কিন্তু ফেক নিউজ বলতে মোটেই এতটা সহজ নয়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় হরেক রকমের প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। সেই সমস্ত প্ল্যাটফর্মে কোনো একটা কিছু লিখে পোস্ট করা, সেটাকে জনে জনে শেয়ার করা, এখন সেটাও না কি ‘নিউজ’। সোশ্যাল মিডিয়ায় আচমকা ফেক নিউজের বহর বাড়ছে বলে সরকারি ভাবেও দাবি করা হচ্ছে। এই ফেক নিউজ বলতে ভুয়ো খবর। তবে শুধু মাত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা ‘ফেক নিউজ’ই নয়, এখন নাক ঘুরিয়ে নিশানায় নিউজ পোর্টালের খবরও।

কতগুলো খুব সহজ কথা এতটা চওড়া করে বলার কারণ, করোনাভাইরাস (Coronavirus) প্রাদুর্ভাবকে কেন্দ্র করে ভুয়ো খবরের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে সরব হচ্ছে কেন্দ্র, রাজ্য সরকার, এমনকি সেলেব্রিটিরাও। কখনও অভিযোগ উঠছে, রাজনৈতিক দলের আইটি সেল ভুয়ো খবর ছড়াচ্ছে। কখনও অভিযোগ উঠছে, সংবাদ মাধ্যম হিসাবে পরিচিতরাও ভুয়ো খবর ছড়াচ্ছে। কিন্তু অভিযোগের নিশানায় বর্তমানের অতি প্রয়োজনীয় নিউজ পোর্টালগুলি। তাদের পরিবেশিত খবরের লিঙ্ক সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার হয়।

এ কথা অস্বীকার করার কথা নয়, রাজনৈতিক দলের মদতপুষ্ট কিছু নিউজ পোর্টালও রয়েছে। কিন্তু নিউজ পোর্টাল জন্মানোর অনেক আগে থেকেই পেড নিউজ বলে একটা কথা চালু রয়েছে। খবরের কাগজ অথবা বৈদ্যুতিন খবরের চ্যানেল পেড নিউজে হাত পাকিয়েছে অনেক দিন আগেই। কিন্তু এখন সোশ্যাল মিডিয়া আর ফেক নিউজের চক্করে ওয়েবসাইট-নির্ভর পোর্টালগুলিকে কাঠগড়ায় তোলার অদৃশ্য প্রয়াস নজর এড়াচ্ছে না। কী ভাবে?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগেই জানিয়ে দিয়েছে, খবরের কাগজের মাধ্যমে মোটেই করোনাভাইরাস ছড়ায় না। অনেকে বিশ্বাস করছে, অনেকে নয়। খবরের কাগজের এজেন্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, তাঁদের অনেক গ্রাহকই কাগজ নেওয়া বন্ধ করে দিচ্ছেন। যদিও কাগজ থেকে ভাইরাস ছড়ানো সম্ভব নয়, এমন বোঝার মতো বুদ্ধি ওই গ্রাহকদেরও রয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

বিষয়টির দিকে নজর রেখে সরকারি এবং বেসরকারি ভাবে খবরের কাগজের ক্রেতাদের ভয় কাটানোর চেষ্টা চলছে। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাতেই হয়। কিন্তু বেশ কিছু উদ্যোগে যেন অন্য রকমের আভাস মিলছে। পুঁজির প্রয়োগে কোনো একটা মহলকে চাপে রাখার চেষ্টা খালি চোখে ধরা পড়ছে। কিছু সচেতনতা বার্তায় স্পষ্ট করেই বলা হচ্ছে, টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রে প্রকৃত খবর পাওয়া যাবে। সোশ্যাল মিডিয়ার ভুয়ো খবরে বিশ্বাস করবেন না।

ঘুরে ফিরে আসে ফের সেই সোশ্যাল মিডিয়ার খবর। ফেসবুক বা হোয়াটঅ্যাপের মতো বহু-ব্যবহৃত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে কোনো মন্তব্য লিখে পোস্ট করলেই সেটা নিউজ বা খবর হয়ে যায় না। মিথ্যে এবং যাচাই-না-করা কোনো তথ্য যদি হোয়াটসঅ্যাপের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া অবশ্যই আইনবিরুদ্ধ কাজ। করোনা মহামারির জেরে দেশের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৫ এবং এপিডেমিক ডিজিজেস অ্যাক্ট, ১৮৯৭ নিয়েও জোর চর্চা চলছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, ওই সামাজিক মাধ্যমগুলিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওয়েব পোর্টালগুলির খবরের লিঙ্ক শেয়ার করা হয়। এখন লকডাউন বলে যাঁরা অসীম সময় কাটাতে ঘরে টিভির সামনে বসে রয়েছেন, তাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ার খবর বলতে এই পোর্টালগুলির খবরকেই বোঝেন। কারণ বাসে-ট্রেনে বা অফিসে তো টিভি সেট সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া যায় না। খবরের কাগজও সেই সকালেই হাতে পাওয়া যায়। দিনের বাকি সজাগ সময়ে তাঁদের কাছে খবরের উৎস এই সোশ্যাল মিডিয়াই। ডেস্কটপ তো বটেই, পকেটের মোবাইলেও পাওয়া যায় নিউজ পোর্টাল। যে কারণে ওই অংশটির কাছে সোশ্যাল মিডিয়ার খবর বলতে, ওয়েবসাইট-নির্ভর নিউজ পোর্টাল অথবা টিভি চ্যানেলের খবরের লিঙ্ক। এই লিঙ্কগুলি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়ের গতিতে শেয়ার হয়ে অগুনতি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। একটা মহলের সমস্যা যেন সেখানেই।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নিরিখে কয়েকটা উদাহরণ তুলে ধরা যেতেই পারে। গত ২১ মার্চ রেল জানায়, দু’টি পৃথক ট্রেনের ১২ জন যাত্রীর শরীরে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়েছে। খবরটি পাওয়া যায় রেল মন্ত্রকের নিজস্ব টুইটার হ্যান্ডেল থেকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, খবরটি ফেসবুকে পড়তেই সেটাকে ফেক নিউজ বলে গালমন্দ শুরু করে দিলেন কয়েক জন। অথচ দেখুন ওই খবরের ভিতরে রেলমন্ত্রকের টুইটগুলি ছবির আকারে দেওয়া রয়েছে। তাও সেটা ফেক নিউজ হয়ে গেল।

সেই খবরই কিছুক্ষণ বাদে বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্ব সহকারে দেখানো হল, পরের দিন সকালে খবরের কাগজে যত্ন করে ছাপা হল। তখন কিন্তু ফেক নিউজ তকমা সাঁটা সম্ভব হল না। কারণ কে আর টিভি চ্যানেলের অফিসে ফোন করবে, অথবা কে আর সংবাদপত্রের অফিসে চিঠি পাঠিয়ে প্রতিবাদ করবে, তেমনটা নয়।

কারণটা হল, ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে খুব সহজেই প্রতিক্রিয়া দেখানো যায়। ফেক নিউজ, পেড নিউজ বলে দেগে দেওয়া যায়। উল্টোদিকে টিভি চ্যানেলে বা খবরের কাগজে সে সব একটু কষ্টকর, ব্যয় এবং সময়সাধ্যও বটে!

অন্য দিকে সাম্প্রতিক সময় করোনাভাইরাস মহামারির জেরে ফেক নিউজ বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে বিভিন্ন মহলের তরফে। গত ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কোনো রকমের গুজবে বিশ্বাস না করার আবেদন জানিয়েছিলেন। গুজব কিন্তু গুজবই, ভারতে বিশাল সংখ্যক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী সেই গুজবের শিকার হয়ে চলেছেন। অনেক সময় তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে সংবাদ মাধ্যমের যোগ না থাকতেও পারে।

এর পর গত ২৪ মার্চ প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (পিআইবি) খোলসা করে দেয়, কোভিড-১৯ (Covid-19) মহামারির জেরে দেশের আর্থিক জরুরি অবস্থা জারি নিয়ে ভুয়ো খবর (Fake News) ছড়ায়। অনেকাংশে যার দায় এড়াতে পারে না তথাকথিত সংবাদ মাধ্যমও। অনুমানভিত্তিক এবং সূত্র উদ্ধৃত করা সেই খবর আসলে ভুয়ো ছিল। ক’ দিন আগে এক মার্কিন সমীক্ষক সংস্থা জানায়, বর্তমান পরিস্থিতির নিরিখে ভারতের লকডাউন সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করা যেতে পারে। জিঞ্জাসা চিহ্ন মেরে সেই খবর বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যমে এমন ভাবে সম্প্রচারিত হল, যেন সরকার ওই রকম সিদ্ধান্তই নিতে চলেছে। সেই খবর কানে-মুখে ঘুরতে ঘুরতে মানুষের কাছে তেমন ভাবেই পৌঁছোল। তাই বলে গুজব কী করে নিউজ হবে!

শুধু করোনা কেন, যে কোনো বিষয়েই ভুয়ো খবর ছড়ানো শুধু অপরাধযোগ্য নয়, ক্ষমারও অযোগ্য। অনেক সময় আবার জ্ঞাতসারেই এই কাজটি করা হয়ে থাকে। সেটা যে কোনো ধরনের সংবাদ মাধ্যমেই হতে পারে। শুধুমাত্র নিউজ পোর্টালের ঘাড়ে ফেক নিউজের ‘বেতাল’কে চাপিয়ে দিয়ে কী লাভ। নিউজ পোর্টাল প্রতিটা মুহূর্তে আপডেট হয়ে থাকে। ফলে কোনো সূত্রের আভাসও খবর হিসাবে সেখানে প্রকাশিত হয়। পরে ঘটনাক্রমের আপটেড হলে খবরও আপডেট হয়ে থাকে। কী বড়ো পুঁজি, কী ছোটো – সব জায়গাতেই একই দশা। বড়ো পুঁজির পোর্টালগুলির মাথায় কোনো সংবাদপত্র থাকতে পারে, টিভি চ্যানেল থাকতে পারে। ছোটোগুলির সে সবের বালাই নেই। তাদের জোর লড়াই চালিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে হয়। ফলে কোনো কোনো সময় ‘বিপ্লব’ দেখাতে গিয়ে দু-একটা ফাউল হয়েই যায়। কিন্তু এই মাধ্যমের সুবিধা এটাই, লালকার্ড দেখা মানেই মাঠের বাইরে নয়, জার্সি বদল করে ফের পুরো দমে খেলা যায় – মানে আপডেট করেও খবরটিতে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরা যায়।

আর যে পোর্টালগুলির কাজই হল, ফাউল করে বিপক্ষকে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া, সেগুলি নিজেদের ভূমিকাতেই অনড় থাকে। বাংলা ভাষায় ওয়েব পোর্টালের প্রায় এক দশক পার করে আসা পাঠকের একটা বড়ো অংশ ভালোই চেনেন এবং বোঝেন ওই ধরনের পোর্টালগুলিকে। কেউ কেউ অবশ্য ওই ধরনের পোর্টালগুলিকে আলাদা করতে পারেন না। ফলে ওই ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ভুয়ো খবর ছড়ানোর পোর্টালগুলির সঙ্গে তাঁরা প্রকৃত অর্থে সংবাদ মাধ্যমের নীতি-নৈতিকতা মেনে চলা পোর্টালগুলিকে গুলিয়ে ফেলেন। এটা অবশ্যই পাঠকদের কোনো ভুল নয়। তাঁদের বিভ্রান্ত করা হয়।  কারও কারও উদ্দেশ্য থাকলেও থাকতে পারে। সেটা শুধু নিউজ পোর্টাল কেন, পেপার-চ্যানেলও হতে পারে। তাই বলে সমস্ত নিউজ পোর্টালকেই ভুয়ো খবরের কারখানা হিসাবে চিহ্নিত করার কারণ নেই। বিশেষত, বর্তমানের কঠিন সময় যখন একাধিক নিউজ পোর্টাল পাঠকদের কাছে প্রতিটা মুহূর্তের আপডেট পৌঁছে দিচ্ছে, তখন ‘প্রকৃত খবর শুধু সংবাদপত্র আর টিভির নিউজ চ্যানেলে পাওয়া যায়’ জাতীয় সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনে সেই উদ্দেশ্যই প্রতিফলিত হয় না কি!

প্রবন্ধ

গীতিকার প্রণব রায়ের প্রয়াণবার্ষিকীতে সশ্রদ্ধ প্রণাম

আজ থেকে ঠিক ৪৫ বছর আগে এমনই এক ৭ আগস্টে প্রয়াত হয়েছিলেন তিনি।

শুভদীপ রায় চৌধুরী

“…প্রভাতে কে আর মনে রাখে বলো রজনী শেষের চাঁদে,/ শুধু দুদিনের সাথীরে কে আর মালার বাঁধনে বাঁধে।।…”

আজ ৭ আগস্ট। কবি ও গীতিকার প্রণব রায়ের (Pranab Roy) প্রয়াণবার্ষিকী। আজ থেকে ঠিক ৪৫ বছর আগে এমনই এক ৭ আগস্টে প্রয়াত হয়েছিলেন তিনি।

প্রণব রায়ের জন্ম ১৯১১ সালের ৫ ডিসেম্বর, প্রখ্যাত সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারে। সাবর্ণ পরিবারের সুসন্তান প্রণব রায়ের রচিত প্রায় সাড়ে তিন হাজার গান রয়েছে যা বাংলা আধুনিক গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

ছাত্রাবস্থায় ‘কমরেড’ শীর্ষক কবিতা লেখায় তাঁকে কারাবাসও করতে হয়, তবুও তাঁর সৃষ্টি থেমে থাকেনি। কাজী নজরুল ইসলামের ভাবশিষ্য প্রণব রায় ব্রাহ্ম বয়েজ স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সিটি কলেজে ভর্তি হন। ছেলেবেলা থেকেই সাহিত্যের নেশা ছিল তাঁর। ‘বিশ্বদূত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘কমরেড’ কবিতাটি। গীতিকার হওয়ার প্রেরণা পেয়েছিলেন কাজী নজরুলের কাছ থেকে। তাঁর বহু রচনায় কাজী নজরুল সুরও করেছিলেন।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের রেকর্ড করা প্রথম গানের রচয়িতা প্রণব রায়। এ ছাড়া যূথিকা রায়ের কণ্ঠে আধুনিক গানের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ‘সাঁঝের তারকা আমি’ ও ‘আমি ভোরের যূথিকা’ গান দু’টির রচয়িতাও তিনি। ১৯৩৪ সালে গীতিকবি প্রণব রায়ের প্রথম গান রেকর্ড হয় কাজী নজরুলের তত্ত্বাবধানে। ১৯৩৬ সালে ‘পণ্ডিতমশাই’ ছায়াছবিতে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন গীতিকার প্রণব রায়। তাঁর প্রথম গানটি কমল দাশগুপ্তের সুরে এবং ভবানী দাসের কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়।

প্রথম গল্পগীতি লেখেন প্রণব রায়। জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে গাওয়া তাঁর লেখা গল্পগীতি ‘চিঠি’, ‘সাতটি বছর আগে পরে’ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁর গীতিকবিতার প্রতিটি ছন্দে জীবনের সূক্ষ সূক্ষ অনুভূতি ধরা পড়ত, যার অধিকাংশই তিনি রচনা করেছিলেন বাংলা চলচিত্রের জন্য। প্রায় তিনশোটি ছবির গান লিখেছিলেন তিনি। ছবির পরিবেশের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই গান রচনা করতেন। এমনকি তিরিশ থেকে চল্লিশের দশকে গীতিকবিতার রচয়িতা হিসাবে রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুলের সঙ্গে একত্রে উচ্চারিত হত তাঁর নাম।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের কণ্ঠে এবং শৈলেন দাশগুপ্তের সুরে প্রণব রায় লিখেছিলেন ‘কেন দিলে এত গান’, রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে লিখেছিলেন ‘মনের দুয়ার খুলে কে’, সুবল দাশগুপ্তের সুরে লিখেছিলেন ‘যদি ভুলে যাও মোরে’। এ ছাড়াও লিখেছিলেন ‘সে বুঝি ফিরে গেছে’, ‘কোথায় হারালো দিন’, ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে’, ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’, “চম্পা চামেলি গোলাপেরই বাগে’, ‘আমার সোনা চাঁদের কণা’ ইত্যাদি অসংখ্য গান। সুরকার দুর্গা সেনের সুরে লিখেছিলেন ‘যে গান হল না গাওয়া’, ১৯৪২ সালে শৈলেন দাশগুপ্তের সুরে লিখেছিলেন ‘সেদিন মাধবী রাতে’, ১৯৪৫ সালে কমল দাশগুপ্তের সুরে লিখেছিলেন ‘কণ্ঠে আমার নিশিদিন’ ইত্যাদি।

শুধু গীতিকারই নন, বহুমুখী প্রতিভার মানুষ ছিলেন প্রণব রায়। চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার হিসাবেও কাজ করেছেন তিনি। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও জহর রায় অভিনীত বিখ্যাত কমেডি ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্টেন্ট’-এর কাহিনি রচনা করেছিলেন প্রণব রায়।

অনেকেরই জানা নেই হয়তো, রহস্য-রোমাঞ্চ বা ভৌতিক গল্প রচনাতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। অতীত দিনের রহস্য-সাহিত্যে জনপ্রিয় পত্রিকা ‘রোমাঞ্চ’ এবং অন্যান্য পত্রিকায় তাঁর নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হত।

গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার প্রণব রায়ের আরেকটা পরিচয় ছিল – তিনি ছিলেন সাংবাদিক। বছরখানেক কাজ করেছিলেন ‘বসুমতী’ পত্রিকায় বার্তা সম্পাদক হিসাবে। ব্রিটিশবিরোধী পত্রিকা ‘নাগরিক’-এর সম্পাদক ছিলেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে প্রণব রায় ছিলেন খুব কম কথার মানুষ। বাংলা সংস্কৃতি জগতের এই প্রতিভাধর মানুষটির প্রতি রইল অনেক শ্রদ্ধা।

Continue Reading

প্রবন্ধ

শ্রাবণের এই রাখিপূর্ণিমাতেই জন্মেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ-শিষ্য স্বামী নিরঞ্জনানন্দ

শুভদীপ রায় চৌধুরী

সময়টা ১৮৮১-৮২ সালের কোনো এক দিন। দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করতে হাজির কলকাতার এক যুবক। বয়স ১৮-১৯। ঠাকুর সে সময় থাকতেন দক্ষিণেশ্বরে রানি রাসমণির প্রতিষ্ঠিত কালীবাড়িতে। তাঁর অদ্ভুত ঈশ্বরনির্ভর জীবন ও সহজ সরল ব্যবহার তখনকার কলকাতার অনেকেই জানতেন এবং তাতে আকৃষ্ট হয়ে তাঁর কাছে ছুটে আসতেন। লোকমুখে ঠাকুরের কথা শুনে সেই যুবকও তাঁকে দর্শন করবেন বলে দক্ষিণেশ্বরে এসেছেন। দেখলেন ঠাকুর ভক্তপরিবেষ্টিত হয়ে রয়েছেন। সন্ধে হতেই ভক্তরা একে একে চলে গেলে ঠাকুর তাঁর ভবিষ্যতের প্রিয় শিষ্যকে পাশে বসিয়ে অনেক কথা বললেন, যেন কত দিনের চেনা। ভবিষ্যতের সেই প্রিয় শিষ্য হলেন নিত্যনিরঞ্জন ঘোষ তথা স্বামী নিরঞ্জনানন্দ।   

তাঁর তরুণ ভক্তের শক্তি ভুল পথে ব্যয়িত হচ্ছে দেখে শ্রীরামকৃষ্ণ চিন্তিত হলেন। বললেন, “দ্যাখ নিরঞ্জন, ভূত ভূত করলে তুই ভূত হয়ে যাবি, আর ভগবান ভগবান করলে ভগবান হবি। তা কোনটা হওয়া ভালো?” নিরঞ্জন সরল ভাবেই উত্তর দিলেন, তা ভগবান হওয়াই ভালো।

ঠাকুর কেন হঠাৎ সে দিন নিরঞ্জনের ভূত-সঙ্গের কথা পেড়েছিলেন? একটু পেছনে ফিরে যাওয়া যাক।  

উচ্চ আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন নিত্যনিরঞ্জন ১২৬৯ বঙ্গাব্দের (১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ) শ্রাবণ পূর্ণিমার দিন রাজারহাট-বিষ্ণুপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে এই অঞ্চলটি কলকাতার মধ্যে অবস্থিত হলেও অতীতে এটি অবিভক্ত চব্বিশ পরগনার একটি গ্রাম ছিল। নিত্যনিরঞ্জনের বাবার নাম ছিল অম্বিকাচরণ ঘোষ। বারাসতের পণ্ডিত কালীকৃষ্ণ মিত্র ছিলেন নিরঞ্জনের মামা। মাতুলের কলকাতাস্থ বাড়িতে থেকে নিরঞ্জন লেখাপড়া করতেন।

স্বামী নিরঞ্জনানন্দ।

শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে আসার আগে নিরঞ্জন আহিরীটোলানিবাসী ডাক্তার প্যারীচাঁদ মিত্রের বাড়িতে একটি প্রেততত্ত্বান্বেষী দলের সঙ্গে পরিচিত হন। তারা নিরঞ্জনকে ভূত নামানোর মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করত। এই ভাবে ভূতুড়েদের দলে যাতায়াত করতে করতে একটি ঘটনায় নিরঞ্জনের মনে বৈরাগ্যের সঞ্চার হয়। দীর্ঘ ১৮ বছর অনিদ্রায় ভোগার পর জনৈক ধনী ব্যক্তি নিরঞ্জনের শরণাপন্ন হন। নিরঞ্জন পরে বলেছিলেন, তাঁকে ওই ভাবে দারুণ কষ্ট পেতে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, তা হলে আর এত ধনসম্পত্তির কী প্রয়োজন।

বৈরাগ্য থেকেই নিরঞ্জনের মনে আধ্যাত্মিক রাজ্যের দ্বার খুলে গিয়েছিল। তত দিনে শুনেছেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কথা। তাঁর অতুলনীয় ভগবৎপ্রেম ও আকর্ষণীয় উপদেশের কথা তখন লোকের মুখে মুখে প্রচার হচ্ছে। নিরঞ্জন ছুটে এলেন দক্ষিণেশ্বরে। সে দিন নিরঞ্জনকে ভুতুড়েসঙ্গ ত্যাগ করতে বলেছিলেন ঠাকুর এবং নিরঞ্জনে সেই সঙ্গ ত্যাগ করেছিলেন।

এর কয়েক দিন পরে নিরঞ্জন আবার এলেন দক্ষিণেশ্বরে। ঠাকুর ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে, বললেন, “ওরে নিরঞ্জন, দিন যে যায়রে – তুই ভগবান লাভ করবি কবে? দিন যে চলে যায়, ভগবানকে লাভ না করলে সবই যে বৃথা যাবে। তুই কবে তাঁকে লাভ করবি বল, কবে তাঁর পাদপদ্মে মন দিবি বল? আমি যে তাই ভেবে আকুল!” নিরঞ্জন অবাক হয়ে ভাবলেন, ইনি কে? আমার ভগবানলাভ হচ্ছে না বলে, দিন চলে যাচ্ছে বলে আমার জন্য এঁর এত আর্তি কেন? পরের জন্য এ কি অহৈতুকী ভালোবাসা! নিরঞ্জন এ রহস্য ভেদ করতে পারলেন না বটে, কিন্তু ঠাকুরের এই আবেগভরা কথায় তাঁর হৃদয় বিগলিত হল। সে দিন আর কলকাতায় ফিরে যেতে পারলেন না তিনি। সেই দিন তো ছার, পর পর তিন দিন নিরঞ্জন থেকে গেলেন দক্ষিণেশ্বরে।

নিরঞ্জনের সরলতা ঠাকুরকে প্রথম থেকেই মুগ্ধ করেছিল। একদিন শ্রীম তথা মাস্টারমশায়কে ঠাকুর বলেছিলেন, “তোমায় নিরঞ্জনের সঙ্গে দেখা করতে বলছি কেন? সে সরল ইহা সত্য কি না, এইটি দেখবে বলে।” ১৮৮৪-এর ১৫ জুন কাঁকুড়গাছিতে সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাগানবাড়িতে এক মহোৎসবে যোগ দেন ঠাকুর। এক সময় নিরঞ্জন এসে ঠাকুরকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন। ঠাকুর তাঁকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “তুই এসেছিস।” কাছেই ছিলেন মাস্টার (শ্রীম)। নিরঞ্জনকে দেখিয়ে তাঁকে বললেন,  “দেখ, এ ছোকরাটি বড় সরল। সরলতা পূর্বজন্মে অনেক তপস্যা না করলে হয় না। কপটতা পাটোয়ারী এসব থাকতে ঈশ্বরকে পাওয়া যায় না।”

নিরঞ্জনের সরলতা ও বৈরাগ্যের জন্য ঠাকুর তাঁর প্রতি অত্যন্ত স্নেহপরায়ণ ছিলেন। একদিন এই প্রসঙ্গে ঠাকুর বলেছিলেন, “দেখছ না নিরঞ্জনকে? তোর এই নে, আমার এই দে”- ব্যস, আর কোন সম্পর্ক নাই। পেছু টান নাই।”

নিরঞ্জনের স্বভাবে কিছুটা উগ্র ভাব থাকলেও তিনি ছিলেন খুবই সাহসী। আর ভেতরে ভেতরে ছিলেন কোমল প্রকৃতির এক মানুষ, অত্যন্ত সেবাপরায়ণ। ঠাকুরের দেহত্যাগের পর নরেন্দ্রনাথ-সহ গুরুভাইরা যখন আঁটপুরে যান তখন নিরঞ্জনও গিয়েছিলেন। স্নান করতে গিয়ে একদিন সারদাপ্রসন্ন (পরবর্তী কালে স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ) পুকুরে ডুবে যাচ্ছিলেন। তখন প্রাণের মায়া ত্যাগ করে নিরঞ্জন পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে উদ্ধার করেন। ১৮৮৮ সালে লাটু মহারাজের নিউমোনিয়া হলে নিরঞ্জন মহারাজ তাঁর সেবার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ভক্তপ্রবর বলরামবাবুর শেষ অসুখের সময়ও নিরঞ্জন প্রাণ ঢেলে তাঁর সেবা করেছিলেন।

গুরুভাইদের সঙ্গে স্বামী নিরঞ্জনানন্দ (একেবারে ডান দিকে)।

১৮৮৭ সালের প্রথম দিকে বরানগরে অন্য গুরুভ্রাতাদের সঙ্গে নিরঞ্জনও সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর নাম রাখেন ‘স্বামী নিরঞ্জনানন্দ’। সন্ন্যাস গ্রহণের পরেই তিনি শ্রীক্ষেত্র পুরীধামে গিয়ে ৮ এপ্রিল মঠে ফিরে আসেন। এর পর ১৮৮৯-এর নভেম্বরে আবার বেরিয়ে পড়েন স্বামী নিরঞ্জনানন্দ। প্রথমে দেওঘরে বৈদ্যনাথ দর্শন করেন। তার পর সেখান থেকে কাশীতে যান এবং বংশীদত্তের বাড়িতে কিছু দিন থেকে তপস্যা করেন। এ সময় তিনি মাধুকরী ভিক্ষা করে খেতেন। এরই মধ্যে স্বামী যোগানন্দের অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তিনি প্রয়াগে যান। সেই সুযোগে স্বামী নিরঞ্জনানন্দের কল্পবাসও হয়। পরে উত্তর ভারতের আরও কিছু তীর্থদর্শনে বেরিয়ে পড়েন তিনি এবং কোনো কোনো জায়গায় তপস্যাও করেন।  

কালীকিঙ্কর বোস তখনও স্বামী বিরজানন্দ হননি। ১৮৯১-৯২ সালে তখন তাঁর বয়স ১৮-১৯, বরানগর মঠে যাতায়াত শুরু করেছেন। সেই সময় নিরঞ্জন মহারাজকে প্রায়ই দেখতেন দক্ষিণেশ্বরের যেতে। সেখানে পঞ্চবটীতলায় ও ঠাকুরের ঘরে ধ্যান করতেন তিনি। মাঝেমধ্যে কালীকিঙ্করও তাঁর সঙ্গী হতেন। ১৮৯৩ সালে স্বামী নিরঞ্জনানন্দ আবার তীর্থদর্শনে এবং তপস্যার জন্য বেরিয়ে পড়লেন। ১৮৯৫ সালের প্রথম দিকে ঠাকুরের জন্মোৎসবের আগে তিনি আলমবাজার মঠে ফিরে আসেন।

স্বামী নিরঞ্জনানন্দ খুবই শৃঙ্খলাপরায়ণ ছিলেন। খবর পেলেন স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ব জয় করে ১৮৯৬-এর শেষ দিকে পশ্চিমের দেশ থেকে ভারতের উদ্দেশে রওনা হবেন। সেই খবর পেয়ে নিরঞ্জন মহারাজ বিশ্ববিজয়ী গুরুভাইকে অভ্যর্থনা জানাতে কলম্বো রওনা দেন। পরের বছর ১৫ জানুয়ারি স্বামীজি মহারাজ জাহাজ থেকে নামলে সর্ব প্রথম তাঁকে অভ্যর্থনা জানান নিরঞ্জন মহারাজ।

শুধুমাত্র ঠাকুরই নন, সারদাজননীর প্রতিও স্বামী নিরঞ্জনানন্দের অগাধ শ্রদ্ধাভক্তি ছিল। ঠাকুরের অদর্শনের পর শ্রীমাই ছিলেন তাঁর আশ্রয়স্থল। সবাইকে এই কথা মুক্তকণ্ঠে জানাতে দ্বিধাও করতেন না। অনেককে এই আশ্রয়ে তিনি পৌঁছেও দিয়েছেন। মা যে কেবল গুরুপত্নীই নন, তিনি যে জগজ্জননী আদ্যাশক্তি, এ কথা তিনি সর্ব সমক্ষে প্রচার করতেন।

১৯৫৩ সালের ২৪ আগস্ট স্বামী শিবানন্দ মহারাজের শিষ্য স্বামী সংশুদ্ধানন্দ মহারাজ কয়েক জন সন্ন্যাসী ও গৃহীভক্তকে নিয়ে রাজারহাট-বিষ্ণুপুরের ঘোষবাড়িতে আসেন। চণ্ডীমণ্ডপের ঠিক পূর্ব দিকের ঘরটিতে নিরঞ্জন ভূমিষ্ট হয়েছিলেন বলেই জানা যায়। সেই স্থানটিকে চিহ্নিত করে সেখানে ঠাকুর-মা-স্বামীজি ও স্বামী নিরঞ্জনানন্দের পট স্থাপন করে সকলে প্রণাম নিবেদন করেন। এর পর স্থানীয় ভক্তদের কঠোর পরিশ্রমে ‘শ্রীরামকৃষ্ণ-নিরঞ্জনানন্দ আশ্রম’-এর সূত্রপাত হয় ১৯৫৪ সালে। তখন বাৎসরিক উৎসব হত চণ্ডীমণ্ডপে ও আটচালায়।

ঘোষ পরিবারের মণিভূষণ ঘোষ দু’ শতক জমি আশ্রমকে দান করেন। সন্ন্যাসগ্রহণের পর নিরঞ্জন মহারাজ যখন শেষ বার আটচালায় এসেছিলেন সেই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন মণিভূষণ ঘোষ মহাশয়। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন স্নানযাত্রার দিন আশ্রমের নবনির্মিত মন্দিরের দ্বার উদ্ঘাটন করেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের পূজ্যপাদ শ্রীমৎ স্বামী ভূতেশানন্দজি।

নিরঞ্জন সম্পর্কে ঠাকুর বলেছিলেন, “ঈশ্বরকোটি, রামচন্দ্রের অংশে জন্ম।” রাখি পূর্ণিমার পুণ্য লগ্নে সেই পুণ্যপুরুষ স্বামী নিরঞ্জনানন্দের প্রতি রইল আমাদের প্রণাম।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:

শ্রীরামকৃষ্ণ-ভক্তমালিকা – স্বামী গম্ভীরানন্দ

বিশ্বচেতনায় শ্রীরামকৃষ্ণ – সম্পাদনায় স্বামী প্রমেয়ানন্দ, নলিনীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় ও স্বামী চৈতন্যানন্দ

শ্রীম কথিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত

Continue Reading

প্রবন্ধ

যোগকেন্দ্র-জিম খোলার এটাই কি যথার্থ সময়?

অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্র। সব কিছুই যখন একে একে খুলছে, তা হলে যোগকেন্দ্র অথবা জিম সেন্টার কেন নয়? লিখলেন ত্রিশিরা তঙ্কাদার

৫ আগস্ট থেকে যোগকেন্দ্র এবং জিম খোলার শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কোভিড-১৯ মহামারি (Covid-19 pandemic) পরিস্থিতিতে তৃতীয় ধাপের আনলক-এ শরীরচর্চার অন্যতম কেন্দ্রগুলি খোলার অনুমতি দেওয়ার পরেও দোটানায় ভুগছেন সেখানকার কর্তৃপক্ষ এবং সেখানে গিয়ে শরীরচর্চাকারী সদস্যরাও।

লকডাউনের জেরে বদ্ধঘরে থাকতে থাকতে এক দিকে যেমন স্থবিরতা আসছে শরীরে, তেমনই জড়তা জড়িয়ে ধরছে মনকেও। ঘরে বসে যতই শরীরচর্চা করা হোক না কেন, কেন্দ্রের মতো প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধান এবং যথোপযুক্ত পরিবেশ বাড়িতে অমিল। সারা পৃথিবীতে এমন কয়েক লক্ষ মানুষ রয়েছেন, যাঁরা ওষুধের পাশাপাশি শরীরচর্চাকেও রোগ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার উপাদান হিসেবে মেনে চলেন। ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের জেরে যোগকেন্দ্র অথবা জিমে না যেতে পারার কারণে তাঁদের শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। সঙ্গে মানসিক বিষণ্ণতা তো রয়েইছে। কিন্তু করোনা আক্রান্তের সংখ্যা যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখন এই কেন্দ্রগুলি খুলে দেওয়া হলে উল্টো ফল যদি হয়!

এ ধরনের কেন্দ্রগুলি মূলত বদ্ধঘরেই হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞরা আবার বলছেন, বদ্ধঘরে এক জনের থেকে আর এক জনের শরীরে ভাইরাস সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা বেশি। ফলে কোনো উপসর্গহীন আক্রান্ত আগাম না বুঝেই যদি কেন্দ্রে আসেন, সে ক্ষেত্রে তাঁর থেকে অন্য কারো সংক্রামিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। এ ক্ষেত্রে শর্ত হিসেবে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টিতেও সমান ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রটির দরজা-জানলা খোলা রেখে আয়তনের তুলনায় কতজন সদস্যকে অনুমতি দেওয়া হবে, সেটাও দেখার বিষয়।

অন্য দিকে মাস্ক পরার বিষয়টিতে এখন সবমহলের তরফে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যোগ অথবা জিমের ক্ষেত্রে মাস্ক পরা অবস্থায় শরীরচর্চা করা কতটা যুক্তযঙ্গত, তা নিয়েও বিশেষজ্ঞ মহল একমত হতে পারছে না। ব্যায়ামের সঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠানামার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধার সৃষ্টি করতে পারে, এমন কোনো মাস্ক পরে ব্যায়াম করলে হিতে বিপরীত হতে পারে কি না, সেটা নিয়েও চলছে জোর আলোচনা।

এ ব্যাপারে চলে আসছে আমেরিকা প্রসঙ্গও। আক্রান্তের সংখ্যা যখন চূড়োর দিকে দৌড়োচ্ছে, তখন জর্জিয়া, ওকলাহোমার বেশ কিছু জিম সদস্যদের জন্য দরজা খুলে দেয়। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই দেখা যায়, সংক্রমণ ছড়ানোর উৎস হয়ে উঠছে সেগুলি। কারণ, এ ধরনের কেন্দ্রগুলিতে যতই স্যানিটাইজেশন করা হোক না কেন, সর্বক্ষণ শারীরিক দূরত্ব, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা মুশকিলের কাজ। সেখানকার সরঞ্জামগুলো একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করেন। অন্য দিকে হংকং কিন্তু করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে জিমের দরজা সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করে দেয়।

তবে কেন্দ্রীয় সরকার যখন অনুমোদন দিয়েছে, তখন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শের পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা এক প্রকার নিশ্চিত। একটি মহল এমনও বলছে, দোকান-বাজার, গণপরিবহণ যখন সব কিছুই খোলা, তখন যোগ-জিম সেন্টার আর কী দোষ করল!

হু কী বলছে?

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সাম্প্রতিক একটি পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, বায়ু চলাচল অবরুদ্ধ কোনো ভিড়যুক্ত স্থান কোনো আক্রান্তের থেকে অন্যের শরীরে ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

একই সঙ্গে বলা হয়েছে, বদ্ধঘরের বিষয়টি ব্যতিরেকেও আরও একটি অন্যতম কারণ, শরীরচর্চার সময় গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস। গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা থেকে যায়। এমনিতেই ড্রপলেটের মাধ্যমে ভাইরাসের বেশকিছুটা দূরত্ব অগ্রসর হওয়ার প্রমাণও মিলেছে। ফলে জিমে গিয়ে আধঘণ্টা থেকে একঘণ্টা সময় অতিবাহিত করার বিষয়টিতে আশঙ্কা থেকে যেতে পারে।

আবার একই সঙ্গে সংস্থা দাবি করেছে, কোনো প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে আধঘণ্টার শরীরচর্চা অনাক্রম্যতা বজায় রাখতে সহায়ক।

সংকট বাড়ছে জিম-মালিকদের

কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা জারির পর উত্তরপ্রদেশ এবং হরিয়ানার মতো রাজ্য সরকারগুলিও আগামী ৫ আগস্ট থেকে জিম খোলার শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে।

জিম-মালিকরা বলছেন, মহামারিতে চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন তাঁরা। এমনিতে মাস চারেক সম্পূর্ণ বন্ধ, তার উপর বকেয়া বিল মেটানোরও কোনো লক্ষণ নেই। বাড়িভাড়া-সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। যোগ অথবা জিমের প্রশিক্ষকরা অনলাইনে প্রশিক্ষণ দিলেও সেখান থেকে আয় নামমাত্র।

এমন পরিস্থিতিতে অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই তাঁরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেন্দ্রগুলি চালু করতে আগ্রহী। কেউ কেউ স্থির করেছেন, কোনো সদস্যকে জিমে ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি দেওয়া হবে না। প্রতিটি সদস্যকে সুতির মাস্ক এবং গ্লাভস দেওয়া হবে এবং প্রশিক্ষকরা পিপিই কিট পরে থাকবেন। এ ক্ষেত্রে জিমের মালিকরা নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত সদস্য সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনলাইনে রেজিস্টার ব্যবস্থাও চালু করছেন। তবে তাঁদের এই উদ্যোগে সদস্যরা কতটা আগ্রহ দেখাবেন, সেটাই মূল প্রশ্ন।

Continue Reading
Advertisement
দেশ8 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ৬২৫৩৮, সুস্থ ৪৯৭৬৯

গাড়ি ও বাইক2 days ago

পেট্রোলচালিত গাড়ি ‘এস-ক্রস’ বাজারে নিয়ে এল মারুতি সুজুকি

ক্রিকেট2 days ago

অঘটন! ৩২৯ তাড়া করে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারাল আয়ারল্যান্ড

ক্রিকেট2 days ago

আইপিএলের নিয়মাবলি: গুচ্ছের টেস্টিং, চলা-ফেরায় নিয়ন্ত্রণ, একটি দলের জন্য একটি হোটেল

দেশ2 days ago

রুপোর ইট দিয়ে রামমন্দিরের শিলান্যাস করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

প্রযুক্তি2 days ago

শাওমি, বাইডু-সহ আরও বেশ কয়েকটি চিনা সংস্থার অ্যাপ নিষিদ্ধ করল কেন্দ্র

কলকাতা1 day ago

রাতভর প্রবল বৃষ্টিতে ভাসল কলকাতার একাংশ

দেশ2 days ago

আক্রান্তের সংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিল সুস্থতা, সক্রিয় কোভিডরোগী কমল ভারতে

রবিবারের খবর অনলাইন

কেনাকাটা

কেনাকাটা22 hours ago

ঘর ও রান্নাঘরের সরঞ্জাম কিনতে চান? অ্যামাজন প্রাইম ডিলে রয়েছে ৫০% পর্যন্ত ছাড়

খবরঅনলাইন ডেস্ক : অ্যামাজন প্রাইম ডিলে রয়েছে ঘর আর রান্না ঘরের একাধিক সামগ্রিতে প্রচুর ছাড়। এই সেলে পাওয়া যাচ্ছে ওয়াটার...

কেনাকাটা24 hours ago

এই ১০টির মধ্যে আপনার প্রয়োজনীয় প্রোডাক্টটি প্রাইম ডে সেলে কিনতে পারেন

খবরঅনলাইন ডেস্ক : চলছে অ্যামাজনের প্রাইমডে সেল। প্রচুর সামগ্রীর ওপর রয়েছে অনেক ছাড়। ৬ ও ৭  তারিখ চলবে এই সেল।...

কেনাকাটা2 days ago

শুরু হল অ্যামাজন প্রাইম ডে সেল, জেনে নিন কোন জিনিসে কত ছাড়

খবরঅনলাইন ডেস্: শুরু হল অ্যামাজন প্রাইম ডে সেল। চলবে ২ দিন। চলতি মাসের ৬ ও ৭ তারিখ থাকছে এই অফার।...

things things
কেনাকাটা1 week ago

করোনা আতঙ্ক? ঘরে বাইরে এই ১০টি জিনিস আপনাকে সুবিধে দেবেই দেবে

খবরঅনলাইন ডেস্ক : করোনা পরিস্থিতিতে ঘরে এবং বাইরে নানাবিধ সাবধানতা অবলম্বন করতেই হচ্ছে। আগামী বেশ কয়েক মাস এই নিয়মই অব্যাহত...

কেনাকাটা1 week ago

মশার জ্বালায় জেরবার? এই ১৪টি যন্ত্র রুখে দিতে পারে মশাকে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: একে করোনা তায় আবার ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়েছে। এই সময় প্রতি বারই মশার উৎপাত খুবই বাড়ে। এই বারেও...

rakhi rakhi
কেনাকাটা2 weeks ago

লকডাউন! রাখির দারুণ এই উপহারগুলি কিন্তু বাড়ি বসেই কিনতে পারেন

সামনেই রাখি। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে মনের মতো উপহার কেনা একটা বড়ো ঝক্কি। কিন্তু সেই সমস্যা সমাধান করতে পারে অ্যামাজন। অ্যামাজনের...

কেনাকাটা2 weeks ago

অনলাইনে পড়াশুনা চলছে? ল্যাপটপ কিনবেন? দেখে নিন ৪০ হাজার টাকার নীচে ৬টি ল্যাপটপ

ইনটেল প্রসেসর সহ কোন ল্যাপটপ আপনার অনলাইন পড়াশুনার কাজে লাগবে জেনে নিন।

কেনাকাটা3 weeks ago

করোনা-কালে ঘরে রাখতে পারেন ডিজিটাল অক্সিমিটার, এই ১০টির মধ্যে থেকে একটি বেছে নিতে পারেন

শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বুঝতে সাহায্য করে এই অক্সিমিটার।

কেনাকাটা3 weeks ago

লকডাউনে সামনেই রাখি, কোথা থেকে কিনবেন? অ্যামাজন দিচ্ছে দারুণ গিফট কম্বো অফার

খবরঅনলাইন ডেস্ক : সামনেই রাখি। কিন্তু লকডাউনের মধ্যে দোকানে গিয়ে রাখি, উপহার কেনা খুবই সমস্যার কথা। কিন্তু তা হলে উপায়...

laptop laptop
কেনাকাটা3 weeks ago

ল্যাপটপ কিনবেন? দেখে নিন ২৫ হাজার টাকার মধ্যে এই ৫টি ল্যাপটপ

খবরঅনলাইন ডেস্ক : কোভিভ ১৯ অতিমারির প্রকোপে বিশ্ব জুড়ে চলছে লকডাউন ও ওয়ার্ক ফ্রম হোম। অনেকেই অফিস থেকে ল্যাপটপ পেয়েছেন।...

নজরে

Click To Expand