kolkata international book fair
কলকাতা বইমেলার ফাইল ছবি। ছবি: রাজীব বসু।
jahir raihan
জাহির রায়হান

এক, ট্রেনেই আলাপ হয়েছিল মন্দিরা ও তার সদ্যবিবাহিত স্বামী সন্দীপ নায়েকের সঙ্গে। আমি তখন বিনা টিকিটের যাত্রী, রবীন্দ্র ভারতীর ছাত্র। ডাকসাইটে সুন্দরী মন্দিরা মুড়াগাছা বা ধুবুলিয়া স্টেশনে নেমে যাওয়ার আগে একটা ভিজিটিং কার্ড আমার হাতে দিয়ে বলেছিল, যোগাযোগ রেখো। তারা নেমে যাওয়ার পর কার্ডে চোখ রেখেই চক্ষু চড়কগাছ! পুনশ্চ!

দুই, নেতাজি সুভাষচন্দ্রের পর আমার জানা আর একজন সুভাষ হলেন সুভাষ দত্ত। খবরের কাগজ পড়েই তাঁর এলেম সম্পর্কে অবগত হয়েছি। বাপ রে বাপ, ভয়ানক একবগ্গা ভদ্রলোক, প্রশ্ন যখন পরিবেশ রক্ষার।

তিন, ছাত্রাবস্থা কেটে যাওয়ার পর যখন কী করি, কী করি করে বেড়াচ্ছি, মাথায় এল, ট্যুরের ব্যবসা করি। অনেকেই হয়তো জানেন, ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসাকে এক সময় মাম্মী পাপা’স বিজনেস বলা হত। ঘর-লাগোয়া একটা বারান্দা আছে? একটা টেবল-চেয়ার নিয়ে বসুন, ব্যবসা শুরু, এই রকম আর কী! তো নানা রকম লোকের সঙ্গে যখন এই নিয়ে আলোচনা করছি, কী করা যায়, কী ভাবে করা যায়, তখনই গার্গীদির বর সঞ্জয়দা বলল – শোনো দিঘা, দার্জিলিং ছাড়ো, অনেকেই করেছে, অনেকেই করবে ও সব, তুমি বরং অফবিট ট্যুর অ্যারেঞ্জ করো। জানতে চাইলাম, কী রকম?

আরও পড়ুন আমার বই পড়া: আমার পড়া বড়োই অগোছালো

সহৃদয় পাঠকগণ, আমার ধানাই পানাই-এ ইতিমধ্যেই যাঁরা বিরক্তি বোধ করতে শুরু করেছেন, মনে মনে গালিও দিচ্ছেন হয়তো, তাঁদের জানাই, ওই তিনটি অবস্থার একটাই গন্তব্য – কলকাতা বইমেলা!

মন্দিরা নায়েকের বাড়িতে গিয়েই প্রথম জানতে পারি, টয়লেটেও বই পড়া যায়। জেনে অবাকও হয়েছি। তাই তো, সময়ের এ রূপ সুলভ সদ্ব্যবহার তো দুর্দান্ত! এক দিকে হালকা হচ্ছেন, আর এক দিকে হচ্ছেন জ্ঞানে ঋদ্ধ।

সে দিন ফেসবুকেই দেখলাম, জাপানের সমস্ত বাস স্টপেজেই একটা আলমারিতে কিছু বইপত্র রাখা থাকে, বাসের প্রতীক্ষায় রত যাত্রীসাধারণ তা নিয়ে দিব্যি পড়তে পারে। চমৎকার চিন্তাভাবনা, তাই না? অবশ্য আমাদেরও কিছু কিছু স্থানে কসমোপলিটান, ভাবী কি পেয়ার, রাশিচক্র, সিনে অ্যাডভান্স ইত্যাদি জাতীয় পত্রপত্রিকার ছোটোখাটো স্টল থাকে। লুকিয়ে পড়তে হয়, এই যা।

আরও পড়ুন বইয়ের কথা: পদ্যে গদ্যে শীতের ছোঁয়া

বন্ধু কৌশিকের জোরাজুরিতে আর পুনশ্চ স্টল অভিযানের তাগিদে, আমার প্রথম বইমেলা যাওয়া। বইমেলা তখন ময়দানে। অত বড়ো ময়দান তখন যেন যন্তরমন্তরের ফাঁদ। রাস্তা, স্টল, বই, সুন্দরী, হাঁকডাক আর ধুলো – একেবারে মারকাটারি ব্যাপারস্যাপার। এরই মাঝে চোখে পড়ল ইউবিআই অডিটোরিয়াম। এখানে কী হয় ভাই?

কৌশিক দায়সারা ভাবে বলল, নতুন বই প্রকাশ, বিভিন্ন আলোচনা, আঁতলেমি, এটা সেটা। কৌশিকের সঙ্গে কলকাতায় বেড়ানোর সমস্যা একটাই – আপনি কোনো ললনারই মনোযোগ পাবেন না, সব ওই কৌশিক ব্যাটাই টেনে নেবে – ফারদিন খানের মতো দেখতে আমার এই বন্ধুটি এই একটি ব্যাপারে মারাত্মক স্বার্থপর।

a stall in book fair
বইমেলার ছোট্ট স্টলে বইক্রেতাদের ভিড়। ছবি শ্রয়ণ সেন।

চোখে পড়ল আনন্দ পাবলিশার্স। পোশাক পরিচ্ছদ দেখে আপনি যদি কোনো ব্যক্তির কৌলিন্য আন্দাজ করতে পারেন, তা হলে স্টলসজ্জা দেখেও বুঝবেন নিশ্চয়, কার দৌড় কত দূর। তবে নানা শৈল্পিক ও নান্দনিকতার মিশেলে নির্মিত স্টলগুলি কৌতূহলী মনের খোরাক হয়ে ওঠে বই-কি।

কাঠ বেকার আমরা তখন, বই তো কিনতে পারব না, দু’ একখান চুরি করতে পারি অবশ্য। অভিজ্ঞদের মতে, অপরের বই আর পরের বউ চুরিতে কোনো পাপ নেই। অনেকক্ষণ ধরেই কানে আসছিল, সে পথে কিছুটা গিয়েই চোখে পড়ল এক দঙ্গল তরুণতরুণী গিটার বাজিয়ে গান গাইছে। বেশ কিছু দর্শক-শ্রোতাও জুটে গিয়েছে তাদের, আজই হয়তো জন্ম নেবে ভবিষ্যতের কোনো শিল্পী।

আরও পড়ুন বইমেলার বাছাই: বরণীয় ব্যক্তিত্বদের নিয়ে ‘বোধিসত্ত্ব’র বইয়ের ডালি

খবরের কাগজ পেতে নিছক আড্ডারও জটলা দেখলাম। লিটল ম্যাগ? শখের কবি? তাঁরাও রয়েছেন। কোনো কোনো স্টলে আবার হঠাৎ ভিড়, কী হয়েছে খোঁজ নিয়ে জানা গেল কোন বিখ্যাত লেখক এখন ওখানে উপস্থিত রয়েছেন। ও পথ আবার আমার জন্য নয়, বিখ্যাত লোকেদের সান্নিধ্যে আমার নিজেকে লিলিপুট বলে মনে হয়। একবার রবীন্দ্র সদনে ২১ ফ্রেবুয়ারির অনুষ্ঠানে নচিকেতা চক্রবর্তী ও পল্লব কির্তানীয়ার সঙ্গে আলাপ করার পরই আমার ওই দুর্ভাবনার শুরু।

অনেক খোঁজাখুজিঁর পর, একই রাস্তায় অন্তত বারতিনেক চক্কর কাটার পর পেলাম ‘পুনশ্চ’কে। আশা ছিল কিনতে না পারি, একটা বই অন্তত উপহার পাব এখানে। নিরাশ হলাম, নায়েকদম্পতি অনুপস্থিত। শুধু তাকিয়ে আছে মোটা মোটা শংকর।

ব্যক্তিগত ভাবে আমি ১ বৈশাখ তথা নববর্ষ জমকালো ভাবে পালন করতে উৎসাহী, পাঁচ-সাত দিন ধরে। দুর্গাপূজাকে সর্বজনীন বলা হলেও নানা জায়গায় ধর্মীয় কারণেই আমরা কাছাকাছি আসতে পারি না। আমরা-ওরা বিভেদ থেকেই যায়, ঠিক হিন্দু, মুসলিম শব্দদু’টির মধ্যে যে ভাবে অদৃশ্য একটা হাইফেন বরাবর থাকে। হ্যাঁ, বহু স্থানেই ভিন্ন ধর্মীয়রা দুর্গাপুজোয় প্রত্যক্ষ ভাবে অংশগ্রহণ করে, জানি সেটা, সেটা মাথায় রেখেই বলছি।

two readers
দুই খুদে পড়ুয়া। ছবি রাজীব বসু।

তবে এতে আমার মন ভরে না। আমি চাই একটা আপাদমস্তক বাঙালি উৎসব, তাতে জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সব ধরনের বাঙালির অংশগ্রহণ থাকবে প্রচণ্ড ভাবে, এবং সেটা ধর্মীয় কারণে হবে না। যত দিন সেটা না হচ্ছে, তত দিন আসুন আমরা বইমেলাকেই আঁকড়ে ধরি। বাঙালি হিন্দু সেজেগুজে ঠাকুর দেখতে বেরোলে, বাঙালি মুসলিম জুলজুল চোখে দেখবে না। আবার ঈদের চালের রূটির জন্য হিন্দু বন্ধুর হা হুতাশও নেই এখানে। বইমেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেই আপনার তাবৎ পরিচয় ছাপিয়ে একমাত্র পরিচয় জেগে উঠে, আপনি বইপ্রেমী। আপনি বই কিনতে, দেখতে বা নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকতে এসেছেন এখানে।

যে ক’টা রাজ্য রাজধানী কারণে-অকারণে ঘুরেছি আজ অবধি, আমার মনে হয়েছে কলকাতা এমন একটা রাজধানী যেখানে আপনার অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গবাসীর প্রধান খাদ্য ডাল ভাত, পকেটে একটা দশ টাকার নোট থাকলে দিব্যি খেতে পাবেন, হ্যাঁ আজও। কলকাতায় আমি স্নাতকোত্তর পড়েছি মাসিক ১৩ টাকা বেতনে।

কলকাতার হয়তো অনেক কিছুই নেই, প্রচুর ফ্লাইওভার, জেটগতির জীবন, কিন্তু হৃদয়টা রয়েছে অটুট। আর সেই হৃদয়ের উপর দিকেই রয়েছে, কলকাতা বইমেলা। তাই যে দিন শুনেছিলেন, আগুন লেগেছে বইমেলায়, অদ্ভূত এবং অজানা আশঙ্কায় আপনার মনটাও হু হু করে উঠেছিল।

আরও পড়ুন বইমেলা বাছাই : অধিকার ভাবনায় পরিবেশ

পাঠক, লেখক, বই-পাগল ও বই-প্রেমিকদের মিলনস্থল এই বই-সমাবেশ। মোবাইল এসে হয়তো আপনার পড়ার অভ্যাস নষ্ট করেছে, বইয়ের আলমারিতে ধুলো জমেছে, বন্দি অবস্থায় রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিম। আপনি একবার বইমেলা ঘুরে আসুন। দেখবেন পরের রবিবারই ওই আলমারি পরিষ্কার করার কাজে আপনি নেমে পড়েছেন। দেখবেন হয়তো কোনো বই আপনাকে দেবে আপনার লেখা বা আপনাকে লেখা প্রথম প্রেমপত্র, অথবা দাদুর হাতে লেখা কোনো হলদেটে খরচের হিসেব, আদরের ছোটোবোনের বিয়ের কার্ডও কোনো রচনাবলির ভেতর হতে আসতে পারে বেরিয়ে। আপনি ওদের বলেননি, ওরাও আপনাকে বলেনি কোনো দিন, যে দিন প্রথম আপনি অ আ ক খ শিখেছিলেন সে দিন থেকেই ওরা আপনাকে ভালোবাসে।

পুনশ্চ, সুভাষ দত্তের খবর পাইনি অনেক দিন, ময়দান থেকে কলকাতা বইমেলা চলে গিয়েছে মিলন মেলা প্রাঙ্গণ হয়ে সেন্ট্রাল পার্ক চত্বরে, কিন্তু অফবিট ‘কলকাতা বইমেলা ট্যুর’-এর ব্যবস্থা আমি আজও করে উঠতে পারিনি। তবে কোনো দিন যদি কলকাতার রাস্তায় একটি বড়ো বাস আর তাতে ‘কলকাতা বইমেলা দর্শন’ লেখা ব্যানার চোখে পড়ে আপনার, নিশ্চিত জানবেন, ওটা আমারই কাণ্ড।

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন