মৌসুমি বিলকিস

সাহিত্য চর্চা ঠিক কেমন হওয়া উচিত? কেবল ফর্ম নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা নাকি কন্টেন্টের গা চুঁইয়ে জন্ম নেবে এক বোধ?

যে বোধ এড়ানো সহজ হবে না। যে বোধ ঘুমে জাগরণে ক্রমাগত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে। যে বোধ চাষার লাঙল ছুঁয়ে, শ্রমিকের হাতুড়ি ধরে, দলিতের দরজা ঘুরে, অন্ত্যজ জনের অন্তরের ভেতর দিয়ে, দেশ হারানো মানুষের হাহাকার নিয়ে,ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি ছিন্নভিন্ন করে, পিতৃতান্ত্রিক সামন্ত মানসিকতার ক্ষমতা-কাঠামো ভেঙে, লিঙ্গ ভিত্তিক বৈষম্য ভেদ করে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় লিঙ্গের স্বর নিয়ে, ছাঁটাই হওয়া ও বেকার অসংখ্য মুখ স্পর্শ করে, কর্পোরেট চাকরি কাঠামোর ক্লান্তিকর ও মুনাফালোভী ভাঁওতাবাজি ধরতে ধরতে প্রযুক্তি নির্ভর যুগের অন্ধকার দিক দিয়ে হেঁটে যাবে।

কিন্তু সত্যিই এমনভাবে সাহিত্য চর্চা কি সম্ভব? ফর্ম আর কনটেন্ট নিয়ে ইতিমধ্যেই কি দীর্ঘ দীর্ঘ কথোপকথন, বাদ প্রতিবাদ হয়ে যায়নি? ফর্ম আগে না কনটেন্ট আগে না দুইয়ের মিশে যাওয়া উচিত নিয়ে তুমুল বিতর্ক? তাহলে নতুন করে আর কী বলার আছে?

আছে।

কর্পোরেট সংস্থা ও রাষ্ট্র সব কিছুকেই নিয়ে আসতে চায় হাতের মুঠোয়। মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার থেকে শুরু করে শিল্প, সাহিত্য, সিনেমার ওপর খবরদারি করতে চায়। হয় ভয় দেখিয়ে অথবা অর্থ দিয়ে নিজেদের তাঁবেদার করে রাখতে চায়। নিজেরাই ঠিক করে দেয় শিল্প, সাহিত্যের মানদণ্ড। ‘অপর’ স্বরকে সেন্সর করে। নিষিদ্ধ করে দেয় শিল্প, সাহিত্য। কাঁচি চালাতে বাধ্য করে সিনেমার দৃশ্যে। বন্ধ করে দেয় শুটিং।

হিন্দুত্ববাদীদের হাতে এম এম কালবুর্গি, নরেন্দ্র দাভোলকর বা গোবিন্দ পানসারে, গৌরি লঙ্কেশের মৃত্যু আমরা দেখেছি। চুপ হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন পেরুমল মুরুগান। মালয়ালম কবি কে. শ্রীকুমার, মালয়ালম লেখক এম. টি. ভাসুদেভন নায়ার, পাঞ্জাবি লেখক বলদেভ সিং সদকনামা (মুরুগানের মতোই তিনিও লেখা ছেড়েছেন প্রতিবাদে), পাঞ্জাবি কবি সুরজিত গ্যাগ প্রমুখ লেখক-কবিদের ওপর হিংস্র আক্রমণ চালিয়েছে বিজেপি ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। কর্নাটকের দলিত লেখক হুছাঙ্গা প্রসাদ কাস্ট সিস্টেমের সমালোচনা করে বই লেখায় তাঁর ওপর আক্রমণের পাশাপাশি আঙুল কেটে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে যাতে তিনি আর লিখতে না পারেন। এমনকি বলা হয়েছে পূর্ব জন্মের পাপের ফলেই এ জন্মে দলিত হয়ে জন্মেছেন তিনি। হাস্যকর ও বেদনাদায়ক নয় কি? যে দেশের বিজ্ঞান মঞ্চে পৌরাণিক গল্পে বিজ্ঞান খোঁজা হয় সে দেশে আর কী-ই বা আশা করা যাবে? কাঞ্চা ইলাইয়াহ্‌। লেখেন ইংরেজি ও তেলেগু ভাষায়। দলিত অধিকার নিয়ে কথা বলেন। তাঁর বই নিষিদ্ধ করা হয় (Vysyas are Social Smugglers)। তরুণ লেখক ও ডাক্তার হাঁসদা শউভেন্দ্র শেখর-এর গল্পে উঠে আসে সাঁওতাল জনজীবনের খুঁটিনাটি। নিষিদ্ধ হয় তাঁর গল্পগ্রন্থ (The Adivasi will not dance)। লেখকদের ওপর খড়্গহস্ত ক্ষমতার কারবারিরা।

এরকম এক কঠিন সময়ে হেঁটে চলেছি আমরা।

ধান ভানতে শিবের গান গাইছি না। ভেবে দেখুন, প্রত্যেকটি ঘটনা ভীষণভাবে সংযুক্ত। কন্টেন্টের কথা উঠলেই সাম্প্রতিক সময়, দেশ, দেশের মানুষ সামনে এসে ভিড় করে। কন্টেন্টের কথা উঠলেই মনে হয় সব সাহিত্যিক হবেন রাজনীতি সচেতন। না হলে তিনি কী করে কন্টেন্ট সচেতন হবেন? কী করে বাছবেন লেখার বিষয় আর বিষয়ের মধ্যে অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে থাকা আপাত তুচ্ছ ঘটনার ভেতরেও রাজনীতির অভিঘাত?

কিন্তু, মূল ধারার সাহিত্য পত্রিকা বা দৈনিক সংবাদপত্র সব লেখা, সব বিষয় ধারণ করতে পারে কি? তাদের মানদণ্ডের ভেতর খাপ খায় কি প্রান্তিক স্বর? আর মূল ধারার সাহিত্যের একটা চেষ্টাও কি থাকে না প্রান্তিককে আরও প্রান্তিক করে দেওয়ার? দ্বিতীয় বা তৃতীয় লিঙ্গকে আরও পিছনে ঠেলে দেওয়ার? অন্যদিকে যে সব সাহিত্যিক লেখার ওপর নির্ভর করেই জীবন নির্বাহ করতে চান তাঁদের জায়গাটাও ছোটো হয়ে আসে।

পাশাপাশি টাটা, এসার, বেদান্ত-এর মতো সংস্থা যখন সাহিত্য উৎসব করে আর তাতে যোগ দেন বিখ্যাত সাহিত্যিকরা তখন এক বিপন্ন বিস্ময় মাথার ভেতর খেলা করে বৈকি। কারণ এইসব কোম্পানিগুলোই তাদের হাত রাঙিয়ে নেয় আদিবাসীদের রক্তে। তাদেরই সশস্ত্র বাহিনি কলিঙ্গনগর, নিয়মগিরি,বস্তারে আদিবাসীদের ছিন্নমূল করে জমি দখল করে। এই সংস্থাগুলোই যখন সাহিত্য উৎসব করে তখন সেই উৎসব অবশ্যই অশ্লীলতার উৎসব। সেই উৎসব আমাদের পৌঁছে দিতে পারে না কোনও উত্তরণের পথে। বরং নিয়ে চলে আরও পিছনের দিকে।

এই বিপন্নতা থেকেই জন্ম নেয় ‘জনতার সাহিত্য উৎসব’। বস্তার সলিডারিটি নেটওয়ার্ক (কলকাতা চ্যাপ্টার) এগিয়ে আসে। ভিন্ন স্বরগুলোকে উদযাপনের উদ্যোগ নেয়। দেশ ও বিদেশের ছোটো ছোটো বৃত্তের প্রায় অশ্রুত সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের উৎসবে জড়ো করার প্রয়াস শুরু হয়। গত বছর (২০১৮) প্রথম হয় এ উৎসব। এবার দ্বিতীয় বর্ষ। আগামি ১৫, ১৬ ফেব্রুয়ারি ফুলবাগান সুকান্ত মঞ্চে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এ উৎসব।

প্রথম বর্ষের অতিথিদের তিনজন এখনও বন্দি। ভারভারা রাও, অরুণ ফেরেইরা এবং ভার্নন গঞ্জালভেস। আগেই উল্লেখ করেছি, মুক্ত চিন্তা, সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের ওপর দমননীতি কীভাবে চলছে। রাষ্ট্র ও তার মদত-পুষ্ট হিংসার কারবারিরা আঘাত করতে তৈরি।

এই উৎসবের আরও একটি ঘোষিত বৈশিষ্ট, কর্পোরেট বা সরকারি ফান্ড নয়, ক্রাউড ফান্ডিং দিয়েই চালানো হয়/হবে উৎসবের খরচ। অর্থের হিসাব নিকাশের স্বচ্ছতা রেখেই ফান্ড চলছে, চলবে। উৎসবের হারানোর কিছু নেই, লুকোনোর কিছু নেই। শুধু আছে উত্তরণের পথ।

ভিন্ন স্বর থেমে থাকবে না। চলবে। এ উৎসবের হাত ধরে।

১৫ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানের সময়সূচি

এবারের অন্যতম অতিথি আঞ্জুম জামারুদ হাবিব। কাশ্মীর অধিগ্রহণের রাজনীতি সাধারণ মানুষের জীবন কিভাবে তছনচ করে দেয় সে বিষয়েই ‘সন্ত্রাসবাদী’ আখ্যা পান, বন্দি হন। মীনাক্ষী সেন, জয়া মিত্র বাঙালি পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন আঞ্জুমের (‘জেলের ভেতর জেল’, ‘হন্যমান’)।জেলের অভিজ্ঞতা নিয়ে আঞ্জুম লেখেন ‘প্রিজনার নাম্বার হাণ্ড্রেড: অ্যান অ্যাকাউন্ট অফ মাই নাইটস অ্যান্ড ডেজ ইন অ্যান ইন্ডিয়ান প্রিজন’। উৎসবের প্রথম দিন অধিগ্রহণের রাজনীতি নিয়ে বলবেন তিনি।

তনভির আঞ্জুম, পাকিস্তানের কবি। তাঁর কবিতায় উঠে আসে বিশিষ্ট নারী স্বর। তিনি উপলব্ধি করেন, পশ্চিমী নারীবাদ দিয়ে পাকিস্তানের নারীবাদ বিচার করা যাবে না। তিনি উৎসবের প্রথম দিন ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সাহিত্য নিয়ে বলবেন।

এই একই বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেবেন তেলেগু সাহিত্যের অন্যতম নাম পি. ভারালক্ষ্মী। কুড়ানকুলাম আন্দোলনের অন্যতম মুখও তিনি। সেই অভিজ্ঞতাই তিনি ব্যক্ত করেন ‘সমুদ্রম থো সম্ভাষণা’ (সমুদ্রের সঙ্গে কথোপকথন) নামের গ্রন্থে।

এই বিভাগের আরও এক অতিথি শাহ্‌ আলম খান তাঁর ‘দ্য ম্যান উইথ দ্য হোয়াইট বিয়ার্ড’ বইয়ে তুলে ধরেছেন শিখ দাঙ্গার ভয়াবহ স্মৃতি। তিনিদিল্লির সরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক। প্রতিষ্ঠান বিরোধী রাজনৈতিক প্রবন্ধগুলিতে তাঁর সচেতন নাগরিক সত্ত্বার পরিচয় পাওয়া যায়।

এছাড়াও প্রথম দিন থাকবেন রঞ্জনা পাধি, হাফিজ আহমেদ, মোনালিসা চাঙ্কিজা, হেমন্ত দলপতি প্রমুখ।

১৬ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানের সময়সূচি

উৎসবের দ্বিতীয় দিন থাকছেন আল্পনা মণ্ডল। তাঁর বিষয়ে বাঙালি পাঠকের কাছে নতুন করে কিছু বলার নেই। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে করতে, জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতাগুলো পেরোতে পেরোতে যিনি হয়ে উঠেছেন চণ্ডালিনী। কালীর মতোই হাতে খড়্গ নিয়ে হেঁটে চলেছেন তিনি ‘বাবু’ সমাজের বুকে। এক্ষুনি খড়্গ রক্তাক্ত হয়ে উঠতে পারে। তাঁর বই ‘চণ্ডালিনী বৃত্তান্ত’ প্রকাশের অপেক্ষায়। খেটে খাওয়া মানুষের সাহিত্য নিয়ে কথা বলবেন তিনি।

একই বিভাগের বক্তা বি. অনুরাধা হায়দরাবাদের নারী আন্দোলনের অন্যতম কর্মী। বিনা বিচারে চার বছর তাঁকে হাজারিবাগ জেলে বন্দি জীবন কাটাতে হয়। এই সময়ে যেসব মহিলা বন্দিদের সংস্পর্শে আসেন তিনি তাঁদের জীবন উঠে আসে তাঁর গল্পে। বন্দি মেয়েদের বন্দি হওয়ার পিছনের গল্পগুলো জানলে আমাদের দেশের সাধারণ নাগরিকদের শোচনীয় অবস্থার ধারণা পাওয়া যায়। কোনোদিন কেউ শুনেছে কোনও মেয়ের ঘরে ছাগল ঢুকে তারই সারাদিনের খাবার সামান্য লপ্‌সি খেতে গিয়ে ছাগল মরে গেলে পুলিস ও ছাগলের মালিক জেলে পাঠায় সেই মেয়েকে? হ্যাঁ, বেড়ার এক চিলতে ঘরে ছাগল আটকানোর ক্ষমতা নেই, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অর্থ নেই যে মেয়ের তাঁকে জেলেই যেতে হয়, দিনের পর দিন কাটাতে হয় বন্দি জীবন। এই মেয়ে আমার আপনার সহনাগরিক। রক্ত হিম হয়ে যায় না? বি.অনুরাধা এইসব অশ্রুত গল্পই বলেন। ‘Prison Notes by a Woman Naxalite’-এ তাঁর গল্প আত্ম প্রকাশের অপেক্ষায়।

তামিলনাড়ুর দলিত নারিবাদী লেখিকা বামা একই বিভাগের আর এক বক্তা। তাঁর আত্মজীবনী‘কারুক্কু’ (১৯৯২)-তে অবদমিত, নিপীড়িত দলিত জীবনের ছবি। তাঁর উপন্যাস ও ছোট গল্প সংকলনগুলিতে দলিত নারীর ‘স্পর্ধা’ ও প্রতিরোধের আগুন জেগে থাকে। তাঁর অন্যতম গ্রন্থ‘সঙ্গতি’ (১৯৯৪), ‘কুসুমবুক্করন’ (১৯৯৬), ‘ভনমাম’ (২০০২) ও ‘ওরু তাত্তাভুম এরুমায়উম’ (২০০৩)।

নল্লুরি রুক্মিণী অন্ধ্রপ্রদেশের প্রকাশম জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জীবন শুরু করেন। এই গ্রামের প্রথম শিক্ষার সুযোগ পাওয়া মেয়ে তিনি। ফলত বোঝাই যায় তাঁর লড়াইয়ের রাস্তা মসৃণ ছিল না। দলিত জনগোষ্ঠী ও মেয়েদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে তাঁর লেখা। তাঁর জেলার করমচেড়ু গ্রামে দলিত গণহত্যার ঘটনায় উচ্চবর্ণের জমির মালিকদের হাতে খুন হন ছ’জন দলিত ভূমিহীন কৃষক, আহত হন অনেকে। রুক্মিণীর উপন্যাস ‘অন্দ্রুমতি’ (উর্বর জমি) এই হত্যা ও অবদমনের রক্তাক্ত প্রতিরোধের কাহিনি।ব্রাম্ভণ্যবাদ ও পিতৃতন্ত্র বিরোধী সাহিত্য বিষয়ে বলবেন তিনি।

দ্বিতীয় দিনে থাকছেন মীরা সংঘমিত্রা, লীনা মনিমেকালাই, মীরা নন্দা, সব্যসাচী দেব প্রমুখ।

এছাড়াও উৎসবের দুদিনই থাকছে গান। প্রথম দিন গান গাইবে লাল-অন ব্যান্ড এছাড়াও থাকবে আরও একটি অনুষ্ঠান।

দ্বিতীয় দিন গোকুল হাজরা ও প্রাণেশ মোহন পাল তাঁদের কবিগানের লড়াইয়ে তুলে ধরবেন দেশের বর্তমান ফ্যাসিবাদী প্রবণতার দু প্রান্ত, পক্ষ ও বিপক্ষের যুক্তি। কোন পক্ষ জিতবে? দর্শকরা অপেক্ষায়।

ছবি সৌজন্য: বিএসএন

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here