আকুইয়ের নেতাজি সংঘের রবীন্দ্রস্মরণ-এক মনোজ্ঞ সন্ধ্যা

0
শ্রয়ণ সেন

বাঁকুড়ার মাটি পুণ্যভূমি। বাঁকুড়ার মাটির যে কী মাহাত্ম্য সেটা নিজের গলায় অসাধারণ ভাবে বুঝিয়েছেন লোকসংগীত শিল্পী সুভাষ চক্রবর্তী। সেই বাঁকুড়ার মাটিতেই আমার আদিবাড়ি এটা ভাবলে এমনিতেই কেমন যেন একটা শিহরণ জাগে আমার মনে। তার পর যখন দেখা যায় এখানে বিশ্বকবির জন্মদিন বিশেষ ভাবে পালন করা হয়, তখন যে কী গর্ব হয়, সেটা বোধহয় বলে বোঝানো যাবে না।

বাঁকুড়ার ইন্দাস থানার অন্তর্গত আকুই গ্রামের পশ্চিমপাড়ায় আমাদের বাড়ি। এই পশ্চিমপাড়ার হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে রেখেছে দু’টি জিনিস, হাটতলা এবং নেতাজি সংঘ। এই নেতাজি সংঘের উদ্যোগেই এক মনোজ্ঞ রবীন্দ্র জয়ন্তী-সন্ধ্যা উপভোগ করলাম বৃহস্পতিবার। চার ঘণ্টার এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে গান আর কবিতায় মাতিয়ে রাখল পাড়ার খুদেরা। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে কৃতি ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়ানো হল আর সেই সঙ্গে পরিবেশিত হল অসাধারণ এক  নৃত্য গীতিআলেখ্য।

Loading videos...

এই নেতাজী সংঘের যাত্রা শুরু ১৯৬১ সালে। পশ্চিমপাড়ার কয়েক জন তরুণের হাত ধরে যাত্রা শুরু করল নেতাজি সংঘ। এই তরুণদলের মধ্যে একজন রমাপ্রসাদ সেন, আমার জেঠু। সেই সংঘ এখন ৬০ বছরে পদার্পণের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। জেঠুরা এখন কেউ প্রৌঢ়, কেউ বৃদ্ধ। কিন্তু তখন যে ভাবে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন হত, এখনও ঠিক সেই ভাবেই পালিত হচ্ছে, এই কথাটা বলতে গিয়ে জেঠুর যে কত গর্ব হচ্ছিল সেটা বলে বোঝানো যাবে না।

তবে শুধু কি রবীন্দ্রজয়ন্তী? নজরুলজয়ন্তী, কিংবা সরস্বতীপুজো, নেতাজি সংঘ পালন করবেই। জেঠুর পরের প্রজন্ম, অর্থাৎ আমার দাদা-দিদিরা এখন মূল হোতা, তবুও বিশেষ অতিথি হিসেবে তাঁর উপস্থিতি না হলে চলবেই না।

‘হে নতুন দেখা দিক আরবার…’

ঘড়ির কাঁটায় সন্ধ্যা সাতটা। উদ্বোধনী সংগীতের মধ্যে দিয়ে শুরু হল রবীন্দ্রজয়ন্তীর এ বারের অনুষ্ঠান। তার পর একে একে গান আর কবিতা পরিবেশন করে গেল পশ্চিমপাড়ার ছেলেপুলেরা। শহুরে জাঁকজমক ছিল না, কিন্তু ছিল একাত্মতা।

দর্শক আসন পুরোপুরি ভরে উঠেছে। একে একে গান গেয়ে, কবিতা পড়ে যাচ্ছে খুদেরা আর আমার মন আরও বেশি করে নিশ্চিন্ত হচ্ছে। আজকাল শহুরে ছেলেপুলেদের দেখি এখনই হাতে স্মার্টফোন চলে এসেছে। স্কুলের পথে যায় দিব্যি কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে। মাত্র বছর বারো আগে আমরা যখন স্কুলে যেতাম তখন এটা ভাবতেও পারতাম না। শহুরে খুদেদের মধ্যে ‘মল কালচার’ ঢুকে যাওয়ায় খুব সন্দেহ হত, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি তা হলে রবীন্দ্রনাথকে ভুলে যাবে? না, সেটা যে হবে না আকুইয়ের পশ্চিমপাড়াই বুঝিয়ে দিল।

প্রথম অংশে গান-কবিতা পাঠের পর অঞ্চলের কৃতী ছাত্রছাত্রীদের বিশেষ ভাবে সম্মান জানানো হল। এই সম্মাননা জ্ঞাপনে যার কথা আলাদা ভাবে বলতেই হয় সে অন্তরা পাত্র। রমাপ্রসাদ সেনের কথায়, সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া পাত্রপাড়ার অন্তরা অনন্য এক কীর্তি অর্জন করেছে। তার পাড়ার প্রথম মেয়ে হিসেবে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে সে। ২০১৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে এখন সে পড়ছে আকুইয়ের নবনির্মিত মহিলা কলেজে।

সন্ধ্যার আসল আকর্ষণ অবশ্য তখনও বাকি ছিল। সেটা শুরু হল রাত ন’টার পর। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে নৃত্য-গীতিআলেখ্য ‘ঋতুরঙ্গ’ পরিবেশন করলেন, আকুই এবং আশেপাশের গ্রামের মেয়েরা। সৃজিতা দে, সমৃদ্ধি গুহ, চন্দ্রিমা চৌধুরী, শ্রেয়সী রক্ষিতদের অসাধারণ এই পরিবেশনটির সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন রনি মণ্ডল। আর গোটা গীতিআলেখ্যটি যোগ্য হাতে পরিচালনা করেছেন রনির বাবা তথা এলাকারই স্বনামধন্য সংগীত শিক্ষক রবীন মণ্ডল।

শেষলগ্নে একটি বিশেষ বার্তা দিয়ে রবীন্দ্র জয়ন্তীর মূল সুতোটা বেঁধে দিলেন খবর অনলাইনের এডিটর ইন-চিফ তথা এই গ্রামেরই সন্তান শম্ভু সেন। তাঁর কথায়, “রবীন্দ্রনাথ আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাস করতেন। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ মানতেন না। আজ দেশ এমনকি সারা বিশ্বে মানুষের মধ্যে এই ভেদাভেদের বাতাবরণ, এই পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথকে আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরতে হবে আমাদের।”

জনতার সম্মতিসূচক হাততালিই বুঝিয়ে দিল, রবীন্দ্রনাথকে আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরতে প্রস্তুত আমার গ্রাম।

সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইন্দ্রাণী সেন।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন