ইরানের আঙ্গিকের ভরসায় ভারতের আকাশ ভরা মেঘ পেরোনো হল না মাজিদির

সুঅঙ্গনা বসু

মেঘের ওপারে চাঁদের বাড়ি, সেখানে চলে গেছে ছোটুর মা। সে দেশে যক্ষা নেই, সেখানে তাঁর মার কাশি সেরে গেছে। এই গল্প বলে দু দিন ধরে ছোটুকে খাওয়াবার চেষ্টা করছে তারা নিশান। জ্ঞান হওয়া অবধি জেলের কুঠুরিতে বড় হয়ে ওঠা, ছোটু জানে না চাঁদ কী? তাই এক ঘোর বর্ষার রাতে কারারক্ষীকে ঘুষ দিয়ে, ছোটুকে চাঁদ দেখাতে ছাদের কাছে নিয়ে আসে তারা। আর অপেক্ষা করতে থাকে, বৃষ্টি শেষের পরিষ্কার আকাশে চন্দ্রোদয়ের। গারদের ফাঁক দিয়ে তাঁদের হাতের ওপর ঝরে পরতে থাকে বৃষ্টি সুখটুকু, সিনেমা শেষ হয়ে যায়।

আলো জ্বলে ওঠে। পিছনের আসনের সদ্য যুবতী বলে ওঠেন, কিছু সিনেমা হঠাৎ মাঝখানে শেষ হয়ে যায়। অর্থাৎ তাঁর পরিচিত গল্প বলার ধরনের সঙ্গে মিল নেই মাজিদ মাজিদির হিন্দি ছবি ‘বিয়ন্ড দ্য ক্লাউডস’-এর। মনে পড়ে যায় বহুকাল আগে শোনা – ইরানের নবতরঙ্গ হলিউড ধাঁচের গল্প বলে না, আবার ইউরোপের ধাঁচের-ও নয়। কেন? কী? ইত্যাদি নানা কথা। কীভাবে তৈরি হল ইরানের ছবির এমন আশ্চর্য ভাষা, এসব নিয়ে শোনা-পড়া নানা কথা।

আমাদের দেশে যখন আর্ট ফিল্ম এবং কমার্শিয়াল ফিল্মের বিভাজন অনেক বেশি স্পষ্ট ছিল সেসময় বাস্তবধর্মী ছবিগুলিতে সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য রাখা হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। ইরানে সব সময় সোচ্চারে সব কথা বলা সম্ভব ছিল না। সেই সীমাবদ্ধতা পার করেই সেখানকার পরিচালকরা মেঘের ওপারে চাঁদের দেশে পৌঁছে গিয়েছিলেন ‘হোয়াইট বেলুন’, ‘মিরর’, ‘সং অফ স্প্যারোস’ এরকম অসংখ্য ছবিতে। সাধারণ বিষয় নিয়ে নিপুন হাতে বহমান জীবনের ছবি এঁকে বারবার পৃথিবীকে চমকে দিয়েছেন মাজিদিরা। ইরান এবং ভারতের প্রেক্ষিত আলাদা তাই রিয়েলিস্টিক ছবির ফর্ম হিসেবে ইরানের ধাঁচ ভারতে কতটা প্রয়োগযোগ্য তা নিয়ে নানা মত থাকতে পারে। একটা অন্য কথা বলি। পঙ্কজ কপূরের ছেলে শাহিদ কপূর, তাঁর সৎ ভাই ইশান খট্টর। ‘বিয়ন্ড দ্য ক্লাউডস’ তাঁর ডেবিউ ফিল্ম। পরিবার হিসেবে শহিদরা বিশাল ভরদ্বাজের বিশেষ বন্ধু। বিশাল ভরদ্বাজ আবার এই ফিল্মের কী সব যেন করেছেন। ইশানের কষ্ট করে করা মেথড অ্যাক্টিং ভীষণ আরোপিত, বুঝতে পারেননি মাজিদি!!!! বিদেশ বিঁভূই-এ চেনা গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে মেঘের ওপারে চাঁদ খোঁজার সাধ্য নেই তাঁর!! কোন বাধ্যবাধকতায় জানা নেই। এটুকু না করতে পারলে আর ইরানের ছবির থাকল কী? মালবিকা মোহনানের অভিনয় বসে দেখা মুসকিল। বিশেষ করে এই সময়, যখন আমাদের মেনস্ট্রিমের নায়িকারা প্রতিদিন তুখোড় অভিনয় করছেন। চিত্রনাট্যের আরোপিত মেলোড্রামার কারণেই হয়তো।

কয়েকজন সর্বহারা মানুষ নানা সংকটে জেরবার। প্রতিটি চরিত্রের মানবিক বিপন্নতাগুলি ছুঁয়ে তাঁদেরকে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে দিতে চেয়েছেন মাজিদি। মদ খেয়ে বউ পেটাত, তাই বরকে মেরে ফেলে যাবজ্জ্বীবন হয়েছিল ছোটুর মায়ের। পরে সে জেলে মারা যায়। নিজেকে ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে প্রতিবেশী অক্ষিকে প্রায় মেরে ফেলে জেলবন্দি হয় তারা নিশান। জেলেই ছোটু পেয়ে যায় তারাকে।  ছবির ইঙ্গিত থেকে ধরে নেওয়া যেতে পারে মায়ের মৃত্যুর পরেও মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হবে না ছোটু। যেমন কোনো ধর্ষণ উন্মুখ মূহূর্তেরই ধোবিঘাটের সাদা কাপড় ঘেরা রোম্যান্টিক পটভূমি থাকেনা, তেমনই ছোটুরাও অনাথ হয়ে বেঁচে থাকে। মেঘের ওপারে চাঁদের বাড়ি দূর অস্ত, এতগুলো বছর কেটে গেল ছোটুরা কেউ বিজয় দিনানাথ চৌহান হয়ে উঠেছে বলেও তো খবর পেলাম না। যেমন প্রতিদিন এত বধূমৃত্যু, এত ধর্ষণের খবরের মাঝে প্রতি-আক্রমণের খবর বিরলের মধ্যে বিরলতম। তবু কবিতা, রূপকথা, রূপকের কাছে দায়বদ্ধ মাজিদি পিতৃতন্ত্র-পুঁজিবাদের খোসা ছাড়িয়ে ফিকশনে ঢেলে দিতে চেয়েছেন। মনে হয় কিছু ভৌগলিক ও ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার কারণেই এই নির্মাণটি প্রাণ ছোঁওয়া শিল্প হয়ে উঠতে পারেনি।

কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে মাজিদির ‘সং অফ স্প্যারোস’ দেখতে গিয়ে স্ট্যাম্পিড হওয়ার যোগাড় হয়েছিল। বছর দশেক আগে। কলকাতার মানুষের হৃদয়ে আছেন তিনি। এবার ‘বিয়ন্ড দ্য ক্লাউডস’-এর প্রচারে এসে নাকি বাংলার প্রথম সারির পরিচালকদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছেন সত্যজিত ভক্ত মাজিদি। কী বলেছেন কে জানে, যে বিষয় অথরিটি হয়তো সে বিষয় নিয়েই কথা হয়েছে, অর্থাত নিজের দেশের রূপ রস বর্ণ গন্ধকে নানা সীমাবদ্ধতার বেড়াজাল টপকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার ফর্মুলা। অবশ্য ‘বিয়ন্ড দ্য ক্লাউডস’ দেখে আশা জাগল না যে তিনি ভারতের গল্পও সমান শৈল্পিক দক্ষতায় বলতে পারবেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.