আলিয়ার চেনা দুঃখ চেনা সুখ, প্রিয় জীবন ও শাহরুখ

0

suangana-basuসুঅঙ্গনা বসু

তিনি শাহরুখ খান, পাঞ্চলাইন তাঁর ঠোঁটের ডগায় ডিম্পলের ভাঁজে লুকনো থাকে সব সময়। এ ছবি মুক্তির আগেও সশব্দে জানিয়েছিলেন তাঁর স্টারডমের লম্বা ছায়া যেন বাকিদের কাজ ঢেকে না দেয়। মহিলা পরিচালক (গৌরী শিন্ডে)এবং নায়িকার(আলিয়া ভাট) ‘ডিয়ার জিন্দেগি’-র স্ক্রিপ্টে তিনি নেহাতই ‘এক্সটেন্ডেড ক্যামেও’। তবু সাইকো থেরাপিস্ট শাহরুখকে নতুন আলোয় দেখতে চাওয়ার ইচ্ছে সামলানো দায়। আর সত্যিই, থেরাপিস্টের ‘কুর্সিতে’ বসলেই উল্টোদিকের জানলা দিয়ে তাঁর মুখে এসে পড়ছিল এক অপার্থিব মন ভালো করা থেরাপিউটিক আলো। ডিয়ার জিন্দেগি ছবির ক্যামেরা (আফটার অল নায়িকা বড় সিনেমাটোগ্রাফার হতে চায়) বেশ আরামদায়ক। গোয়ার রাস্তাঘাট, পোশাক-আশাক, সমুদ্র, পর্তুগিজ স্থাপত্যের আলো ছায়া পরিচালক, দর্শক এবং সিনেমাটোগ্রাফারদের কাছে সব সময়ই লোভনীয়। তবে সিনেমা তো শুধু মনোরম দৃশ্যের সমাহার হতে পারে না, বিশেষ করে নায়িকা যখন মন ভাল করতে ‘দিমাগ কা ডাক্তারের’ সাহায্য নিচ্ছে, তখন আলোয় ফেরা বোঝাতে একটু অন্ধকার তো দেখাতেই হতো। মাল্টিপ্লেক্সের দর্শক বিরূপ হবেন ভেবেই হয়তো অন্ধকারকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে ছোঁয়ার চেষ্টাটাও করেননি পরিচালক।

যাই হোক। কায়রা আকা আলিয়া ভাট আজাদ হতে চায়। বড় সিনেমাটোগ্রাফার হতে চায়। সে ট্যালেন্টেড বলেই যেন তাঁকে কাজ দেওয়া হয়, ‘হট’ বলে নয়, এ কথাটা সে বারবার বলে এবং নাটকের প্রত্যাশা জাগিয়ে ছবি শুরু হয়। যেচে আসা প্রযোজককে সটান প্রশ্নটা করে ফেলে কায়রা, নিশ্চিত হয় ড্রিম প্রোজেক্ট পেতে চলেছে শুধু ট্যালেন্টের জোরেই। (কায়রা ‘হট’ বলে কাজটা তাঁকে দেওয়া হলে কী সে কাজটা ছেড়ে দিত? এমনটা হয়ে থাকে বুঝি অসলি জিন্দেগিতে?) কায়রা মুখে যাই বলুক, প্রযোজকের ভূমিকায় কুনাল কাপুর হ্যান্ডসাম, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং কাজ দেওয়ার বিনিময়ে মোটেই শুতে চান না বরং বিয়ে করতে চান। (শোওয়া অবশ্য ততদিনে হয়ে গেছে, এবং কায়রা তাঁর বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে এই গ্রাউন্ডে সম্পর্ক ছেদ করে দিয়েছে)। তবে সমস্যা কোথায় ? যার জন্য ডক্টর জাহাঙ্গির খানের শরণাপন্ন হতে হল কায়রাকে ? সমস্যা আছে, সেগুলির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও বলতে হয়ে গৌরি শিন্ডে কখনোই সেই সমস্যার মূলে পৌঁছতে চাননি, গোটা পর্দা জুড়ে আলিয়া ভাটকে ধরেছেন, নায়িকার অভিনয় প্রতিভার প্রদর্শনী হয়েছে, কিন্তু নাটকের তল কূল মেলেনি।

আলিয়াকে উড়তা পঞ্জাবে দেখা গেছে নিজেকে ভেঙে চুরে চরিত্রে মানিয়ে নিয়েছেন। সেখানে তিনি খুপরি জানলা দিয়ে গোয়া যাওয়ার বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং-এর দিকে তাকিয়ে আজাদির স্বপ্ন দেখা এক প্রান্তিক মজদুর। এই ছবিতে গোয়াতে রয়েছে তাঁর পৈতৃক ভিলা, যেখানে থাকতে তিনি অপছন্দ করেন। অভিনয়ের কথা বলতে গেলে এখানে আলিয়া নিজের এলিমেন্টে রয়েছেন। ক্যামেরায় সাংঘাতিক স্বত:স্ফূর্ত, ভীষণ স্মার্ট। আর তাই থেরাপিস্টের চেয়ারে বসে তাঁর চোখের জল অনেক সময় আরোপিত হয়ে ওঠে। শত অভিনয় দক্ষতা দিয়েও ঢাকতে পারেননি সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো কায়রা এবং আলিয়া আলাদা নন। তাই তাঁর সুখ – দু:খ হৃদয় ছুঁতে পারেনা।  নায়িকা শেষ পর্যন্ত কতটা এবং কী কী থেকে আজাদ হলেন তাও তাঁর অভিব্যক্তি থেকে আলাদা করে কিছু বোঝার উপায় নেই।

 


ছবিটি আলিয়া কেন্দ্রিক, আশেপাশে থাকা চরিত্রগুলি সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা গেল না।


ডক্টর জাহাঙ্গির খানের সংগে আলোচনায় বেরিয়ে আসে কায়রার জমে থাকা দুখের কাহিনি, পুতুল খেলার গল্প। সেরে ওঠে কায়রা, অ্যাটলিস্ট সিনেমার শেষ দৃশ্য অবধি মনে হয় সে সুস্থই আছে। থেরাপিস্টের চেয়ারে (সিনেমায় যাকে কুর্সি বলা হয়েছে) শাহরুখ খান থাকলে সেরে না উঠে এবং তাঁকে মিস না করে উপায় কী ? তবে ‘এক্সটেন্ডেড ক্যামেও’, তাই নায়িকা সেরে ওঠার পরের দৃশ্যগুলিতে তিনি ছবিতে নেই। আর নায়িকার সঙ্গে আমরাও তাঁকে মিস করতে থাকি। সমস্যাগুলি বিশ্বাসযোগ্য না হয়ে উঠলেও সমাধানটাকে শাহরুখ খান বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন বটে(নায়কের কাজ-ই তো তাই)।

আমরা যারা শাহরুখকে ‘ডিডি’ (দূরদর্শন, দিমাগ কা ডাক্তার নয়) যুগে দেখেছি তাঁরা জানি মা, বোন, প্রেমিকাকে তিনি চিরকাল বিশ্বাসযোগ্যভাবে ‘ডিয়ার জিন্দেগি’ উপহার দিয়েছেন। এক্ষেত্রেও কায়রার মতই, কিছু মানুষ ছবি শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও নিশ্চয়ই মনে মনে ডক্টর জাহাঙ্গির খানকে খুঁজতে থাকবেন। তবে তাতে তো সমস্যার সমাধান হবে না, শুধু প্রমাণ হবে শাহরুখ বহু ব্যবহারে জীর্ন হননি, কায়রা কী তাতে আজাদ হবে?

দুটি ছবির কথা মনে পড়ছিল, ১. দীপ জ্বেলে যাই – যেখানে থেরাপিস্টের ওপর ডিপেন্ডেন্ট হয়ে পড়তেন রোগীরা। এক্ষেত্রেও থেরাপিস্টের পাসোর্নাল টাচে সেরে উঠলেন রোগিনী, রোগ নির্মূল করা গেল কী না বোঝা গেল না। ২. অর্থ- আলিয়া ভাটের বাবার পরিচালনায় তৈরি আশির দশকে বানানো ছবি। – ডিয়ার জিন্দেগি ছবিতে আলিয়া বারবার তাঁর কাজের মেয়েকে জড়িয়ে ধরছেন, তাঁর সঙ্গে বন্ধুর মত শেয়ার করছেন জীবনের গল্প (মূলত বদলে যাওয়া বয়ফ্রেন্ড ইত্যাদি), স্কাইপে কথা বলছেন – কিন্তু ওই মেয়েটির সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যাচ্ছে না। অর্থ ছবিটিতে কিন্তু রোহিনী হাতাঙ্গারি (কাজের মেয়ে)ও শাবানা আজমির সম্পর্কের একটা তাৎপর্য তৈরি হয়েছিল, প্রান্তিকতায় মিলে গিয়ে হাতে হাত রেখেছিলেন তাঁরা। আর নানা টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে সাইকো থেরাপিস্ট ছাড়া আজাদ হতে হয়েছিল শাবানাকে। অবশ্য দুটি ছবির প্রেক্ষিত আলাদা।

আগেই বলেছি ছবিটি আলিয়া কেন্দ্রিক, আশেপাশে থাকা চরিত্রগুলি সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা গেল না। বন্ধু জ্যাকির (মেয়ে) সঙ্গে সবসময় ঘুরছে কায়রা কিন্তু ছেলেরা দেখামাত্র কায়রাকে হট ইত্যাদি বলে এগিয়ে আসছে, জ্যাকি কায়রাকে স্পেস দিয়ে সরে আসছে বারবার (এর থেকে আবার নতুন কোনো সমস্যা না তৈরি হয়)। জ্যাকির কোনো স্টেডি বয়ফ্রেন্ড আছে তো ? নইলে কিন্তু কায়রার সাপোর্ট সিস্টেম ফের ভেঙ্গে পড়তে পারে, তখন ডক্টর জাহাঙ্গির খান পক্ষপাতিত্ব করে ফেলবেন না তো ? শাহরুখের ওপর ভরসা রাখতে ইচ্ছে করে….. তিনি ছাড়া কে পারত এত ভালবাসা দিয়ে মেয়েদের হকি টিমকে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন করতে ? ছবিতে মনে রাখার মত গান নেই, পুরোনো রেকর্ড প্লেয়ার দেখা গেছে কয়েকবার। জিন্দেগিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে গান লেখার লোকগুলো কমে আসছে, যেমন লিখতেন গুলজার– ‘অ্যায় জিন্দেগি গলে লাগালে, ম্যায়নে ভি তো তেরে হর এক গম কো গলে সে লাগায়া হ্যায়, হ্যায় না?’

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন