ছাই উড়িয়ে পাপ খুঁজতে খুঁজতে মাস্টারপিস বানিয়ে ফেললেন অরিন্দম শীল

0

প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী[/caption] ‘ধরা পড়লে ধনঞ্জয়, না পড়লে এনজয়’। এই কুৎসিত দু-লাইন ছড়িয়ে পড়েছিল সে সময়। এখনও ইতিউতি শোনা যায় কথাটা। রাজ্যের সরকারি দলের নেতা-মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ মানুষ যখন কোনো অপরাধীর ফাঁসির সাজা দ্রুত বলবৎ করার জন্য ময়দানে নেমে পড়েন, তখন বাজারে এ ধরনের ছড়া যে ঘুরবে, তাতে আর আশ্চর্য কি! তারপর নাটা মল্লিক। ফাঁসুড়ে এবং ফাঁসির দড়ি নিয়ে বাঙালির যাবতীয় কৌতূহল নিবৃত্ত করতে উঠে পড়ে লাগল সংবাদ মাধ্যম। এ সব অদূরের ইতিহাস অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ‘ধনঞ্জয়’ ছবিতে তুলে এনেছেন পরিচালক অরিন্দম শীল। এ সব করার মধ্য দিয়ে হয়তো তাঁর রাজনৈতিক শিবির বদলের ভিত্তিটা আরও একটু দৃঢ় করে ফেললেন তিনি। কারণ ওই ইতিহাসের সঙ্গে আরেকটি ঘটনাও সে সময় ঘটেছিল। মৃত্যুদণ্ড থাকা উচিত কি না, সেই বিতর্কটাও সমাজের অঙ্গনে দৃঢ়তার সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন রাজ্যের মানবাধিকার কর্মীরা। সেটা কিন্তু এই ছবিতে অনুল্লেখিত। আরও পড়ুন: ধনঞ্জয়ের ফাঁসির পুনর্তদন্তের আর্জি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সত্যি বলতে কি, তার প্রয়োজনও পড়েনি। কারণ, এই ছবিতে মিমি চক্রবর্তী ও কৌশিক সেনের উকিলের ভূমিকাটা দামিনি ছবির সানি দেওলের মতো নয়। আর্থ-সামাজিক কারণে সাজা পেতে চলা কোনো নিরপরাধীকে বাঁচিয়ে আনার কাজ তাঁদের ছিল না। এমনকি বিচার ব্যবস্থার কোনো ফাঁক, দুর্নীতি বা বৃহত্তর কোনো চক্রান্তের গল্পও বলতে চাননি পরিচালক। তিনি ছুঁতে চেয়েছেন আরও বৃহত্তর, আরও পরম এক সত্যকে। এবং হ্যাঁ, অরিন্দম শীল দুর্দান্ত ভাবে সফল হয়েছেন। কী সেই সত্য? যে সমাজে আমরা বাস করি, তার কাঠামোটাই এমন যে গরিব মানুষের বিচার পাওয়া সাধারণ প্রক্রিয়ায় অসম্ভব। সেই বিচারে তাঁর ফাঁসি হোক কিংবা অন্য কোনো শাস্তি। কারণ তাঁর পয়সা নেই। আর পয়সা ছাড়া ভালো উকিল জোটে না। সরকারি উকিলের একটা গল্প আছে বটে, কিন্তু সেটা এমনই যে তা নিয়ে চর্চা না করাই ভালো। পরিচালকও করেননি। আর অন্যদিকে রয়েছে সামাজিক ভাবে ক্ষমতাসীন শ্রেণি। প্রশাসন ও রাজনৈতিক জগতে যাদের যোগাযোগ অঢেল। নিজেদের বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস জোগাড় করতে খুব একটা কাঠখড় পোড়াতে হয় না তাঁদের। এই কাহিনিতে তাঁরা হয়তো গুজরাটি। কিন্তু তাঁরা বাঙালিও হতে পারেন। এবং সর্বোপরি শ্রেণিবিভক্ত সমাজের ভয়ঙ্কর নীরব হিংসার নিয়ম মেনে, ক্ষমতাসীনরা নিজেদের বাঁচাতে যে কোনো নিরালম্ব মানুষকে বলি করতে পারে। এক্ষেত্রে হয়তো যেমন করা হয়েছিল ধনঞ্জয় চ্যাটার্জিকে। পরিচালক সরাসরি সে কথা না বললেও ইঙ্গিত তেমনই দিয়েছেন। ছেলের ফাঁসির পর ধনঞ্জয়ের দরিদ্র ব্রাহ্মণ কালিভক্ত বাবাকে দিয়ে ইষ্টদেবতার উদ্দেশে বলিয়েছেন, “শালি, তুই বড়ো লোকের কালি”। অভিনন্দন জানাতে হয় চিত্রনাট্যকার পদ্মনাভ দাশগুপ্তকে। ১৪০ মিনিটের কোর্টরুম ড্রামাকে টানাটান ধরে রাখার প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন তিনি। সত্য আর ফিকশনের অনবদ্য মিশেলে মধ্যবিত্ত দর্শককে স্বাধীনতা দিবসের লং উইকএন্ডের বাজারে উপহার দিয়েছেন হাড়হিম করা বিনোদন। সেই বিনোদন তাঁরা যে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছেন, তার প্রমাণ মিলল স্বাধীনতা দিবসের ছুটির সকালে দক্ষিণ কলকাতার মাল্টিপ্লেক্সের হাউজফুল থিয়েটারে বসে। আরও পড়ুন: যে ছবি বক্স অফিসে চলবে সেটাই কমার্শিয়াল ছবি: মিমি এবং অভিনয়। ছবির চিত্রনাট্য জুড়ে রয়েছেন মিমি চক্রবর্তী। সেই সুযোগ তিনি সুদেআসলে তুলে নিয়েছেন। কৌশিক সেন ম্যানারিজম ভুলে দারুণ। ধনঞ্জয়ের বাবার চরিত্রে পরান বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমা পারেখের মায়ের চরিত্রে সুদীপ্তা চক্রবর্তী প্রত্যাশামতোই চমৎকার। ছোটো ছোটো চরিত্রে যারা অভিনয় করেছেন, প্রত্যেকেই অসম্ভব ভালো কাজ করেছেন। তবে আলাদা করে বলতে হয় ধনঞ্জয়ের চরিত্রে অনির্বাণ ভট্টাচার্যর কথা। নাট্য জগতের চেনামুখ অনির্বাণ কিছুদিন ধরেই সিনেমায় অভিনয় করছেন, টেলিভিশনেও দেখা যাচ্ছে তাঁকে। কিন্তু তাঁর প্রতিভার মাপটা পর্দার দর্শকরা করে উঠতে পারছিলেন না। সেদিন এবার ফুরলো। ধনঞ্জয়ের চরিত্রে তিনি এতটাই বিশ্বাসযোগ্য যে কোনো পুরস্কার না পেলে অবাক লাগবে। পুরস্কার প্রাপ্য মিমিরও। এবং অবশ্য ছবির পরিচালক-চিত্রনাট্যকারের। অরিন্দমের আগের ছবিগুলি বিনোদন কোশেন্টের নিরিখে ভালো নম্বর পেলেও, এ ছবিতে তিনি সে সব ছাড়িয়ে অনেকদূর চলে এসেছেন। তবু সব কিছুর শেষে, সেই সব মানবাধিকারকর্মীদের কথা মনে পড়ে। যারা ধনঞ্জয় ইস্যুতে একটা সামাজিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন। যারা জেরে, রাজ্য সরকারে পরিবর্তনের পর হলেও, আইএসআই-এর অধ্যাপকরা ধনঞ্জয়ের মামলাটি নিয়ে বই লিখলেন(যে বইয়ের ভিত্তিতেই নাকি এই ছবি তৈরি)। ছোটো আকারে হলেও, ধনঞ্জয়ের মামলাটি নতুন করে চালু করার দাবি পৌঁছল মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। আর কে জানে, সেই দাবির উত্তরেই হয়তো একটা মাস্টারপিস তৈরি হল। ছবি: এসএভি টুইটার পোস্ট এবং ইউটিউব থেকে নেওয়া]]>

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here