রজনীকান্তের রাজনৈতিক কেরিয়ার তৈরির ছলে ইতিহাসে জায়গা করে নিলেন ‘কালা’র পরিচালক

0
প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

সেই ছোটোবেলা থেকে রজনীকান্তকে নিয়ে কত না জোকস শুনেছি। পরে টিভির পর্দায় দেখেছি গ্যালারিতে পরচুল পরে বিগ বি-র পাশে প্রায় টাকমাথা, ক্যাজুয়াল তামিল সুপারস্টারকে। অবশেষে টিকিট কেটে সিনেমা হলে গিয়ে দেখা হল তাঁর সিনেমা। কিন্তু হায়! এ রজনীকান্ত তো শুধু সুপারস্টার নন, তিনি এখন রাজনৈতিক নেতা হওয়ার প্রত্যাশী। ভাগ্যিস! রজনীর সেই আকাঙ্ক্ষায় সাহায্য করতে গিয়ে ভারতের মেইনস্ট্রিম রাজনৈতিক সিনেমার ইতিহাসে জায়গা করে নিলেন পরিচালক পিএ রঞ্জিত। রজনীকান্তের মতো সুপারস্টারকে কাজে লাগিয়ে তিনি যে কাহিনিটি বললেন এবং যেভাবে বললেন, তা দেখে স্তব্ধ ও মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়।

অথচ এই গল্পটা বলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা ছিল একজন সুপারস্টারের উপস্থিতি। কিন্তু চিত্রনাট্যটি প্রায় নিখুঁত সাজিয়েছেন পরিচালক। তাতে রজনীর সুপারস্টার সুলভ উপস্থিতি আছে, অ্যাকশন দৃশ্য আছে আর আছে জনগণের উৎসব। যে উৎসবে কালো পোশাক পরা, ধুলো মাখা শ্রমজীবীর দলের উদ্‌যাপনে উদ্দাম পর্দা হঠাৎই টকটকে লাল হয়ে যায়। আবার কখনও নীল। বিপ্লবের কথা, দলিতদের স্বাধিকারের বার্তা যে স্পষ্টতার সঙ্গে এই ছবিতে পরিচালক উচ্চারণ করেছেন, তা ভোলার নয়।

মূল কাহিনিটি উচ্ছেদ বিরোধিতার। যেখানে প্রতিপক্ষ একটি রাজনৈতিক দল, যারা দেশকে স্বচ্ছ করতে চায়, রাম কর্তৃক রাবণের হত্যার কাহিনি যাদের ধর্মের পবিত্র বাণীসম, যার নেতা নানা পাটেকর সর্বদা সাদা পোশাক পরে থাকেন এবং কালো রং-কে ঘৃণা করেন। তাঁর স্বচ্ছতার এজেন্ডা কার্যকর করতে দেশের সবচেয়ে বড়ো বস্তি ধারাভি-কে উচ্ছেদ করতে চান নানা। যাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় কালা থুড়ি রজনীকান্ত। তারপর কাহিনি এগোয় বহু মৃত্যু, কালার ব্যক্তিগত ক্ষতি, জনগণের সচেতনতা ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। জনগণ জয়ী হয়।

কিন্তু সে সবের বাইরে একগাদা জরুরি কথা বলেছেন পরিচালক। এবং চিত্রনাট্য এতই চমৎকার যে কোনোটাই জ্ঞান দেওয়া বলে মনে হয়নি। যেমন, চেনা প্রোমোটারকে সরিয়ে আন্তর্জাতিক এনজিও-র মুখোশে বৃহৎ পুঁজির অনুপ্রবেশ। যা কিনা কালা বুঝতে পেরে নিজের প্রাক্তন প্রেমিকা ও একান্ত ভালবাসার মানুষ হুমা কুরেশির সঙ্গে দ্বন্দ্ব জড়িয়ে পড়ে। অথচ কালার ছোটো ছেলে লেনিন বুঝতে পারে না। কর্পোরেট চক্রান্তর ঘুঁটি হয়ে যায় সে। ছেলের সঙ্গে ঝগড়ার মুহূর্তে রজনী বলেন, ছেলের নামটা বিপ্লবীর নামে রাখাটাই তাঁর ভুল হয়েছে। শেষ অবধি অবশ্য লেনিন জনগণের পক্ষে দাঁড়ায়। নিজের পেশাটি যে আসলে জনগণের সেবার ভড়ং-এ তাঁদের ক্ষতি করে চলেছে, তা বোঝেন হুমাও।

যেমন নারীর ক্ষমতায়ন। এই সংক্রান্ত এক অসাধারণ দৃশ্য রচিত হয়েছে এই ছবিতে। লেনিনের প্রেমিকা পুয়াল(অঞ্জনা পাতিল)-কে পুলিশের দল যখন অপমান করার করতে মারধর করে প্যান্ট খুলে নেয়। তখন বিধ্বস্ত, কাদামাখা অঞ্জনা হামাগুড়ি দিয়ে প্যান্ট না কুড়িয়ে পাশে পড়ে থাকা লাঠি তুলে নিয়ে পুলিশকে আঘাত করে। সে নিজের জমি থেকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লড়ছে। এই লড়াইয়ের প্রতিপক্ষকে তাঁর যৌনতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ সে দেয় না।

পাশাপাশি এই ছবিতে বৃহৎ পুঁজির-রাজনৈতিক নেতাদের উন্নয়নের মডেলের বিপ্রতীপে জনগণের নিজস্ব উন্নয়নের যে মডেলটি বিবৃত করা হয়েছে, তাও অত্যন্ত জরুরি।

এবং ছবির গান। র‍্যাপ সঙ্গীতকে সন্তোষ নারায়ণন অসামান্য কায়দায় ব্যবহার করেছেন। জনগণের সঙ্গীতের ধারা যদি জনগণের উৎসবের সঙ্গী না হতে পারে, তবে আর লাভ কি!

অভিনয় ভাল করেছেন সকলেই, তবে সেরা অবশ্যই রজনীর স্ত্রীর ভূমিকায় ঈশ্বরী রাও।

সবই তো হল। কালা বানিয়ে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে তো ঢুকে গেলেন রঞ্জিত। কিন্তু রজনীকান্ত? ছবি মুক্তির কিছুদিন আগেই তিনি বলেছেন, তুতিকোরিনের আন্দোলনে সমাজবিরোধীরা যুক্ত ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ গুলি চালিয়ে ঠিক করেছে। এই অবস্থান নিয়ে তিনি যদি রাজনীতির ময়দানে পা রাখেন, তাহলে ‘কালা’ ছবির জেগে ওঠা জনতা কি তাঁকে ছেড়ে কথা বলবে? থালাইভার কী ভাবছেন?

------------------------------------------------
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.