তেরঙা প্রেমের দড়ি বেয়ে পার্সি ব্যবসায়ীকে হাঁটালেন বিশাল ভরদ্বাজ

0

prasenjitপ্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

হায়দার ছবিতে কাশ্মীরের পটভূমিকায় খুদে শহিদ কাপুরের চিকিৎসক বাবাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি কোন পক্ষে ? উত্তরে সেই মাঝবয়সি মানুষটি বলেছিলেন, ‘জীবনের পক্ষে’। আর ‘রেঙ্গুন’-এ পৌঁছে যুবক শহিদ বললেন, “বাইরের শত্রুকে চিনতে পারা যায়। কিন্তু ঘরের শত্রুকে চেনা যায় না”। সেখানেই না থেমে, জমাদার (নাকি ক্যাপ্টেন) নবাব মালিক বলে দিলেন, নিজের জীবনের চেয়ে দামি সেটাই, যার জন্য প্রাণ দেওয়া যায়। প্রতুলের গান যেন, ‘বেচো না বেচো না বন্ধু, তোমার চোখের মণি’।

ব্যস। আর কি বলব রেঙ্গুন ছবি নিয়ে। সিনেমা দেখে ঘরে ফিরে বিশাল ভরদ্বাজের ফিল্মোগ্রাফি দেখছিলাম উইকিপিডিয়ায়। যেহেতু সিনেমা জগতের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, তাই এসব মনে থাকার কথাও নয়। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, মাকড়ি থেকে হায়দার পর্যন্ত, তাঁর সবক’টি সিনেমাই আমার দেখা। মাকড়ি বাদে, বাকিগুলো রিলিজের অব্যবহিত পরে হলে গিয়ে। অতএব বলাই যায়, বিশাল ভরদ্বাজের আমি ফ্যান বটে। আমাদের প্রজন্মের অনেকের মতোই। আহা, গুলজার ছবি বানানো বন্ধ করার পর, তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে বিশালকেই তো পেয়ে গিয়েছিলাম আমরা বছর পনেরো আগে। অনুরাগ কাশ্যপরা বহু জরুরি ছবি বানানোর পরও আমাদেরই তো মনে হয়, বিশালের মতো সৃজনশীল কাজ হল কি ?


কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলের সুভাষ বোস প্রীতি মাথায় রেখেও সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের জয়গানে সামন্ততন্ত্রের তলোয়ারকে কেন্দ্রে রাখা, সে সবই তো বিশালের কাছে প্রত্যাশিত।


থাক সে সব ব্যক্তিগত(সমস্টিগতও?) কথা। মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট সিনেমা শুরুর আগে জাতীয় সঙ্গীত বাজানো বাধ্যতামূলক করা ও সিনেমার মাঝে জাতীয় সঙ্গীত বাজলে দাঁড়ানো বাধ্যতামূলক না করার পর এই প্রথম হলে গেলাম। ২ ঘণ্টা ৪৭ মিনিটের ছবি দেখতে। কিন্তু ‘মিনিট পনেরো কমানো যেত’ মার্কা ক্লিশেটা বলতে পারছি না। শাহিদ-কঙ্গনার ওই কাদায় মাখামাখি প্রেম ও চুম্বন এবং জাপানি সৈনিকের মতো সাবপ্লট ছাড়া পিরিয়ড পিস তৈরি হতে পারে না। তার ওপর পটভূমিকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ইংরেজ শাসন, আইএনএ আরও কত কি। এ সবের মাঝেই বিবাহিত পার্সি ফিল্ম প্রযোজক রুশি বিলিমোরিয়ার কাছ থেকে পাওয়া জীবন নিয়ে গদগদ মিস জুলিয়া হঠাৎ একদিন জানতে পারলেন, জীবনের মানে বোঝানোর জন্য আসলে অন্য একজনকে দরকার ছিল তাঁর। এবং তাঁকে তিনি পেয়ে গিয়েছেন।

rangoon

দুটো ভারী প্রাকৃতিক সম্পর্ক একসঙ্গে বোনার ঝুঁকি নিয়েছিলেন বিশাল ভরদ্বাজ। ১৪ বছর বয়সে ‘কিনে আনা এক বেজন্মা’ মেয়ের সঙ্গে তাঁর মেন্টরের কথায় কথায় ‘কোলে বসার’ যৌনপ্রেম আর এক যুবক-যুবতীর কাদায় মাখামাখি শরীরি প্রেম। বিশাল কতটা ভাল পেরেছেন, তার চেয়েও বড়ো কথা কঙ্গনা রানাওয়াত ফাটিয়ে দিয়েছেন দ্বন্দ্বময় অভিনেত্রীর চরিত্রে। তিনিই এই ছবির স্টার। নারীবাদের যাবতীয় ভারতীয়ত্বকে করতলে নিয়ে মিস জুলিয়াই এ ছবির বচ্চন, তিনিই খান। 

শহিদ কাপুর তাঁর বাবার ছেলে। তাঁর চরিত্র অনুযায়ী ম্যানারিজমবিহীন অভিনয়, সব সিনেমাতেই প্রশংসার দাবি রাখে। রেঙ্গুনও তার ব্যতিক্রম নয়।  

ওমকারার ‘ল্যাংরা ত্যাগী’ বরং এ ছবিতে কিছুটা নিষ্প্রভ। পার্সি ফিল্ম প্রযোজক ও জুলিয়ার প্রেমে পাগল বিবাহিত পুরুষের চরিত্রে সেফ আলি খানের অভিনয় যেন কিছুটা একটেরে।

বিশালের ছবিতে তাঁর গান কখনও সম্পদ, কখনও বোঝা। এ ছবিতে মিলিয়ে মিশিয়ে।

ভায়োলেন্স আর শ্রেণির গল্প বলিউডে কিছু কম হয়নি। তবু রেঙ্গুনের মতো ‘ওয়ার মুভি’ মনে পড়ে না। হিংসা দেখানোর ক্ষেত্রেও কোনো বোঝাপড়া করা হয়নি। প্রতিটি শ্রেণি, তার দোদুল্যমানতা এখানে উপস্থিত স্বরূপে, এমনকি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের জেরে তাদের বেসামাল পরিবর্তনগুলিও। অধুনা কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলের সুভাষ বোস প্রীতি মাথায় রেখেও সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের জয়গানে সামন্ততন্ত্রের তলোয়ারকে কেন্দ্রে রাখা, সে সবই তো বিশালের কাছে প্রত্যাশিত। রূপকের পর্দা সরিয়ে হায়দার এবং রেঙ্গুনে তিনি বরং অনেক সরাসরি। কিন্তু যাবতীয় জরুরি কথা বলতে বারবার প্রেমঘটিত সম্পর্কের সাহায্য নেওয়াটা কখনও কখনও যেন সীমাবদ্ধতা বলেই মনে হয়। রেঙ্গুনের বিশাল ক্যানভাস, সিনেমাটোগ্রাফি, ক্যামেরা, অতিনাটকীয়তার শক্তিশালী চমক বিশালকে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডের গণ্ডি পার করে দিতেও পারে। কিন্তু আমরা, যারা নানা ছবি দেখতে দেখতেও বিশালের খবর রাখতে থাকি নিয়ত, তাদের পক্ষ থেকে কিছু না বললে রিভিউ তো সম্পূর্ণ হয় না। এই আর কি…   

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.