prasenjitপ্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

দু-একটা খুন করে, গালে কাকা জুলফিকারের মতো চাপ দাড়ি লাগিয়ে আর নুসরতের সঙ্গে শুয়ে হঠাৎ ‘অ্যাডাল্ট’ হয়ে যাওয়া অঙ্কুশ কি পারবেন ওই বিশাল রাজ্যপাট সামলাতে ? হাতে তো শুধু রোগা-পাতলা কাঞ্চন। টলিউডের প্রথম গ্যাংওয়ার মুভি দেখে, মাঝেমধ্যে হাততালি দিয়ে হল থেকে বেরিয়ে আসার সময় খানিক চিন্তায় পড়ে যান বাঙালি দর্শক। নেহাতই পথে তখন পুজো হপিং-এর ভিড় আর কানে মণ্ডপ থেকে ভেসে আসা ভদ্রলোকের সাংস্কৃতিক সানাই, তাই চিন্তাটা জায়গা করতে পারে না। টিকিটের দাম তো মোটের ওপর উসুল, শুধু যদি কোনও এক ‘ঝিঙ্কু মামনি’-র শরীরি বিভঙ্গে একটা ‘বিল্লো রানি’ বা ‘বিড়ি জালাইলে’ থাকতো,  বাঙালির কোনও আফশোস থাকতো না ২০১৬ সালের শারোদৎসবে। থাকলে কীই বা ক্ষতি হতো ‘ক্লাস’-এর হ্যাংওভার কাটিয়ে পুরোপুরি ‘মাস’-এর পরিচালক হতে চাওয়া বঙ্গজীবনের অঙ্গ সৃজিত মুখার্জির! অনসম্বল কাস্টে আর একটা নাম বাড়তো। ক্ষমতার দেনা-পাওনার গল্পে একটি বার কাম রেস্তোরাঁ-র উপস্থিতি তো ছিলই।   

জুলফিকারে সৃজিত যা যা দেখিয়েছেন, তাঁর নেওটা বড়ো সংখ্যক আরবান দর্শক সে সবের অনেক কুশলী রূপায়ণ দেখেছেন বলিউডের ছবিতে কিংবা হলিউডে। তবু এ ছবি হিট হবে, কারণ শুধু শহুরে দর্শকদের ভরসায় এবার আর সৃজিত থাকেননি। বাংলায় এমন অ্যাকশন মুভি এই প্রথম। ২ ঘণ্টা ১৯ মিনিটের বাউন্ডারিতে ঢুকিয়েছেন যত সম্ভব জনপ্রিয়তার মশলা। সঙ্গে প্রেম, যৌনতা ও ক্ষমতা-কাঠামোর ভাঙা-গড়া(সৌজন্য: এক ব্রিটিশ নাট্যকার), তা সে লড়াই যত ছদ্মই হোক। ছদ্ম, কারণ, সিন্ডিকেটের লড়াইয়ে গোলাগুলি-মৃত্যু সবই তো ঘটে-ঘটেছে রাজারহাটে বা অন্য কোনওখানে। সিন্ডিকেট যে আসলে মানুষের ভালো চায়, সেই তত্ত্বও বারবার নামিয়েছেন সেখানকার জন প্রতিনিধি। অথচ, নানারকম ভারসাম্যের খেলা খেলে পরিচালক গল্পটাকে বন্দরে এনে ফেলেছেন। তাতে, জুলফিকারকে বসিরের গুলি চালানোর সময়, বসিরকে দিয়ে “জয়হিন্দ” বলিয়েছেন। সেই কবে, সারফারোস ছবিতে আমরা ‘ভালো মুসলমান’-রূপী ইন্সপেক্টর সেলিমকে দেখেছিলাম। সেই থেকে বহমান চক্করটি থেকে যে বাইশে শ্রাবণ, চতুষ্কোণের পরিচালকেরও বেরোনোর উপায় নেই, তা জুলফিকার না দেখলে জানা যেতো না। বেরোবেনই বা কেন, বন্দর এলাকার অত অত নয়নাভিরাম দৃশ্য তাঁকে শ্যুট করাতে হয়েছে সৌমিক হালদারকে দিয়ে। হাওড়া ব্রিজের অসাধারণ দৃশ্যায়নে বাঙালিকে কৃতার্থ করেছেন। এনকাউন্টারও চলেছে জম্পেশ। শঙ্খচিল ছবিতে গৌতম ঘোষ প্রতীকী অর্থে বারবার বাইক রেসিং দেখালেও, এই ছবিতে সৃজিত দুই প্রধান চরিত্রকে বাইকের লড়াইতে নামিয়েছেন। পাঠকের যদি সাম্বিয়া সোহরাবের অডি গাড়িটার কথা মনে পড়ে, কর্তৃপক্ষ দায়ী হবে না। কিন্তু, অনেক অপেক্ষাতেও সুজেট জর্ডন আর কাদের খানকে পাওয়া যায়নি। রানি তলাপাত্রের আশেপাশে তাদের ছায়া আর নেই হয়তো। ক্ষমতা-কাঠামো নিয়ে জনগণের বাংলা ছবির এমন নিয়তি হওয়াই তো স্বাভাবিক। যেমন স্বাভাবিক, ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত যৌনতার অমন রোমান্টিক দৃশ্যায়ন। বুম্বাদার সঙ্গে তার চেনা বিষাদগণিকার যৌনতা যদি অভ্যেসও হয়ে গিয়ে থাকে, তরুণ তুর্কি অঙ্কুশ কী দোষ করলেন! ভারসাম্যের খেলায় এরোটিসিজম-কেও আপাতত বাদই রেখেছেন সৃজিত।

ইন্টারভ্যালের একটু পরেই জুলফিকার রূপী জুলিয়াস সিজার খুন হয়ে যান। মানে, খুনিদের কাছে তিনি কতটা বিপজ্জনক হয়ে গিয়েছিলেন, তা সিনেম্যাটিকালি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসযোগ্য না হতেই দর্শক জেনে ফেলেন খুনিদের সংকট, সিদ্ধান্ত ও পরিণতি।  তাতে অবশ্য তেমন খারাপ কিছু হয়নি। প্রসেনজিতের দ্রুত মৃত্যু যে, যেকোনও ছবির পক্ষে ভাল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পরমব্রত যে আপ্রাণ চেষ্টা করেও আদ্যন্ত মিডিওকার থেকে যাবেন, তা এতদিনে প্রমাণিত। যিশু তো ভালই করছেন আজকাল, এখানেও তাই। একই কথা রাহুলের সম্পর্কেও খাটে। কৌশিক সেন বেশ ভাল। তবে কথা না কয়ে অভিনয়ে ফাটিয়ে দিয়েছেন দেব। যে সব দর্শক অ্যান্টনি থুরি মার্কাসের না বলা কথা শুনতে না পেয়ে মন খারাপ করলেন, তারাই যদি দেবের পরের যে কোনও একটি কথা বলা ছবি দেখেন, সাংসদের কাছে নির্বাক ছবির দিন ফেরানোর দাবি করবেন কি তাঁরা ? 

তবে, এতকিছুর পরেও নবারুণকে ধার করে বলতে মন চায়, বাঙালি বড় ‘অসহায়’। সিনেমা শেষের পর যে তরুণ-তরুণীদের অভিনেতাদের নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করতে শুনি, তারা কল্পনা করতে পারেনা, যিশুর চরিত্রটি উৎপল দত্ত করলে কেমন হত বা কৌশিকের ভূমিকায় অঞ্জন দত্ত। উর্দু উচ্চারণে যে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে কৌশিক ছবিটা শুরু করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতা থাকেনি। পরমব্রতর চরিত্রের অকারণ ইংরিজির দায় অভিনেতার নয় বটে, কিন্তু অ্যাংলো-র বাংলা ও ইংরাজি উচ্চারণ ঠিকঠাক করতে গেলে যে ন্যূনতম পরিশ্রম করা দরকার, তা মনে হয় এদের প্রয়োজন নেই। তাছাড়া, সৃজিত-মুগ্ধ বাঙালির হয়তো শেক্সপিয়রের অনুষঙ্গেও মনে পড়ে যায় না, বিশাল ভরদ্বাজের ওমকারা কিংবা মকবুলের কোনও কোনও দৃশ্য।

এবং নুসরত জাহান। ‘সরকার পাল্টালে চাকরির হাত বদল হয়, জমির হাত বদল হয়’, দাড়িওয়ালা এক জার্মান দেড়শো বছর আগেই তো লিখে গিয়েছিলেন এ কথা। নুসরতও হয়ে যান বেঁচে থাকার স্বার্থে। তবু তো তিনি মানিকের কুসুম নন। ক্লিওপেট্রার মতো তাঁরও মন আছে। অতএব প্রেমাস্পদের মৃত্যুর যন্ত্রণা না বইতে পেরে বড়ো কষ্টের আত্মঘাত ডেকে আনেন তিনি। না হলে হয়তো ভালই হত। যৌবনে পৌঁছেই সাম্রাজ্য পেয়ে যাওয়া অঙ্কুশকে হয়তো রূপের বিস্ফোরণে আটকে রাখতে পারতেন রানি তলাপাত্র। কিন্তু ভারসাম্যটা খামোকা নষ্ট করবেন কেন পরিচালক। বাঙালি দর্শকের অভিশাপের অস্বস্তি নুসরতের যে প্রাপ্য নয়, তা তো সৃজিত জানেনই। তাছাড়া তাঁর তো ঢাল আছেই। শেক্সপিয়র।

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন