কিরীটি ও কালো ভ্রমর: বাংলা রহস্য সিনেমার অন্ধকার যাত্রা

0

chiranjib-paulচিরঞ্জীব পাল

কিরীটি অমনিবাসের প্রথম খণ্ডের মুখবন্ধে কিরীটির পরিচয় দিতে গিয়ে প্রমথনাথ বিশী লিখছেন, “কিরীটি রায় রোমাঞ্চ-অন্বেষী কিশোর মনের চিরন্তন নায়ক”। কিরীটির গল্পে রহস্যের চেয়ে রোমাঞ্চই বেশি। নিজের সৃষ্ট গোয়েন্দাচরিত্রকে সে ভাবেই আলাদা করতে চেয়েছেন নীহাররঞ্জন গুপ্ত।

বই পড়ে সিনেমা দেখতে যাওয়ার কোনও মানে নেই। সাহিত্য আর সিনেমা দুটো আলাদা মাধ্যম। দুটো আলাদা ভাবে পাঠ করতে হয়। তবে, সাহিত্যের কোনও চরিত্রকে নিয়ে ছবি তৈরি হলে দর্শক তা মিলিয়ে দেখবেন, সেটাই স্বাভাবিক। তবু ‘কিরীটি ও কালো ভ্রমর’ দেখতে ঢোকার আগে মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলাম, তুলনার মধ্যে যাব না। সিনেমার মতোই পাঠ করব।

বেরিয়ে এলাম প্রচণ্ড হতাশা আর মনে অজস্র প্রশ্ন নিয়ে। ‘কিরীটি ও কালো ভ্রমর’ ছবিতে না আছে রহস্য, না রোমাঞ্চ। তীব্র মিউজিকের ঝঙ্কারে রোমাঞ্চ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। মিউজিক বন্ধ হলেই সব রোমাঞ্চ মুহূর্তে উবে গেছে। দুর্বল চিত্রনাট্যের কারণে মনে হয়েছে অনর্গল কিছু কথা বলে যাওয়া হচ্ছে। অথচ চিত্রনাট্য লিখেছেন ‘বদলাপুর’, ‘এজেন্ট বিনোদ’ ছবির চিত্রনাট্যকার অরিজিৎ বিশ্বাস।

টলিউডে এখন রহস্যগল্প থেকে ছবি তৈরির ঢল নেমেছে। সত্যজিত রায়ের তৈরি ফেলুদা বা ব্যোমকেশের কথা না হয় বাদ দিলাম, চলতি গোয়েন্দা সিরিজের ছবিগুলোর কয়েকটি তো বেশ ভালো হয়েছে। এত দিন অধরা ছিল নীহাররঞ্জন গুপ্তের কিরীটি। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবে প্রত্যাশার পারদ একটু উঁচুতেই থাকবে। কিন্তু পরিচালক অনিন্দ্যবিকাশ দত্ত সেই প্রত্যাশায় জল ঢেলে দিলেন।  

পাঠক হয়তো কিরীটি সিরিজ পড়ে থাকবেন। তিনটে গল্পকে মিশিয়ে তৈরি হয়েছে এ ছবির চিত্রনাট্য। গল্পে কালো ভ্রমর একজন গ্যাংস্টার, ওষুধ মাফিয়া, সিরিয়াল কিলার। তাকে ধরার দায়িত্ব পায় কিরীটি। আসলে কালো ভ্রমর পেশায় একজন চিকিৎসক। রহস্য ভেদ করে তা ধরে ফেলে কিরীটি। কালো ভ্রমরের সিরিয়াল কিলার হয়ে ওঠার পেছনে একটা ইতিহাস আছে। ডাঃ সান্যাল ওরফে কালো ভ্রমরের বাবার সঙ্গে প্রতারণা করে তাঁর তিন বন্ধু। দেনার দায়ে জর্জরিত তার বাবা আত্মহত্যা করে। সেই থেকে ছেলের মনে প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি হয়। বড়ো হয়ে সে নামী চিকিৎসক হয়। প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা থেকেই সে হয়ে ওঠে কালো ভ্রমর। কালো ভ্রমরকে ধরে ফেলে কিরীটি। তার সঙ্গে এনকাউন্টার হয়। আহত অবস্থায় কালো ভ্রমর ঝাঁপ দেয় নদীতে।

সত্তর দশকে লেখা গল্পকে সমসাময়িক করতে চেয়েছেন পরিচালক। সেখানেও ঘেঁটে ফেলেছেন। মোবাইল টাওয়ার লোকেশন ধরে কালো ভ্রমরকে ট্র্যাক করা বা গুগুল নামক ‘সিধু জ্যাঠা’-র সাহায্যে তথ্য বার করা, সব কিছুই রয়েছে। কিন্তু কালো ভ্রমর যদি বর্তমান সময়ের গ্যাংস্টার হয় তবে তার ধরনধারণ তো একেবারে অন্য রকম হবে। তার বিন্দুমাত্র নমুনাও মেলেনি ছবিতে। যখন পুলিশ রেড করছে কালো ভ্রমরের বিভিন্ন গুদামে, তখন দেখা যাচ্ছে একটি ‘ছিঁচকে’ চোর মার্কা লোককে ধাক্কা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছবিতে কৃষ্ণার সঙ্গে কিরীটির প্রেমও জোর করে চাপিয়ে দেওয়া মনে হয়েছে।

ছবির শেষে দেখা যাচ্ছে কালো ভ্রমর ভালো হয়ে গিয়েছে। সে বিহারের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে চার্চের ফাদার। কাগজে দুটি জঙ্গি খুনের খবর এবং খুনের  পদ্ধতি জেনে কিরীটি বুঝতে পারে কালো ভ্রমর বেঁচে আছে। খুঁজে বার করে তাকে। কিরীটির ফের মোলাকাত হয় কালো ভ্রমরের সঙ্গে। কালো ভ্রমর জানায় জঙ্গিদের হাত থেকে চার্চের শিশুদের বাঁচাতে সে ফের অস্ত্র ধরেছে। জঙ্গিরা নাকি শিশুদের ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে চেয়েছিল। এই জঙ্গি কারা? মাওবাদীরা। না, পরিচালক বলেনি। কিন্তু যে ভাবে মুখে গামছা বাঁধা প্রতীকী জঙ্গি দেখিয়েছেন তাতে কারও বুঝতে অসুবিধা হয় না ওরা কারা। কালো ভ্রমরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে কিরীটি। জঙ্গিদের গুলিতে মারা যায় কালো ভ্রমর। এক নয় একাধিক গুলি। গুলির পর গুলি। কালো ভ্রমর মহান হয় মাওবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। কালো ভ্রমরকে মহান করার এর চেয়ে প্রাসঙ্গিক পদ্ধতি আর কী বা হতে পারে? আর যুদ্ধ? পাড়ার যাত্রাপালার যুদ্ধকে হার মানাবে।

ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত, কৌশিক সেন তাঁদের দক্ষতা মতোই অভিনয় করেছেন। কিন্তু শেষবেলায় সিনেমা তো ‘ডিরেক্টরস মিডিয়া’। তাই সব মিলিয়ে বড্ড কাঁচা কাজ হয়েছে ‘কিরীটি ও কালো ভ্রমর’। ছবিতে ব্যবহৃত গানগুলোও বড্ড বেমানান। এই ছবিকে বাংলা রহস্য সিনেমার ইতিহাসে তালিবানি হামলাও বলতে পারেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.