সমালোচনা, প্রশংসা ও প্রশ্নের আঙ্গিকে মঞ্চে মোহনদাসকে খোঁজার ঋজু প্রয়াস

0
পিনাকিপ্রসাদ ভট্টাচার্য

দু’ ঘণ্টায় যা দেখলাম এবং শুনলাম, তাতে মনে হয়েছে উপাদান সংগ্রহে, সংলাপ রচনায়, কোরিওগ্রাফিতে, শব্দে, যন্ত্রে এবং টেকনিকে একটা নতুন কিছু দেখলাম। আমাদের দেশে এ জিনিস হয়নি। কোনো মনীষীকে দেখানো কঠিন বই-কি। কোনো মনীষীর সবটুকু দেখানো যায় না। দেখাতে গেলেই তাঁর জীবনের দুঃসাহসী বা রোম্যান্টিক জীবনের বা জীবনযাপনের স্রোতকে খপ করে ধরে নিয়ে মনহারানো বা নয়নভুলানো একটি নাতিদীর্ঘ শীলনির্ভর ছবি হয়ে যাবে। ‘বাপু মহাত্মা মোহনদাস’ নাটকের নাট্যকার ও নির্দেশক সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায় গান্ধীজিকে নিয়েছেন প্রায় ২০ বছর বয়স থেকে, কৈশোরকে বাদ দিয়েছেন – যেখানে গান্ধীজিকে নিয়ে শয়ে শয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নির্দেশক ভালোই করেছেন। গান্ধীজিকে ধরেছেন ‘God is Truth’-এর প্রবক্তা হিসাবে নয়, গান্ধীজিকে দেখেছেন যখন তিনি ইট কাঠ পাথরের সমস্ত বাস্তবতাকে ঈশ্বর মনে করছেন। না হলে সমাজজীবনে, রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশকে তিনি যাচাই করবেন কী ভাবে? অর্থাৎ বাস্তবতাই ঈশ্বর – Truth is God থেকে। ‘আত্মনো মোক্ষার্থম জগদ্ধিতায়’ আদর্শের একটা বড়ো রূপ। বনে বা একান্ত নির্জনে নয়, নির্যাতিত মানুষের মধ্যেই ‘হরিদর্শন’, এখান থেকেই তাঁর আশ্রমজীবন শুরু।

গান্ধীজিকে দেখিয়েছেন, তাঁর পারিবারিক জীবন এনেছেন, কস্তুরবা, সরলা ও দূরের এবং কাছের সেবিকাদের সুমিত্র নিয়ে এসেছেন তাঁর পরিবারকে, বলেছেন তাঁর অন্দরমহলের কথা। দেখিয়েছেন গান্ধীজি যখন মহাত্মা হয়েছেন, তখনও তাঁর বড়ো ছেলে মত্ত অবস্থায় বাবাকে তিরস্কার করতে করতে বলছেন – ছিঃ ছিঃ, তুমি মহাত্মা হয়েছ। কস্তুরবার কথাবার্তায়ও সাংসারিক জীবনের শান্তির কথা ছিল না। সাংসারিক দায়দায়িত্ব পরিচালনায় স্বামীকে সব সময় না পাওয়ার উষ্মাও প্রকাশিত হয়েছে। মা হয়ে ছেলেকে মানুষ করতে না পারার ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে তাঁর মুখে। বেশ করেছেন কথাগুলো প্রকাশ করে। যা ঘটেছে, যা সত্য, তা প্রকাশ করায় ক্ষতি কী? গান্ধীজির আত্মজীবনী অথবা লুই ফিশারের লেখা বইয়েও তো এগুলো স্বীকৃত হয়েছে দ্ব্যর্থহীন ভাষায়। আসলে সত্য ঘটনা তা যদি প্রকাশিত না হয়, তা হলে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে অনেক অতিরঞ্জিত অপ্রাসঙ্গিক তথ্য এসে সত্যের গলা চেপে ধরে। স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে, নেতাজির জীবনসংগ্রাম নিয়্‌ স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়কালে আরএসএস-এর ভূমিকা নিয়ে সত্য প্রকাশিত হয়নি। তাই তা পল্লবিত হওয়ার সুযোগ ছড়াচ্ছে। সত্যকে হত্যা করে অসত্যকে প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠার অপপ্রয়াস এখন ইতিহাসের পাতা ভর্তি করছে। সে জায়গায় দাঁড়িয়ে এই প্রয়াস অভিনন্দনযোগ্য। নির্দেশক ১৯১৫ থেকে ১৯৪৮ সালে মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত গান্ধীজিকে দেখিয়েছেন আশ্রমের পরিসরকে ভিত্তি করে। মোহনকে দেখিয়েছেন তাঁর পরিবারে, মহাত্মাকে দেখিয়েছেন তাঁর সংগ্রামে, বাপুকে দেখিয়েছেন তাঁর আশ্রমে। তাঁর আদর্শের পতাকা উড়িয়েছেন তাঁর আশ্রমে। ‘মোহন’ এবং ‘মহাত্মা’, সব এসে মিলেছে ‘বাপু’র সেবাশ্রমে। তাই আমার ভালো লেগেছে। অনেক টুকরো টুকরো ‘মোহন’ আর ‘মহাত্মা’কে নিয়ে এসে একটা বাপুর সমগ্রতায় গান্ধীজিকে বিচার করেছেন। এ ভাবেই কোনো ব্যক্তিত্বের সমগ্রতাকে চিনতে হয় – কোনো এক জন রাষ্ট্রনেতার প্রতি অমলিন শ্রদ্ধা অর্পণ অথবা তীব্র আক্রমণ বা ব্যঙ্গ বিদ্রূপের মধ্যে দিয়ে নয়। আমি তো পাতার পর পাতা নিবিষ্ট অধ্যয়নে দিনরাত কাটিয়েছি গান্ধীজিকে নিয়ে। মনে হয়েছে আমার চিন্তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াগুলো যেন অসমাপ্ত থেকে গিয়েছে।

এই নাটকের দু’টো সংলাপ আমার মন কেড়েছে। ‘স্বরাজ এখন আর বাপুর কাছে যায় না’, আর ‘আমার মৃত্যুর পরে তোমার হাতে বোনা খদ্দরের ধুতি আমায় পরিয়ে দিও’। নাট্যকার কী বলে ফেলেছেন জানেন? আমরা প্রতি মুহূর্তে গান্ধীজিকে হত্যা করে চলেছি। এবং তারও কারণ হচ্ছে আমরা নিছক পূজার ছলে তাঁকে ভুলেই আছি।

নির্দেশক তাঁর নির্দেশনায় কখনও কোনো বক্তব্যকে সিদ্ধান্ত হিসাবে উপস্থাপিত করেননি। গান্ধী-ঘনিষ্ঠ সাংবাদিককে দিয়ে Truth is God, গান্ধীর এই দর্শনটিকে যেমন উপস্থাপিত করেছেন, তেমনি ড. আম্বেদকরের এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের মুখ দিয়ে তাঁর দর্শনটিকে ভণ্ডামি বলেও শানিত বাক্যবাণ নিক্ষেপ করতে দ্বিধা করেননি। বেশ তো? তাতে ক্ষতি কোথায়? ভ্রান্তিতে, মাৎস,র্যে স্খলিত আদর্শে এবং সংগ্রামী নির্দেশনার কঠোরতম দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেললে তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা কি কমে যাবে? বরং বাস্তবতায় পরিশ্রুত হয়ে তা আরও গভীর হবে। শ্রদ্ধা আর অশ্রদ্ধা মিশ্রিত সংশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে তুলাদণ্ডে শ্রদ্ধার দিকটিই উন্নত থাকবে।

আরেকটি দিকে নাটকটির প্রশংসা না করে পারছি না। সবাই তো ভাবছিল এই বার গান্ধীজি আসবেন। অভিযোগের আঙুল তুলে যাঁরা গান্ধীজির সমালোচনা করছিলেন তিনি তাঁদের এক এক করে জবাব দেবেন। কিন্তু সমগ্র নাটকে জীবিত গান্ধীজি কখনও স্বশরীরে মঞ্চে অবতীর্ণ হননি। তার জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে ছবি। গান্ধীজি সাম্প্রদায়িক মিলনে নেই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকায় নেই, দৈনন্দিন পারিবারিক সমস্যায় নেই, সেবিকাদের ভালোবাসায় নেই, কস্তুরবার চোখের জলেও নেই। ওই যে প্রথম পর্দা উঠেছিল যে প্রার্থনাসংগীত দিয়ে তিনি সেই ‘রাজা রামের’ কাছে, ‘পতিতপাবনের’ কাছেই আছেন। এবং চিরকাল থাকবেন। মঞ্চে প্রদর্শিত ঘটনার মালিন্যে তিনি আর আসবেন না।

ভালোই করেছেন। আরও ভালো হত অনেক দিন পর্যন্ত বেঁচেছিলেন যে ধাইমা রম্ভা তাঁকে যদি নির্দেশক কুশীলবদের এক জন করে নিতেন এবং গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠে একবার ‘হে রাম’ শব্দটি উচ্চারিত হত।

ছবি: অভিজিত দাশগুপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.