ছোটন দত্ত গুপ্ত

সময়টা অদ্ভুত, একসময় ছাত্র থেকে নাট্যকর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়ত কৃষক-শ্রমিক  ও খাদ্য আন্দোলনে(এখন খাদ্যমেলায় ঝাঁপায়)। সেই আদর্শ থেকেই গণসংগীত– গণনাট্য গড়ে উঠেছিল। তখন আজকের মতো নাট্য প্রযোজনা এত গোছান ছিল না, ফান্ডও তেমন মিলত না নাট্য কর্মীদের হাতে। তবুও প্রান্তিক মানুষের কথা ভেবেই নাটক-গান হত। আজ পরিকল্পিত, দেখার মত গোছান সব বড় বড় দল। বিশাল ব্যানার, বিজ্ঞাপন। তবুও নাটকের বেশিরভাগ বিষয় মানুষের অবাঞ্ছিত কচকচানি বা সস্তা প্রেম। আঙ্গিকে, লাঠিখেলা-গানের বিরক্তিকর ব্যবহার(আমি গান জানি, লাঠিখেলা জানি, নাটকে থাকবেই। নাটকের সঙ্গে যাক বা না যাক। শুধু কেওয়াস)। আবার, কোনো কোনো দল মানুষের নাটক একটু ছুঁলেও আঙ্গিকের (না জানা)মাতব্বরিতে দর্শক কে হল থেকে বেড়িয়ে বলতে শুনেছি, পরিচালক ‘টর্চার’ করছেন। দর্শক কিন্তু ভাল নাটক খুঁজছে। এটা ঠিক, অনেক অজানা নাটকের দল উন্নতমানের কাজ করছে। আর্থিক কারণে আমরা জানতে পারছি না।

এরকমই ভাল নাটক খুঁজতে গিয়ে ‘চার অক্ষর’ নাটকটি দেখলাম। এরকম সাহসী প্রযোজনা এই সময় বিরল। ছোটো দল(মাথায় না), কোন ফান্ড নেয় না। নাটক করছে প্রান্তিক মানুষকে নিয়ে। এই প্রান্তিক মানুষটি(গোপাল)‘গণতন্ত্র’ কী তা জানে না, তাকে পুলিশ সন্দহের বশে ধরে অমানবিক অত্যাচার করতে থাকে। আর বলে ‘স্যার এরা ‘গণতন্ত্র’-এর পক্ষে বিপদজনক। এরা ‘গণতন্ত্র’-এর পক্ষে ক্ষতিকারক।

গোপাল(আস্তিক)।। ‘গণতন্ত্র’ কে! আমি তার ক্ষতি করিনি।

পুলিশ।। নাম বল?

গোপাল(আস্তিক)।। গো…পা…ল।

পুলিশ।। এটা তোর আসল নাম নয়-নাম বল?

এইভাবেই নাটকের বিষয়-আঙ্গিক এর মাধ্যমে নাটক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক-সামাজিক–সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মুখ তুলে ধরে। কিভাবে প্রতিষ্ঠান তার রং পাল্টে মানুষকে একই ভাবে শোষণ করছে এই নাটক তাই দেখায়।

‘যাদবপুর ব্যতিক্রম’ প্রযোজিত মণি মুখোপাধ্যায়ের ‘গণতন্ত্র ও গোপাল কাহার’ গল্প  অবলম্বনে ‘চার অক্ষর’ নাটক এই সময়ের সাহসী প্রয়াস। পরিচালক দেবা রায় দক্ষতা ও সাহসের সঙ্গে পরিচালনা করেছেন। এ নাটক প্রান্তিক, দল প্রান্তিক এবং কলাকুশলীরাও প্রান্তিক। মূখ্য চরিত্রে আস্তিক কুমার নাইয়া গোপালের ভুমিকায় অভিনয় করেছেন। অভিনয়ে অনবদ্য। না দেখলে বিশ্বাস হবে না। আস্তিক কুমার নাইয়া জাতীয়স্তরের অভিনেতাদের সঙ্গে আলোচিত হবার যোগ্য। যদিও স্নাতক আস্তিক কুমার নাইয়া বারুইপুরে আখের রস বিক্রি করেন, প্রান্তিক মানুষ। সেই ভেবে যদি নাক-সিঁটকান তবে কিছু বলার নেই। গোপালের বউ-এর ভুমিকায় সুতপা দত্ত বেশ ভাল, কিন্তু মেকআপে এর ঘাটতি আছে। ওসি দিগম্বরের ভুমিকায়  অরুণ কুমার অধিকারী একদম ঠিকঠাক। এস আই মল্লিকের চরিত্রে বরুণ কয়াল প্রাণবন্ত। বরুণ কয়াল বাস্তবে জীবিকায় অটো চালক। তিনমাস ধরে মায়না না পাওয়া কর্মী সঞ্চয়ন ঘোষ, কাগজ কুড়ুনির ভূমিকায় চোখে পড়ার মত। এছাড়াও নান্টু মোল্লা (সঞ্জয় দত্ত), গোবিন্দ মাষ্টার (তপন কুমার দাস)এদের সবার অভিনয় ‘চার অক্ষর’ নাটককে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

তবে আলোর ব্যবহার আরও ভাল করার প্রয়োজন। আবহের ব্যবহারে একটু সম্পাদনার দরকার। কিছু অগোছাল জায়গা আছে, সেটা হয়ত আর্থিক কারণে তবে তা আরও কিছু শো হবার পর হয়তো ঠিক হয়ে যাবে।

ছবি সৌজন্য: যাদবপুর ব্যতিক্রম

1 মন্তব্য

  1. যাদবপুর ব্যতিক্রমের পক্ষ থেকে খবর অনলাইন ডট কম কে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আমাদের নাট্যচর্চার পাশে থাকার জন্য। চার অক্ষর নাটকটি নিয়ে ছোটন দত্ত গুপ্তের সামালোচনাইয় আমরা আপ্লুত। ধন্যবাদ।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here