‘কোজাগরী’- অন্ধকার থেকে আলোর অভিমুখে ‘বেলঘরিয়া অভিমুখ’

0

sumitraসুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

মেনে নিতে নিতে এবং মানিয়ে চলতে চলতে সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রের কাছে অন্ধ আনুগত্য প্রকাশ করতে করতে, এক ধরনের ‘ঠিক’ বেঁচে থাকায় যখন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে সকলে, যখন প্রতিটা বাক্যের শেষে ‘ঠিক আছে’ শব্দ দু’টো প্রায় গণ মুদ্রাদোষের আকার নিয়েছে –তখন যেন নিজের কানের কাছেই নিজের মুখের কথা আর বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। তাই ‘ঠিক আছে’-র অতিরিক্ত সংযোজন। ব্যক্তি স্বার্থের ক্ষুদ্র ক্লীব জীবনকে সকলে যখন সানন্দে বরণ করে নেয়, চিন্তার দাসত্ব, প্রশ্ন করার অক্ষমতাই যখন খুব স্বাভাবিক মনে হয়, তখন সময় অন্ধকার। এই রকম অন্ধকার সময়ে, আলো দেখাতে প্রয়োজন হয় সেই সব শিল্প কর্মের যা মানুষের ঝুঁকে যাওয়া মেরুদণ্ডকে সোজা হতে বলে। ইদানিং বাংলা শিল্প সাহিত্যে ‘সেফ’ থাকার প্রবণতাই সর্বত্র বিরাজমান, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর এখন বিলুপ্ত প্রায় অথবা ভিনগ্রহের প্রাণী। সর্বগ্রাসী এই ঝলমলে আঁধারের মধ্যে, সমুদ্রে পথভ্রষ্ট নাবিকের কাছে আশার আলো হয়ে যেমন জ্বলে ওঠে তীরের বাতিঘর, তেমনই বাংলা নাটকে জ্বলে উঠল সদ্য জন্মানো নাট্যদল ‘বেলঘরিয়া অভিমুখ’, তাদের প্রযোজনা কৌশিক চট্টোপাধ্যায় রচিত-নির্দেশিত নাটক ‘কোজাগরী’-কে নিয়ে।

যুক্তির সঙ্গে আবেগের সার্থক মেলবন্ধন ঘটিয়ে এমন প্রতিবাদী নাট্য নির্মাণ করেছেন কৌশিক যা দেখতে দেখতে বিভিন্ন বয়স ও সামাজিক অবস্থানের দর্শকের হৃদয় গর্জে উঠতে চাইছে। চোখ যাচ্ছে ভিজে। গত শতকের পাঁচের দশকে মার্কিন লেখক হাওয়ার্ড ফাস্টের লেখা সুপরিচিত উপন্যাস ‘সাইলাস টিম্বারম্যান’। বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের অধ্যাপক সাইলাস টিম্বারম্যানের জীবন ছিল সুখী ও নিস্তরঙ্গ। কোনো রকম ঘটনার ঘনঘটা বা বিপর্যয়ের সম্ভাবনা সেখানে ছিল না। আচমকা এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হল সাইলাসের জীবনে, যখন তিনি গভীর প্রশ্নচিহ্নের মুখোমুখি হলেন। নিজের মুক্ত চিন্তার স্বপক্ষে থেকে, বাকস্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে মতপ্রকাশের অধিকারকে মান্যতা দেবেন এবং বিরুদ্ধ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে তার মোকাবিলা করবেন নাকি প্রতিবাদ বিমুখ হয়ে থাকবে, নাকি নিজের স্বাধীনতা বন্ধক রেখে ‘ঠিক’ নিরাপদ জীবনের গণ্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখবেন। কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের রূপান্তরে ‘সাইলাস টিম্বারম্যান হয়ে ওঠে শৈলেশ কাষ্ঠ। পশ্চিমবঙ্গের জেলা বা কলকাতা থেকে দূরে কোনো জনপদের কলেজের শিক্ষক। স্ত্রী ময়ূরী ও কন্যা জাগরীকে নিয়ে তাঁর চমৎকার দিন কেটে যাচ্ছিল শিক্ষাকতা আর সাহিত্যচর্চায়। কলেজের পেছন দিকে রয়েছে এক বিশাল শালবন, যা কেটে সাফ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে এক দল মতলববাজ এবং বলা বাহুল্য এই কাজে রয়েছে উঁচুতলার রাজনৈতিক মদত। এই ঘটনার বিরুদ্ধে কিছু সংবেদনশীল মানুষ প্রতিবাদ সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। শৈলেশও স্বাক্ষর করেন তাঁদের প্রতিবাদপত্রে। এই ছোট্টো সইটাই বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনে শৈলেশ আর তাঁর পরিবারের জীবনে। জবাবদিহি, ধমক-চমক, প্রাণনাশের হুমকি যত বাড়তে থাকে শৈলেশও তত ঋজু হয়ে ওঠে, দৃঢ় হতে থাকে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।

kojagori-1

কুড়ি-পঁচিশ বছর আগে বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশিত হয়েছিল ‘সাইলাস টিম্বারম্যান’। বিশেষ পরিচিত না হলেও আগ্রহী পাঠক মহল তা জানতেন। কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের রূপান্তরের গুণে আখ্যানটি এতটাই বাংলার জল হাওয়ার স্পর্শে লালিত ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে যে না বলা থাকলে বা জানলে বোঝার উপায় নেই ‘কোজাগরী’ কোনো বিদেশি অখ্যানের আশ্রয়ে সৃষ্ট। এর থেকে আরও একটা বিষয় স্পষ্ট যে ক্ষমতার আস্ফালন এবং প্রতিবাদের চরিত্র দেশ, কাল, সমাজ নিরপেক্ষ।

‘কোজাগরী’ দেখতে দেখতে আরও মনে হয় যে, যা অভিনয় হচ্ছে তার অন্তর্নিহিত সত্যটাই দর্শকের কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। এই নাট্যে আয়োজনের প্রাচুর্য নেই। নেই চোখ ধাঁধানো বৈভব বা শরীরী কসরতের ভেল্কি। নেই বর্ণময় তারকা সমাবেশ তবুও দেখতে দেখতে হৃদয় ছুঁয়ে যায়। মুগ্ধ করে সমগ্র পরিকল্পনার পরিমিতিবোধ। প্রতিবাদে পরিণত, পরিশীলিত ও প্রায় অনুচ্চারিত ধরন। মঞ্চ ভাবনায় শুরু থেকেই বিশাল কুঠার ঝুলে থাকে যা সমগ্র নাটকের সঙ্গে আশ্চর্য সম্পর্ক স্থাপন করে। এই জন্য মঞ্চ ভাবনায় জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধুবাদ প্রাপ্য। কথায় বলে গুরুরা শিষ্যদের মধ্যে বেঁচে থাকেন বা বলা ভালো তাঁদের বিদ্যার সম্প্রসারণ ঘটে, এই নাটকের আলোর অভিব্যক্তি, বিশেষ করে নাটকের মেজাজটাকে ফুটিয়ে তুলতে ও নাট্যমুহূর্তগুলোকে দৃশ্যগতভাবে অর্থবহ করতে আলোক পরিকল্পনায় দীপঙ্কর দে তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে গুরু জয় সেনের স্মৃতিকে বার বার  মনে করালেন। সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ উজান চট্টোপাধ্যায় আবহ সৃষ্টিতে কাজ করেছেন পরিণত পেশাদারের মতোই। বিশেষ করে এই নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে উপস্থিত রবীন্দ্র চেতনা – তাঁর লেখা, গান, দর্শন। এই রবীন্দ্রভুবন ও নাট্য ঘটনার মেলবন্ধন নাট্য আবহে চমৎকার আসে। শুধু শেষে শুভদীপ গুহর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীতটির গায়কি আরও পরিমিত হলে নাটকের মেজাজের সঙ্গে আরও অনেক বেশি মানানসই হবে। আধুনিক নাটকের অনেক নির্দেশকই মঞ্চ ও প্রেক্ষাগৃহের ব্যবধানকে নানা ভাবে কমাতে চেয়েছেন। ‘কোজাগরী’তে সেই প্রয়োগ চূড়ান্ত ভাবে সফল। মিটিং-এর দৃশ্যে শৈলেশের বক্তৃতার সময় প্রেক্ষাগৃহ জুড়ে নির্বোধ ছাত্রদের ‘শেম শেম’ ধ্বনি দর্শকদের মধ্যে দমবন্ধ করা পরিস্থিতি তৈরি করে, যা সহজে বিস্মৃত হওয়া যায় না।

kojagori-2

‘কোজাগরী’ নাটকের অভিনয় দেখতে দেখতে ভুলে যেতে হয় যাঁদের দেখছি তাঁরা অভিনেতা-অভিনেত্রী। সবাই এতটাই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেন মঞ্চে, মনে হয় যেন যে-যে চরিত্রে অভিনয় করছেন তিনি সেটাই। সবার নাম আলাদা করে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। কিন্তু ধন্যবাদ সকলের প্রাপ্য। বহুদিন মনে থাকবে বিনায়ক সেন চরিত্রে জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়কে। লীলাময় – কল্যাণব্রত ঘোষ মজুমদারকে। তীর্থ রূপী উজান চট্টোপাধ্যায়, অধ্যক্ষ – শান্তনু সাহাকে। শৈলেশের স্ত্রী ময়ূরীর চরিত্রে জয়তী চক্রবর্তীর অন্তর্মুখী অভিনয় চরিত্রটিকে শুধু সশরীরে নয় – তাঁর মনটাকেও উপস্থাপিত করে, আর শৈলেশ কাষ্ঠ চরিত্রে অশোকে মজুমদার, প্রচুর প্রশংসা বাক্যও তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়। অভিনয়ে কোনো ‘গ্যালারি শো’ নেই, ট্রেন ধরতে হবে না তাই ছোটাছুটি তাড়াহুড়ো নেই। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে চরিত্রের অন্তর জগৎ। এক সময় দর্শককে একাত্ম করে তোলেন শৈলেন কাষ্ঠের বেদনায়, অসহায়তায়, সংকল্পে ও প্রতিবাদে ঋজু হয়ে ওঠার আখ্যানে। অশোক মজুমদার নিশ্চয়ই অনেক দিনের নাট্য শিল্পী, যদিও আগে তাঁর অভিনয় দেখা হয়নি, তাই বলতে ইচ্ছা করছে এত দিন কোথায় ছিলেন। অভিনয়ের ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যাও নাটকে অনুভব করা গেছে। কথা প্রধান নাটকে ভালো করে শুনতে পাওয়াটাও জরুরি। কিন্তু অনেক সময়েই অনেক চরিত্রের ‘ভল্যুম’ কমে যাচ্ছিল। এমনকি সামনের দিকের আসন থেকেও শোনা যাচ্ছিল না। আশা করি পরবর্তীকালে এই বিষয়ে অভিনেতারা খেয়াল রাখবেন। নাটক চলাকালীন মঞ্চের আশেপাশে, সাজঘরে মোবাইল ফোন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় না থাকলে শব্দযন্ত্রে সমস্যা হয়।

পরিশেষে নির্দেশক কৌশিক চট্টোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ ও ভালোবাসা জানাই এক জন দর্শক হিসেবে। ভিড়ের মাঝে হারিয়ে না গিয়ে সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা ও তা প্রকাশের সৎসাহস দেখানোর জন্য। প্রার্থনা করি ক্ষমতাকেন্দ্রের অরাজকতার বিরুদ্ধে তাঁর ও ‘বেলঘরিয়া অভিমুখ’-এর জেহাদ জায়মান থাকুক, সব ‘ঠিক আছে’ না বলে, বলুক অনেক কিছুই ভুল হচ্ছে।

ছবি সৌজন্য: বেলঘরিয়া অভিমুখ

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.