Connect with us

নাটক

‘কোজাগরী’- অন্ধকার থেকে আলোর অভিমুখে ‘বেলঘরিয়া অভিমুখ’

sumitraসুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

মেনে নিতে নিতে এবং মানিয়ে চলতে চলতে সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রের কাছে অন্ধ আনুগত্য প্রকাশ করতে করতে, এক ধরনের ‘ঠিক’ বেঁচে থাকায় যখন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে সকলে, যখন প্রতিটা বাক্যের শেষে ‘ঠিক আছে’ শব্দ দু’টো প্রায় গণ মুদ্রাদোষের আকার নিয়েছে –তখন যেন নিজের কানের কাছেই নিজের মুখের কথা আর বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। তাই ‘ঠিক আছে’-র অতিরিক্ত সংযোজন। ব্যক্তি স্বার্থের ক্ষুদ্র ক্লীব জীবনকে সকলে যখন সানন্দে বরণ করে নেয়, চিন্তার দাসত্ব, প্রশ্ন করার অক্ষমতাই যখন খুব স্বাভাবিক মনে হয়, তখন সময় অন্ধকার। এই রকম অন্ধকার সময়ে, আলো দেখাতে প্রয়োজন হয় সেই সব শিল্প কর্মের যা মানুষের ঝুঁকে যাওয়া মেরুদণ্ডকে সোজা হতে বলে। ইদানিং বাংলা শিল্প সাহিত্যে ‘সেফ’ থাকার প্রবণতাই সর্বত্র বিরাজমান, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর এখন বিলুপ্ত প্রায় অথবা ভিনগ্রহের প্রাণী। সর্বগ্রাসী এই ঝলমলে আঁধারের মধ্যে, সমুদ্রে পথভ্রষ্ট নাবিকের কাছে আশার আলো হয়ে যেমন জ্বলে ওঠে তীরের বাতিঘর, তেমনই বাংলা নাটকে জ্বলে উঠল সদ্য জন্মানো নাট্যদল ‘বেলঘরিয়া অভিমুখ’, তাদের প্রযোজনা কৌশিক চট্টোপাধ্যায় রচিত-নির্দেশিত নাটক ‘কোজাগরী’-কে নিয়ে।

যুক্তির সঙ্গে আবেগের সার্থক মেলবন্ধন ঘটিয়ে এমন প্রতিবাদী নাট্য নির্মাণ করেছেন কৌশিক যা দেখতে দেখতে বিভিন্ন বয়স ও সামাজিক অবস্থানের দর্শকের হৃদয় গর্জে উঠতে চাইছে। চোখ যাচ্ছে ভিজে। গত শতকের পাঁচের দশকে মার্কিন লেখক হাওয়ার্ড ফাস্টের লেখা সুপরিচিত উপন্যাস ‘সাইলাস টিম্বারম্যান’। বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের অধ্যাপক সাইলাস টিম্বারম্যানের জীবন ছিল সুখী ও নিস্তরঙ্গ। কোনো রকম ঘটনার ঘনঘটা বা বিপর্যয়ের সম্ভাবনা সেখানে ছিল না। আচমকা এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হল সাইলাসের জীবনে, যখন তিনি গভীর প্রশ্নচিহ্নের মুখোমুখি হলেন। নিজের মুক্ত চিন্তার স্বপক্ষে থেকে, বাকস্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে মতপ্রকাশের অধিকারকে মান্যতা দেবেন এবং বিরুদ্ধ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে তার মোকাবিলা করবেন নাকি প্রতিবাদ বিমুখ হয়ে থাকবে, নাকি নিজের স্বাধীনতা বন্ধক রেখে ‘ঠিক’ নিরাপদ জীবনের গণ্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখবেন। কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের রূপান্তরে ‘সাইলাস টিম্বারম্যান হয়ে ওঠে শৈলেশ কাষ্ঠ। পশ্চিমবঙ্গের জেলা বা কলকাতা থেকে দূরে কোনো জনপদের কলেজের শিক্ষক। স্ত্রী ময়ূরী ও কন্যা জাগরীকে নিয়ে তাঁর চমৎকার দিন কেটে যাচ্ছিল শিক্ষাকতা আর সাহিত্যচর্চায়। কলেজের পেছন দিকে রয়েছে এক বিশাল শালবন, যা কেটে সাফ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে এক দল মতলববাজ এবং বলা বাহুল্য এই কাজে রয়েছে উঁচুতলার রাজনৈতিক মদত। এই ঘটনার বিরুদ্ধে কিছু সংবেদনশীল মানুষ প্রতিবাদ সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। শৈলেশও স্বাক্ষর করেন তাঁদের প্রতিবাদপত্রে। এই ছোট্টো সইটাই বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনে শৈলেশ আর তাঁর পরিবারের জীবনে। জবাবদিহি, ধমক-চমক, প্রাণনাশের হুমকি যত বাড়তে থাকে শৈলেশও তত ঋজু হয়ে ওঠে, দৃঢ় হতে থাকে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।

kojagori-1

কুড়ি-পঁচিশ বছর আগে বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশিত হয়েছিল ‘সাইলাস টিম্বারম্যান’। বিশেষ পরিচিত না হলেও আগ্রহী পাঠক মহল তা জানতেন। কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের রূপান্তরের গুণে আখ্যানটি এতটাই বাংলার জল হাওয়ার স্পর্শে লালিত ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে যে না বলা থাকলে বা জানলে বোঝার উপায় নেই ‘কোজাগরী’ কোনো বিদেশি অখ্যানের আশ্রয়ে সৃষ্ট। এর থেকে আরও একটা বিষয় স্পষ্ট যে ক্ষমতার আস্ফালন এবং প্রতিবাদের চরিত্র দেশ, কাল, সমাজ নিরপেক্ষ।

‘কোজাগরী’ দেখতে দেখতে আরও মনে হয় যে, যা অভিনয় হচ্ছে তার অন্তর্নিহিত সত্যটাই দর্শকের কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। এই নাট্যে আয়োজনের প্রাচুর্য নেই। নেই চোখ ধাঁধানো বৈভব বা শরীরী কসরতের ভেল্কি। নেই বর্ণময় তারকা সমাবেশ তবুও দেখতে দেখতে হৃদয় ছুঁয়ে যায়। মুগ্ধ করে সমগ্র পরিকল্পনার পরিমিতিবোধ। প্রতিবাদে পরিণত, পরিশীলিত ও প্রায় অনুচ্চারিত ধরন। মঞ্চ ভাবনায় শুরু থেকেই বিশাল কুঠার ঝুলে থাকে যা সমগ্র নাটকের সঙ্গে আশ্চর্য সম্পর্ক স্থাপন করে। এই জন্য মঞ্চ ভাবনায় জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধুবাদ প্রাপ্য। কথায় বলে গুরুরা শিষ্যদের মধ্যে বেঁচে থাকেন বা বলা ভালো তাঁদের বিদ্যার সম্প্রসারণ ঘটে, এই নাটকের আলোর অভিব্যক্তি, বিশেষ করে নাটকের মেজাজটাকে ফুটিয়ে তুলতে ও নাট্যমুহূর্তগুলোকে দৃশ্যগতভাবে অর্থবহ করতে আলোক পরিকল্পনায় দীপঙ্কর দে তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে গুরু জয় সেনের স্মৃতিকে বার বার  মনে করালেন। সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ উজান চট্টোপাধ্যায় আবহ সৃষ্টিতে কাজ করেছেন পরিণত পেশাদারের মতোই। বিশেষ করে এই নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে উপস্থিত রবীন্দ্র চেতনা – তাঁর লেখা, গান, দর্শন। এই রবীন্দ্রভুবন ও নাট্য ঘটনার মেলবন্ধন নাট্য আবহে চমৎকার আসে। শুধু শেষে শুভদীপ গুহর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীতটির গায়কি আরও পরিমিত হলে নাটকের মেজাজের সঙ্গে আরও অনেক বেশি মানানসই হবে। আধুনিক নাটকের অনেক নির্দেশকই মঞ্চ ও প্রেক্ষাগৃহের ব্যবধানকে নানা ভাবে কমাতে চেয়েছেন। ‘কোজাগরী’তে সেই প্রয়োগ চূড়ান্ত ভাবে সফল। মিটিং-এর দৃশ্যে শৈলেশের বক্তৃতার সময় প্রেক্ষাগৃহ জুড়ে নির্বোধ ছাত্রদের ‘শেম শেম’ ধ্বনি দর্শকদের মধ্যে দমবন্ধ করা পরিস্থিতি তৈরি করে, যা সহজে বিস্মৃত হওয়া যায় না।

kojagori-2

‘কোজাগরী’ নাটকের অভিনয় দেখতে দেখতে ভুলে যেতে হয় যাঁদের দেখছি তাঁরা অভিনেতা-অভিনেত্রী। সবাই এতটাই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেন মঞ্চে, মনে হয় যেন যে-যে চরিত্রে অভিনয় করছেন তিনি সেটাই। সবার নাম আলাদা করে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। কিন্তু ধন্যবাদ সকলের প্রাপ্য। বহুদিন মনে থাকবে বিনায়ক সেন চরিত্রে জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়কে। লীলাময় – কল্যাণব্রত ঘোষ মজুমদারকে। তীর্থ রূপী উজান চট্টোপাধ্যায়, অধ্যক্ষ – শান্তনু সাহাকে। শৈলেশের স্ত্রী ময়ূরীর চরিত্রে জয়তী চক্রবর্তীর অন্তর্মুখী অভিনয় চরিত্রটিকে শুধু সশরীরে নয় – তাঁর মনটাকেও উপস্থাপিত করে, আর শৈলেশ কাষ্ঠ চরিত্রে অশোকে মজুমদার, প্রচুর প্রশংসা বাক্যও তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়। অভিনয়ে কোনো ‘গ্যালারি শো’ নেই, ট্রেন ধরতে হবে না তাই ছোটাছুটি তাড়াহুড়ো নেই। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে চরিত্রের অন্তর জগৎ। এক সময় দর্শককে একাত্ম করে তোলেন শৈলেন কাষ্ঠের বেদনায়, অসহায়তায়, সংকল্পে ও প্রতিবাদে ঋজু হয়ে ওঠার আখ্যানে। অশোক মজুমদার নিশ্চয়ই অনেক দিনের নাট্য শিল্পী, যদিও আগে তাঁর অভিনয় দেখা হয়নি, তাই বলতে ইচ্ছা করছে এত দিন কোথায় ছিলেন। অভিনয়ের ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যাও নাটকে অনুভব করা গেছে। কথা প্রধান নাটকে ভালো করে শুনতে পাওয়াটাও জরুরি। কিন্তু অনেক সময়েই অনেক চরিত্রের ‘ভল্যুম’ কমে যাচ্ছিল। এমনকি সামনের দিকের আসন থেকেও শোনা যাচ্ছিল না। আশা করি পরবর্তীকালে এই বিষয়ে অভিনেতারা খেয়াল রাখবেন। নাটক চলাকালীন মঞ্চের আশেপাশে, সাজঘরে মোবাইল ফোন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় না থাকলে শব্দযন্ত্রে সমস্যা হয়।

পরিশেষে নির্দেশক কৌশিক চট্টোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ ও ভালোবাসা জানাই এক জন দর্শক হিসেবে। ভিড়ের মাঝে হারিয়ে না গিয়ে সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা ও তা প্রকাশের সৎসাহস দেখানোর জন্য। প্রার্থনা করি ক্ষমতাকেন্দ্রের অরাজকতার বিরুদ্ধে তাঁর ও ‘বেলঘরিয়া অভিমুখ’-এর জেহাদ জায়মান থাকুক, সব ‘ঠিক আছে’ না বলে, বলুক অনেক কিছুই ভুল হচ্ছে।

ছবি সৌজন্য: বেলঘরিয়া অভিমুখ

নাটক

বাঁকুড়ার আকুই গ্রামে অনুষ্ঠিত হল তিনদিনব্যাপী নাট্যোৎসব

ইন্দ্রাণী সেন,বাঁকুড়া: তিনদিনব্যাপী আঠারোতম নাট্যোৎসবের সমাপ্তি হল বাঁকুড়ার ইন্দাসের আকুই গ্রামে। শুরু হয়েছিল শুক্রবার, শেষ হল রবিবার।

শুক্রবার স্থানীয় হাইস্কুল মাঠ-সংলগ্ন প্রয়াত হরিসাধন ঘোষাল ও সুনীতিদেবী স্মৃতিমঞ্চে নাট্যোৎসবের উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব কৌশিক চট্টোপাধ্যায়। নাট্যমঞ্চটি উৎসর্গ করা হয়েছিল আকুই সংস্কৃতি সমিতির সদ্যপ্রয়াত সদস্য সুনীল ভট্টাচার্যের নামে। নাট্যোৎসবের প্রথম দিনে তাঁকে স্মরণ করা হয়।

প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করছেন সমিতির সভাপতি রমাপ্রসাদ সেন।

২৮ ফ্রেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত তিন দিনে মোট পাঁচটি নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পাশাপাশি ব্লক, জেলা ও রাজ্যে সংশ্লিষ্ট সমিতির কৃতী শিল্পীদের সন্মাননা প্রদান করা হয়। উপস্থিত বিশিষ্ট জনদের সমিতির পক্ষ থেকে স্মারক সন্মাননা প্রদান করা হয়।

সংস্থার সম্পাদক তুহিন দলুই জানান, নাট্যোৎসবের প্রথম দিনে নদিয়ার শান্তিপুর সংস্কৃতির ‘রক্ত উপাখ্যান’, দ্বিতীয় দিনে আকুই সংস্কৃতি সমিতির ‘বারাব্বাস’, উত্তর চব্বিশ পরগনা ইচ্ছাপুর আলেয়ার ‘৬:১’ এবং তৃতীয় তথা শেষ দিনে আকুই সংস্কৃতি সমিতির ‘অমল তিয়াস’ ও বীরভূম আননের ‘মহাজ্ঞানী’ নাটক মঞ্চস্থ হয়। নাটকের পাশাপাশি তিন দিনই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এবং নাটকবিষয়ক আলোচনাসভাও বসে।

উল্লেখ্য, ইন্দাস এলাকার সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশে দীর্ঘদিন ধরে মুখ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে আকুই সংস্কৃতি সমিতি। রাজ্যে ছাত্র-যুব উৎসবে জেলা স্তরে নাটক প্রতিযোগিতায় সেরার সেরা সন্মান এদের ঝুলিতে। শ্রেষ্ঠ নির্দেশনা, অভিনেতা ও অভিনেত্রী এবং সেরা শিশুশিল্পীর সম্মান অর্জন করেছেন এই সমিতির সদস্যরা। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে থেকেও এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নাট্যোৎসব চালিয়ে এসে এই সমিতি রাজ্যে স্তরে বিশেষ ভাবে প্রশংসিত ও সমাদৃত।

আরও পড়ুন: প্রভাস এবং দীপিকাকে জুটি বাঁধতে দেখা যাবে রুপালি পর্দায়

সংস্থার সভাপতি রমাপ্রসাদ সেন বলেন, “এই বছর আমরা আমাদের অত্যন্ত প্রিয় বিশিষ্ট নট ও নাট্যকার সুনীল ভট্টাচার্যকে হারিয়েছি। এক প্রতিকূল পরিবেশে সমিতির সদস্যদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নাট্যোৎসব সম্পন্ন হল।

Continue Reading

নাটক

‘রথের রশি’ ও ‘ভারত এক খোঁজ’ দুটি অঙ্গন নাটক বিচ্ছেদের প্রচেষ্টায় জল ঢেলে দেয়

বিজ্ঞান আবিষ্কারের ধারা চলতে থাকে – প্রয়োজন ও সত্যের উৎস সন্ধানের মানসিক খিদে থেকে। সেখানে গবেষণার সময় মানুষ থাকার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু মানুষ তার ফলভোগ করে।

ছোটন দত্ত গুপ্ত

বিজ্ঞান আবিষ্কারের ধারা চলতে থাকে – প্রয়োজন ও সত্যের উৎস সন্ধানের মানসিক খিদে থেকে। সেখানে গবেষণার সময় মানুষ থাকার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু মানুষ তার ফলভোগ করে। সেখানে মানুষ আবিষ্কারের মননের চর্চার সাথে একাত্ম হয় না। কিন্তু শিল্পচর্চার মূল ভিত্তি হল সমাজের মানোন্নয়ন, সুস্থ সমাজ ও মানুষের মধ্যে সম্পর্কের শিকড় একাত্ম করে আগামী সুন্দর পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাওয়া।

নাটক তারই শাখা হয়ে, মানুষের কাছে যাবার শক্তিশালী মাধ্যম হয়। মানুষের কাছে কী নিয়ে যাবো? কী ভাবে যাবো? তা ব্যক্তি মানুষ বা দলের ওপর নির্ভর করে।
প্লেটোর ছাত্র অ্যারিস্টটল পছন্দ করতেন অনুকারী(Mimetic)নাটক। নীতিমূলক(Didactic) নাটক আবার প্লেটোর পছন্দ। নীতিমূলক নাটক এসকাইলাসের ‘Euomenides’ পেটের ভাইস – এর ‘Vietnam –Diskurs’ গোটা পৃথিবীর থিয়েটারের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময় জার্মানির হিটলার শাসনের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ব্রেখট আরো বেশি করে দর্শকের সঙ্গে সংযোগের প্রয়োজন অনুভব করলেন। প্রসেনিয়াম মঞ্চ থেকেই নাটক থামিয়ে- দর্শকদের নাট্যভাবনার সঙ্গে যুক্ত হতে বলেছেন। বাস্তববাদী এই নাট্য প্রযোজকদের তাগিদেই তৈরী হল ‘ফোর্থ ওয়াল থিয়েটার’। জনগণকে বাদ দিয়ে থিয়েটার হয় না।

তাই, আজকের ভারতবর্ষে এই সময় খুব জরুরি হয়ে পড়েছে অঙ্গন নাটক, পথ নাটক, অন্তরঙ্গ থিয়েটার, সাইকো নাটক (অভিনেতা সাইকেলে করে কয়লার শ্রমিকের বাড়ি গিয়ে নাটক করে আসেন) । যা মানুষে মানুষে সম্পর্ক তৈরি করবে। যেখানে অভিনেতা ও দর্শকদের মধ্যে দেওয়াল থাকবে না। একাত্ম হয়ে মিলেমিশে একাকার হবে। ‘সাহিত্যিকা’(শান্তিনিকেতন) সংস্থার ‘রথের রশি’ ও ‘ভারত এক খোঁজ’ দুটি অঙ্গন নাটকের বিষয়, আঙ্গিক ও আভিনয়; এই অস্থির সময়ে ভরসা ও সাহস দেয়। বিচ্ছেদের প্রচেষ্টায় জল ঢেলে দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রথের রশি’ ঘরোয়া পরিবেশে অঙ্গন আঙ্গিকে একক অভিনয় ও পরিচালনা করেন দীপ্র মজুমদার। যা দেখার মতো। রথের রশি নাটকের বিভিন্ন চরিত্র দীপ্র যেভাবে রপ্ত ও প্রয়োগ করেছেন তা শেখার মতো। প্লেটো বলেছেন, অভিনেতা নিজের দেহ ত্যাগ করে অন্যের দেহে প্রবেশ করে। অন্যব্যক্তির ব্যক্তিত্ব লাভ করে। দীপ্র একই নাটকে প্লেটো’র মন্তব্য বাস্তবায়িত করেছে। সত্যি তো মহাকালের রশি কেউ টানছে না। যে বন্ধনে টানবে তা আজ বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে আমাদের ব্যবস্থা, এই সময়। মহাকাল তো থমকে।

‘রথের রশি’ নাটকে বিভিন্ন দীপ্র মজুমদার

‘ভারত এক খোঁজ’ নাটক আরো সহজ সরল উপস্থাপনা। বিষয় তো ভীষণ প্রাসঙ্গিক ও জ্বলন্ত । কবি জয়দেব বসুর কবিতা অবলম্বনে এই নাটক। যা বর্তমান ভারতবর্ষের আয়না। যে রাষ্ট্র খেতে দেয় না সে ছলে-বলে-কৌশলে ধর্মের নামে বিভেদ ঘটায়, হত্যা করে নিজের সিংহাসন মজবুত করার জন্য। যৌনপল্লীর বেড়ে ওঠা একজন মানুষ সে জন্মভূমির খোঁজে যায়। যার মধ্যে দিয়ে আমরা বাস্তবকে সামনে দেখতে পাই। কী ভাবে বিভেদের মদতদাতা রাষ্ট্র মানুষে মানুষে হিংসা বাঁধায়। ‘ভারত এক খোঁজ’ নাটকে মূল চরিত্রে সৌমেন সেনগুপ্তকেও আমি প্লেটোর বক্তব্যের বাস্তব রূপ বলব। সৌমেনের গানও বেশ। পাঠকের অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে কিন্তু জানেন তো একটা দল মানসিকভাবে চর্চা করলে প্রত্যেক সদস্যই এই কাজটি করতে পারেন। কমিউন হলেই তা সম্ভব। এরকম বহু অজানা নাটকের দল আছে যাদের মধ্যে এরকম পারফর্মার পাবেন। তাঁদের খুঁজতে হবে। ‘ভারত এক খোঁজ’ নাটকে সৌমেন ছাড়াও আরো চারজন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যে অভিনয় করেছেন তারাও কিন্তু সমান দক্ষ।

দুটো প্রযোজনার- বিষয়ক নির্বাচন, মিউজিক, পোশাক, গানের ব্যবহার ও অভিনয়ে পরিমিতি বোধ আছে পরিচালকের। ‘রথের রশি’র মিউজিকে কোথাও খামতি মনে হলেও ‘ভারত এক খোঁজ’ এ ঠিকই আছে। তবে ‘রথের রশি’ নাটকে রাবীন্দ্রিক ফর্মে নৃত্য ব্যবহার, কিছুটা হলেও নাট্য-টোনের বলিষ্ঠতা হারিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা বলেই এই নৃত্যফর্ম ব্যবহার করতেই হবে, শিল্পে এরকম বাধ্য-বাধকতা ভাবনায় থাকলে তা মহাকালের রথের চাকার গতি শ্লথ করে।

Continue Reading

নাটক

নাবালিকা বিবাহ-বিরোধী নাটক ‘রাধারানি’, ‘বিদূষক’-এর সার্থক প্রযোজনা

A scene from Radharani,

নিজস্ব প্রতিনিধি: নাবালিকাদের বিয়ের ব্যাপারটা কি শুধুই গ্রামের সমস্যা? নাকি, শহর কলকাতারও? মনে হতেই পারে, মহানগরীতে এ সমস্যাটা বোধ হয় তেমন নেই। কিন্তু খাস কলকাতারই একটা স্কুলে কাজ করতে গিয়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতা এক নাট্যদলের।

পূর্ব কলকাতা বিদূষক নাট্যমণ্ডলী যখন ঠিক করে যে তারা তাদের এলাকার স্কুলগুলোর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে কাজ করবে, তখন কিন্তু নাবালিকা বিবাহের ব্যাপারটা তাঁদের ভাবনার ধারেকাছেও ছিল না, বলছেন দলের সেক্রেটারি অরূপ খাঁড়া। কিন্তু পূর্ব কলকাতার বেলেঘাটা শান্তি সংঘ বিদ্যায়তনের বালিকা বিভাগে যখন তাঁরা তাঁদের প্রস্তাব নিয়ে গেলেন, সেখান থেকেই উঠে এল নাবালিকা বিবাহের সমস্যাটার কথা। স্কুলের একটু উঁচু ক্লাসের মেয়েদের মধ্যে নাকি পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করার প্রবণতা প্রবল। প্রধান কারণ, বাপের বাড়ি দুর্বিষহ। বিয়ের পর বেশির ভাগ মেয়েই পড়াশুনো ছেড়ে দেয়।

নাটক মঞ্চস্থ করার পরে।

তাই নাট্যদলের তরফে প্রস্তাবটা পেয়ে বিষয় বাছতে এক মুহূর্তও সময় নেননি স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা সুস্মিতা মণ্ডল। মেয়েদের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয় পেয়ে নাটক লিখতে দেরি করেননি ‘বিদূষক’-এর রাজা বিশ্বাসও। স্কুলের গরমের ছুটির সময়েই লেখা হয়ে যায় নাটক ‘রাধারানি’, যেখানে গানে গানে বলা হচ্ছে ক্লাস টেনের এক মেয়ের গল্প।

শহরের এক খালের ধারে থাকে সেই মেয়ে — রাধারানি, যার প্রেমে পড়ে পাশের পাড়ার শ্যাম। মদ্যপ বাপের অত্যাচারে অতীষ্ঠ হয়ে ঘর ছাড়ে রাধা, পালিয়ে বিয়ে করে শ্যামকে। তার পর? তার পর সেই একই কাহিনি — ‘নতুন করে বলি শোনো, পুরান ঘটনা’; প্রচলিত লোকগানের এই চিরপরিচিত সুরেই চলতে থাকে রাধার গল্প, তার মায়েরই মতো, পরিত্রাণহীন।

মেক আপে ব্যস্ত শিল্পী।

প্রধানশিক্ষিকা সুস্মিতাদেবী বলছেন, নাটক দেখে একটু হলেও যদি সচেতন হয় তাঁর ছাত্রীরা, তা হলেই তাঁদের উদ্যোগ সফল হবে। একই মত অপর দুই শিক্ষিকা সুদক্ষিণা চক্রবর্তী ও তপতী সর্দারের, যাঁরা এই নাটকটি নির্মাণের সহায়তাকারী।

সচেতন তারা অবশ্যই, বলছে শান্তি সংঘ স্কুলের রূপা সর্দার, বর্ণালী দলুই, সায়নী মণ্ডল, প্রিয়াঙ্কা পাণ্ডে, পায়েল সর্দার, অঞ্জলি মণ্ডল, টিনা বেরা, রিনি ঘোষ, যুথিকা গায়েনের মতো মেয়েরা, যারা এই নাটকের কুশীলব। মাস তিনেকের রিহার্সালে তাদের সঙ্গে ছিল দিয়া দাস, প্রিয়া দাস, তনয়া পাণ্ডে, পায়েল বিশ্বাস। এদের অনেকেরই পারফরমেন্স বেশ সম্ভামনাময়, বললেন নাটকের নির্দেশক অরূপ খাঁড়া। নাটকের প্রযোজনায় সহকারী সায়ন্তন মিত্র ও স্বাধীনা চক্রবর্তী এবং প্রচারসজ্জায় নীতীশ সরকার।

ছাত্রীদের অবশ্য বক্তব্য — সবই তো বুঝলাম, কিন্তু বিয়ের বিকল্পটা কী? গরিব ঘরের মেয়েদের জন্য স্বনির্ভরতার উপায়গুলো কী?

আরও পড়ুন: একগুচ্ছ শারদ পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে শুরু হল বসিরহাট লিটল ম্যাগাজিন ফোরামের পথচলা

প্রশ্নের উত্তরে, স্কুলেরই শরণ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে শেষ হচ্ছে নাবালিকা বিবাহ-বিরোধী নাটক ‘রাধারানি’। মেয়েদের অন্যান্য স্কুলেও বিনামূল্যে নাটকটির শো করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের, জানাচ্ছে বিদূষক নাট্যমণ্ডলী।

Continue Reading
Advertisement
দেশ4 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ২৭১১৪, সুস্থ ১৯৮৭৩

কলকাতা3 days ago

কলকাতায় লকডাউনের আওতায় পড়া এলাকাগুলির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশিত

ক্রিকেট3 days ago

১১৬ দিন পর শুরু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, হাঁটু গেড়ে বসে জর্জ ফ্লয়েডকে স্মরণ ক্রিকেটারদের

রাজ্য2 days ago

ঘুমের মধ্যেই চলে গেলেন মহীনের অন্যতম ‘ঘোড়া’ রঞ্জন ঘোষাল

LPG
দেশ3 days ago

উজ্জ্বলা যোজনায় বিনামূল্যের এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়ার মেয়াদ বাড়ল আরও তিন মাস

দেশ2 days ago

সক্রিয় করোনা রোগীর ৯০ শতাংশই আটটি রাজ্যে!

কলকাতা2 days ago

করোনার পাশাপাশি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে শুরু হচ্ছে অন্যান্য রোগের চিকিৎসা

শিক্ষা ও কেরিয়ার2 days ago

শুক্রবার আইসিএসই, আইএসসি-র ফল

কেনাকাটা

কেনাকাটা2 days ago

ঘরের একঘেয়েমি আর ভালো লাগছে না? ঘরে বসেই ঘরের দেওয়ালকে বানান অন্য রকম

খবরঅনলাইন ডেস্ক : একে লকডাউন তার ওপর ঘরে থাকার একঘেয়েমি। মনটাকে বিষাদে ভরিয়ে দিচ্ছে। ঘরের রদবদল করুন। জিনিসপত্র এ-দিক থেকে...

কেনাকাটা4 days ago

বাচ্চার জন্য মাস্ক খুঁজছেন? এগুলোর মধ্যে একটা আপনার পছন্দ হবেই

খবরঅনলাইন ডেস্ক : নিউ নর্মালে মাস্ক পরাটাই দস্তুর। তা সে ছোটো হোক বা বড়ো। বিরক্ত লাগলেও বড়োরা নিজেরাই নিজেদেরকে বোঝায়।...

কেনাকাটা5 days ago

রান্নাঘরের টুকিটাকি প্রয়োজনে এই ১০টি সামগ্রী খুবই কাজের

খবরঅনলাইন ডেস্ক : লকডাউনের মধ্যে আনলক হলেও খুব দরকার ছাড়া বাইরে না বেরোনোই ভালো। আর বাইরে বেরোলেও নিউ নর্মালের সব...

কেনাকাটা6 days ago

হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে অ্যামাজন

অনলাইনে খুচরো বিক্রেতা অ্যামাজন ক্রেতার চাহিদার কথা মাথায় রেখে ঢেলে সাজিয়েছে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সম্ভার।

নজরে