সুখী রাজপুত্র – যে হৃদয় দুঃখে ফেটে যায়, আগুনে গলে না

0
সৈকত ভকত

একটা টান, একটা গভীর আত্মীয়তা, একটা নিবিড় যোগ আছে শিকড়ে। তাই ভালো লেগে গেল নাটক- ‘সুখী রাজপুত্র’।

নাগরিক অভ্যাসে সমাজের পেশিগুলো শক্ত হয়ে আসছে ক্রমশ। যে উপলব্ধি থেকে রবীন্দ্রনাথ শেষ বয়সে লেখেন- ‘যদি পরজন্মে পাইরে হতে ব্রজের রাখাল বালক’ কিংবা- অন্তিম ছবিতে সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘আগন্তুক’ মনমোহনের উচ্চারণে হতাশা ছড়িয়ে বলেন- আমি সেই আদিম গুহাবাসীর মতো বাইসন আঁকতে পারি না।

সহজ হওয়া বড়ো সহজ নয়- কিন্তু, ‘পূর্ব কলকাতা বিদূষক’ যথার্থই সহজ হতে পেরেছে তাদের নবতম প্রযোজনা- ‘সুখী রাজপুত্র’-তে।

রাজপুত্র অকাল মৃত। তাই রাজকীয় শোক আর বুনিয়াদি দম্ভ মিলে মিশে তৈরি হল মণিমাণিক্য খচিত সোনার মূর্তি, স্থাপন করা হল নগরের মাঝে। এখন রাজপুত্র সেই মানুষগুলোকে দেখতে পায় রোজ, যারা তার জীবিত অবস্থায় ছিল অহংকারের প্রাকারের বাইরে। তাদের দেখে কেঁদে উঠল তার প্রাণ, তাই সে এখন দু:খী রাজপুত্র।

শীতের রাতে শহরে এল এক সোয়ালো পাখি।

রাজপুত্রের ধাতব শরীরে লাগল মুক্তির ছোঁয়া। প্রেম হয়ে গেল স্থাবরে জঙ্গমে। এর পর সোয়ালোর সাহায্যে দু:খী মানুষদের মধ্যে রাজপুত্র বিলিয়ে দিল তার শরীরে থাকা সেই আর্থিক ভাবে মহামূল্যবান এবং ব্যবহারিক ভাবে অনর্থক মণি-রত্ন-সোনা-দানাগুলো। এখন সে যথার্থই সুখী, মৃত সোয়ালোর পাশে ভাঙা হৃদপিণ্ড নিয়েই তার শ্রেষ্ঠ সুখ- সে চায় নিজের রাজপুত্র পরিচয়টুকুও মুছে দিতে।

অস্কার ওয়াইল্ডের এই গল্প তো আমরা জানি। রাজা বিশ্বাসের (চমৎকার নয়, অপূর্ব এবং অনবদ্য) নাট্যরূপ দানে তা এসেছে, মিশেছে আমাদের মাটিতে। পরিচালক অমিত সাহার প্রসঙ্গেও এই একই কথা প্রযোজ্য। এই নাট্য প্রযোজনায় সিম্ফনির মায়াজাল নেই, নেই কোনো ধ্রুপদী মূর্ছনা, রাখালিয়া বাঁশির মেঠো সুর আছে। স্বর্ণমন্দিরের  সূক্ষ কাজের বদলে আছে সাঁওতাল বাড়ির মাটির দেওয়ালে মোটা তুলির টান।

এ নাটক শুরু হয়- শ্রমিকদের কাঁধে চেপে, সুখি রাজপুত্রের মূর্তি স্থাপন দিয়ে। রাজার দু:খ প্রকাশেও তো শ্রমিকদের সাহায্য লাগে।
আর শেষ হয়- শ্রমিকদের কাঁধে চেপে ভাঙ্গাচোরা মূর্তির আস্তাকুঁড় যাত্রা দিয়ে।

শ্রমিকদের প্রতি যথার্থ সহমর্মিতা এ নাটকের প্রাণ। বস্তুত শ্রমিকদের দৃষ্টিকোনেই এ নাটক উপস্থাপিত। দু’জন দেবদূত (দেবশ্রমিক) এ নাটকের কথক। স্বাধীনা চক্রবর্তী এবং তমালিকা রায় দুজনেই দেবদূতের ভূমিকা কথায় গানে মজিয়ে রাখেন। রাজপুত্রের ভূমিকায় সায়ন্তন আর সোয়ালোর ভূমিকায় শ্রেয়া মঞ্চে নতুন কিন্তু তারাও পরিচালকের ভাবনার পরিপূরক। সামান্য কিছু প্রাথমিক ত্রুটিটুকুই এই নাটকের এক সম্পদ হয়ে ওঠে।
আয়াস সাধ্য উৎপাদনের মূল্যায়ন চলে, অনায়াস প্রকৃতি তো অমূল্য।
আর এখানেই পরিচালকের সেই মোটা তুলির অনবদ্য টান। যেখানে রসের আস্বাদন নয়, অবগাহন অনিবার্য। যা দেখে কিছু শহুরে মানুষ নাক সিঁটকোতে পারেন। কিন্তু মনে মনে একটু সহজ হয়ে এ নাটক দেখলে মজে যাবেন নিশ্চিত।

বিশেষত বর্তমানে কিছু পরিচালক গোষ্ঠী, যারা থিয়েটারকে করপোরেট কমোডিটি করে তুলতে চান, তারা একবার এসে দেখুন। এ যাত্রায় বেঁচে গেলেও যেতে পারেন।

বাজনদারদের একটা দল বসে মঞ্চের এক পাশে। গানবাজনায় বেঁধে রাখেন দর্শকদের হৃদয়। এই দলে অঙ্কন ভট্টাচার্য, প্রভাত পাইন, অরূপ খাঁড়া, এবং নীতিশ সরকারের সঙ্গত, সুসংগত। তবে আরেকটু সংযত হওয়ার প্রয়োজন হয়ত আছে। অভিনয়ে জয়িতা, শ্রেয়া, অনীশ, বিশ্বজিৎ, শোভন তণ্ময়, রানা যথাযথ।

আলাদা করে নজর কাড়ে না সঙ্গীতার পোষাক পরিকল্পনা, আর সেখানেই তার স্বার্থকতা। গভীর নৈপুন্যে একাত্ম হয়েছে পোশাক থেকে মঞ্চসজ্জা সব কিছু।

একটা কথা পরিশেষে পরিচালককে বলতে চাই- যাত্রা-দেখা আর যাত্রা শোনা এই দু’য়ের মধ্যে দ্বিতীয় শব্দবন্ধই বেশি প্রচলিত, এবং সেটাও প্রকৃতি বিজ্ঞানের নিয়ম মেনেই। সুতরাং আরেকটু মনোযোগ দিন সংলাপ প্রক্ষেপণের দিকে। দর্শক শোষিত না হলেও কিঞ্চিৎ বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন।

নাটককার রাজা বিশ্বাসকে অভিবাদন – তাঁর সেই হৃদয়ের স্পর্শ এই নাটকে আছে, ‘যা দু:খে ফেটে যায়, কিন্তু আগুনে গলে না’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.