নতুন করে রবি ঠাকুরের ‘শাস্তি’

প্রায় দেড়শো বছর আগেকার পূর্ব বঙ্গের গরিব চাষার ঘর-গেরস্থালি, আর জমিদারের অত্যাচারে সে-সব উড়ে-পুড়ে যাওয়ার গল্প।

0
sashti
শান্তি নাটকের একটি দৃশ্য

সুনীল রায়: দিনটা ছিল ২১ জুলাই ২০১৯। শহর কলকাতায় লোকারণ্য, শাসক দলের ‘শহিদ দিবস’। তবে, বিকেল হতেই রোববারের আমেজ। তার পর বৃষ্টিহীন শ্রাবণের ভ্যাপসা গোধূলি। তার মধ্যেই শহরের এক হলঘরে হাজির হল চাষিবউ চন্দরা, তার বর ছিদাম, ভাসুর দুখিরাম, জা রাধা, প্রতিবেশী রামলোচন, আরও দু’-চার জন। রবীন্দ্রনাথের ‘শাস্তি’ গল্পের চরিত্ররা। অনেকেরই পড়া গল্প, স্কুলপাঠ্যেও থেকেছে বহুবার। তবু যেন চরিত্রগুলো নতুন করে জ্যান্ত হল সে-দিন, কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের পুরোনো বাড়িটার তিনতলায়। ‘বই-চিত্র’ সভাগৃহের ঘরোয়া পরিবেশে পূর্ব কলকাতা বিদূষক নাট্যমণ্ডলী পেশ করল তাদের নতুন প্রযোজনা, ‘শাস্তি’।  

পিছনে একটা কালো কাপড়, সামনে ঘটে চলে ঘটনা। অপরিসর হলঘরের মেঝেতে বসে দেখতে কিন্তু ভালোই লাগল নাটকটা। প্রায় দেড়শো বছর আগেকার পূর্ব বঙ্গের গরিব চাষার ঘর-গেরস্থালি, আর জমিদারের অত্যাচারে সে-সব উড়ে-পুড়ে যাওয়ার গল্প। জা রাধার খুনের মিথ্যা দায়ভার মাথায় নিয়ে নায়িকা চন্দরার আত্মঘাতী প্রতিবাদ। আর ছিদামের মুখে সেই বিখ্যাত বা কুখ্যাত সংলাপ — বউ গেলে বউ পাব, কিন্তু ভাই গেলে তো আর ভাই পাব না। যার কাছাকাছি একটা সংস্করণ বাংলা সিনেমার অধুনা-প্রাক্তন এক হিরোর মুখে বসিয়ে আমরা হাসি-ঠাট্টা করি। কিন্তু প্রশ্নটা এখনও কতটা কড়া বাস্তব সেটা মনে হতেই পারে নাটকটার শেষ দৃশ্যে, যখন চন্দরা ফাঁসির দড়ি গলায় পরে। তার ‘স্বীকারোক্তি’-র কাছে হার মানে দোর্দণ্ড ব্রিটিশ আদালতও, ভুল হচ্ছে জেনেও তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে বাধ্য হয়। দেখে, কোনও দর্শকের মনে আসতেই পারে ইদানীংকার কৃষক আত্মহত্যার কথা।

শাস্তি নাটকের একটি দৃশ্য

নাটকটাকে ভালোই বেঁধেছেন নির্দেশক অমিত সাহা। গল্পটাকে শুধু চন্দরা-ছিদাম ও রাধা-দুখিরামের ঘরোয়া ঝগড়ার ট্র্যাজেডি হিসেবে নয়, দেখিয়েছেন তৎকালীন আর্থ-সামাজিক টানাপোড়েনের আলোয়। রাজা বিশ্বাসের করা স্ক্রিপ্টও বেশ টানটান। তবে, নাটকের গানগুলো আর একটু মেশার দরকার গল্পের সঙ্গে। আবহ কিন্তু চমৎকার। প্রশংসা প্রাপ্য সঙ্গীত নির্দেশক শৌভিক বিশ্বাস এবং তাঁর সঙ্গতকার শুভ্রজিৎ সাহা ও অঙ্কন ভট্টাচার্যের। চন্দরার চরিত্রে পিঙ্কি দাস দর্শককে টেনে রাখেন। সঙ্গে বলতে হয় দুখিরাম পার্থ রায়, পেয়াদা অরূপ খাঁড়া, রামলোচন তারক গাঙ্গুলি, পুলিশ অফিসার নীতীশ সরকারের অভিনয়ের কথা। বাকিরা আর একটু আন্তরিক হলে বোধ হয় ভালো হয়। আর, সূত্রধরের সংলাপে সাধু বাংলা ভাষার প্রয়োগ যদি করতেই হয়, তা হলে সেটা সুচারু হওয়া প্রয়োজন। তবে, সব মিলিয়ে একটা হলঘরের অন্তরঙ্গ পরিবেশে রবীন্দ্রনাথের ‘শাস্তি’ দেখার এ অভিজ্ঞতা বেশ নতুন ও তৃপ্তিকর। পাঠকদের বলব — পারলে, নাটকটা দেখে নেবেন। মিনিট পঁয়তাল্লিশেক সময়টা নষ্ট হবে না।

শিল্প-সংস্কৃতির আরও খবর পড়তে ক্লিক করুন এখানে

ছবি: অর্ঘদেব মিত্র  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here