‘সওদাগরের নৌকা’-র ‘সতী’-কে খোলা চিঠি

0
sudipta and debshankar
‘সওদাগরের নৌকা’র একটি দৃশ্যে সুদীপ্তা ও দেবশংকর।
অময় দেব রায়

প্রিয় সুদীপ্তাদি,

হঠাৎ তোমার বার্তা এল – “অ্যাকাডেমিতে অনেক দিন পর ‘সওদাগরের নৌকা’। ফ্রি থাকলে চলে এসো। নইলে মিস করবে। আমি টিকিট রেখে দেব।” এ বার্তা উপেক্ষার প্রশ্নই আসে না! কাজের প্রয়োজনে নিয়মিত ছবি দেখার চর্চা থাকলেও মাঝে নাটক দেখায় দীর্ঘ ছেদ পড়েছিল। তোমার সৌজন্যে আবার ঝালিয়ে নিলাম।

তোমার অভিনয় নিয়ে কী বলি বল তো! ‘সওদাগরের নৌকা’-য় তুমি ‘সতী’-র চরিত্রে। অশীতিপর বৃদ্ধা। কী অনায়াস দক্ষতায় নিজের বয়স লুকিয়ে বৃদ্ধার চরিত্রে হাজির হলে! শরীরী বিভঙ্গ, গলার স্বর – সব মিলিয়ে এমন ভাবে নিজেকে গুটিয়ে নিলে আমি আবার বিস্মিত হলাম! কী ভাবে এত বিশ্বাসী করে তুললে চরিত্রটিকে? কোথায় লুকোলে তোমার বয়স? সে জাদুমন্ত্র তুমিই জানো! আমার মুগ্ধতা আরও কয়েকশো গুণ বেড়ে গেল!

আরও পড়ুন সাহসী প্রযোজনায় সময়ের প্রতিবিম্ব

ভালো লাগল তোমার হবু বৌমা ‘আশালতা’কে। আশালতার চরিত্রে নিবেদিতা মুখোপাধ্যায়ের গ্রাম্য সারল্য, স্বভাব চপলতা নাটকের খোলা হাওয়া। ‘কালো’ চরিত্রের বহু স্তরীয় জটিলতা সুজন  মুখোপাধ্যায়ের চোখেমুখে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। দেবশংকর হালদারের অভিনয়ক্ষমতা নিয়ে মন্তব্য করার ধৃষ্টতা আমার নেই! তবু বলি আজকাল তিনি যেন বড্ড বেশি ম্যানারিজম প্রধান! ‘উইংকল টুইংকল’, ‘রুদ্ধসংগীতে’র ম্যানারিজম যেন প্রসন্নের ভিতরেও এক ফাঁকে ঢুকে পড়ল!

sujan and debshankar
সুজন ও দেবশংকর।

জানো সুদীপ্তাদি, ‘সওদাগরের নৌকা’ দেখতে দেখতে আমার জীবনানন্দ দাশের ‘কারুবাসনা’ মনে পড়ে যাচ্ছিল। প্রসন্ন তো আর পাঁচ জনের মতো নয়। সবার মতো এক ছাঁচে ঢালা বুলি আওড়ায় না! তার কথাবার্তা যেন কেমন কেমন! অনেকটা বইয়ের লেখার মতো। তাই লোকে তাকে পাগল বলে! প্রসন্ন’র শিল্পীসত্তার সংকট, শিল্পসৃষ্টির বাসনা ও বাস্তবের দ্বন্দ্ব, সর্বোপরি সময়, সমাজ, পরিবারের কাছে আবর্জনা হয়ে যাওয়া একটি চরিত্রের যন্ত্রণা মিলেমিশে যায় হেমের কারুবাসনার অন্তর্ঘাতের সঙ্গে। আমার মনে হয় হেম যখন ঘরবাড়ি, পরিজন ছেড়ে কলকাতার রাস্তায়, ফুটপাতে, চায়ের দোকানে, ট্রামে-বাসে অবহেলায় হেঁটেচলে বেড়ায়, পুরোনো বইপত্র নেড়েঘেঁটে দেখে, ঠিক একই সঙ্গে হেমের সমান্তরালে একবার নয়, বারবার ঘর ছাড়তে প্রস্তুত হয় প্রসন্ন। সওদাগরের পাঠ আর পাবে না জেনেও নাচের ছন্দে ভিড়ে যায় যাত্রাদলে! এ কারুবাসনা নয় তো কি?

debshankar
দেবশংকর।

কিন্তু দেবেশ চট্টোপাধ্যায় মানেই তো পারফরমেন্স। সেট-কে দুমড়ে-মুচড়ে একটা চরিত্র করে তোলা। প্রপ-কে নানা কায়দায় বারবার ব্যবহার করা। তিনিই তো বাংলা নাট্যমঞ্চে সিনোগ্রাফিকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। ‘সওদাগরের নৌকা’য় সেই পারফরমেন্সে’র যেন কিছুটা ঘাটতি থেকে গেল। তাই শেষ দিকে শুধুই সংলাপের বাহুল্য! তবে আলো এবং দেবজ্যোতি মিশ্রের আবহ নাটককে জোরালো করেছে। না বলে পারছি না, সব মিলিয়ে জমজমাট আড়াই ঘণ্টা। অনেক দিন পর আবার শো, তাতেই কানায় কানায় পূর্ণ অ্যাকাডেমি! না এলে সত্যিই মিস করতাম! ‘সওদাগরের নৌকা’য় স্বপ্ন-উড়ান বাকি থেকে যেত!

তোমার পরবর্তী ডাকের অপেক্ষায় থাকলাম। ভালো থেকো। ভালো রেখো।

অময়

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here