‘রথের রশি’ ও ‘ভারত এক খোঁজ’ দুটি অঙ্গন নাটক বিচ্ছেদের প্রচেষ্টায় জল ঢেলে দেয়

0
ভারত এক খোঁজ’ অঙ্গন নাটকে মূল চরিত্রে সৌমেন সেনগুপ্ত

ছোটন দত্ত গুপ্ত

বিজ্ঞান আবিষ্কারের ধারা চলতে থাকে – প্রয়োজন ও সত্যের উৎস সন্ধানের মানসিক খিদে থেকে। সেখানে গবেষণার সময় মানুষ থাকার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু মানুষ তার ফলভোগ করে। সেখানে মানুষ আবিষ্কারের মননের চর্চার সাথে একাত্ম হয় না। কিন্তু শিল্পচর্চার মূল ভিত্তি হল সমাজের মানোন্নয়ন, সুস্থ সমাজ ও মানুষের মধ্যে সম্পর্কের শিকড় একাত্ম করে আগামী সুন্দর পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাওয়া।

নাটক তারই শাখা হয়ে, মানুষের কাছে যাবার শক্তিশালী মাধ্যম হয়। মানুষের কাছে কী নিয়ে যাবো? কী ভাবে যাবো? তা ব্যক্তি মানুষ বা দলের ওপর নির্ভর করে।
প্লেটোর ছাত্র অ্যারিস্টটল পছন্দ করতেন অনুকারী(Mimetic)নাটক। নীতিমূলক(Didactic) নাটক আবার প্লেটোর পছন্দ। নীতিমূলক নাটক এসকাইলাসের ‘Euomenides’ পেটের ভাইস – এর ‘Vietnam –Diskurs’ গোটা পৃথিবীর থিয়েটারের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময় জার্মানির হিটলার শাসনের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ব্রেখট আরো বেশি করে দর্শকের সঙ্গে সংযোগের প্রয়োজন অনুভব করলেন। প্রসেনিয়াম মঞ্চ থেকেই নাটক থামিয়ে- দর্শকদের নাট্যভাবনার সঙ্গে যুক্ত হতে বলেছেন। বাস্তববাদী এই নাট্য প্রযোজকদের তাগিদেই তৈরী হল ‘ফোর্থ ওয়াল থিয়েটার’। জনগণকে বাদ দিয়ে থিয়েটার হয় না।

তাই, আজকের ভারতবর্ষে এই সময় খুব জরুরি হয়ে পড়েছে অঙ্গন নাটক, পথ নাটক, অন্তরঙ্গ থিয়েটার, সাইকো নাটক (অভিনেতা সাইকেলে করে কয়লার শ্রমিকের বাড়ি গিয়ে নাটক করে আসেন) । যা মানুষে মানুষে সম্পর্ক তৈরি করবে। যেখানে অভিনেতা ও দর্শকদের মধ্যে দেওয়াল থাকবে না। একাত্ম হয়ে মিলেমিশে একাকার হবে। ‘সাহিত্যিকা’(শান্তিনিকেতন) সংস্থার ‘রথের রশি’ ও ‘ভারত এক খোঁজ’ দুটি অঙ্গন নাটকের বিষয়, আঙ্গিক ও আভিনয়; এই অস্থির সময়ে ভরসা ও সাহস দেয়। বিচ্ছেদের প্রচেষ্টায় জল ঢেলে দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রথের রশি’ ঘরোয়া পরিবেশে অঙ্গন আঙ্গিকে একক অভিনয় ও পরিচালনা করেন দীপ্র মজুমদার। যা দেখার মতো। রথের রশি নাটকের বিভিন্ন চরিত্র দীপ্র যেভাবে রপ্ত ও প্রয়োগ করেছেন তা শেখার মতো। প্লেটো বলেছেন, অভিনেতা নিজের দেহ ত্যাগ করে অন্যের দেহে প্রবেশ করে। অন্যব্যক্তির ব্যক্তিত্ব লাভ করে। দীপ্র একই নাটকে প্লেটো’র মন্তব্য বাস্তবায়িত করেছে। সত্যি তো মহাকালের রশি কেউ টানছে না। যে বন্ধনে টানবে তা আজ বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে আমাদের ব্যবস্থা, এই সময়। মহাকাল তো থমকে।

‘রথের রশি’ নাটকে বিভিন্ন দীপ্র মজুমদার

‘ভারত এক খোঁজ’ নাটক আরো সহজ সরল উপস্থাপনা। বিষয় তো ভীষণ প্রাসঙ্গিক ও জ্বলন্ত । কবি জয়দেব বসুর কবিতা অবলম্বনে এই নাটক। যা বর্তমান ভারতবর্ষের আয়না। যে রাষ্ট্র খেতে দেয় না সে ছলে-বলে-কৌশলে ধর্মের নামে বিভেদ ঘটায়, হত্যা করে নিজের সিংহাসন মজবুত করার জন্য। যৌনপল্লীর বেড়ে ওঠা একজন মানুষ সে জন্মভূমির খোঁজে যায়। যার মধ্যে দিয়ে আমরা বাস্তবকে সামনে দেখতে পাই। কী ভাবে বিভেদের মদতদাতা রাষ্ট্র মানুষে মানুষে হিংসা বাঁধায়। ‘ভারত এক খোঁজ’ নাটকে মূল চরিত্রে সৌমেন সেনগুপ্তকেও আমি প্লেটোর বক্তব্যের বাস্তব রূপ বলব। সৌমেনের গানও বেশ। পাঠকের অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে কিন্তু জানেন তো একটা দল মানসিকভাবে চর্চা করলে প্রত্যেক সদস্যই এই কাজটি করতে পারেন। কমিউন হলেই তা সম্ভব। এরকম বহু অজানা নাটকের দল আছে যাদের মধ্যে এরকম পারফর্মার পাবেন। তাঁদের খুঁজতে হবে। ‘ভারত এক খোঁজ’ নাটকে সৌমেন ছাড়াও আরো চারজন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যে অভিনয় করেছেন তারাও কিন্তু সমান দক্ষ।

দুটো প্রযোজনার- বিষয়ক নির্বাচন, মিউজিক, পোশাক, গানের ব্যবহার ও অভিনয়ে পরিমিতি বোধ আছে পরিচালকের। ‘রথের রশি’র মিউজিকে কোথাও খামতি মনে হলেও ‘ভারত এক খোঁজ’ এ ঠিকই আছে। তবে ‘রথের রশি’ নাটকে রাবীন্দ্রিক ফর্মে নৃত্য ব্যবহার, কিছুটা হলেও নাট্য-টোনের বলিষ্ঠতা হারিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা বলেই এই নৃত্যফর্ম ব্যবহার করতেই হবে, শিল্পে এরকম বাধ্য-বাধকতা ভাবনায় থাকলে তা মহাকালের রথের চাকার গতি শ্লথ করে।

------------------------------------------------
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.