সেবা-সম্মান-সংহতি, সার্থক ‘স্পর্শ’-এর মূল মন্ত্র

0
special guests in the programme
'স্পর্শ'-এর অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথিরা। নিজস্ব চিত্র।

কলকাতা: খুন, ধর্ষণ, গণপিটুনি, রাজনৈতিক হানাহানি, জাতপাত-ধর্ম নিয়ে সংঘাত, পরিবেশ দূষণ, পৃথিবী ক্রমশ জলশূন্য হয়ে যাওয়া, নিজেদের ধ্বংস ত্বরান্বিত করা – চারিদিকে মন খারাপ করা খবর। আর এত খারাপ খবরের ভিড়ে হারিয়ে যায় ভালো খবরগুলো। কথায় বলে না, খারাপ খবর অতি দ্রুত পৌঁছে যায়। আর ভালো খবর সৃষ্টির কারণ যাঁরা, তাঁরা যদি প্রচারের আড়ালে বিচরণ করেন তা হলে তো সেই খবর পাওয়া আরও দুষ্কর হয়ে ওঠে।

তবে রয়েছে ‘স্পর্শ’। যাঁরা ভালো খবর সৃষ্টির কারণ হয়েও পাদপ্রদীপের আলো থেকে দূরে থাকেন, বা দূরে থাকতে পছন্দ করেন, তাঁদের খুঁজে আনে ‘স্পর্শ’। আর শুধু খুঁজেই আনে না, তাঁদের সম্মানিত করে ধন্য হয়।

প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা।

এই মানুষগুলো, সংগঠনগুলো লড়ে যাচ্ছেন সমাজকে আরও সুন্দর করার জন্য, সমাজকে আর একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আর এই ইতিবাচক প্রয়াস বা উদ্যোগে তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের এগিয়ে আসতে দেখে ভরসা জাগে সমাজের – তা হলে এখনও সব কিছু ফুরিয়ে যায়নি।

এ রকমই এক গুচ্ছ লড়াকু, ব্যতিক্রমী মানুষ আর সংগঠনকে সম্মানিত করা হল ‘স্পর্শ’-এর অনুষ্ঠানে। কলকাতা সাক্ষী থাকল এক বিরল সমাবেশের।

বক্তৃতা করছেন ‘স্পর্শ’-এর সভাপতি সুজিত চক্রবর্তী।

শনিবার সন্ধ্যায় মধ্য কলকাতার সুবর্ণবণিক সমাজ হলে তাদের ষষ্ঠ বর্ষপূর্তির ‘হর্ষ’ অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘স্পর্শ’। এই মঞ্চেই সম্মান জানানো হল সমাজের বেশ কিছু যোদ্ধাকে। এঁদের মধ্যে সব বয়সের যোদ্ধাই ছিলেন – একেবারে কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্ক পর্যন্ত।

তালিকায় আছেন ২১ বছরের সায়নী দাস, যিনি সম্প্রতি ৩৩ কিমি দীর্ঘ ক্যাটালিনা প্রণালী ১৩ ঘণ্টার  সাঁতরে পার হয়েছেন। এই সায়নীই বছর দুয়েক আগে ইংলিশ চ্যানেল জয়ী হন। রয়েছেন এভারেস্টজয়ী শেখ সাহাবুদ্দিন। সম্মানিত করা হল কালনার পাঁচ টাকা ভিজিটের ডাক্তার গৌরাঙ্গ গোস্বামীকে, যাঁর নেশাই হল রোগী দেখা, যত রাতই হোক, তাঁর চেম্বার থেকে কেউই ফিরে যান না। তালিকায় রয়েছেন প্রসেনজিৎ গোস্বামী যিনি ৩৭ বছর ধরে অবলা অসহায় মৃত্যুমুখী পথপশুদের জীবনদানের মতো সেবামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্মানিত করা হল দমদমের ‘গাছ-দাদু’ পার্থসারথি গাঙ্গুলিকে, যিনি প্রতিবেশীদের কাছ থেকে প্লাস্টিক সংগ্রহ করে তাতে গাছ লাগিয়ে তাঁর অঞ্চলের সবুজায়ন করছেন।

কিংবা দিলীপ কুমার করণের কথাই ধরা যাক। সমাজের একেবারে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির ছেলেমেয়েরা কী ভাবে বেপথু হয়ে গিয়ে সমাজবিরোধী তৈরি হয়, তা নানা ভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে ওই সব শিশুদের ভোকাট্টা জীবনে আলো দেখানোর জন্য দক্ষিণ ২৪ পরগণায় গড়েছেন সূর্যনগর আনন্দমন আশ্রম। একাধিক শিশু-কিশোর, প্রাপ্তবয়স্ক নারীপুরুষ, প্রতিবন্ধী মানুষের ঠিকানা এই আশ্রম। শুধু বাসস্থানই নয়, অন্ন বস্ত্রের ব্যবস্থাও করেছে এই প্রতিষ্ঠান। সেই সঙ্গে গড়া হয়েছে একটি স্কুল। ‘স্পর্শ’ সম্মানিত করল দিলীপবাবুকে।

গাছই এখন এই পৃথিবীর সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার মুল ওষুধ। সে কথা মনে রেখেই ‘স্পর্শ’-এর তরফে প্রত্যেক অতিথিকে দেওয়া হল চারাগাছ।

‘স্পর্শ’ সম্মানিত করল মহম্মদ জালালুদ্দিন গাজীকে। দারিদ্র্যের জন্য স্কুলে যাওয়া হয়নি। তার বদলে কিশোর বয়স থেকে রিকশার প্যাডেলে পা। রিকশা থেকে ট্যাক্সি। কিন্তু স্বপ্নটা বরাবরই দেখতেন। স্কুলে যেতে না পারার দুঃখটা ভুলতে চেয়েছেন দুঃস্থ শিশুদের স্কুল গড়ে। যে স্কুল শুরু হয়েছিল ১৬ জন ছাত্র আর ২ জন শিক্ষক দিয়ে, সেই স্কুল আজ দাঁড়িয়ে আছে ৫ বিঘা জমির ওপর ৪০০ ছাত্রছাত্রী আর ১৬ জন শিক্ষক নিয়ে।

নামে আর কাজে এত মিল দেখা যায় না। বিখ্যাত ফুডচেনে কর্মরত পথিকৃৎ সাহা খাবারের বাতিল অর্ডারে পথশিশুদের পেট ভরাচ্ছেন। আজ তাঁর নাম হয়েছে রোলকাকু। অথবা সায়ন চক্রবর্তীর কথাই ধরা যাক। তিনিও বিখ্যাত এক ফুডচেনে কর্মরত। প্রতি দিন যে খাবার উদ্বৃত্ত হয় রাতে সেই খাবার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পথবাসীদের খাইয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি। ‘স্পর্শ’ সম্মানিত করল এঁদেরও।    

‘স্পর্শ’ এ দিন আর যাদের সম্মানিত করল তাদের মধ্যে রয়েছে ‘স্বপ্নের কারখানা’, ‘পদক্ষেপ’ (ব্যারাকপুর), ‘পদক্ষেপ’ (কলকাতা), ‘প্রয়াস’ এবং ‘রামধনু’। দরিদ্রদের জন্য কম্বল, সোয়েটার, ইত্যাদি নিয়ে পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যায় ‘স্বপ্নের কারখানা’। জমি কেনা হয়ে গিয়েছে, এ বার তারা স্কুল গড়বে দুস্থদের জন্য। ‘পদক্ষেপ’ (ব্যারাকপুর) পৌঁছে যাচ্ছে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে দুস্থ শিশুদের জন্য শিক্ষার সামগ্রী নিয়ে। শুধু তা-ই নয়, সরবরাহ করেছে খাবার, পোশাকও। সুন্দরবন থেকে পুরুলিয়া – রাজ্যের প্রত্যন্ত সব জায়গায় পোশাক-আশাক, খাবারদাবার, কম্বল, মুসুরি ডাল, স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে দরিদ্র মানুষদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে ‘পদক্ষেপ’ (কলকাতা)। ঠিক এ ভাবেই শয়ে শয়ে দরিদ্র মানুষের কাছে নতুন জামা, আর খাবার নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে ‘প্রয়াস’। আর হালিশহরের ৭৫ জন যুবককে নিয়ে গড়া ‘রামধনু’ গড়েছে হেঁশেল, যার সাহায্যে সেই সংস্থা রোজ ১০০ জন নিরন্ন মানুষকে অন্ন জোগাচ্ছে। এ বার তার লক্ষ্য ১২৫ জনের অন্নের ব্যবস্থা করা।

অনাথ শিশু-কিশোরকিশোরীদের হাতে ‘স্পর্শ’-এর তরফে তুলে দেওয়া হল পুজোর পোশাক।

কিন্তু ‘স্পর্শ’ নিজে বসে থাকে না। তার কাজ যে শুধু সমাজকে যে বা যাঁরা অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসছেন তাঁদের সম্মানিত করা তা নয়, তারা নিজেরাও নিয়ত সমাজসেবায় মেতে আছে। নানা ভাবে নিয়মিত সাহায্য করে যাচ্ছে রামকৃষ্ণ অনাথ ভাণ্ডারকে। এ বার তারা অনাথ ভাণ্ডার-এর শিশু-কিশোরকিশোরীদের জন্য পূজার পোশাক কিনে দিয়েছে। আর সেই কাজ করতে ‘স্পর্শ’কে সাহায্য করেছে ১৩ বছরের পূর্ণাশা। সমাজের জন্য যে কিছু করা উচিত, সেই বোধ তার মধ্যে এখনই চারিত হয়ে গিয়েছে। তাই টিফিনের পয়সা জমিয়ে সেই অর্থ ‘স্পর্শ’-এর হাতে তুলে দিয়েছে ক্লাস এইটের ছাত্রী পূর্ণাশা চট্টোপাধ্যায়।   

আরও পড়ুন: প্রকাশিত হল স্বামী সম্বুদ্ধানন্দের কথায় ও সুরে শান্তনু রায়চৌধুরীর সিডি ‘পূজাঞ্জলি’

এ দিন বিশেষ অতিথি হিসাবে ‘স্পর্শ’-এর এই ক্রিয়াকর্মের সাক্ষী থাকলেন রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠের স্বামী আত্মবোধানন্দ, বেঙ্গল অর্গান ডোনেশন সোসাইটির (বিওডিএস) চেয়ারম্যান ডা. সৌরভ কোলে, ডা. শুভাশিস গুহ, ডা. সুজিত কুমার ব্রহ্মচারী, কলকাতা পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার বুদ্ধদেব মুখার্জি প্রমুখ। প্রধান অতিথি হিসাবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক শম্ভু সেন। এ ছাড়াও মঞ্চে ছিলেন ‘স্পর্শ’-এর সভাপতি সুজিত চক্রবর্তী, কার্যকরী সভাপতি রঞ্জন সিনহা, মুখ্য উপদেষ্টা কলকাতা পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগের ওসি শান্তনু চট্টোপাধ্যায়, চিফ মেন্টর রাজেশ চন্দ্র এবং সংস্থার দুই উপদেষ্টা রোহিত কুমার ইউ. শুক্লা ও রবীন্দ্রনাথ মল্লিক।

‘স্পর্শ’-এর এই প্রয়াসকে সাধুবাদ জানালেন প্রত্যেক অতিথিই। তাঁরা কামনা করলেন, এ ভাবেই আরও এগিয়ে যাক ‘স্পর্শ’। সমাজের আরও অন্দরে, আরও অন্তরে পৌঁছে যাক তারা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সমস্ত অতিথিকে বরণ করেন ‘স্পর্শ’-এর সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার দে। সমগ্র অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন প্রজ্ঞা মুখোপাধ্যায় ও সাম্য কার্ফা। ‘স্পর্শ’-এর মূল মন্ত্র সেবা, সম্মান, সংহতি। এ দিনের অনুষ্ঠান তারই জাজ্বল্য প্রমাণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here